আমার শৈশব কেন এত নোংরা ছিল মা?

Send
বিথী হক
প্রকাশিত : ১১:১৯, মে ১৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০১, মে ১৬, ২০১৭

বিথী হকমায়ের চোখে স্বতন্ত্র এক রকমের ভাষা আছে, স্বরযন্ত্রের ব্যবহার ছাড়াই প্রত্যেক সন্তান সে ভাষা বোঝার ক্ষমতা অর্জন করে থাকে নাড়ির সূত্রেই। আমিও মায়ের চোখের দিকে তাকালেই বুঝতাম, এখন মা আমাকে ঘরে যেতে বলছেন, খেতে বলছেন, আর একটি বার কিছু বললে আমার জিহ্বা কেটে দেওয়ার ঈঙ্গিত দিচ্ছেন বা আর এক পা এগুলেই আজকের পর আমার এক পা ছাড়াই হাঁটতে হবে বুঝিয়ে দিচ্ছে মায়ের চোখ। কিন্তু এখন তো দিন বদলেছে। সাহসও হয়েছে কয়েক ছলক।
আজকে তাই বুকে বল নিয়ে তরকারি কাটাকুটি করতে থাকা মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম—মা, তোমার কী মনে হয়, তোমার কড়া শাসনে আমার জীবনটা খুব নির্ঝঞ্ঝাট কেটেছে? কোনও হয়রানি ছাড়া বেশ সুন্দর শৈশব কেটেছে আমার? মা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আমার প্রশ্ন গিলে জিজ্ঞেস করলো, মানে? আজ এত বছর পর কী বলতে চাও? আমি ঢোক গিলে বললাম, নয়/দশ বছর বয়সের আমি ফেরিওয়ালার বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে চুড়ি কেনার সময় দাড়িওয়ালা ইসলাম-ধর্মের শিক্ষক যখন আমার গলায় নোংরা করে হাত বোলাচ্ছিল, পিঠের অনাবৃত অংশে সাপের মতো এঁকেবেঁকে হাত দিচ্ছিল তখন কিছু বলোনি কেন? কেন তখন শুধু আমার চোখের দিকে রাগী দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়েছিলে? কেন তখন কিছু না বলে বাড়ি ফিরে বকা দিচ্ছিলে? তোমার কি ধারণা যৌন হয়রানি নিয়ে আমার তখন বিশাল জ্ঞান ছিল? কেন ওই অমানুষকে দুঘা না লাগিয়ে আমার শরীর নিয়ে মিথ্যে কথা বলেছিলে? কেন বলোনি ওভাবে শরীরে হাত দেওয়ার অধিকার কারো নেই? কেন এসব লুকিয়ে বার বার আমাকে বিদঘুটে পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছ?
তুমি জানো ওই ব্যক্তিটি ক্লাসে ঢুকেই মেয়েদের পেটে বুকে খোঁচা দিয়ে বলতো, এবার তুই পড়া বল! তুমি জানো ওই শিক্ষক নামের মানুষটি ক্লাসে মেয়েদের বুকের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলতো, বুকের ভেতর ও দুটো কী! মেয়েরা তখন স্কার্ফ-বেল্ট ঠিক করতে থাকলে ব্ল্যাকবোর্ডে ই্ংরেজিতে BOOK লিখে ডাবল ওর নিচে আন্ডারলাইন করে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতো। মা, তুমি জানতে সেই লোকটা ক্লাসে একদিন বলেছিল, মেয়েরা কখনও সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা বসতে পারে না। কারণ তাদের সামনের দিকে সবসময় ভার থাকে। মা আমি বিশ্বাস করেছিলাম, মেয়েরা কখনও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না! তুমি আমাকে কেন কোনও দিন শেখাওনি, যে কেউ আমার শরীর নিয়ে চাইলেই কথা বলতে পারে না। বললে তার উত্তর দিতে হবে। কেন শেখাওনি কেউ নোংরা কথা বললে কিভাবে জবাব ছুড়ে দিয়ে কারও মুখ বন্ধ করতে হয়? তোমার কী মনে হয়েছিল, খুব স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছি আমি? তোমার কি মনে হতো আমার সঙ্গে খারাপ কিছুই ঘটছে না? আমাকে মুখ খুলতে না শিখিয়ে কেন শিখিয়েছিলে, নীরবতা মঙ্গল না করিলেও ক্ষতি করে না! তোমার কি সত্যিই মনে হয় আমার কোনও ক্ষতি হয়নি?

দিনের পর দিন এমন সব নোংরা কথা আর নোংরা পরিবেশে বাড়তে বাড়তে চারপাশের গন্ধ আমার নাক সওয়া হয়ে গিয়েছিল ভেবে কোনোদিনই জানতে পারোনি নাকে কাপড় না দিয়ে, গন্ধে বমি না করে কোনও রকমে বড় হচ্ছি প্রকৃতির মতোই। মা, তুমি তো জানতে ছোটবেলায় আমার মুখে কথা ছিল না। হ্যাঁ বা না কিছুই বলতে পারতাম না কাওকে। জানতাম না মানুষের সঙ্গে কিভাবে মিশতে হয়, কথা বলতে হয়, কতটুকু কথা অন্যকে বলতে হয়। জানতাম না বলে কখনও আমাকে জানানোর প্রয়োজনও মনে করোনি?

কেন হাজার হাজার মণ কথার বস্তা কাঁধে নিয়ে কুঁজো হয়ে আমাকে হাঁটতে হতো মা? কেন কুঁজো হতে হতে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার সময় আমাকে আবার বেঁচে ওঠার তাগিদে, নিজেকে রক্ষা করার জন্যে কথা বলতে শিখতে হয়েছে? গলা খুলে চিৎকার করতে শিখতে হয়েছে। কথা বলার জন্যই শুধুমাত্র দ্বিতীয়বার আমাকে কেন জন্ম নিতে হয়েছে? দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পর, অসংখ্যবার ঠকে গিয়ে না বলতে শিখতে হয়েছে মা?  কেন শেখাওনি চলার পথে কাঁটা আসলেই তা উপড়ে ফেলতে হয়, নয় তো একই কাঁটা বার বার আঘাত দেবে। বার বার রক্তে লাল হবে মাটি আর পথ। তাই কাঁটা তুলতে তুলতে এগুতে হয়। কেন কোনও দিন বলোনি মেয়েদের জন্য সব কাঁটা ফুলের মতো দেখতে হয়। কিন্তু হাঁটতে গেলে পায়ে বিঁধে। ক্ষত-বিক্ষত হয় সারাশরীর। এ কাঁটা তাই যত্ন করে তুলতে হয়! কেন বলোনি নারীদের রক্ত ঝরাতেই হয় আজীবন?

ইসলাম শিক্ষার স্যার হোক বা গণিতের স্যার হোক, সবার কাছেই নারীর শরীর একটি আলাদা শরীর। বলো মা, কেন আজ এত বছর পেরিয়ে এসে তোমার চোখে চোখ রেখে পুরনো হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে? তুমি কি সত্যিই কোনও দিন বোঝোনি আমার মনের ভেতর সারাক্ষণ ঝড় বয়েছে? ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া ঝড়ে স্যারের কুঁজো-তত্ত্ব আমাকে পিঠ সোজা করে দাঁড়াতে দেয়নি। লম্পটটার হলদে-সাদা দাঁত আমার মতো অসংখ্য মেয়েকে রাতে ঘুমানোর আগে বিরক্ত করে, বিব্রত করে, জানতে পেরেছিলে কোনও দিন? কত মেয়েরা তার কু-দৃষ্টি এড়াতে দিনের পর দিন ক্লাসে না এসে, ভালো মার্ক না পাওয়ার কথা জেনেও মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থেকেছিল। অনেকে তো হেরেও গেছে মা। আমিও যদি সে রকমই জীবনযুদ্ধে হেরে বসে থাকতাম, তবে আজ এই প্রশ্নগুলো তোমার চোখে চোখ রেখে করার সুযোগ পেতাম না। তখন কি তুমি জানতে লোকচক্ষুর আড়ালে এই আমি এত এত ঘটনার সিন্দুক মগজে রেখে বুকে ভার নিয়ে কতটা পথ হেঁটেছি। স্যারের মতো অসংখ্যা কাক কর্কশ স্বরে ডেকে গেছে পথরোধ করতে, নোংরা করে গেছিল হাঁটা সব পথঘাটগুলো। সে নোংরা হয়ে যাওয়া পথে চোখ মুখ বুজে হেঁটে না পার হতে পারতাম যদি? যদি ডাস্টবিনের ভেতর ঝাঁপ দিয়ে পচে গলে জৈব সার হয়ে যেতাম?

এটুকু শুনে মা মুখ শক্ত করে বসে পড়ল। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম মায়ের চোখে চকচকে স্মৃতিতে এক এক করে ভেসে উঠছে আমার না গোনা শতশত দিনরাত্রি। ভেসে উঠছে আমার শুকনো মুখ, ইউনিফর্ম চেইঞ্জ না করে বিছানায় সটান পড়ে থাকা একটা ছোট্ট দেহ। মায়ের চোখে ভেসে উঠছে আমার ছলছল চোখ, না বলা অসংখ্য যন্ত্রণা। বার বার ভেসে উঠছে বুকে ভর দিয়ে দাঁড়াতে চাওয়ার দৃশ্য, আমার কুঁজো পিঠ, ভার লাগা বুক আর অসংখ্য বিষমাখা তীরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া একটা ছোট্ট জগৎ। মায়েদের চোখের পাতায় সমৃদ্ধ ভাষার ভাণ্ডার আর কেউ না পারুক, সন্তানের কাছে সুইমিং পুলের নীল জলের মতো স্বচ্ছ।

আমার তখন বলতে ইচ্ছে করছিল, মাগো একলা একলা বেড়ে ওঠার ভীষণ কষ্ট। ইঞ্চি-ইঞ্চি করে বাড়তে থাকা শরীর, বিবেক বা বুদ্ধি সবকিছুর জন্যই মাকে খুব দরকার। তুমি তো অন্তত তখন ছিলে, যাদের মা নেই এত যুগ পরে তারা এসব প্রশ্ন কার কাছে করবে?  কে বোঝাবে জীবনের সব ভাঙাচোরা গল্প জোড়া দিলে একটা মানুষ বানানো যায়? ওদের কুঁজো পিঠ একটু একটু করে ভারহীন করবে কে মা? তুমিই আমাকে বাঁচাও, আমাকে ভেঙে ফেলতে পারো, ভারহীন করতে পারো, করতে পারো নষ্টও। আমার শরীর আমার করে রাখতে হলে, শকুনের চোখের সামনে থেকে প্রতিদিন কি করে বেঁচে-বর্তে থাকতে হয় সে শিক্ষা তোমারই দিতে হবে। তোমারই বলতে হবে আমার শরীরে কতখানি কাছে পোকামাকড় এলে হাতের বাড়িতে ঝেড়ে ফেলতে হবে। তা নাহলে যুগে যুগে আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলব আমার শৈশব এত নোংরা কেন ছিল মা?

তোমাদের তখন আমাদের মুখ চেয়ে চুপ করা ছাড়া আর কোনও উপায়ান্তর নেই, থাকবে না! তোমার চোখে তখন তোমার সন্তানের নষ্ট শৈশব ছাড়া আর কিছু ভেসে উঠবে না! সিদ্ধান্ত নাও মা, সময় থাকতেই।

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X