আমি তানহার মা বলছি...

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১৭:২৮, আগস্ট ০১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩০, আগস্ট ০১, ২০১৭

লীনা পারভীনইদানিং সংবাদপত্র পড়ি না। টেলিভিশনে সংবাদ দেখি না কতদিন, মনে পড়ে না। ইচ্ছা হয় না। কী হবে সংবাদ পড়ে বা দেখে? পড়লেই রক্ত গরম হয়ে যায় কিন্তু কিছুই করতে পারি না। নিজেকে বড় অক্ষম লাগে আজকাল। তাও ঘটনা যেহেতু ঘটে চলেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকলেই সামনে চলে আসে একের পর এক নৃশংস ঘটনার বিবরণ। চাইলেও এড়াতে পারি না। প্রতিবাদী লোকগুলোর প্রতিক্রিয়া দেখি। নিজেও কিছু লিখি। মনটা কিছুক্ষণের জন্য শান্ত থাকে।
এই যে প্রতিটা দিন একের পর এক নারী, শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে জীবন দিচ্ছে কার কী আসে যায় তাতে? কেউ কি মাথা ঘামায়? কোথায় রাষ্ট্র, আইন, সমাজ, বিচার ব্যবস্থা? কোথায় আমাদের বিবেক?
কী অসহায় আমরা। কতটা সহায়হীন সেই চার বছরের শিশু তানহার পরিবার। তাকাতে পারিনি। আমি দু’চোখ মেলে চাইতে পারিনি তানহার ছবিটির দিকে। কী নির্মল চাহনি বাচ্চাটির! দুনিয়ার কিছুই তাকে ছোঁয়নি এখনও। সে এখনও বুঝে ওঠেনি জীবন কী? নারী কী? নারী জীবন কী? নারীত্ব বলতে কী বোঝায়? কেন নারী হিসেবে জন্মালে তাকে একজন পুরুষের লালসার শিকার হতে হবে? কী এমন আলাদা আছে তার শরীরে যা একজন ৩৫ বছরের পুরুষকে আকৃষ্ট করলো?
জানি না। বাচ্চাটা কিছুই জানে না। সে যে একজন নারী, এই বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
খবরটা দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম কেবল ওই অসহায় শিশুটির মুখের দিকে। বাড্ডার আদর্শনগর এলাকায় ৩৫ বছরের এক পশুর লোভের শিকার হয়েছে আমার সন্তান। হ্যাঁ, তানহা আমার সন্তান। আমার কন্যা নেই কিন্তু দুনিয়ার সমস্ত কন্যাকে আমার নিজের কন্যা মনে হয়। কারণ আমি একজন মা। মাতৃত্বের কোনও সীমা থাকে না। সেখানে আপন পর বলে কোনও বিষয় কাজ করে না। ঠিক তেমনি পিতৃত্বেরও কোনও আপন পর থাকার কথা নয়।

শিপন নামের যে পুরুষটি আমার ৪ বছরের তানহাকে খাবারের লোভ দেখিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করলো সে কি আসলেই পুরুষ? আমাদের পুরুষজাতি কী এই শিপনকে তাদের সমগোত্রীয় বলে স্বীকার করবে? আমি অন্তত চাই না। আমার কাছে এই শিপনরা পুরুষ হতে পারে না। তারা পুরুষ নামের কলঙ্ক। এরা যদি পুরুষ হয় তাহলে আমার পিতাকে আমার ভাইকে আমার স্বামীকে পুরুষ বলতে আমার ঘৃণা হবে। অথচ জানি তারাতো শিপন নয়।

আহারে মেয়েটা আমার। নিজের ঘর থেকে পাশের ঘরে বেড়াতে যাচ্ছিল। শিপন আমার তানহাকে বড় হতে দিলো না। তাকে একজন পূর্ণাঙ্গ নারী হতে দিলো না। নিজের জীবনকে উপভোগের সুযোগ দিলো না। ফুল হওয়ার আগেই আমার ফুলমনিকে সে হত্যা করেছে।

আমি এর বিচার চাই। আমি শিপনের ফাঁসি চাই। কেবল শিপন নয়। শিপনের মতো যত শিপন এই সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমি চিৎকার করে তাদের ফাঁসি কার্যকর দেখতে চাই। শিপন ধরা পড়েছে। তাকে ছাড়বেন না। ওকে শাস্তি দিন। তানহাকে আমরা ফিরে পাব না কিন্তু চারপাশের হাজারো তানহার নিরাপত্তার জন্য এই শিপনদের ফাঁসি দেওয়ার প্রয়োজন আছে।

আমি আমার সমাজকে ধর্ষকদের হাতে তুলে দিতে চাই না। এই রাষ্ট্র কোনও ধর্ষকের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে পারে না। হতে দিতে পারি না।  বিচারপতিরা আপনারা কি তানহার চিৎকার শুনতে পাচ্ছেন? কান পেতে শুনুন। ব্যাথায় চিৎকার করছে আমার মেয়েটা। চিৎকার করতে করতে তার গলা বন্ধ হয়ে গেলো চিরতরে। কারণ গলা টিপে ধরেছে ওই শয়তান শিপন। এই শিপনরা এভাবেই দিনে দিনে তানহাদের মেরে ফেলছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি সবার কর্তা। আপনার কাছে গেলে কেউ খালি হাতে ফিরে আসে না। আমি জানি না, আপনার কানে আমার এই আহাজারি পৌঁছাবে কিনা। বিশ্বাস করুন, আমি এই মেয়েটার চেহারা দেখতে পারছি না। মনে হচ্ছে বাচ্চাটা আমার স্বর্গের দুয়ার থেকে কেঁদে কেঁদে জিজ্ঞেস করছে, ‘মা, আমি তো কোনও জিনিস নষ্ট করিনি। আমি তো তোমার শাসনেই চলার চেষ্টা করেছি মা। আমি তো তুমি যে খাবার এনে দাও, তা খেয়েই বড় হচ্ছিলাম। তবে কেন আমাকে তোমরা মেরে ফেললে? কেন আমাকে ওই লোকটা খাবারের লোভ দেখিয়ে ঘরে নিয়ে গিয়ে ব্যথা দিয়ে গলা টিপে মেরে ফেল্লো মা? তোমাকে এত ডাকলাম। কেউ তোমরা শুনলে না। কেন মা? আমার যে ব্যথা করছিল সেটা কি তুমি বোঝোনি মা? আমাকে কেন বাঁচার সুযোগটুকু করে দিলে না? আমি তো একটি স্বাধীন দেশেই জন্মেছিলাম। সে দেশে আইন আছে, নিয়ম আছে, বিচার আছে, শাস্তি আছে। পারো না তোমরা শিপনকে শাস্তি দিতে? ওহ! আমি ছোট বলে আমার জীবনের কোনও দাম নেই, না? আমি জানি আমাকে মেরে ফেলার শাস্তিও হবে না। এর আগে তো পুজাকে ধর্ষণের শাস্তি এখনও হয়নি। তনু আপাকে মেরে ফেলার শাস্তি তোমরা নিশ্চিত করতে পারোনি। ওই যে উইলস লিটলের একজনকেও তো এভাবেই হত্যা করেছিল কোনও এক শিপন। তার কি কিছু হয়েছে? হয়নি। তবে আমিই বা কেমন করে আশা করি যে আমাকে মেরে ফেলার বিচার হবে? বোকা আমি। করি না। বিচারের আশা করি না মা। কেবল একটা অনুরোধ। এই দেশে যেন আমার মতো আর কোনও তানহাকে কেবল নারী হয়ে জন্মের কারণে নারী হওয়ার আগেই জীবন দিতে না হয়। আর কোনও কন্যা শিশু যেন কোনও অসভ্য পুরুষের লালসার শিকার না হয়। পারবে না মা?

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ