চিকিৎসা বাণিজ্যের বিকাশ, উপেক্ষিত জনস্বার্থ

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১৩:৩০, অক্টোবর ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৩, অক্টোবর ১৩, ২০১৭

শুভ কিবরিয়াযে কোনও জেলায় কিংবা উপজেলায় গেলে আমার চোখে পড়ে দুটো জিনিসের বিস্তার। এক. ডায়াগনস্টিক সেন্টার দুই. কোচিং সেন্টার। এই দুই সেন্টারের বিরাট বিকাশ প্রমাণ করে এই দুই ক্ষেত্রেই আমাদের বিনিয়োগ বা খরচ বাড়ছে। আগে রোগ বালাই হলেই মানুষ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতো। এখন পয়সাওয়ালারা বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতালে যায়। যাদের পয়সা আরেকটু বেশি তারা যায় বিদেশ। একসময় বলা হতো যোগাযোগ ভালো থাকলে সেরা ট্রিটমেন্ট মিলবে পিজি হাসপাতালে বা ঢাকা মেডিক্যালে। কারণ সেরা ডাক্তাররা সেখানে কাজ করে। যদি খুটির জোর থাকে তাহলে এই সরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসা মিলবে কম পয়সায় সবচেয়ে ভালো। এখন আর সেইকথা বলা যায় না।  কেননা এক. এই সরকারি হাসপাতালগুলো ওভারবার্ডেন; ক্ষমতা যা আছে তার চাইতে চার/পাঁচ গুণ চাপ সইতে হয় তাদের। পাবলিক খাত বলে এখানে ব্যবস্থাপনার মান নানান চাপে দিন দিন খারাপ হয়েছে। সুতরাং ভালো চিকিৎসা এখানে কঠিন। তবুও এই সরকারি হাসপাতালগুলোই গরিব মানুষের ভরসা। দুই. গত দেড় দশকে চিকিৎসাশিক্ষা খাতে দুর্নীতি এবং রাজনীতিকরণ এমন মাত্রায় বেড়েছে যে, ভালো ডাক্তার আর তৈরি হচ্ছে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষায় চান্স পাওয়া আর পাস করা এখন যতটা মেধার বিষয় তার চাইতে অনেক বেশি রাজনীতির বিষয়। একসময় বিএনপির সংগঠন ড্যাব যারা করতেন আর এখন স্বাচিপ যারা করেন তাদের মধ্যে ক্ষমতাবানরাই এসব সুবিধা বাগিয়ে নেন। ফলে ঢাকার বড় বড় হাসপাতালে যারা বড় বড় পদ বাগিয়ে বসে আছেন তারা কতটা ভালো ডাক্তার বলা মুশকিল। এদের অনেকেই হয়তো চিকিৎসাবিদ্যার চাইতে রাজনীতিবিদ্যায় অধিকতর পারদর্শী। সেকারণেই এইরকম ডাক্তাররা কতটা বিপদমুক্ত চিকিৎসা দেবেন বলা মুশকিল।

২.

সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা এখন সেবা নয়। মানুষ পয়সা দিয়ে চিকিৎসা কিনছে। কিন্তু সেখানে ভোক্তাস্বার্থ কতটা রক্ষিত হচ্ছে সেটা দেখার কেউ নেই। সংকটটা সেখানেই।  বাণিজ্যও খুব খারাপ জিনিস নয়, যদি বাণিজ্যপ্রবাহে নৈতিকতা বা এথিকস পালিত হয় যথাযথভাবে। অথবা যেসব মানদণ্ড থাকা দরকার তা প্রতিপালিত হয় ঠিকভাবে। কিংবা মনিটরিং ব্যবস্থাটা ন্যায্য থাকে।

প্রাইভেটখাতে চিকিৎসাবাণিজ্য বড় আকারে বিস্তার লাভ করলেও এই বাণিজ্য নিয়ে মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। বড় অভিযোগ হচ্ছে এক. ডাক্তাররা ডায়াগনস্টিক সেক্টরের সঙ্গে যোগসাজসে বিপুলতর টেস্ট করান। দুই, ওষুধ কোম্পানির ব্যবসা বাড়াতে ডাক্তাররা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ লেখেন। তিন. ওষুধের দাম ভয়ানকভাবে বেড়ে চলেছে। এটা নিয়ন্ত্রণের কোনও কার্যকরী ব্যবস্থা দেশে সচল নাই।  মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বেড়েই চলেছে। এর কতটা ন্যায্য ব্যয় আর কতটা ডাক্তার-ডায়াগনস্টিক সেন্টার-ওষুধ কোম্পানির যোগসাজসের ফল এবং তাদের বাড়তি মুনাফার চাপ, সেটা মানুষ বুঝতে পারছে না।

৩.

সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে পাওয়া কতগুলো পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যেতে পারে।

এক. স্বাস্থ্যব্যয়ে সরকারের অংশ দিন দিন কমছে। ১৯৯৭ সালে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় ছিল ৩৭ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশে। অপরপক্ষে ১৯৯৭ সালে স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারি ব্যয় ছিল ৫৭ শতাংশ, ২০১৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে।

দুই. মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ছে কিন্তু তাতে সরকারের অংশ কমছে, আর ব্যক্তির নিজের পকেটের খরচ বাড়ছে।

তিন. সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যের জন্য ব্যক্তি বা পরিবারের পকেট থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে বাংলাদেশের মানুষ।

চার. ব্যক্তির স্বাস্থ্যব্যয়ের ৭০ শতাংশ ব্যয় যায় ওষুধের পেছনে।

পাঁচ. দেশে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন গড়ে ৫টি করে বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে ওঠছে।

৪.

কিন্তু মানুষের ভোগান্তি কমছে না কেন?

এক. এইখাতে সহজ ও ব্যাপক এবং দ্রুত মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সে কারণেই অনেকেই এই ব্যবসায় প্রবেশ করছে।

দুই. অনেকের মতে সরকারেরর ভ্রান্ত নীতি ও কার্যকর মনিটরিং এবং ব্যবস্থাপনার অভাবেই এই নিয়ন্ত্রণহীন চিকিৎসা বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিন. ওষুধের পেছনে রোগীদের বেশি খরচ হলেও তা দেখার কেউ নেই। সরকার ওষুধ কোম্পানির কাছে একধরনের আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। কোন ওষুধের উৎপাদন খরচ কত, মুনাফা কত হওয়া ন্যায্য, তা নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যবস্থা কার্যকরি নেই। ফলে ওষুধের দাম বেড়েই চলেছে লাগামহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে।

চার. চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বাড়ছে। তার কোয়ালিটি দেখার কেউ নেই। চিকিৎসা ব্যয় কতটা যৌক্তিক তাও দেখার কেউ নেই। সেটাও এই ব্যবসাকে লাগামছাড়া মুনাফার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

ফলে চিকিৎসা খরচ মানুষের কাছে এক ভীতিকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৫.

এখন তাহলে মুক্তির উপায় কী? চিকিৎসা বাণিজ্যে ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষিত হবে কিভাবে?

প্রথমত, চিকিৎসাব্যবস্থায় চিন্তাগত পরিবর্তন জরুরি। চিকিৎসা শিক্ষা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার পুরনো মডেল পরিবর্তন করা খুব দরকারি হয়ে পড়েছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনার মান প্রযুক্তি নির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতেই হবে। নাহলে দেশের চিকিৎসাখাত থেকে আয়ের একটা বড় অংশ দেশের বাইরে চলে যাবে। ইতোমধ্যে দেশের রাস্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সচিব, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ সহ স্বচ্ছল জনগোষ্ঠীর বড় অংশ যেকোনও রকম রোগেই বিদেশি চিকিৎসাব্যবস্থার শরণাপন্ন হন। অর্থাৎ বলা যায়, আমাদের ক্ষমতাসীন শ্রেণির কাছে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা আস্থা হারিয়েছে বহু আগেই।  এই ‘আস্থা’ পুনরুদ্ধারের কাজটি করতেই হবে সর্বাগ্রে। দায়সারা ভাবে নয়, প্রকৃতই একটা স্বয়ংক্রিয়, সার্থক, কার্যকর, স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থাপনা উপহার দিতে হবে স্বাস্থ্যখাতে, সরকারি ও বেসরকারি উভয়খাতেই।

দ্বিতীয়ত, ওষুধের দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে দেওয়া যাবে না। এখানে কষ্ট ইফেক্টিভ একটা নীতি গ্রহণ করতে হবে। ওষুধশিল্পে বাংলাদেশের অর্জন ব্যাপক। বিদেশে গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ রফতানি করছে বাংলাদেশ। ওষুধ শিল্পে উচ্চমানসম্পন্ন মানবসম্পদ আছে আমাদের। নানারকম প্রটেকশন নীতিমালাও বহাল আছে এই শিল্পে। সবমিলিয়ে ওষুধশিল্পে একটা যোগ্যতর অবস্থা বিরাজমান। শুধু নীতিগত কিছু পরিবর্তন আর কার্যকরী তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই এই খাতের লাগামহীন মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সহনীয় দামে দেশের মানুষকে ওষুধ দেওয়া সম্ভব।

তৃতীয়ত, বেসরকারিখাতে চিকিৎসা বাণিজ্যের বিরাটতর সংখ্যাগত বিকাশ হয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাব, হাসপাতাল গড়ে ওঠেছে। কিন্তু এইসব প্রতিষ্ঠানের সার্ভিসের গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় নাই। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত জবাবদিহিতার আওতায় আনা দরকার। এইখাতে সুশাসন নিশ্চিত করা দরকার।

চতুর্থত, সরকারি চিকিৎসা সেবাখাতে চাপ বেড়েছে বহুগুণে কিন্তু সেই তুলনায় জনবল এবং অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়েনি। বিনিয়োগ বাড়েনি। এক্ষেত্রে মনোযোগী হওয়া দরকার। সরকারি চাকুরিরত ডাক্তারদের কর্মপরিবেশ, পদোন্নতি, পারিশ্রমিক বিষয়েও নতুন করে ভাবা দরকার। তাদের কর্মনীতিও নতুন ও যুগোপযোগী করা দরকার।

পঞ্চমত, দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। তারা চিকিৎসাখাতে যে পরিমাণে ব্যয় করে সেই অনুপাতে সেবা পায় না। এক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানো দরকার। সরকার ইতোমধ্যে হাজার হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের ব্যবস্থা করেছে। এই কমিউনিটি ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনার মান উন্নত করা দরকার। কমিউনিটি ক্লিনিক যাতে তার সক্ষমতার পুরোটো সার্ভিস ডেলিভারি দিতে পারে সেটাও নিশ্চিত করা দরকার।

সর্বোপরি চিকিৎসা শিক্ষা, চিকিৎসা বাণিজ্য, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সর্বত্রই দর্শনগত পরিবর্তনে মনোযোগ দেওয়া দরকার। এই খাত সেবাখাত হবে, না মুনাফানির্ভর বাণিজ্যখাত হবে সেই, বিবেচনার মীমাংসাও হওয়া দরকার। মুনাফা করলে তার মার্জিন কী হবে, সেই মার্জিন নিয়ন্ত্রণের দেখভাল করার দায়িত্ব কে নেবে, তার জবাবদিহিতা কার কাছে থাকবে এইসব নীতি-ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাটাও জরুরি। নইলে এইখাতে চলমান অরাজকতা বন্ধ করা যেমন সম্ভব হবে না তেমনি ভোক্তাস্বার্থ নিশ্চিত করার কাজটিও অসম্ভব হয়ে পড়বে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ