নির্বাচনের হাত থেকে গণতন্ত্রের মুক্তি চাই!

Send
ড. রাহমান নাসির উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৮:৪১, এপ্রিল ০১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৪, এপ্রিল ০২, ২০১৭

রাহমান নাসির উদ্দিনযেকোনও নির্বাচন এলেই আমাদের গণতন্ত্রকেন্দ্রিক চেতনা হঠাৎ জেগে ওঠে। আমরা নির্বাচনকে গণতন্ত্রের গুণগত মাপকাঠি হিসেবে চিন্তা করি। সংবাদপত্রের কলামের অবিরাম বিশ্লেষণ আর বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোর আলোচনার বদৌলতে নির্বাচন আমাদের মধ্যে এ গণতান্ত্রিক বোধ ও মৌসুমি চেতনা সৃষ্টির পেছনে বিরাট ভূমিকা পালন করে। আমি নিজে অভ্যাসবশত যেকোনও নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি ফল পর্যব্ক্ষেণ করার পাশাপাশি মৌসুমি চেতনা গভীরভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। দীর্ঘদিনের আন-ক্রিটিক্যাল চর্চা ও সুশীলদের অবিরাম বয়ানের ফলে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ‘নির্বাচন’ আর ‘গণতন্ত্র’ মোটামুটি একই জিনিস। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন, নির্বাচন-উত্তর প্রতিক্রিয়া দেখে ‘নির্বাচন ও গণতন্ত্রের আন্তঃসম্পর্ক’ নিয়ে আমার ‘বদহজম’ জাতীয় চিন্তাভাবনা মাথার মধ্যে নতুন দর্শন নিয়ে হাজির হয়েছে।এখানে সংক্ষেপে সেটা পেশ করছি।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, গণতন্ত্রের নিত্য-বিলাপকার আমাদের রাজনীতিবিদদের প্রথম মাস্টার মশাই আব্রাহাম লিংকন। তিনিই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা শিখিয়েছেন, অন্তত কথায় কথায় এদেশের রাজনীতিবিদরা লিংকনের সংজ্ঞা যেভাবে ‘পাইকারিহারে’ উদ্ধৃত করেন, তাতে এ রকম মনে হওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর রাজনীতিবিদরা তাদের মাস্টার মশাইয়ের যোগ্য শিক্ষার্থী হিসেবে এদেশের জনগণকে নিয়মিত পাঠ দিয়ে গেছেন ‘গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণেরই শাসন’ (ডেমোক্রেসি ইজ এ গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল বাই দ্য পিপল অ্যান্ড ফর দ্য পিপল।)
রাজনীতিবিদরা তাদের মাস্টার মশাইয়ের দেওয়া সংজ্ঞামতো কতটা কাজ করেছেন, তা স্বাধীনতা-উত্তর প্রায় পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এদেশের মানুষ ক্রমান্বয়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। গণতন্ত্র ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছে নির্বাচনকেন্দ্রিক এক ধরনের রাজনৈতিক টুর্নামেন্ট, যেখানে শাসক শ্রেণির দু’টি বিবদমান পক্ষ লড়াই করে, দরকার  হলে  জনগণ ‘আমার ভাই, তোমার ভাই’ বা ‘আমার বোন, তোমার বোন’ বলে মিছিল করে, গলা ফাটায় আর নির্বাচনের দিন লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেয়। আর এ টুর্নামেন্টের এক পক্ষ জেতে শাসন ক্ষমতায় আসীন হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত পক্ষ শাসনের অধিকার লাভ করে। এরপর যে জনগণ ভোট দিয়ে শাসকশ্রেণির একদলকে নির্বাচন করে তারা প্রথমেই জনগণের কথা ভুলে যায়। তাই নির্বাচনে জয়-পরাজয় হিসাব করে জনগণের জীবনমানের তেমন কোনও উন্নতি হয় না। ফলে নির্বাচনের বিবাদমান শাসকশ্রেণির প্রতিনিধিদের মধ্যে কে জেতে বা কে হারে, সেটা যাই হোক না কেন, জনগণই যে শেষ বিচারে পরাজিত হয়, এতে কোনও সন্দেহ নেই। অন্তত ইতিহাসের অভিজ্ঞতা আমাদের জনগণের এ-পরাজয়ের পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়। 

যদি নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকেই সত্যিকার গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে বলে ধরে নেই, তাহলে এ নির্বাচন এবং এর সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাই। আমি পত্রিকান্তরে লিখেছি, ‘‘বিগত দুই দশকের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর পাঁচ বছর পর পর একটি জাতীয় নির্বাচন প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। অবস্থা এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র আর গণতন্ত্র মানেই নির্বাচন। এদেশের রাজনীতিবিদ, দলীয় বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের লোকজন পাবলিককে মোটামুটি এটা গিলিয়ে ছেড়েছে যে, ‘গণতন্ত্র মানে হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্বাচন’। আমরা এখন বুঝি, পাঁচ বছর পর পর শাসকশ্রেণির লোকদের হাতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবার নাম হচ্ছে গণতন্ত্র। আমরা পাবলিকরা রাজনীতিবিদদের এ গণতান্ত্রিক দাওয়াই খেয়ে এবং দলীয় বুদ্ধিজীবী অবিরাম লেকচারের ভেতর দিয়ে বেশ শিক্ষিত হয়ে উঠেছি, কেননা আমরা এখন সত্যিকার অর্থেই জানি গণতন্ত্র মানে কী! পাঁচ বছর পর পর একটা করে ভোট দিয়ে একটি নির্দিষ্ট দলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হচ্ছে গণতন্ত্র এবং প্রয়োজনে পাঁচ বছর পর আরেক দলকে ক্ষমতায় বসাব। কেননা জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস; ক্ষমতা হাতে থাক বা না থাক সংবিধানে তো আছে! রাষ্ট্রের মালিক জনগণ! সুতরাং এ রাষ্ট্রকে লুটপাট করার দায়িত্ব কাকে দেবে সেটা জনগণ ঠিক করবে! পাবলিক ভোট দিয়ে রাষ্ট্রকে একটি রাজনৈতিক দলকে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় বসাবে আর পরবর্তী পাঁচ বছর জীবনের ঘানি টানতে টানতে হা-পিত্যেস করে অপেক্ষা করবে, যেন মেয়াদান্তে আরেকটি ভোট দিতে পারে। যেন গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে! গণতন্ত্রের নামে এর চেয়ে নির্মম তামাশা আর হতে পারে না!’’

একটি বড় উদ্ধৃতি দেওয়ার কারণ হচ্ছে, গণতন্ত্র আর নির্বাচনের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে আমার চিন্তাভাবনাগুলো কিভাবে পাঁচ বছর পরও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক তার একটি কানেকশন তৈরি করা। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয়। একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচন প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের একটি বৈশিষ্ট্য মাত্র, যার ভেতর নিয়ে শাসন ব্যবস্থায় জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। কিন্তু তাই বলে, নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো এবং নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে জনগণকে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বিশেষ করে মূলত প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল বা জোট, যে দলগুলো এদেশের শাসকশ্রেণির একচ্ছত্র প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে থেকেই একজনকে বেছে নিতে হয়। ফলে এ মনোনয়নে জনগণের ইচ্ছার কোনও প্রতিফলন ঘটে না। নির্বাচনের মনোনয়নের ক্ষেত্রেও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং এলাকার মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার চেয়ে দলীয় দাসত্ব, নেতার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য এবং অর্থ-পেশির জোর অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে যেখানে পুরো নির্বাচনের মনোনয়ন প্রক্রিয়াটাই চৌদ্দ আনা অগণতান্ত্রিক, সেখানে কিভাবে নির্বাচন আর গণতন্ত্র এক হয়! এ রকম একটি ভাবনার পাটাতন তৈরি করে যদি আমরা কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে একটি ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে হাজির হয়।  

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে বিএনপি'র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। সুতরাং টকার-সুশীল আর নির্বাচন-বিশেষজ্ঞরা এর একটা তরল বিশ্লেষণ দাঁড় করাচ্ছেন এভাবে—আওয়ামী লীগ হারলেও গণতন্ত্রের জয় হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রমাণিত হয়েছে। তার অর্থ দাঁড়ায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আওয়ামী লীগকে হারতে হবে। আর আওয়ামী লীগ হারলেই কেবল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রমাণিত হয়। এ বিশ্লেষণের মধ্যে যেমন রাজনৈতিক চাতুরতা আছে, তেমনি আছে একটা ভয়াবহ রাজনৈতিক শঙ্কা। কেননা এ বিশ্লেষণের বিপ্রতীপ চেহারাটা তখন এ রকম দাঁড়ায়—যদি আওয়ামী লীগ জিততো, তাহলে গণতন্ত্র পরাজিত হতো আর নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হতো। সুতরাং আওমী লীগকে পরাজিত হয়েই বিএনপির আস্থা অর্জন করতে হবে। আমার কাছে পুরো চিন্তাপ্রক্রিয়াটাই একটা ভয়াবহভাবে অগণতান্ত্রিক বলে মনে হয়। কেননা নিজের পরাজয় দিয়ে প্রতিপক্ষের বাহবা কুঁড়ানো যেমন হাস্যকর,  আবার আবার কুসিকের মতো নির্বাচনের জয় দিয়ে প্রতিপক্ষকে ‘নিরপেক্ষতার সার্টিফিকেট’ বিলানোও রাজনৈতিক অজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক-দর্শনের ফকিরিপনা বলে মনে হয়। আসলে আমরা এখনও গণতন্ত্রের জয়-পরাজয় কিসে এবং কিভাবে হয়, সেটাই বুঝলাম না। গণতন্ত্রের জন্য কেবল বিলাপই করলাম, আর ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ বলে উদোম গায়ে রাস্তায় মরলাম! অথচ নির্বাচনের চিপায় গণতন্ত্রকে ঠেলে দিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রকে টানছি, আর নির্বোধের মতো নির্বাচনকেই গণতন্ত্র মানছি। এটা আমাদের এক বিরাট রাজনৈতিক দৈন্য! হয়তো আমাদের বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাজীবীদের এরকম দৈন্যের উপলব্ধি থেকেই আহমদ ছফা ১৯৭২ সালে বলেছিলেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলেন, তা শুনলে এদেশ স্বাধীন হতো না; আর বুদ্ধিজীবীরা এখন যা বলছেন, তা শুনলে এদেশের মানুষের কোনোদিন সত্যিকার মুক্তি আসবে না’। তাই নির্বাচন আর গণতন্ত্রকে সমার্থক করে যে ‘বড়ি’ আমাদের উদ্বিগ্ন নাগরিক, উত্তেজিত সুশীল, দলীয়-টকার এবং নির্বাচন-বিশেষজ্ঞরা আমাদের নিত্যসেবন করে চলেছেন, তা শুনলে এবং মানলে এদেশে মানুষ কোনও দিন সত্যিকার গণতন্ত্রের চেহারা দেখতে পাবে না। তাই প্রথমেই নির্বাচনের হাত থেকে গণতন্ত্রের মুক্তি জরুরি।   

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ