ঠিক কাজটি করুন

Send
কাজী জাহিন হাসান
প্রকাশিত : ১৭:১৮, অক্টোবর ১০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৩০, নভেম্বর ০৩, ২০১৭

কাজী জাহিন হাসানএক মাস আগেই রোহিঙ্গাদের ‍ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো শুরু করে মিয়ানমার। এরপর বাংলাদেশে পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। দুর্ভাগ্যবশত মিয়ানমারের পক্ষে চীনের সমর্থন রয়েছে। মিয়ানমারে সেফজোন নির্মাণে জাতিসংঘের প্রস্তাবে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগও করতে পারে চীন।
সেফ জোন তৈরি করা হলেও রোহিঙ্গারা যে দেশে ফিরে যাবেন, সে বিষয়ও নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। কারণ তারা চোখের সামনে দেখেছে যে তরুণদেরকে কিভাবে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়েছে, কিভাবে কিশোরী বয়সের মেয়েদেরকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে, গুলি করা হয়েছে।
তাই মিয়ানমারের দেওয়া কোনও প্রতিশ্রুতিই তারা বিশ্বাস করতে পারবে না। অনেকেই ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেও ফিরে গিয়েছিলো। কিন্তু আবার পালিয়ে আসতে হয়েছে তাদের।
মনে রাখা দরকার, বসনিয়ান যুদ্ধে জাতিসংঘের তৈরি ‘সেফ এরিয়া’তেও সার্বিয়ান বাহিনী হামলা চালিয়েছিলো। আট হাজার বসনিয়ান মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছিলো স্রেব্রেনিকা নামের ওই সেফ এরিয়াতে।

জাতিসংঘের প্রস্তাবে সেফ এরিয়া তৈরি করা হলেও সদস্য দেশগুলো তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে সেখানে মোতায়েন করতে রাজি হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও আর এই ভুল করতে চাইবে না। এমন কোনও সেফ এরিয়া তারা তৈরি করবে না, যার নিরাপত্তা সেই দেশের সেনাবাহিনীর হাতেই ন্যস্ত থাকবে।

আরসা’র মতো বিদ্রোহীরা মিয়ানমার থেকে আরাকানকে স্বাধীন করতে পারবে না। বাংলাদেশ মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা পেয়েছে। কারণ আমরা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। বাংলাদেশে সহজেই তাদের সেনা নিয়ে আসতে পারেনি পাকিস্তান।

কিন্তু আরাকান মিয়ানমারের সঙ্গে সংযুক্ত। তাই আরসা’র বিরুদ্ধে চাইলেই তারা ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে পারবে।

আরসা আরাকান রাজ্যকে মুক্ত করতে পারবে না; রোহিঙ্গারা কেবল নাগরিকত্বের নিশ্চয়তায় ফিরে যেতে পারবে। মিয়ানমারই এই অধিকার কেড়ে নিয়েছে এবং তাদেরই এটা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করতে হবে।

চাপে পড়ে মিয়ানমার সম্প্রতি বলেছে, বাসিন্দা প্রমাণ করতে পারলে তারা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেননি তারা। আর এটা বুঝে-শুনেই করছে মিয়ানমার। কারণ তারা জানে, যতদিন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে না, ততদিন তাদের তাড়িয়ে দেওয়া যাবে।

তাই এর একমাত্র সমাধান আসলে কূটনীতিতে। বাংলাদেশের উচিত মিয়ানমারে ব্যবসায়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিত্ব দেওয়ার প্রশ্নেই কেবল এই নিষেধাজ্ঞা তুলতে হবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং সৌদি আরব, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার মতো শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য সমর্থন আনতে হবে। তাদেরকে রাজি করাতে হবে যেন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে ফিরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারের ওপর নিষেধজ্ঞা জারি থাকে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য রুখতে কাজে দিয়েছিলো বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য রুখতেও এই নিষেধাজ্ঞা ভূমিকা রাখতে পারে।

আমরা যদি উল্লেখিত দেশগুলোকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করতে রাজি করিয়েও ফেলি, তবুও মিয়ানমারে এই বৈষম্য দূর করতে ১০ বছরের বেশি সময় লেগে যাবে। ততদিন পর্যন্ত রোহিঙ্গারা নাগরিক হিসেবে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে না। এই সময়ে আমাদের সঠিক কাজটিই করা উচিত। এই অসহায় ও দুর্ভাগা মানুষদের স্বাগত জানানো উচিত। কারণ তাদের আর যাওয়ার কোনও জায়গা নেই।

এক্ষেত্রে প্রথমে আমাদের সব রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। ইউরোপ ও আমেরিকার ধনী দেশগুলোকে অনুরোধ করতে হবে যেন যতসংখ্যক সম্ভব রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সবাইকে আশ্রয় দেবে, এমনটা আশা করা ঠিক নয়। আমাদের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে খাবার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সহায়তা চাইতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক শরণার্থীদের জন্য বাংলাদেশের যেকোনও স্থানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের আরও নিয়োগযোগ্য করে তোলার জন্য আমাদের উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তহবিল চাওয়া। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের এদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত।

একইভাবে এটাও গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে যে আমাদের কী করা উচিত নয়। তাদের সিম কার্ড কেনা থেকে নিবৃত্ত করা আমাদের উচিত নয়। পরিবারের জীবিত সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সেলফোনের দরকার রয়েছে। তাদের দূরবর্তী দ্বীপে একটি ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ করে ফেলা উচিত নয়; যেখানে তাদের কর্মসংস্থানের সন্ধান করা এবং আমাদের সমাজের সঙ্গে একীভূত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এক প্রজন্ম আগে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহিংসতা থেকে পালিয়ে যাওয়া লাখ লাখ বাংলাদেশিকে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর এই শরণার্থীরা নিজ দেশে ফিরে আসেন। রোহিঙ্গারা আরাকান থেকে পালিয়ে গেছে। কিন্তু আরসা বিদ্রোহীদের পক্ষে স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র জয়ের কোনও সুযোগ নেই। তাদের কোনও ঘরবাড়ি নেই যেখানে তারা ফিরে আসতে পারে। আমরা শুধু সুবিবেচনা বোধ দিয়ে তাদের এই দেশে স্বাগত জানাতে পারি।

লেখক: চেয়ারম্যান, টু-এ মিডিয়া লিমিটেড।

/এমএইচ/এমপি/এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ