অপূর্ণতায় পূর্ণ এক মানুষ লাকী আখন্দ

Send
ফাহমিদা নবী
প্রকাশিত : ১৪:১৯, এপ্রিল ২৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪০, এপ্রিল ২৫, ২০১৭

ফাহমিদা নবীমন কী যে চায় হিসেব ছাড়া...!
কতটুকু পাওয়া হলো ....?
সেই হিসেবের খাতা বাকি রেখে চলে গেলেন গান পাগল প্রিয় লাকী চাচা...!
কত কী বাকি ছিল- কথা ছিল কোনও একদিন পাহাড়ের চূড়ায় বসে, হাতে গিটার, জ্বলন্ত কাঠ কয়লা-চুলায়, ঝুলন্ত কেটলিতে চা তৈরি হবে সাথে প্রিয় গানের মানুষগুলোকে নিয়ে গান তৈরি করবেন। গান হবে, আড্ডা হবে, সাথে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক... আহা কী দারুণ...! মেঘ চাদর গায়ে জড়িয়ে গানের সঙ্গে মিশে একাকার হবে। আরও কত কী...
শিল্পীর ভাবনা তো এমনই... কিংবা কোনও দ্বীপে বসে পুরো মিউজিক দল মিলে প্র্যাকটিস চলবে প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে সুর যাবে ছড়িয়ে...!
কী চমৎকার... এই ভাবনাগুলো লাকী চাচাকে কখনও কখনও নির্বাসনে নিয়ে যেতো।
শিল্পী তো এমনই... আমাদেরও এমন ইচ্ছে করে শুধু গান গাই... সৃষ্টিতে মেতে থাকি... এমনই লাকী চাচাকে দেখেছি, জেনেছি শেষ দিন পর্যন্ত।

সংগীত ভাবনা তাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। মনের কত বড় জোর। কতটা সাহস, কতটা একরোখা চমৎকার স্বপ্ন লালন করেছেন! শিল্পীর কাজই তো স্বপ্ন দেখানো। সেই স্বপ্ন ধারণ করেছিলেন বলেই হয়তো অসুস্থতার সময়টুকুতে হার না মেনে সবাইকে স্বপ্নের কথাই বলেছেন। ব্যথাকে ব্যথা মনে করেননি। বরং ভাবিয়েছেন কত কী করার আছে। চলে যেতে হবে জেনে গেলে...কেউ কেউ সাহসী যোদ্ধা হয়ে যায়...। মুক্তির যুদ্ধ... ভালোবাসায় বন্দী থাকার বিদায় যুদ্ধ।

লাকী চাচাকে এক হিসেবে, জীবনের আয়োজনের পূর্ণতায় এক অজানা পরিপূর্ণতার আলোকে দেখতে পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে সেই ছোটবেলা থেকেই যেমনটা লাকী চাচা, হ্যাপী চাচাকে দেখেছি যা ভালোবাসতেন, তাই করতেন। শিল্পী মানুষের মন যেমন হয়, ঠিক তেমনই কখনও অনেক আবেগ, কখনও উদাস, কখনও বা গানের জন্য ঝটপট হিসাব মিলিয়ে ফেলতে পারার বিশাল ক্ষমতা ছিল লাকী চাচার। যখন মনে হয়েছে গান তৈরি করবেন তখনই গান তৈরি করে ফেলেছেন। এবং সেক্ষেত্রে গানের কথা, সুর, গায়কী কোনোটাতেই তৃপ্তির ছাড় দেননি। সেটা যেন শ্রোতারই মনের কথাগুলোই তিনি বলে দিচ্ছেন গল্পের মতো সুরে সুরে। সেই সাথে আমি অবশ্যই বলতে চাই, একটি রুচিশীল সভ্য সমাজ গঠনের। কাজটাই করেছেন কারণ গানের কথা সুরের মধ্যে যেমন আধুনিকতার ছাপ তেমনি মধ্যশ্রেণির সংস্কৃতির সাধারণ চাওয়াকেই বলতে চেয়েছেন।

শিল্পীর অভিমান তার একটা অলংকার, অভিমান ছাড়া শিল্পী কোনও সৃষ্টিতে মেতে থাকতে পারে না। লাকী চাচা অনেক ভালোবাসা পেয়েই ফিরে গেছেন সৃষ্টিকর্তার কাছে। তার গান শ্রোতা ভালোবাসে, তাকে গানে গানে মনে রাখবে সবাই। বাকি যে অধিকারের জায়গা নিয়ে প্রশ্ন অনেক তা আমাদের প্রত্যেক শিল্পীর জন্যই একই প্রশ্ন- রয়েলিটি বা ন্যায্য অধিকার। সে নিয়ে আর না কথা বলি।

সুন্দর একটা ছোট্ট জীবনে লাকী চাচা যা দিয়েছেন তা দিতে অনেক সাধনার প্রয়োজন। এই সংগীত অঙ্গনের যারা আছি তারা যদি সেই দিয়ে যাওয়া রুচিশীল গানগুলো গাইতে পারি সঠিকভাবে তাতে করে শেখা এবং শুদ্ধ চর্চাও হবে আর শ্রোতারাও তাদের প্রিয় শিল্পীকে বারবার ফিরে পাবে গানে গানে।

লাকী চাচার গান গাইতে গিয়ে শিখেছি কঠিন গান সহজ করে গাইবার অনুভূতি। যেমন করে লাকী চাচা আমার বাবার গায়কী দেখে তাকিয়ে থাকতো মুগ্ধতায়। লাকী চাচা আপনার পূর্ণতা এখানেই, সবাই আপনার সুর, দান রুচিশীলতাকে শ্রদ্ধা করে যতটুকু অপূর্ণতা তা শিল্পীর জীবনের একটা অংশ। অপূর্ণতা তো শিল্পীকে শিল্পী বানায়।

নিশ্চয়ই হ্যাপী চাচার দেখা পাবেন কিংবা আমার বাবার- বলবেন সবাই তাদের সবসময় মনে করে।

বাকিটা জানি না, জানেন আমাদের সৃষ্টিকর্তা।

লাইচা যেখানেই থাকেন ভালো থাকবেন...

ইতি,
নূমা

লেখক: সংগীত ব্যক্তিত্ব

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ