নারীর বেদনা ও লড়াই: রাষ্ট্র কি আদৌ অনুভব করে?

Send
শারমিন শামস্
প্রকাশিত : ১৪:০৫, মে ২০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২১, মে ২০, ২০১৭

শারমিন শামস্আচ্ছা উগ্র পোশাক দেখেও যেসব পুরুষের ধর্ষণ আকাঙ্ক্ষা জাগে না, তারা কি পুরুষ না? আচ্ছা, যে পুরুষেরা বিদেশের সমুদ্রতটে বিকিনি পরা বা সম্পূর্ণ নগ্ন নারীকে দেখেও কখনও ধর্ষণ করার কথা ভাবেন না, এমনকি চোখ দিয়েও তাদের কামনা-বাসনা পূরণ না করে স্বাভাবিক শান্ত স্থির থাকতে পারেন, তারা কি অক্ষম পুরুষ? সভ্য দেশের মাটিতে আমি তো এমন পুরুষই দেখি চারপাশে যারা অপরিচিত নারীর দিকে ভুলেও চোখ তুলে তাকান না, আর পরিচিত নারীর প্রতি পূর্ণ সম্মানের দৃষ্টি ধরে রেখে কথা বলেন! তার মানে কী? সেসব দেশে স্বল্প পোশাকের নারীরা কি এইসব পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় বলে ধরা পড়েন না? তা তো নয়। নারীর সৌন্দর্য্য, তার দেহবল্লরী, সবই তো পুরুষের চোখে ধরা পড়ছে, ভালোও লাগছে। তাতেই কি পুরুষেরা ধর্ষক হয়ে উঠছেন? পুরুষের ইন্দ্রিয় ক্ষমতা কি এতটাই দুর্বল যে খোলা বা স্বল্প পোশাক দেখে তারা নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারিয়ে দানব হয়ে ওঠেন?
মনে আরও প্রশ্ন আসে। উগ্র পোশাক বস্তুটা আসলে কী? যে পোশাক নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না, এই তো? উগ্র পোশাক দেখলেই এদেশে পুরুষের ধর্ষণ জায়েজ হয়ে যায়। এদিকে শাড়ি পরা মধ্যবয়স্ক থেকে শুরু করে ফ্রক পরা আড়াই বছরের শিশুকেও ছাড়ে না ধর্ষক।
দেশজুড়ে ধর্ষণের যে মহোৎসব চোখের সামনে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে গত কয়েকদিনে, সেগুলো দেখে দেখে ক্লান্ত দুই চোখ আর মন; এরকম নানা প্রশ্ন আর বেদনা জমা হয় বুকের মধ্যে। একজন নারী ছাড়া তার বেদনাকে শতভাগ উপলব্ধি করার ক্ষমতা কেউ রাখে না। হ্যাঁ, এই সমাজে এখনও নারীবাদী, প্রকৃত পুরুষ আছেন। তবু তারাও হয়তো কোনও একটা জায়গায় গিয়ে ঠেকে যান আমাকে সম্পূর্ণ উপলব্ধি করবার ব্যাপারে। এই যে আমি সকালে ওঠে কাজে বেরোই, রাস্তায় হাঁটি- কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোনো মাত্র আমার প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে আমাকে বারবার বুঝিয়ে দেওয়া হয়, আমি নারী, মানুষ নই। হেঁটে যাওয়া পথচারী, রিকশাওয়ালা, বাস ড্রাইভার, দোকানদার, সুইপার, টাই পরা ভদ্রলোক, তরুণ, কিশোর, হাঁড় জিরজিরে বৃদ্ধ- কেউ তো বাদ রাখে না আমাকে রসিয়ে রসিয়ে পরখ করে দেখতে। তাদের এই তীব্র দৃষ্টি আমার চলাকে, আমার মনটাকে কতটা আহত আর অপমানিত করে রোজ প্রতি মুহূর্তে- তার খবর কি পুরুষেরা রাখেন? সেটি উপলব্ধি করার মন কি পুরুষের আছে? থাকে?

প্রতিদিন এরকম আহত ক্লান্ত মন নিয়েই তবু আমরা চলি ফিরি। সদা সতর্ক থাকাই আমাদের নারী জীবনের ভবিতব্য। কাউকে বিশ্বাস না করতে পারাই আমাদের জীবন। বন্ধু, আত্মীয়, সহকর্মী যে কেউ আমাদের সরলতার সুযোগ নিতে পারে যেকোনও সময়। এসব জানি বলেই বহু পুরুষকে আমাদের ভুল বুঝতে হয়। বহু প্রয়োজনে বহু জায়গায় যাওয়ার থাকলেও, তা বাদ দিতে হয়। অনেক স্থানে দুরুদুরু বুক নিয়ে পা বাড়াতে হয়। আমাদের মন কখনও আমাদের নিশ্চিত, নিরাপদ থাকতে দেয় না। এই সমাজ আমাদেরকে মানুষ নয়, ভোগের পণ্য নারী করে রেখেছে আর যেকোনও মুহূর্তে আমাদেরকে খুবলে নিতে প্রস্তুত। আর এই রাষ্ট্র সেই খুবলে ধরা ধর্ষকদের নিরাপত্তা দিয়ে, তোয়াজ করে, প্রশংসা করে মাথায় তুলতে বদ্ধ পরিকর। এটি এমন এক রাষ্ট্র যেখানে নারীর প্রকৃত অর্থে কোনও নিরাপত্তা নেই। এটি এমন এক রাষ্ট্র যে রাষ্ট্রে ধর্ষণের বিচার চাইতে থানায় গেলে মামলা না নিয়ে কর্তব্যরত পুলিশ বাদীকে চরিত্রহীন আখ্যা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এটি এমন এক রাষ্ট্র যে রাষ্ট্রে ধর্ষণের মামলা করলে চারিপাশের নারী-পুরুষ মুখর হয়ে ওঠে ধর্ষিতাকে চরিত্রহীন, বাজে মেয়ে বলে। এটি এমন এক সমাজ যে সমাজে বিচারপ্রার্থী ধর্ষিতার মুখ লুকাতে হয় নাম লুকাতে হয়, ধাম লুকাতে হয় পর্দার আড়ালে। তাকে কেউ চিনে ফেললেই ‘ছিঃ ছিঃ’ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাই তারই ওপরে। নারীর এই চূড়ান্ত অপমান, জীবনের এই চরম অবমাননার জায়গাটি কি আসলেই হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেন কোনও পুরুষ?

আমি জানি না।

যখন আমি কোনও রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রিকশাওয়ালা অথবা কোন পথচারী আমার শরীরের দিকে ইঙ্গিত করে ফিসফিসিয়ে কোনও চরম নোংরা উক্তি ছুঁড়ে দেয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি, আমার পদ পদবী, আমার সম্মান, আমার আত্মবিশ্বাসের জায়গাটিতে লাথি দিয়ে সদর্পে চলে যায় তারা পাশ কাটিয়ে। আমি একটা তীব্র যন্ত্রণা বুকে ধরে হেঁটে যাই বাকি পথ। যদি আমি প্রতিবাদ করি, যদি আমি ঘুরে দাঁড়াই, তবু সেই প্রতিবাদ, সেই লড়াইয়ের পরও আমার ক্লান্তি আসে, কারণ সেই লড়াইটা আমাকে একাই লড়তে হয়। কোনও পুরুষ ভিড়ের সুযোগে আমার শরীরে হাত দিলেও, আমার অভিযোগ কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। নিমেষেই আমাকে ঘিরে ধরে আরো দশটি পুরুষ। তারা আমার শরীর, পোশাক, আমার সামাজিক অবস্থান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। তারা আমাকে যাচাই করে আর রায় দেয়। আদৌ আমার এখন অভিযোগ করা উচিত কী না সেটা তারাই ঠিক করে দেয়।

আমার জন্ম এই সমাজে, এই রাষ্ট্রে, এই নগরে, এই কলুষিত নারীবিরুদ্ধ দেশটিতে। এখানে যে হেফাজতে ইসলাম নারীর বিরুদ্ধে দফার পর দফা সাজিয়ে পথে নামে, সেই হেফাজতের সাথে সরকারপক্ষকে একই মঞ্চে দেখতে হয়। এই দেশে দিনের পর দিন নারীকে অস্ত্রের মুখে ধর্ষণ করে প্রতিবেশি পুরুষ। শিশুকে ধর্ষণের জন্য ধর্ষক ব্লেড দিয়ে কেটে নেয় তার যোনি। হায়, তবু দিনের পর দিন কাটে, আমরা বিচার দেখি না। যা দেখি তার নাম বিচারের নামে প্রহসন। দেখি বহু ধর্ষণের মামলার আসামি জামিনে ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে আসে। দেখি ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতাকে আপোস-রফায় যেতে হয়, কারণ ধর্ষিতারই দোষ। ইজ্জত নামের হাস্যকর বস্তুটি এখানে চরমভাবে ক্রিয়াশীল, যা কেবল নারীর থাকে। জঘন্যতম অপরাধের পরও পুরুষের ইজ্জত অক্ষুণ্ন থাকে।

যে একাত্তরে লাখ লাখ বীরাঙ্গনাকে ঘরে তুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এই সমাজ, পিতামাতা, ভাইবোন, আত্মীয় পরিজন; আজ ছেচল্লিশ বছর পরও এ সমাজ তার থেকে এতটুকু সামনে এগোয়নি। বরং পিছিয়ে পড়েছে আরো অনেক বেশি। পিছিয়ে পড়েছেন আমাদের রাষ্ট্রীয় নেতারাও।

আসলে হতভাগ্য আমরা, যারা আজ এই যুগে বাংলাদেশ নামের এই ভণ্ড কপটের দেশে জন্মেছি, বড় হয়েছি, বেঁচে আছি এবং লড়ছি। আমাদের লড়াই একাকীত্বের, বেদনায় ভরা, আমাদের লড়াই বড় বেশি বিরুদ্ধ স্রোতের সঙ্গে। আমাদের কেউ বলে না ‘পাশে আছি’। আমাদের নিরাপত্তার জন্য কোনও কঠিন আইন তৈরি হয় না, আমাদের রক্ষা করার জন্য ধর্ষক নিপীড়কদের কঠোর সাজা দেওয়া হয় না, আমাদের জন্য কোনও সুন্দর সমাজ তৈরি হয় না। তবু আমাদের পথ চলতে হয়। আমরা জানি না, এর শেষ কোথায়। আমরা জানি না, পুরুষতান্ত্রিক এক সমাজ,  পুরুষতান্ত্রিক এই রাষ্ট্রব্যবস্থা আদৌ কোনোদিন আমাদের পূর্ণমানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে কী না! 

লেখক: প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ