ব্রিকস সম্মেলন এবং চীন-ভারতের প্রতিযোগিতা

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৩:২২, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১২, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৭

আনিস আলমগীরগত ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ চীনের সিয়ামেনে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। দোকলামে চীন ও ভারতীয় বাহিনীর মুখোমুখী অবস্থানের কারণে অনেকে মনে করেছিলেন হয়তো ব্রিকস সম্মেলন হবে না। কিন্তু আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে, যুদ্ধও হবে না, সম্মেলনও যথা নিয়মে অনুষ্ঠিত হবে। তাই হলো।
যুদ্ধ হলো না কেন? উভয়ের হাঁক-ডাক তো কম ছিল না। চীন বলেছে ভারতের ১৯৬২ সালের কথা স্মরণে থাকা উচিত। আর ভারত বলেছে ১৯৬২ আর ২০১৭ এক কথা নয়। এখন ভারত ও চীন উভয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে মোড়ল হতে চায়। দোকলামে যুদ্ধ হলে এ যুদ্ধে যে পক্ষই পরাজিত হোক না কেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার ভাবমূর্তি ম্লান হয়ে যাবে- তাই কেউ যুদ্ধে যায়নি।
১৯৬২ সালের পর থেকে ভারত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। আর ভারত এখন বিশ্বে এক নম্বর সমরাস্ত্র ক্রয়কারী রাষ্ট্র আবার পারমাণবিক অস্ত্রও রয়েছে তার। সর্বোপরি ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সামরিক চুক্তিও আছে। সুতরাং চীন তাকে কোনোভাবেই অবহেলা করতে পারে না। মানে উভয়ে দোকলাম থেকে সরে গেছে।

চীনে মূলধনের পাহাড় জমেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মূলধন বেড়ে গেলে উপনিবেশ দখল করতো। কাঁচামালও সস্তায় পেত আবার উৎপাদিত দ্রব্যও বিক্রি করতো। এখন উপনিবেশ দখলের সুযোগ নেই। সুতরাং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো নব নব পন্থা উদ্ভাবন করে পুঁজি বিনিয়োগের পথ সৃষ্টি করছে। বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, ব্রিকস ব্যাংক- এগুলো পুঁজি খাটানো এবং উপার্জনের নব নব পন্থা।

বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ পুরনো প্রতিষ্ঠান। পুঁজি বিনিয়োগের ব্যাপারে তারা রক্ষণশীল। ব্রিকস সম্ভবতো কিছুটা উদারনীতি গ্রহণ করবে। ব্রিকস-এর উদ্যোক্তা রাষ্ট্র পাঁচটি- চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা। ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার পুঁজি বিনিয়োগের শক্তি কম। পুঁজি বিনিয়োগের শক্তি আছে চীন, রাশিয়া, ভারতের। ব্রিকসে ধনবাদী রাষ্ট্র হলো চীন। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। বিশ্ব ব্যাংকের ন্যাচারাল লিডার যেমন- আমেরিকা, ব্রিকসেরও ন্যাচারাল লিডার হচ্ছে চীন। চীনের রিজার্ভ এখন ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পুরনো দুই নেতা মাও সে তুং এবং দেং জিও পিং এর মতোই নাকি ক্রিয়েটিভ জিনিয়াস। ব্রিকস, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড তারই ব্রেইন চাইল্ড।

ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড পরিকল্পনাটা হচ্ছে মূলত কানেকটিভিটি। সিল্ক রোড পরিকল্পনায়, স্থল ও নৌপথে চীনকে ৬১টি দেশের সঙ্গে সহজ সংযোগ স্থাপন করে দেবে। এই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড পরিকল্পনায় চীন বহু বন্দরও স্থাপন করছে। এই বন্দরগুলোতে চীন সাবমেরিন ঘাঁটিও স্থাপন করছে। তাতে নৌপথ পাহারার কাজও চলবে।

পাকিস্তানে গোয়াদর বন্দর স্থাপন করেছে চীন। শ্রীলংকা থেকে হামবানতোতা বন্দর কিনে নিয়েছে, সেখানেও সাবমেরিন ঘাঁটি স্থাপনের কাজ চলছে। মিয়ানমারের আকিয়াব উপকূলে কিয়াউকাফিউ বন্দর স্থাপনের কাজ চলছে। এই সব বন্দর স্থাপন করে বাণিজ্যের কাজও চালাবে। আবার নৌঘাঁটিও স্থাপন করে নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করবে। চীনের সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ব্যবস্থাও আছে। বাণিজ্য ও সামরিক শক্তিতে দুনিয়ার শীর্ষস্থান অধিকার করার এক প্রচণ্ড বাসনা নিয়ে চীন অগ্রসর হচ্ছে।

চীনের উন্নয়ন সর্বত্র এক রকম নয়। তাতে চীনাদের মাঝে অসন্তোষও আছে। সব উন্নয়ন হয়েছে বোহাই উপসাগর, পীত উপসাগর, পূর্ব চীন সাগর, টংকিং উপসাগর অর্থাৎ এ সব সাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় যেখানে বন্দরের সুবিধা গড়ে উঠেছে। বন্দর থেকে পশ্চিমের শিনজিয়াং প্রদেশ ২ হাজার মাইল পশ্চিমে। পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরের কারণে শিনজিয়াং-সহ পশ্চিমের কয়েকটি প্রদেশে শিপ উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। তারা গোয়াদর বন্দর ব্যবহার করবে তাদের আমদানি-রফতানির জন্য।

আকিয়াব উপকূলে কিয়াউকাফিউ বন্দর ব্যবহার করে কুনমিং প্রদেশসহ মধ্যচীনে শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে। মধ্যচীনের গ্যাস জালানি যাবে আরাকান থেকে কারণ আরাকানের উপকূলে তেল ও গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে। সে গ্যাস ও তেল নেওয়ার জন্য চীন তার কুনমিং প্রদেশ পর্যন্ত পাইপ স্থাপন করছে। এ কারণেই রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমার যে বেকায়দায় পড়েছে তার থেকে মিয়ানমারকে রক্ষা করার জন্য চীন তার পার্শ্বে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে।

চীন তার সার্বিক উন্নয়নে বদ্ধপরিকর কারণ ওবামা ‘পিভট টু এশিয়া’ নামক পরিকল্পনা রচনা করা হয়েছিলো চীনকে উপলক্ষ্য করে। ট্রাম্প এ পরিকল্পনা বাতিল করেননি। এ পরিকল্পনার মূখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে চীনকে ঘিরে ফেলা আর সোভিয়েতের মতো টুকরো টুকরো করে ফেলা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ নিয়ে খুবই চিন্তিত এবং চীনের সর্বত্র উন্নয়নের প্রয়োজনেই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড পরিকল্পনা তৈরি করেছেন, যেন চীনে গণঅসন্তোষ তৈরি না হয়। আমেরিকা যেন সোভিয়েতের মতো চীনকে ভেঙে দেওয়ার কোনও সুযোগ না পায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৫ আগস্টের ব্রিকস সম্মেলনে যোগদান করেছেন। তারা কিন্তু চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করেননি। সীমান্তে উভয় রাষ্ট্রের মাঝে বিদ্যমান সংকট প্রচুর। ভারত ভিয়েতনামের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করেছে। ভিয়েতনামের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক খুব ভালো নয়।

মরিসাসে ভারত নৌঘাঁটি স্থাপন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট করার চেষ্টা করছে এবং জয়েন্ট ডিফেন্স এর ব্যাপারে বাংলাদেশকে চাপে রাখা হয়েছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার জয়েন্ট ডিফেন্সে সম্মত না হলে হয়তো ২০১৯ সালের নির্বাচনে তাকে ক্ষমতায় আসতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে। শ্রীলংকায়ও ভারত গত নির্বাচনে একই কৌশল অবলম্বন করেছিল। বিএনপি মুখিয়ে আছে ভারতীয় প্রস্তাব গিলে খাওয়ার জন্য। শ্রীলংকায় চীন যে হামবানতোতা বন্দর কিনে নিয়েছে তার পার্শ্বের এক পরিত্যক্ত বিমানবন্দর সংস্কারের কাজ নিয়েছে ভারত। শেষ পর্যন্ত এ বিমানবন্দর লিজ নেওয়ার জোর চেষ্টা করবে। ছোট দেশ হিসেবে হয়তোবা শ্রীলংকা বিমানবন্দর লিজ দিতে বাধ্য হবে।

বড় দেশগুলোর পাশে ছোটদেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ধীরে ধীরে খেল তামাশার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। চীন ১৯৬২ সালে ভারতের লাদাখে ৩২ হাজার বর্গমাইল এলাকা দখল করে নিয়েছে। সে জায়গা এখনও ছাড়েনি। লাদাখের মানুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী তিব্বতের মতো লামা মতের অনুসারী। ভারত অরুণাচল প্রদেশ গঠন করেছে ১৯৭২ সালে আর চীন অরুণাচলের ৩০ হাজার বর্গমাইল এলাকা তার বলে দাবি করছে। ভারতের সেনাবাহিনী এ অঞ্চলে এখন ম্যাক মাহন লাইন থেকে ১২.৫ মাইল দক্ষিণে অবস্থান নিয়ে আছে। এই সব বিরোধ এবং উভয় রাষ্ট্রের ঘাঁটি স্থাপনের প্রতিযোগিতা, সমরাস্ত্রের অফুরন্ত স্টক তৈরির আকাঙ্ক্ষা- সব মিলিয়ে চীন ও ভারত একটা অস্থির অবস্থার মাঝে রয়েছে।

কোনও কারণে কোনও সময় এই সব সমস্যা উভয়ের মাঝে তীব্র আকার ধারণ করলে হয়তোবা ব্রিকস-এর অবস্থা সংকটের মাঝেও পড়তে পারে। আমেরিকা ভারতের সঙ্গে বহু চুক্তি করেছে। আমেরিকা ভারতকে সবসময় কাছে টানতে চেয়েছে, ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য। চীন অর্থে-শক্তিতে বিশ্বের শীর্ষে পৌঁছে যাবে আর আমেরিকার অবস্থা ব্রিটেন/ফ্রান্সের মতো হয়ে যাবে- সে অবস্থা আমেরিকা কখনও মেনে নেবে না।

ব্রিকস-এর অন্য সদস্যের মাঝে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের কোনও বিরোধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ রাশিয়া এখনও বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি। চীন রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধ করে তাকে দূরে ঠেলে দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। নিজের প্রয়োজনেই চীন রাশিয়াকে নিজের কাছে রাখতে হবে। তবে ব্রিকস-এর নেতৃত্বের ব্যাপারে রাশিয়াকে অনুৎসাহিত বলে মনে হয় না।

ব্রিকস ধীরে ধীরে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষ ব্রিকস-ভূক্ত দেশগুলোতে বসবাস করে। বিশ্ব জিডিপির ২৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ব্রিকস। জোটটি আগামীতে সম্প্রসারিত হবে কিনা জানি না। তবে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে সঙ্গে রাখতে ইচ্ছুক তা বুঝা যায়। এই কারণে এবারের সম্মেলনে মিসর, থাইল্যান্ড, মেক্সিকো, তাজাকিস্তান ও গায়নার মতো রাষ্ট্রগুলোর সরকার প্রধানেরা যোগদান করেছেন।

ব্রিকস প্রতিশ্রুতিশীল, হয়ত এ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে সংস্থাটি মহীরুহ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

[email protected]

 

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ