আমিও কি একজন ধর্ষক?

Send
ইকরাম কবীর
প্রকাশিত : ১৫:০৬, আগস্ট ০৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৯, আগস্ট ০৪, ২০১৭

ইকরাম কবীরধর্ষণ চলছেই। বিকৃত যৌনতা নিয়ে এ দেশের মেয়েদের অত্যাচার করেই চলেছে ছেলেরা। অনেকে আবার মানসিক বিকলাঙ্গতার প্রমাণ রেখে যাচ্ছে। এই বিকলাঙ্গতা পুরুষ হিসেবে মনের ভেতর প্রদাহের জন্ম দেয়, আক্রোশের জন্ম দেয়।
পত্রিকায় বেরিয়েছে যে একজন রাজনৈতিক কর্মী একজন ছাত্রীকে বাড়ি থেকে ক্যাডার দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছেন। শুধু ধর্ষণই করেননি, ব্যাপারটি ধামাচাপা দিতে মেয়েটিকে ও তার মাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে দু’জনেরই মাথা ন্যাড়া করে দেন। পুলিশ বলছে, মেয়েটি ও তার মায়ের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।
খাবারের লোভ দেখিয়ে ঘরে ডেকে নিয়ে ঢাকার বাড্ডায় তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে এক পুরুষ। এরপর সে শিশুটির মৃতদেহটি বাড়ির শৌচাগারে ফেলে যায়।
এর কিছুদিন আগে জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে একটি মেয়েকে ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে একটি ছেলের বিরুদ্ধে। তারও কিছুদিন আগে আরও কয়েকজন ছেলে একই ভাবে দাওয়াত দিয়ে দু’জন মেয়েকে ধর্ষণ করেছিল। উঠতি সমাজের উঠতি ছেলেরা যখন ধর্ষণে লিপ্ত হয়, তখন সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়। কিছুদিন এ বিষয়ে খবরের তাণ্ডবও চলে। তারপর আবার বরাবরের মতো ঝিমিয়ে যায়। সংবাদ মাধ্যম অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়। বিষয়টিই হারিয়ে যায়। ঢাকার বাইরে থেকে কয়েকটি ধর্ষণের খবর আসে, তবে অন্য কোনও কিছু না ঘটলে তা খবর হিসেবে পাঠানো হয় পত্রিকার ছাপা হওয়ার জন্য। কয়েক মাস আগে পত্রিকায় সারা দেশে কত ধর্ষণ হয় তা ছাপা হয়েছিল।
এ বছর মে মাসের সাত তারিখে কয়েকটি কাগজে একটি খবর বেরিয়েছিল। এ বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত, তিন মাসে ১৪৪ জন মেয়ে-শিশু আমাদের দেশের নানা স্থানে ধর্ষিত হয়েছে। গত বছর ২০১৬ সালে এই একই সময়ে ৪৪৬ জন, ২০১৫ সালে ৫২১ জন, ২০১৪ সালে ১৯৯ জন, ২০১৩ সালে ১৭০ জন এবং ২০১২ সালে ৮৬ জন মেয়ে-শিশু ধর্ষিত হয়েছিল।

চিন্তা করতে পারেন? প্রতি মাসে আটচল্লিশজন মেয়ে-শিশু! আমরা কেমন সাহসী জাতি!

এই হিসেব কিন্তু শুধু মেয়ে-শিশুদের। মেয়ে-শিশু যাদের বলা হয় তার বাইরের ধর্ষণের সংখ্যা এই খবরগুলোতে আসেনি। তাহলে! সেই সংখ্যা যোগ করলে কত হবে? যারা শিশুদের ধর্ষণ করতে পারে, তারা শুধু মেয়ে নয়, ছেলেদেরও ধর্ষণ করতে পারে। কতজন ছেলে-শিশু ধর্ষিত হচ্ছে তার হিসেব আসেনি, আসবেও না। তবে আমরা সাহসী জাতি; ধর্ষণে পটু। শিশু নয় এমন নারীদের সংখ্যাও দেওয়া হয়নি।

এ অবস্থায় আমরা যদি ধর্ষণের হিসেব করতে বসি তাহলে ভিমড়ি খেতে হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল পাঁচ। যুদ্ধের পর-পরই জেনেছিলাম পাকিস্তানি ধর্ষকেরা আমাদের দু’লাখ মেয়েকে অত্যাচার করেছিল। আমার মনে হয় বন্দুকের গুলি বা বেয়োনেট দিয়ে মারলেও, এর চেয়ে ভালো ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও এ অত্যাচার থামেনি। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা এদেশের ছেলেরা যতগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে, তা হিসেব করলে বোধহয় আমার মাথায়ও গোটা চারেক ধর্ষণের দ্বায় পড়বে। এমন দ্বায় যখন আমার ওপরেও আসে, আমার নিজেকেও একজন ধর্ষক মনে হয়।

সম্প্রতি বনানীর একটি হোটেলে দু’জন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এ দেশে জন্ম নেওয়া পুরুষ হয়ে জন্ম নেওয়া একটি অভিশাপ মনে হচ্ছে। পুরুষ হিসেবে লজ্জা হচ্ছে। কিছু পুরুষ এমন জঘন্য অপরাধ করে যাবে এবং দেশের সব পুরুষকে এর দ্বায়ভার বয়ে বেড়াতে হবে।

হোটেলের ওই ঘটনায় আমার কাছে প্রথম বিরক্তিকর বিষয়’টি হচ্ছে পুলিশের আচরণ। পুলিশ মানুষ বিপদে পড়লে বাঁচাতে আসবে। তারা হোটেলের ধর্ষণের ঘটনা মামলা হিসেবে নিতেই চাননি। অনেক কষ্টে দু’জন মেয়ে মামলা করতে পেরেছিলেন। কেন? ওই ছেলেগুলো প্রভাবশালী ধনী ব্যাবসায়ীদের সন্তান ছিল বলে? পুলিশের এই আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনও সদস্য যখন কোনও ধর্ষিতার অভিযোগ অথবা মামলা গ্রহণ করতে চান না, তখন আমরা কি ভাববো? এরাও কি সমান অপরাধে অপরাধী নন? আমার তো মনে হয়, তাই। সমান অপরাধী।

তারপর কাগজে পড়লাম ধর্ষকেরা দেশে ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। তামাশা নাকি! এতো প্রযুক্তি, এতো মনিটরিং চলছে সন্ত্রাসীদের ধরার জন্য; অথচ আমরা ধর্ষকদের ধরতে পারছি না! আমরা জানতে চাই এ ব্যপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য’রা নির্লপ্ততা দেখিয়েছিলেন কিনা। যা হোক; পরে জানা গেলো তারা দেশ ছেড়ে বেরুতে পারেনি এবং এ বিষয়ে মামলার বিচার কাজ চলছে।  

দ্বিতীয় ভয়ের বিষয়টি হচ্ছে আমাদের গণমাধ্যম যেমন করে ধর্ষণের এই ঘটনাটি প্রচার করেছিল। টেলিভিশন সাংবাদিকদের কেউ-কেউ অত্যাচারিত একটি মেয়ের বাড়িতে গিয়ে জানতে চেয়েছিল যে ‘বাড়িটি ধর্ষিতার বাড়ি কিনা’। আমরা সবাই জানি একটি শিশু, একটি মেয়ে, একজন নারী অত্যাচারিত হওয়ার পর সমাজে তার অবস্থা কী দাঁড়ায়, তাকে কোন পর্যায়ে নামানো হয়। যে সাংবাদিক লাইভে আছেন, তিনি না বুঝে এ কথা বলে থাকতে পারেন। ঠিক আছে, মেনে নিলাম। তার হয়তো ধারণা ছিল না এ অবস্থায় কেমন আচরণ করতে হয়। তাদের অফিসে তাকে ধারণা দেওয়ার মতো কি কোনও সম্পাদক ছিলেন না? নিশ্চয়ই ছিলেন।   

একটি ধর্ষণের ঘটনা প্রচার করার সময় আমরা সংবাদ মাধ্যমে ‘রা-রা’ করে ওঠি। ওই ৪৮ শিশু ধর্ষণ নিয়ে কথা বলছি না কেন? টক-শো সাজাচ্ছি না কেন? বেশির ভাগ সাংবাদিক পুরুষ বলে?

আমাদের পুরুষত্ব নিয়ে একটি উদাহরণ দেই।

কিছুদিন আগেকার কথা। আমার এক প্রাক্তন নারী সহকর্মী বাসে করে তার অফিসে যাচ্ছিলেন। বসার জায়গা না পাওয়ায় সে বাসের ভেতর দাঁড়িয়েই ছিলেন। আরো অনেক নারী-পুরুষও দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি তার নিতম্বে একটি শক্ত বস্তু চাপ অনুভব করলেন। প্রথমে বুঝতে পারেননি। যখন বুঝলেন তখন সন্ত্রস্ত হয়ে দেখলেন যে এক পুরুষ তার উত্তেজিত অঙ্গটি তার শরীরে ঘষছে।

সাহসী নারী অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হলেন এবং পুরুষটিকে আক্রমণ করলেন। বাসের সবাইকে জানালেন ওই পুরুষটির অপরাধের কথা। বাসের ভেতর অনেক পুরুষ ছিলেন। তারা কেউ উচ্চবাচ্য করলেন না। সবাই চুপ। একজন যৌন অপরাধীর হাত থেকে এক নারীকে উদ্ধার করতে কেউ এগিয়ে এলেন না। বরং তারা এই নারীকে ঘটনাটি ভুলে যেতে পরামর্শ দিলেন।

অবাক হওয়ার মতো। আমরা পুরুষরা যখন দিনে-দুপুরে কোনও নারীর প্রতি অত্যাচার দেখি, তা নিয়ে কোনও কথা বলি না। প্রতিবাদ করি না। যৌন অপরাধীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগও আনি না। বরঞ্চ যিনি যৌন-বলি হলেন তাকে শান্ত থাকতে বলি। আর এ সুযোগে অত্যাচারী মুক্ত পাখির মতো উড়ে গিয়ে জনারণ্যে মিশে যায়। এই’তো আমরা! আমরা নাকি কোনও না কোনও নারীর বাবা, ভাই এবং সন্তান।

বনানীর ওই হোটেলের এক যৌন অপরাধীর বাবাও এমনই বলেছিলেন। তার কাছে তার ছেলের অপরাধ অপরাধ মনে হয়নি। ওই দু’জন মেয়ের অনুভুতি বোঝার মতো জ্ঞান তার নেই।

আমার কোনও ছেলে যদি এমন অপরাধ করে, তাহলে আমি কী করবো?  এ সমাজের পুরুষ হিসেবে আমি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করবো। একজন যৌন অপরাধীকে বাঁচানোর চেষ্টা আমায় কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়? একজন যৌন অপরাধীকে বাঁচানোর চেষ্টা যে করে সেও কি একজন অপরাধী নয়? একজন ধর্ষককে বাঁচানোর চেষ্টা যে করে সেও কি একজন ধর্ষক নয়।

লেখক: গল্পকার।

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ