বঙ্গবন্ধু, গণতন্ত্র এবং মাই পিপল

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১৩:৩২, আগস্ট ১৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৬, আগস্ট ১৪, ২০১৭

শুভ কিবরিয়াবঙ্গবন্ধু তখনও বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেননি। তখনও তিনি রাষ্ট্রশাসক নন। কিন্তু এই ভূ-খণ্ডের মানুষের গণতান্ত্রিক আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠছেন। সকল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই ভূ-খণ্ডের মানুষের যে লড়াই তখন তা সংঘটিত হয়ে উঠবার প্রক্রিয়া সংহত হয়ে উঠছে তারই উজ্জ্বল নেতৃত্বে। এই ভূ-খণ্ডের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, মুক্তমত প্রকাশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা- নানা বাঁকে মোড় খেয়ে, নানাজনের উদ্যোগে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে জেগে ওঠবার প্রাণ পাচ্ছে এবং সেই প্রাণময়তা তখন শক্তিমান ও লক্ষ্যস্থির হয়ে উঠছে তারই লড়াকু আহ্বানে। সেটা ১৯৬৬ সালের ঘটনা। কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান তার গণতান্ত্রিক ভাবনা লিপিবদ্ধ করছেন জেলখানায় বসে।
লিখছেন, ‘কারাগারের রোজনামচা’। সেই দিনলিপির বয়ান পাঠ করা যাক:-
২ রা জুন ১৯৬৬ ॥ বৃহস্পতিবার
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে খবর এসেছে পুলিশ বাহিনী নিজেরাই দিনের বেলায় ৭ই জুনের পোস্টার (৭ জুন হরতাল ডাকা হয়েছে- লেখক) ছিঁড়ে ফেলছে। ঢাকা ও অন্যান্য জায়গায় তো করছেই। এই তো স্বাধীনতা আমরা ভোগ করছি।
৩ রা জুন ১৯৬৬ ॥ শুক্রবার
হায়রে দেশ! হায়রে রাজনীতি! লুমুম্মার হত্যার পেছনে যারা ছিল তারাই আজ ফাঁসিকাষ্ঠে জীবন দিল। -কঙ্গোর একজন প্রধানমন্ত্রীসহ চারজন সাবেক মন্ত্রীর প্রকাশ্য জায়গায় ফাঁসি দেয়া হয়েছে। সেখানে ২০ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। কঙ্গোতে সাম্রাজ্যবাদের দাবা খেলা এখনো চলছে। জেনারেল মোবুতু যে পথ বেছে নিয়েছে সে পথ বড় কণ্টককীর্ণ। রক্তের পরিবর্তে রক্তই দিতে হয়। মতের বা পথের মিল না হতে পারে, তার জন্য ষড়যন্ত্র করে বিরুদ্ধ দলের বা মতের লোককে হত্যা করতে হবে এ বড় ভয়াবহ রাস্তা। এ পাপের ফল অনেককেই ভোগ করতে হয়েছে।

৪ঠা জুন ১৯৬৬ ॥ শনিবার

খবরের কাগজ এসে গেল দেখে আমি শিহরিয়া উঠলাম; এদেশ থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ চিরদিনের জন্য এরা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে। জাতীয় পরিষদে; ‘সরকারি গোপন তথ্য আইন সংশোধনী বিল’ আনা হয়েছে। কেউ সমালোচনামূলক যেকোনো কথা বলুন না কেন- মামলা দায়ের হবে। ডিপিআর তো আছেই, সিকিউরিটি অব পাকিস্তান আইন তো আছেই। এছাড়া ১২৪ ধারাও আছে।

বক্তৃতা করার জন্য, ১২৪ ধারা ৭(৩) (ইস্ট পাকিস্তান স্পেশাল পাওয়ার অর্ডিন্যান্স) এবং ভিপিআর রুল দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মোটমাট পাঁচটি মামলা আর অন্যান্য আরও তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

৪ঠা জুন ১৯৬৬ ॥ শনিবার

আমার ভয় হচ্ছে এরা পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতেছে। আমরা এ পথে বিশ্বাস করি না। আর এ পথে দেশে মুক্তিও আসতে পারে না। কিন্তু সরকারের এই নির্যাতনমূলক পন্থার জন্য এদেশের রাজনীতি ‘মাটির তলে’ চলে যাবে। আমরা যারা গণতন্ত্রের পথে দেশের মঙ্গল করতে চাই, আমাদের পথ বন্ধ হতে চলেছে। এর ফল যে দেশের পক্ষে কী অশুভ হবে তা ভাবলেও শিহরিয়া উঠতে হয়! কথায় আছে, ‘অন্যের জন্য গর্ত করলে, নিজেই সেই গর্তে পড়ে মরতে হয়’।

দুই.

স্বাধীন পাকিস্তানে যে রাজনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছিল। কেন পাকিস্তান জনগণের রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারলো না, রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পথে বাধাগুলো কী ছিল তার একটা সংক্ষিপ্তসার আছে বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে। বঙ্গবন্ধু লিখছেন, ‘১৯৪৭ সালে যে মুসলীম লীগকে লোকে পাগলের মত সমর্থন করছিল, সেই মুসলীম লীগ প্রার্থির পরাজয় বরণ করতে হলো কী জন্য? কোটারি, কুশাসন, জুলুম, অত্যাচার, এবং অর্থনৈতিক কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা না করার ফলে। ইংরেজ আমলের সেই বাঁধাধরা নিয়মে দেশ শাসন চলল। স্বাধীন দেশ, জনগণ নতুন কিছু আশা করেছিল, ইংরেজ চলে গেলে তাদের অনেক উন্নতি হবে এবং শোষণ থাকবে না। আজ দেখছে ঠিক তার উল্টা। জনগণের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছিল। এদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই আমাদের শাসক গোষ্ঠির। জিন্নাহর মৃত্যুর পর থেকেই কোটারি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছে। লিয়াকত আলী খান এখন সমস্ত ক্ষমতার অধিকারি। তিনি কাউকেই সহ্য করতে চাইছিলেন না। যদিও তিনি গণতন্ত্রের কথা মুখে বলতেন, কাজে তার উল্টা করেছিলেন’।

রাজনীতিতে এই সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন একটা বড় গুণ। জনগণের জন্য বলা কথা ও কাজের মধ্যে মিল থাকাটাও একটা বড় গুণ। শেখ মুজিবুর রহমান সেই গুণের মানুষ ছিলেন। তাই জনগণ তাকে এতটা ভালোবাসা দিয়েছিল। তিনিও জনগণকে সেই ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন। ফলে জনগণ ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে যোগাযোগের একটা মিথস্ক্রিয়া গড়ে ওঠেছিল। সেকারণেই তাঁর অন্তরে এদেশের মানুষ ‘মাই পিপল’ হয়ে উঠতে পেরেছিল।

তিন.

শেখ মুজিবুর রহমান ততদিনে বঙ্গবন্ধু হয়ে গেছেন। পাকিস্তানি কারাগার থেকে ফিরেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের মানুষের নতুন স্বপ্নের তখন তিনিই সারথি। এই সময়ের একটি ঘটনার কথা লিখেছেন এ বি এম মূসা তার ‘মুজিব ভাই’ নামের বইয়ে।

‘দেশে ফেরার মাস খানেক পরে বিবিসির ডেভিড ফ্রস্ট তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য ঢাকা এলে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি কী, হোয়াট ইজ ইওর স্ট্রেংথ?’ বঙ্গবন্ধু জবাব দিয়েছিলেন, ‘মাই পিপল। আমার জনগণ’। তার পরের প্রশ্ন, ‘হোয়াট ইজ ইওর উইকনেস? আপনার সবচেয়ে বেশি দুর্বলতা কী?’ উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমার জনগণের জন্য ভালোবাসা। মাই লাভ ফর মাই পিপল’।

চার.

এই ‘মাই পিপল’ আর পিপলের জন্য ভালোবাসা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি সপরিবারে খুন হন পৈশাচিক নির্মমতায়। যে মানুষটি গণতন্ত্রের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছিলেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন, স্বাধীন দেশে তার বুকের রক্ত ঝরলো। দেশ পেলো না গণতন্ত্রের ঠিকানা খুঁজে।

কিন্তু কেন এই হত্যাকাণ্ড, কেন এই বাংলাদেশের পেছন কামড়ে ধরা তার রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ আজও সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পেছন কারণ কী ছিল তার রাজনৈতিক কারণ আজও জানা যায়নি।

রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামের দিনে যে গণতন্ত্রের অভাবহীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর কষ্ট ছিল, যার কথা তার ‘কারগারের রোজনামচায়’ তিনি উল্লেখ করেছেন বারেবারে, সেই গণতন্ত্র স্বাধীন দেশেও ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠা পায়নি। দুঃখ সেটাই।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ