ব্রিটেনের গন্তব্য কি আসলেই অনিশ্চিত?

Send
বাধন অধিকারী
প্রকাশিত : ২১:১০, জুন ২১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১২, জুন ২১, ২০১৭

বাধন অধিকারীসাংস্কৃতিক অধ্যায়নের জমিনে শিখেছি, বাস্তবতা আসলে উপস্থাপনযোগ্য নয়। বাস্তবতাকে উপস্থাপন করলেই তা খণ্ডিত হতে বাধ্য, তাতে উপস্থাপনকারীর ব্যক্তিক/রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক/আদর্শিক অবস্থান প্রকাশ না পেয়ে চলে না। তাত্ত্বিকরা তাই মিডিয়ার বাস্তবকে উপস্থাপিত বাস্তব কিংবা খণ্ডিত বাস্তব নামে ডেকে থাকেন। তো মিডিয়া-নির্মিত ব্রিটেনের বাস্তবতাও তেমনই। উপস্থাপিত আর খণ্ডিত বাস্তবতা। সেটাই তাদের বস্তুনিষ্ঠ সত্য। সেটাই তাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা। আলোচনার সূত্রে টেনে আনছি ব্রিটিশ মিডিয়াসহ অপরাপর মূলধারার পশ্চিমা মিডিয়াকে। এরা সবাই মিলে (খানিক ডিফ্যাক্টো বিরোধিতা বাদ দিলে) ব্রিটেনকে উপস্থাপন করছে মোটামোটি এভাবে- অর্থনৈতিক দুর্গতির প্রেক্ষাপটে ব্রেক্সিট প্রশ্নে বিভক্তি, ধারাবাহিক জঙ্গি হামলা, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা, আগুনে মানুষের ভস্মীভূত হওয়া আর সবশেষ সোমবার জঙ্গি ডিসকোর্সের প্রচলিত ধারায় এক নতুন সংযুক্তি। লন্ডনের দৃশ্যমান বাস্তবতায় এটি এমন এক ঘৃণাবাদী হামলা, ‘যা সব মুসলিমকে হত্যা’র বাসনা সামনে এনেছে। স্পষ্টতর হয়েছে ব্রিটিশ সমাজের সভ্যতা আর আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিভক্তির দগদগে ক্ষতচিহ্নগুলো। প্রিয় পাঠক, আপনি কি এখন বলতে চান অনিশ্চয়তাই ব্রিটেনের গন্তব্য? আপনারা কি বলতে চাইবেন, এটাই সেখানকার প্রকৃত বাস্তবতা।
সরকার গঠনের অনিশ্চয়তা, জঙ্গি হামলা-পরবর্তী সরকার-বুদ্ধিজীবী আর অপরাপর ক্ষমতা শক্তিগুলোর পক্ষে গণসংযোগ; এইতো সবমিলে মিডিয়ায় পাওয়া ব্রিটেন। আপনারা কি বলতে চাইবেন, বাস্তবেও ব্রিটেন মিডিয়া-উপস্থাপিত বাস্তবতার ফটোকপি? না, আমি তা মানতে পারি না।
প্রিয় পাঠক, ওইসব করপোরেট মিডিয়াতেই খুব কম গুরুত্ব পাওয়া কিছু খবর, আবার ইন্টারনেটে পাওয়া বিকল্প মিডিয়া থেকে সংগৃহীত খবর আর নিজের কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে আমি বুঝতে পারি; বাস্তব ব্রিটেন এমন ভীতিকর নয়। এমন অনিশ্চিতও নয়। বাংলা ট্রিবিউনের আন্তর্জাতিক সংবাদের তত্ত্বাবধান করতে গিয়ে আমি খুব নিবিড় পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে দেখেছি; মিডিয়ায় ঠিক কেমন বাস্তবতাগুলো আড়ালে চলে যায়। চিন্তাবশীভূতকরণের মন্ত্রগুলোকে খানিক সময়ের জন্য মস্তিষ্ক থেকে সরিয়ে দিয়ে যদি আপনারা দেখতে চান তো আমরা দেখতে পারবো, প্রতিটি জঙ্গি হামলাকে যেভাবে ভীতিকর, ভয়াবহভাবে দেখা হয় একই সেই জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে আমরা মানবীয়তার অনন্য সম্মিলন দেখতে পাই। কিন্তু মিডিয়া তার শকুনি দৃষ্টি আর বিড়ালসম নাক (সংবাদ বিদ্যায় ভালো সাংবাদিকের বৈশিষ্ট্য কিন্তু এটা) দিয়ে জঙ্গি বাস্তবতা খুঁজতে থাকে। ছড়াতে থাকে ভীতি। রক্ত-হিংসা-ঘৃণা-বিদ্বেষের উপাদানগুলো খুঁজে নিয়ে, সঙ্গী করে তারা রাষ্ট্রের সহযোগী ভূমিকা পালন করে। কেউ সরকারি দলের পক্ষে, কেউ বিরোধী দলের পক্ষে। আর উভয়ের ক্ষেত্রেই নিজের করপোরেট মালিকানার স্বার্থে।
বাস্তবের ব্রিটেন, সেই দেশের মানুষের প্রতিরোধের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কিন্তু এগিয়েছে প্রগতির পথে। এখানকার মানুষ  লেবার পার্টিকে কাছে টেনে নিয়েছে আগের থেকে বেশি করে; যে লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় শ্রমজীবী মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ চান, কেবল প্রতিনিধিত্বমূলক ভোট নয়।
গত কয়েকটি জঙ্গি হামলার কথা ভেবে দেখুন পাঠক। ২/৩ জন সন্ত্রাসী এমন হামলা চালিয়েছে, অথচ মিডিয়াজুড়ে তাদেরই উপস্থিতি। তাদের নিয়েই সব কথা। পক্ষে-বিপক্ষে যাই হোক না কেন। সংবাদের একাডেমিক শিক্ষাটাই কিন্তু সেক্সুয়াল অবদমনকে আর ক্রাইমকে প্রধান সংবাদসূত্র মনে করে। বাস্তবে মানুষের সমাজটা কি তাই, পাঠক? অপরাধ আর যৌন অবদমনকে সংবাদের প্রাথমিকসূত্র হিসেবে পড়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। বিগত হামলাগুলোর মধ্যে কেবল আমি ম্যানচেস্টারের হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করছি। আমার বিবেচনায় যে কনসার্টের হামলাকে বৈশ্বিক মিডিয়া নানান কায়দায়, নানান ধারায় আর নানান প্রকৌশলে ঘৃণা-বিদ্বেষ আর ভীতিকে ব্যাপকতার সঙ্গে তুলে ধরলো, বাস্তবে তার বিপরীতে অনেক বেশি মাত্রায় ঐক্য-সম্মিলন-ভালোবাসার প্রেরণা হয়ে ফিরেছিল আরিয়ানার প্রতিশ্রুত কনসার্ট; বাংলা ট্রিবিউন আরিয়ানার সেই কনসার্টকে অনেকখানি জায়গা দিয়ে হাজির করেছে। এই কনসার্ট দেখিয়েছিল, কিভাবে পুলিশ-চিকিৎসাকর্মীসহ সেখানে নিয়োজিত পেশাগত দায়িত্বে থাকা মানুষগুলো সবাই মিলে নেচে উঠেছিল সম্মিলনের গানে। হায়, এই কনসার্ট কেন শীর্ষ সব আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কোণায় পড়ে থাকে? আর শীর্ষস্থানজুড়ে অবস্থান করে ভীতি-বিদ্বেষ-রাজনৈতিক বিভক্তির সূত্র?
পাঠক, সবশেষে ফিনসবারি পার্ক মসজিদে হামলার প্রসঙ্গ। ক্ষমতাপ্রশ্নের দিক থেকে এই হামলার ঘটনায় নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছে ব্রিটেনের সাম্প্রতিক বিভক্তির রাজনীতির সূত্র। ব্রিটেনের বিদেশনীতি, বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আগ্রাসনের বাস্তবতা; এর বিপরীতেই তো মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গিবাদের চাষাবাদ হয়েছে। সেই তারা যখন ব্রিটেনে হামলা চালিয়েছে, তখন সেখানকার মানুষের মধ্যেও ঘৃণাবিদ্বেষ বেড়েছে। আমি যখন ডেস্কে বসে এই কলাম লিখছি, পাশেই আমার একজন বন্ধু-সহকর্মী খবর লিখেছেন; মুসলিমবিদ্বেষ বেড়েছে সাম্প্রতিক ম্যানচেস্টার ও লন্ডন হামলার প্রেক্ষাপটে। খুবই ঠিক কথা। তবে পশ্চিমা মিডিয়া এ পর্যন্ত বলতে রাজি। তবে মুসলিমরা কোন বিদ্বেষ থেকে হামলা চালিয়েছে ব্রিটেনে, সে প্রশ্নের উত্তরে তারা যেন মুসলমানদেরকে এক চিরায়ত জঙ্গিবাস্তবতার প্রেক্ষাপটে হাজির করতে চান।
ফিনসবাড়ি পার্ক ভাষা-সংস্কৃতির ভিন্নতা, বহু জাতীয়তা, সমৃদ্ধ সাঙ্গীতিক সংস্কৃতি, বৈচিত্র্যময় সহঅবস্থানের শহর। এটি কিন্তু সেই জেরেমি করবিনের শহর, যিনি নতুন দিনের প্রত্যয় ঘোষণা করে প্রান্তিক থেকে যাওয়া আর দশটা ভিন্নমতের মানুষ হিসেবে পরিচিত নন। তিনি ব্রিটেনের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নদ্রষ্টা। আজ আন্তর্জাতিক সংবাদের তত্ত্বাবধান করতে গিয়ে দেখেছি, নির্বাচনের আগে যেলেবার পার্টি কোনঠাসা ছিল, কনজারভেটিভদের সঙ্গে ছিল বিশাল দূরত্ব; সেই লেবার পার্টি জরিপে কনজারভেটিভদের চেয়ে তিন পয়েন্ট এগিয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অতীতের ধারাবাহিকতায় যখন ভীতি আর সন্দেহ ফেরি করছে প্রধানত, তাদের অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বের খবর সূত্র থেকেই বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত হয়েছে ‘ফিনসবারিতে বিশ্বাসের ঐক্যে বিদ্বেষ রুখবার প্রত্যয়’ নামের প্রতিবেদন। বাংলা ট্রিবিউনের আন্তর্জাতিক সংবাদের পাতায় (বিদেশ) ২০ জুন মঙ্গলবার অনেকক্ষণ প্রধান খবর হিসেবে ঝুলেছে সেই প্রতিবেদনটি। বহু সংস্কৃতিবাদের ব্রিটিশ মূল্যবোধকে ঐক্যের সূত্র করেছে সেখানকার মানুষ। এক বিশ্বাসের প্রতি আরেক বিশ্বাসের বিদ্বেষকে রুখে দিতে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের নেতারা সম্মিলিত হয়েছেন। আর পরস্পরের বিশ্বাসে আস্থা রেখে লন্ডনবাসী এক কাতারে হেঁটেছেন শোকের মিছিলে।
ওই মিছিলে স্লোগান উঠেছে বিভক্তির বিরুদ্ধে, বিদ্বেষপ্রসূত হামলার বিরুদ্ধে। ‘সম্প্রদায়ভেদে মানুষে মানুষে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায় তারা। ছড়িয়ে দিতে চায় বিদ্বেষের বিষ। চেষ্টা করে মানুষের মধ্যে আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করতে।’ বহুসংস্কৃতির এক নিদারুণ সহিষ্ণুভূমি ফিনসবাড়ির প্রসঙ্গ টেনে তার সোচ্চার উচ্চারণ- 'আমরা সবাই সম্মিলিত। ওরা আমাদের মধ্যে বিভক্তির বীজ পুতে দিতে চাইছে। স্পষ্ট করে তাদের বলছি, তারা সফল হতে পারবে না।’ আপনাদের মনে আছে পাঠক, এই সেই শহর যেখানে ৪০,০০০ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন করবিন।
আমি নিবিড়ভাবে গত ৫টি বছর কাজ করছি আন্তর্জাতিক সংবাদ নিয়ে। পাঠক, আপনাকে সাম্প্রতিকতার কথা বলতে গিয়ে স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আামদের বাস্তব দুনিয়াটার সাপেক্ষ শাসক শ্রেণির ক্ষমতাশালী অংশ হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিপরীতে পাল্টা ক্ষমতা-বাসনার জঙ্গিবাদ যেমন বেড়েছে, এর চেয়ে ঢের বেড়েছে মানুষে মানুষে সম্মিলন আর পুরনো বিভক্তির রাজনীতি বর্জনের সংস্কৃতি। পশ্চিমে সম্প্রতি প্রাচ্যকে চেনার, অজানাকে জানার, আর পুরনো হস্তক্ষেপের বিদেশনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কিংবা সামরিকতা আর যুদ্ধকে রুখে দেওয়ার সংস্কৃতি জোরালো হয়েছে। 
নির্বাচনের একদিন আগে প্রচারণায় নেমে কনজারভেটিভ রাজনীতির রক্ষণশীল-বিভক্তিকে ভোট বাড়ানোর উপায় করতে চেয়েছিলেন। মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে মুসলমান জঙ্গিদের দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট বাড়ানোর পায়তারা করেছেন। থেরেসার এই বিদ্বেষ জনগণ গ্রহণ করেনি। তারা তখন আরিয়ানার ভালোবাসার গানে সম্মিলিত হয়ে মুক্তি খোঁজার চেষ্টা করেছে। জরিপগুলোতে এর প্রমাণ মিলেছিল! সেই থেরেসা মে, পশ্চিমের ইসলামোফোবিয়া আর ‘মুসলিম মানে জঙ্গি’ টাইপ স্টিরিওটাইপ ধারণা থেকে বের হয়ে এসে সবশেষ মসজিদের এই হামলার ঘটনায় বলতে বাধ্য হয়েছেন, এটি মুসলিমদের ওপর সন্ত্রাস। জেরেমি করবিন হামলার পরপরই মসজিদে গিয়ে প্রার্থনার ঘোষণা দেন। পশ্চিমা সাম্রাজ্যের ভূমি গ্রেট ব্রিটেনে তিনি যেন আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধির এক মহাযজ্ঞে নেমেছেন। তার হাত ধরে নিশ্চিত আরও উদার-মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটবে যুক্তরাজ্য!
ব্রিটেন পশ্চিম আকাশে কেবল মেঘ জমিয়েছে তা নয় কিন্তু। পশ্চিমের আকাশে তারারাও আলো জ্বলে। করবিন পশ্চিমের সন্ধ্যাতারা... গণমানুষের সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষা থেকে তার রাজনীতির ভাষানির্মিত হয়। সাম্প্রতিক সব জঙ্গি হামলা, আর গ্রেনফেল টাওয়ারের আগুনে যেন ব্রিটিশ আভিজাত্যের চৈতন্যেই আগুন লেগেছে। এই আগুনের শিখা অনেকদূর বিস্তৃত হবে। জেরেমি করবিন পুড়ে যাওয়া ভবনের ছাইভস্ম থেকে নতুন দিনের 'সব মানুষের' ইতিহাস রচনার উপাদান খুঁজে নিচ্ছেন। থেরেসার বিপন্নতায় আরেকটি আগাম নির্বাচন সেখানে আসন্ন? তবে? কী বলবেন পাঠক? এখনও কি ব্রিটেনের ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত বলবেন?

লেখক: ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ইন চার্জ, বাংলা ট্রিবিউন


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ