প্রত্যেকেই আমরা এক একজন রোহিঙ্গা

Send
কাজী আনিস আহমেদ
প্রকাশিত : ০০:৩৬, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৬, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৭

কাজী আনিস আহমেদচলতি বছরের ২৬ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর নতুন অভিযানে প্রাণ হারিয়েছে এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। এরপর প্রাণ বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। গত দুই সপ্তাহে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা। ২৫ আগস্ট রাখাইনে স্বঘোষিত রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গ্রুপ ‘আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি’ (এআরএসএ) মিয়ানমারের পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এআরএসএ নামের সংগঠনটি ওইদিন ২৪টি পুলিশ পোস্টে হামলা চালায়। এতে ১১ নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন।
নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা কোনও দেশই মেনে নিতে পারে না। তবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কর্মকাণ্ডের জন্য সামগ্রিকভাবে একটি সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না। জাতিগত নিধনযজ্ঞের প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু একটি গোষ্ঠী নিধনে এ অভিযান মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। একটি সম্প্রদায়ের ওপর এমন সহিংসতার পেছনে অজুহাত খাড়া করা হলো—জাতিগত নিধনযজ্ঞ, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার পর অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে বিশ্বের অনেক দেশই উদ্বিগ্ন। তবে, এটা মনে রাখতে হবে, সব সশস্ত্র গোষ্ঠীই উগ্রপন্থী কিংবা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের অংশ নয়। সেইসব গোষ্ঠী লড়াই করছে বিপুল বেসামরিক হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত কোনও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে, তাদের উগ্রপন্থী কিংবা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের অংশ নয়, ভিন্ন চোখে দেখা দরকার।
পরিষ্কার করে বলে নেওয়ার তাগিদ বোধ করছি যে, বাংলাদেশ কিংবা বাংলা ট্রিবিউন কেউই আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি-এআরএসএ’র সমর্থক নয়। আমরা তাদের সহিংস হামলাগুলোকে উপেক্ষা করতে বা এড়িয়ে যেতে চাই না। আসলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডের সমর্থক নয়, আঞ্চলিক প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে তো নয়ই। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, চীন আর ভারত দুই দেশই সাম্প্রতিক রাখাইন সহিংসতা নিয়ে মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ স্বতন্ত্র অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে। এআরএসএ-এর হামলার চেয়ে অনেক বিস্তৃত ও ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তাদের ওপর সংঘটিত মিয়ানমারের নির্যাতন-নিপীড়নকে একাত্তরের গণহত্যার দুঃসহ স্মৃতি বহনকারী বাংলাদেশ তাই উপেক্ষা করতে পারেনি।
রোহিঙ্গাদের প্রশ্নে মিয়ানমারের নীতি হলো রাখাইন প্রদেশ থেকে তাদের উচ্ছেদ করা। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি সম্ভবত ‘নিখুঁত’ভাবে পরিচালিত জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের বড় নজির। এই ‘শুদ্ধি অভিযানে’র কারণেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের অপরিহার্য আশ্রয়দাতার ভূমিকা নিতে বাধ্য হয়েছে।
বলে রাখা ভালো, এর আগে ৭০’র শেষ দিক থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। ৯০’র দশকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের স্রোত বাড়তে থাকে। আজকে এসে সম্ভবত ৫ লাখে দাঁড়িয়েছে।
রাখাইনের সাম্প্রতিক হামলা ভয়াবহতার নতুন মাত্রা হাজির করেছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম, কেটে ফেলা হচ্ছে শিশুদের গলা, নির্বিচারে গুলি করা হচ্ছে অস্ত্রহীন বেসামরিক রোহিঙ্গাদের। পুলিশ আর সেনাবাহিনীর পাশাপাশি কোনও কোনও ক্ষেত্রে অস্ত্রধারী ব্যক্তিরাও যোগ দিচ্ছে হামলায়। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের পৃথককারী সীমান্তবর্তী নাফ নদীতে ভাসছে রোহিঙ্গাদের লাশ। যারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা করছেন, সীমান্ত অঞ্চলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পুঁতে রাখা মাইনের বিস্ফোরণে তাদের পা উড়ে যাচ্ছে।
এইসব ভয়াবহ ঘটনার মধ্যেই পূর্বনির্ধারিত মিয়ানমার সফরে যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ‘উগ্রপন্থী সহিংসতা’র বিরুদ্ধে মিয়ানমারের ‘লড়াই’য়ে সংহতি জানান মোদি। তবে বেসামরিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি কথাও বলেননি তিনি। সম্ভবত নিজ দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যাপারে উদ্বেগের কারণেই ঐক্য আর আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তবে এটাই সম্ভবত ওই একমুখী অবস্থানের একমাত্র কারণ নয়।
এই অঞ্চলে চীন-ভারতের সম্পর্ক জটিলতাপূর্ণ। ভুটানের ডোকলাম মালভূমিতে চীনের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের কারণে ভারত কিছুটা নড়বড়ে অবস্থানে আছে। দীর্ঘদিন চীনের বলয়ের মধ্যে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুহীন থাকা অবস্থায় গত এক দশকে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। চীন যখন ভারতের পুরনো মিত্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়েছে, ভারত তখন চীনের আঞ্চলিক আধিপত্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রয়োজন অনুভব করছে। তাই তারা নিজের নাগরিকদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের নিপীড়ন থেকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। এদিকে চীন তার দীর্ঘদিনের মানবাধিকারের বিষয়ে কাউকে ভর্ৎসনা না করার নীতির কারণে চুপচাপ আছে।
রাষ্ট্রগুলোর ‘আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও ঐক্য’ প্রসঙ্গে ভারত আর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশও সমানভাবে উদ্বিগ্ন। কিন্তু বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে ব্যাপকহারে বেসামরিক লোকদের হত্যাকে উপেক্ষা করা সহ্য করা যায় না। এখন পর্যন্ত পশ্চিমা শক্তিগুলো সময় উপযোগী কথাবার্তা বলছে ঠিকই, তবে খুব বেশি সময় পর্যন্ত তারা আঞ্চলিক সমস্যার বিরূপ প্রভাব এড়াতে পারবে না।
রোহিঙ্গাদের এই দুর্দশার দায় পশ্চিমা বিশ্ব কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। যখন মিয়ানমার একটা অবরুদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে চীন-রাশিয়া ব্লকের ছায়াতলে ছিল, তখন তারা অং সান সু চিকে স্বাধীনতার মূর্তপ্রতীক হিসেবে হাজির করেছে। অং সান সু চিকে একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পশ্চিমা বিশ্ব এতটাই তৎপর ছিল যে, সামরিক জান্তার অধীনে প্রতিষ্ঠিত কথিত গণতন্ত্রের হেঁয়ালিতেও সমর্থন যুগিয়ে গেছে তারা। ক্ষমতার কাঠামোয় কোনও পরিবর্তন আসছে না এবং এই কাঠামোর মধ্যে দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন চলতে থাকবে জেনেও তারা এই ভূমিকা নিয়েছে। তাদের এই ভূমিকায় সু চির মতো ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জাতিগত নিধন প্রক্রিয়া আরও ভয়ানক হয়ে উঠেছে।
এই নিষ্ঠুরতার জন্য পশ্চিমা বিশ্বকে দোষ দেওয়া যায়। তবে আজকের বাস্তব রাজনীতিটা ভারত ও চীনের। চীনে প্রবেশাধিকারের জন্য ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে বাংলাদেশে গণহত্যার বৈধতা দিতে নিক্সন প্রশাসন যে ভূমিকা নিয়েছিল, এখন ঠিক একই ভূমিকা নিয়েছে ভারত। তখনকার লড়াকু ভারতই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে ছিল। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর সীমান্তের ওপারে তার বন্ধু ইন্দিরা গান্ধী মিলে এই মানবিক ভূমিকাকে বাস্তব করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! ১৯৭১ সালে আমরা যেমন বাঁচার জন্য ব্যাকুল ছিলাম, তেমনি এক জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্ব এসে পড়েছে বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়াটা বাংলাদেশের জন্য খুব সহজ নয়। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। আমরা সবেমাত্র মধ্যআয়ের দেশে রূপান্তরিত হয়েছি। এর ওপর রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্বেগে আছে বাংলাদেশের মানুষ। অনেকেই মনে করেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শরণার্থী শিবিরগুলো অপরাধের আখড়ায় রূপান্তরিত হয়ে সামাজিক ভারসাম্য নষ্টের কারণ হতে পারে। এ ধরনের আশঙ্কায় একটা ভ্রান্তি থাকে। আসলে, গরিবেরা অপরাধকর্মের হোতা নয়। যথাযথ সুযোগ-সুবিধা আর সুরক্ষার অভাব তাদের অপরাধীদের হাতিয়ারে পরিণত করে।
বৈধ-অবৈধ দুই ধরনের শরণার্থী নিয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অভিবাসী দেশ। এই দেশের মানুষ শরণার্থীদের বেদনা বুঝতে সক্ষম। অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে বাঁচার আশায় শরণার্থী হতে গেলে যে বঞ্চনা সহ্য করতে হয়, সেই বঞ্চনা তারা অন্যদের দিতে চায় না। ২০১২ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর একইরকমের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা নেমে এসেছিল। তখন আমরা অপরাধ বৃদ্ধির শঙ্কায় সীমান্তে নজরদারি জোরদারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। মিয়ানমার কর্তৃক একটি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির নির্মূলের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতেই এমন অবস্থান নিয়েছিলাম।
এক নতুন বাস্তবতায় রয়েছি আমরা। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষকে হত্যা করে বাকিদের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়াটা যেন আর মিয়ানমারের লক্ষ্য নয়। এবার তাদের অবস্থান হলো, কত বেশি সংখ্যক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা যায়। মিয়ানমারের এই অবস্থান রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষকে আরও বেশি সংবেদনশীল করে তুলেছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সীমান্তে ‘মানবিক’ অবস্থানের উদাত্ত ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে, মাঝে মাঝে সীমান্তে রোহিঙ্গাদের পুশব্যাক করার কথা শোনা গেলেও কার্যত প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই কাজ করতে গিয়ে কোনও অহঙ্কার দেখায়নি বাংলাদেশ। কোনও রকমের বিদ্বেষও কাজ করেনি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি সম্পূর্ণ মানবিক অবস্থান নিয়েছে।
বিশ শতকের যত লেখক তাদের রচনায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংস পরিস্থিতিকে রূপায়ন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম নোবেল বিজয়ী একজন ভি.এস. নাইপল। ‘অ্যা বেন্ড ইন দ্য রিভার’ নামের উপন্যাসের শুরুতে তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্ব যেমনটা আমরা দেখে থাকি ঠিক তেমনই'। মূল্যহীন কিংবা যারা নিজেদের মূল্যহীনতা মেনে নিয়েছেন, তাদের কোনও জায়গা নেই এই বিশ্বে। মিয়ানমারের সরকার ও জনগণ রোহিঙ্গাদের ‘মূল্যহীন’ বিবেচনা করে। আর এ কারণেই বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন ওই জনগোষ্ঠীর আশ্রয় নিশ্চিত করা বাংলাদেশের কর্তব্য। বিশ্বটা নির্মম বা নির্বিকার সেটা এখানে বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য একটাই মূল্যহীনতার অপবাদে অস্তিত্ব— হারানো কখনোই নিয়তি হতে পারে না। এটা আমরা হতে দিতে পারি না ।

লেখক: প্রকাশক, ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউন

.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ