ফেল করা ট্রেনের যাত্রী

Send
ফজলুল বারী
প্রকাশিত : ১৫:৩৯, মে ৩০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০২, মে ৩০, ২০১৭

Fazlul Bariবাংলা ট্রিবিউনের পাতায় চোখ রেখে চোখ ছানাবড়া! এর বর্ষপূর্তির বিশেষ সংখ্যাটি বেরিয়ে গেছে! দেখতে অত ভালো হয়নি। একটি প্রিন্ট এডিশনের প্রথম সংখ্যার মতো যেন। অনেকটা আমার প্রথম পত্রিকা বিচিন্তার প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদের মতো। কিন্তু ভেতরের মালগুলো তথা লেখাগুলো পড়তে পড়তে অনেক ভালো লাগার পাশাপাশি মন খারাপ হয়। কারণ আমাকেওতো লিখতে বলা হয়েছিল। আজ লিখবো কাল লিখবো বলে লেখা হয়নি আর। এখানে দেখি ট্রেন ফেল করে স্টেশনে বসা এক আফসোস মাস্টার যাত্রী একজন আমি।
বাংলা ট্রিবিউন এখন আমার একটি অভ্যাসের নাম। বিদেশে আমরা যারা থাকি অনলাইনে চোখ রেখে দেশ দেখি সারাক্ষণ। এরমধ্যে অনলাইনগুলোর মধ্যে বাংলা ট্রিবিউনও দেখি। এগুলোর মধ্যে বাংলা ট্রিবিউন কোনও কোনও ক্ষেত্রে দ্রুতগতির এবং স্মার্ট। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে, আদিবাসীদের যারা আদিবাসী বলে তাদের বিরুদ্ধে, যে কোনও বঞ্চনার বিরুদ্ধে, সব কপুমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার বলে এটি আমার বোধ-চিন্তার সমার্থক। বিশ্ব নারী দিবসে বাংলা ট্রিবিউনের সব নেতৃত্বে ছিলেন নারী। এটি আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমার মতে কখনও কখনও বাংলা ট্রিবিউনের লুক’টা আকর্ষণীয় না। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকতে, সবাইকে ছাড়িয়ে এক নম্বরে যেতে চাইলে, এগুতে চাইলে বিনিয়োগ সহ সব চাহিদা পূরণ করেই হবে। আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারি। কোথাও মাঝামাঝি কোনও জায়গা নেই।
এক সময় বাংলাদেশি পাসপোর্টে বিদেশে রিপোর্ট করতে যাওয়ার সংগ্রাম জানতাম। এরপরও সবুজ পাসপোর্টে রিপোর্ট করতে গেছি কুড়িটা দেশে। ভিসার সংগ্রাম জয় করে কত স্পটে আরও আগে পৌঁছতে পারিনি। এক সময় ভাবতাম অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট পেয়ে গেলে সারা বছর রিপোর্টের পেছনে ঘুরে বেড়াবো সারা দুনিয়া। কিন্তু এখন আরেক সংগ্রাম জানি। সপ্তাহে আয় করা লাগে কমপক্ষে হাজার ডলার। এরপরও বাংলাদেশের ক্রিকেটের হঠাৎ এক পাগল ভক্ত হিসাবে খেলাগুলো দেখা মিস করতে ইচ্ছা করে না। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আমি দেশের সেরা একটি অনলাইন পোর্টালের হয়ে কভার করেছি। কারণ ওইসময়ে ওই অনলাইনের সাংবাদিক অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের ভিসা পাননি। এরজন্যে তারা যে টাকা দিলো এ টাকায় তারা কোনও রিপোর্টার পাঠাতে পারতো না। কিন্তু টাকাকড়ির ব্যাপারে আমি একটু লাজুক প্রকৃতির। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত জুড়ে ট্যুরে আরেক অনলাইনে লিখলাম। লজ্জা করে তাদের কাছে ট্যুরের খরচ চাইনি, তারাও অফার করলো না।

বাংলাদেশ দলের নিউজিল্যান্ড সফরের সময় বাংলা ট্রিবিউনের কাছে টাকা-পয়সা চাইবার আগেই জব্দ করে বলা হয়, ‘আপনাকেতো টাকা না দিলেও খেলা দেখতে যাবেন’। এরা সবাই আমার ছোট ভাই অথবা সমসায়িক। সবাই মনে করে আমার অনেক টাকা। বাংলা ট্রিবিউন আরেকটি শব্দ ব্যবহার করেও জব্দ করেছে। আমাকে বলা হলো ‘আমরা আপনার ব্র্যান্ডটা কাজে লাগাতে চাই’। এই এক শব্দে বেশ ভাব এসে যায়। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে ক্রিসমাস-নিউইয়ার উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিমান-হোটেল ভাড়ার আকাশচুম্বি অবস্থা সবাই জানেন। কিন্তু দুটি বিশেষ বাক্য-শব্দ ‘আপনাকেতো টাকা না দিলেও যাবেন’ আর ‘ব্র্যান্ডে’ কাবু অবস্থায় টাকা যা পেয়েছি তা বিসমিল্লাহ বলে নিয়ে রওয়ানা হয়ে যাই।

লেখালেখিতে আমার আবার নিজের ওপর অনাস্থা ষোলআনা। আমার লেখা কখনোই আমার ভালো লাগে না। নিজের প্রতি আমার এই অতৃপ্তিই আমার চালিকাশক্তি। নিজের সীমাবদ্ধতার প্রথম দিক হলো আমি কোনও ক্রীড়া সাংবাদিক নই।

দেশে-বিদেশে রাজনীতি-যুদ্ধবিগ্রহ-পর্যটন এসব নিয়েই রিপোর্ট করেছি। আর একটা কাজ করতাম কিভাবে লিখে ভিক্ষা করে কারও চিকিৎসার বা একটি চাকরির ব্যবস্থা করা যাবে। দেশে আমি কোনোদিন খেলার মাঠে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যাইনি। মূলত আইসিসি ট্রফি জেতার পর আর বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পর টিএসসির কী অবস্থা তা দেখে এসে রিপোর্ট করতে একজন ফটোগ্রাফারের বাইকের পেছনে বসিয়ে দু’বার পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে উল্লাসের রঙে ভিজে জবজবা অবস্থায় লেখাগুলোই দেশে মূলত আমার লেখা প্রথম স্পোর্টস রিপোর্ট। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ, ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সাংবাদিক হিসাবে আমার এক্রিডিটেশন করা ছিল না। তাই আমি লিখতাম গ্যালারির রিপোর্ট, নানান জনের ইন্টারভিউ নিয়ে সাইড স্টোরি। কিন্তু নিউজিল্যান্ড ট্যুরে  এক্রিডিটেশন করে আরেক পেরেশানিতে পড়ে যাই।

এখন নানা কারণে দেশের রাজনীতির ওপর লোকজন বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম ভীষণ বিরক্ত। রাজনীতির রিপোর্টের চেয়ে এখন স্পোর্টস রিপোর্ট বিশেষ করে ক্রিকেটের রিপোর্ট জনপ্রিয়। আর এখন এতসব চমৎকার মেধাবী সব ছেলেমেয়ে স্পোর্টস রিপোর্টে এসেছে। খেলার রিপোর্টগুলো এত চমৎকার বাংলায়-গদ্যে লিখে! এক সময়কার জনপ্রিয় বাংলাদেশ সিনেমার নাম অথবা গানের কলি দিয়েও লেখার শুরু অথবা শিরোনাম হয়ে যায়। আমি পড়ে পড়েই মুগ্ধ। আরেকটা মজার পরিস্থিতিতে পড়ি। তা বলার আগে একটা গল্প বলে নেই। একবার ভারতের দিল্লিতে গেছি সার্ক সম্মেলন কভার করতে। বাংলাদেশের এত সাংবাদিক দেখেতো দিল্লিওয়ালদের মাথা খারাপ! বাংলাদেশে এত গুরুত্ব সার্কের! আমরা এক হোটেলে বেশ কিছু সাংবাদিক উঠেছি। প্রতিদিন এক্সক্লুসিভের ধান্ধায় সবাই যারযার মতো করে রুম থেকে বেরিয়ে যাই। রিপোর্ট ছাড়ার বা ছাপা হওয়ার পর মুখ খুলি! এমন একদিন ফুলন দেবীর ইন্টারভিউ করলাম। একদার দস্যুরানী তথা ব্যান্ডেট কুইন ফুলন দেবী তখন আত্মসমর্পনের পর ভারতের লোকসভার সদস্য। ফুলনদেবীর ইন্টারভিউ তখন অনেক সাড়া ফেলেছিল দেশের পাঠক মহলে।

এমন আমি ফুলনদেবীর মতো আলোচিত লোকজন, রাজনীতিক-অর্থনীতিবিদ বা কোনও সেলিব্রেটি সম্পর্কে, তাদের পাঠক গুরুত্ব জানি। কিন্তু এই যে ছেলেরা নানা ভেন্যুতে পাওয়া ক্রিকেট কিংবদন্তিদের খুঁজে খুঁজে একান্তে ডেকে নিয়ে এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ করছে আমিতো তাদের চিনিই না! কিন্তু আমি যে যা পাই শুধু লিখি আর পাঠাই বাংলা ট্রবিনিউনওয়ালারা যাই দিচ্ছি কিছুক্ষণের মধ্যে তাই ছেপে দিচ্ছে, কী কোথায় মিস করছি কিনা তা বলেওনা। এসব নিয়ে সারাক্ষণ মানসিক ধন্দে থাকি। জিজ্ঞেস করলে শুধু বলে ঠিক আছে ঠিক আছে, আরও ‘সাইড স্টোরি’ পাঠান। ওয়েলিংটনে পেয়ে গিয়েছিলাম একটা অটোগ্রাফ ভিক্ষুককে! যে কিনা বহুবছর ধরে ক্রিকেটারদের অটোগ্রাফ নিয়েই চলেছেন! আরেকদিন গ্যালারিতে পেয়ে যায় নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভির স্বামী সেতু ভাইকে! এ দুটি সাইড স্টোরি বেশ পাঠকপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু সবসময়  মানসিকভাবে বিব্রত থাকতাম, ছোটছোট জুনিয়র প্রিয় প্রজন্ম ছেলেদের চমৎকার সব কাজ নিয়ে। আমি এত বিব্রত, কিন্তু বাংলা ট্রিবিউন সব সময় শুধু বলতো- ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’। এ বিষয়টা আরও বিব্রতকর। তবে নিউজিল্যান্ডে দলকে খুব কাছে থেকে দেখে, দল নিয়ে অনেক ক্রিকেট পলিটিক্স দেখেশুনে একটা মন্ত্র শিখেছি, তা হলো খেলার আগেই দলের যা কিছু ভালো সব লিখে ফেলতে হবে। জিতলো ভালো কিন্তু হেরে গেলে এসব আর লিখা যাবে না। পাঠক পারলে পিটাবে।

এই আমার বাংলা ট্রিবিউন ভালোবাসার কয়েক ছত্র। এখানে আমার প্রিয় অনেকজন কাজ করেন। মাঝেমাঝে অমুক অমুকের চাকরির তদবির করেও জবাব পাই ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’। যদিও অর্জন এখন পর্যন্ত শূন্য। আরেকটি শান্তিময় অর্জন আছে। আমি বাংলা ট্রিবিউন সহ বাংলাদেশে কলাম লিখে যে টাকাগুলো আয় করি তা অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আনি না বা ডলারে কনভার্ট করে তা পোষাবেওনা। দেশে আমার আবুল বাজানদার সহ হাসপাতালগুলোতে কিছু রোগী, পড়াশুনায় সহায়তায় আমি যাদের টাকাকড়ি দেই, এ টাকাগুলোও সেখানে কাজে লাগে বলে শান্তিময় একটা পরিতৃপ্তির বিষয় পাই- অনুভব করি যা বলে বোঝাতে পারবো না। দেশের আলোচিত সাবেক বৃক্ষমানব আবুল বাজানদারের চিকিৎসায় বাংলা ট্রিবিউন যে ভ্যানগার্ডের ভূমিকা পালন করেছে এবং করছে তা পাঠক মনে রাখবে। তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা ট্রিবিউনের সব কর্মীদের, পাঠকদের শুভেচ্ছা। ভালোবাসি বাংলা ট্রিবিউন। ‘অনেক পথ যে আমাদের যেতে হবে সাঁঝের মিশ্র আলোতে’। জয় বাংলা।

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

 

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ