জামায়াত নেতাদের সন্তানরা কি ‘হাইব্রিড’ নয়?

Send
শারমিন শামস্
প্রকাশিত : ১৪:০৭, জুলাই ৩১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৯, জুলাই ৩১, ২০১৭

শারমিন শামস্কিছুদিন আগে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ আর ছাত্রলীগ নাকি 'হাইব্রিড' দিয়ে ভরে গেছে। এই 'হাইব্রিড' বলতে তিনি তাদের বুঝিয়েছেন, যারা দল ক্ষমতায় থাকার সুযোগে ভিড়েছেন কিন্তু আদতে তারা আওয়ামী লীগের আদর্শকে অন্তরে ধারণ করেন না।
তো আজ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মনে হচ্ছে, জামায়াত নেতাদের সন্তানরা হাইব্রিড হবেন না। তারা মনেপ্রাণে অন্তরে বাহিরে আওয়ামী লীগকে ধারণ বহন করতে পারবেন। ঠিক কী কারণে এত বড় একজন অভিজ্ঞ নেতার এ ধরনের চিন্তা মাথায় এসেছে আমরা তা বলতে পারি না। জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, একাধিকবার জামায়াতের মনোনয়নে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা মুমিনুল হক চৌধুরীর মেয়ে রিজিয়া নদভী মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া প্রসঙ্গে নানা সমালোচনার সূত্র ধরে ওবায়দুল কাদের বিষয়টি নিয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, বাবার সঙ্গে রিজিয়ার সম্পর্ক নেই। আর বাবা জামায়াত হলেও সন্তান আওয়ামী লীগ করতে পারবেন। এদিকে, রিজিয়া নিজেও এক সময় ইসলামী ছাত্রী সংস্থার নেত্রী ছিলেন।
রিজিয়াকে যে কোনোভাবে হোক পদে ধরে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জানপ্রাণ দিয়ে লড়ছেন। এখন আওয়ামী লীগ তার দলে কাকে নেবে, কাকে নেবে না, সে স্বাধীনতা দলটার আছে। আমরা সাধারণ জনগণ তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, ভূমিকা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করতে পারি। কিন্তু তাদের দল আমরা চালিয়ে দিতে পারি না। কিন্তু দলটি যখন একের পর নানামুখী বক্তব্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে ঘোল খাওয়ানোর চেষ্টা করতে থাকে, তখন কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়তেই হয়। কেননা, ভোটের রাজনীতিতে সাধারণ ভোটার রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন করবে, এটাই স্বাভাবিক।
তো কয়েক বছর ধরেই আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অন্যায় অনাচারের কোনও সংবাদ বেরিয়ে পড়লেই দলটির নেতারা সমস্বরে একটি কথা মুখস্থ বুলির মতো আওড়াতে থাকেন। সেটি হলো, জামায়াত আর বিএনপি’র লোকেরা আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়ে দলের সর্বনাশ করছেন। অর্থাৎ প্রকৃত আওয়ামী লীগ প্রত্যেকেই দুধে ধোয়া তুলসী পাতা। আর যারা 'বজ্জাতি' করে বেড়াচ্ছেন, তারা সবাই প্রকৃতপক্ষে বিএনপি বা জামায়াত। তারা আওয়ামী লীগে ঢুকেছেন দলের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে।
ভালো কথা। মানলাম। এ বছরের ২০ মে, গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঢুকে জামায়াত-শিবিরের লোকেরা সহজেই নেতা হয়ে যাচ্ছে তৃণমূলের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাও বলেছিলেন, দলীয় নেতা বানানোর আগে ভালো করে তাদের পরিবার সম্পর্কে খোঁজ নিন। কেননা এদের মুখে আওয়ামী লীগ আর ভেতরে জামায়াত-বিএনপি।
সম্ভবত তৃণমূল কর্মী-সমর্থক-নেতারা নেত্রীর এ বক্তব্যকে বিশ্বাস করছিলেন। তাই আওয়ামী লীগে জামায়াত-শিবিরের কেউ ঢুকে গেলে তাদের হতাশা ও আক্ষেপ চোখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তারা সেই মুখস্ত বাণীতেই আশ্রয় খুঁজে নেন, এ সব অপকর্ম প্রকৃত আওয়ামী লীগ করছে না, করছে ঢুকে পড়া বিএনপি আর জামায়াত।
এখন কথা হলো, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের পরও দলে জামায়াত ঢুকছে। সর্বশেষ যা হলো, মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও সাবেক ছাত্র সংস্থার নেত্রী রিজিয়া নদভীকে পদ দেওয়া নিয়ে এত ব্যাপক সমালোচনার পরও তাকে ওই পদে বহাল রাখা হয়েছে। ওবায়দুল কাদের বার বার রিজিয়ার স্বামীর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নেওয়ার বিষয়টি সামনে টেনে আনছেন। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, রিজিয়ার স্বামী আবু রেজা নেজামুদ্দিন নদভীও একসময় জামায়াতের রাজনীতি করতেন এবং চার বছর আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি সংসদ সদস্য হয়েছেন। তাই স্বামীসূত্রে রিজিয়া এখন একজন খাঁটি আওয়ামী লীগ কর্মী, যদিও তিনি একসময় মনেপ্রাণে জামায়াতের সদস্য ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থার নিবেদিতপ্রাণ নেত্রী ছিলেন অভিযোগ রয়েছে। তবে ওবায়দুল কাদের এই বিষয়টি সত্য বলেও জানিয়েছেন।
তো বিষয়টি আগেই মীমাংসিত। নেত্রীর আদেশ ও নির্দেশ অনুযায়ীই কাজ করছেন সাধারণ সম্পাদক। এক্ষেত্রে তিনি হুট করে এমন বক্তব্য দিলেন, তা বলার কোনও সুযোগ নেই।
মনে পড়ছে, মাত্র কিছুদিন আগের কথা, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার পর্ব যখন চলছিল, তখন জামায়াত ও বিএনপির তাণ্ডব আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। তার ওপর যা দেখেছি, তা হলো মানবতাবিরোধী অপরাধী নেতাদের সন্তানদের আচরণ, তাদের উগ্রমূর্তি। বাপের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা করতে দেখা যায়নি কারও সন্তানকে। বরং বাবাকে বাঁচাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিং ও নানামুখী প্রচারণা চালিয়ে নানাভাবে বিচারকে তারা বাধাগ্রস্ত করেছে তারা। নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগও আছে এইসব নেতার ছেলেমেয়েদের বিরুদ্ধে।
এ রকম উদাহরণ ও অভিজ্ঞতার পরও আওয়ামী লীগ কিভাবে জামায়াতের নেতাদের সন্তানদের প্রতি আস্থা রাখে যে, তারা মুক্তিযুদ্ধে চেতনা ও আদর্শকে ধারণ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অংশ নেবে? কিসের ভিত্তিতে তারা মনে করছেন জামায়াতের সাবেক সক্রিয় নেত্রী রিজিয়া এবং আরও শত শত রিজিয়া অথবা নদভী বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে, একাত্তরের চেতনাকে সত্য জেনে আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী হতে পারবেন? নাকি এখন আর এসব আওয়ামী লীগে অতটা গুরুত্ব বহন করে না? তবে কি আওয়ামী লীগ একাত্তরের চেতনার যে কথা বলে আসছে যুগ যুগ ধরে, তা আজ বাস্তবতার চাপে মিইয়ে গেছে? যদি তা হয়ে থাকে, তবে কেন শেখ হাসিনা তৃণমূলকে সতর্ক করেন জামায়তের অনুপ্রবেশের ব্যাপারে? তবে কেন ওবায়দুল কাদের হাইব্রিড নেতাকর্মী ঠেকাতে আদেশ দেন? একই মুখে কেন নানামুখী বক্তব্য? এই দ্বৈত অবস্থান শুধু জনগণকেই সংশয়ে ফেলছে না? এটা কি দলের সত্যিকার একনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের দ্বিধাগ্রস্ত ও দ্বিধাবিভক্ত করছে না? ভোটার হিসেবে আমাদের চিন্তাকে দিকভ্রান্ত করছে না?
কোনও এলাকায় আওয়ামী লীগ যদি সাবেক কোনও জামায়াত নেতাকে মনোনয়ন দেয়, তবে ভোটের ব্যালটে ছাপ মারার সময় আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থক এবং জামায়াতকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে, এমন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত আসলে কী হবে?
যে জামায়াত মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করেছে, বঙ্গবন্ধুকে অসম্মান করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করেছে, শীর্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বাঁচাতে পেট্রোল বোমা মেরে শত শত মানুষ হত্যা করেছে, দেশজুড়ে তাণ্ডব সৃষ্টি করেছে, ধর্মের নামে হাজার হাজার মানুষকে রগ কেটে, গলা কেটে হত্যা করেছে, সেই জামায়াতকে কোন পবিত্র জলে ধুয়ে আজ আলিঙ্গনে বাঁধতে প্রস্তুত আওয়ামী লীগ?
এসব ঘটনা আমাদের বেদনার্ত করে। রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচে এদেশের রাজনীতিবিদদের আদর্শ আর মূল্যবোধ আরো কত পচে গন্ধ ছড়াবে, জানা নেই। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার কথা পইপই করে বলা আছে। যত বড় দল হোক, যত বড় নেতাই হোন, কেউ তার ঊর্ধ্বে নন। সেই জবাবদিহির পরোয়া কি আওয়ামী লীগ আদৌ করে?

লেখক: প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ