পেশা নির্বাচনেও স্বাধীনতা নেই আমাদের?

Send
রিয়াজুল হক
প্রকাশিত : ১৮:০২, অক্টোবর ২৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৭, ডিসেম্বর ১০, ২০১৭

রিয়াজুল হকপেশার সঙ্গে অর্থ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট। নেশার সঙ্গে ভালো লাগা কিংবা শখ জড়িত থাকে। কিন্তু জীবিকার তাগিদে আমাদের কোনও না কোনও পেশায় জড়িত হতে হয়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এটাই নিয়ম। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পেশা হিসেবে আমাদের কী নির্বাচন করা উচিত? অল্প বয়সী একটি শিশু যখন খেলা করে, তখন তাকে বলে দেওয়া লাগে না সে কী খেলবে? সে ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন যে কোনও খেলাই উপভোগ করতে পারে। সে তার ইচ্ছা মতোই খেলা নির্বাচন করে থাকে। এখানে ভালো লাগাটাই মুখ্য বিষয়। যে শিশু যে খেলা খেলতে উপভোগ করে, সাধারণত সে সেই খেলায় ভালো করে। পেশার বিষয়টিও ঠিক সেই রকম। যার যে কাজটি করতে ভালো লাগে, তার সেই কাজটি করা উচিত। অন্যের পছন্দের জন্য, নিজের ভালো লাগার কাজ বাদ দেওয়া অদৌ উচিত নয়। এতে করে আর যাই হোক, সাফল্য আসে না। আর সাফল্য না আসলে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসে না ( কিছু চাকরি ছাড়া)।
পেশা নির্বাচনের সময় অবশ্যই নিজের ভালোলাগাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, এতে করে কাজের প্রতি একাগ্রতা যেমন তৈরি হয়, স্বীকৃতিও তেমন পাওয়া যায়। সৎ থেকেই মোটামুটি আর্থিক সমৃদ্ধি (প্রমোশন, ব্যবসায়িক মুনাফা বৃদ্ধি, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, নতুন কিছু উদ্ভাবন ইত্যাদি) তখন অটোমেটিক চয়েজ হয়ে যায়। ভালো লাগা থেকে যে পেশায় আসা হয়, সেখানে সাফল্য আসতে বাধ্য।

অথচ আমাদের ঘটে ঠিক তার উল্টো ঘটনা। অবুঝ সন্তানটির ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তে ভালো লাগে না, কিন্তু তথাকথিত স্ট্যাটাসের জন্য তাকে সেখানেই ভর্তি করা হচ্ছে। বাবা-মায়ের কোনও মানত পূরণের জন্য সন্তানটিকে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হচ্ছে। সন্তানের অনীহার কারণে জীবন দুর্বিষহ সেই ছোট বয়স থেকে। লেখাপড়া তো নিজের কাছে। নিজে লেখাপড়া না করলে বিশ্বের কোনও স্কুল আপনাকে শিক্ষিত করতে পারবে না। আমাদের দেশে যারা শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি রয়েছেন, প্রায় সবাই গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে শহরে এসেছেন। বড় হওয়ার মানসিকতা থেকেই তারা আজ দেশের দশ জনের একজন। তারা কোন পেশায় যাবেন, নিজের চেষ্টার মাধ্যমে সেই পেশায় নিযুক্ত হয়েছেন। সফলতার সঙ্গে সঙ্গে  আর্থিক স্বচ্ছলতার মধ্যেই জীবন পার করছেন।

আবার যারা বিত্তশালী ঘরের সন্তান, টাকা পয়সার মধ্যে বড় হয়েছেন, তারা অনেক সময় নিজেদের সেইভাবে মেলে ধরতে পারেন না। কী বলবেন, এই সন্তানরা সুযোগ সুবিধা কম পেয়েছে? বিষয়টা তা নয়। দেখা যাচ্ছে, এই সন্তানদের ওপর তাদের অভিভাবকদের সবকিছুতে চাপ থাকে। কোন স্কুলে পড়বে, কোন বিভাগে পড়বে, কোন পেশায় যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সব কিছু যদি অভিভাবকরা ঠিক করে দেয়, তবে নতুন কিছু আশা করা ভুল হবে। অনেক কৃষক কখনও তার সন্তানকে বলে না, তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হবে, ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। সন্তান তার পছন্দ অনুযায়ী পেশা নির্ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে।

আমাদের দেশে আরেকটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে। সবাইকে বিএ, এমএ ডিগ্রিধারী হতে হবে। এটা ভালো লক্ষণ না। যার পুঁথিগত বিদ্যা ভালো লাগে না, তাকে কেন জোর করে বই পড়তে হবে। অনেকের কারিগরি কাজে প্রচণ্ড আগ্রহ থাকে। পঞ্চম কিংবা অষ্টম শ্রেণির পর, সরকারি ভাবে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থী নিজ নিজ বিষয়ের ওপর হবে অত্যন্ত দক্ষ। সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রশিক্ষিত কর্মী প্রেরণের বিষয়ে আলাপ আলোচনা করে কর্মক্ষেত্র তৈরি করবে। উন্নত বিশ্বে কারিগরি ক্ষেত্রে যে পরিমাণ কর্ম খালি আছে, সঠিকভাবে যোগাযোগ করতে পারলে আমাদের বেকারত্বের হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। আমরা আমাদের দক্ষ মানব সম্পদ রফতানি করতে পারবো। দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে আমাদের দেশের বৈদেশিক রেমিট্যান্সের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। 

বাবা জীবনে ডাক্তার হতে পারেননি, সন্তানকে ডাক্তার বানিয়েই ছাড়বেন। সরকারি মেডিক্যাল কলেজে চান্স হয়নি। সমস্যা নাই, বেসরকারি মেডিক্যালে ভর্তি করাতে হবে। টাকা তো আছে। সঞ্চিত টাকা যদি সন্তানের জন্য ব্যয় না করা হয় ( প্রয়োজন না থাকলেও), তবে তো এই টাকা মূল্যহীন। কী খোড়া যুক্তি আমাদের, ভাবতেই অবাক লাগে। এরপরেও যদি সন্তান বেসরকারি মেডিক্যালে ভর্তি হতে না পারে, তবে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মোটকথা, ডাক্তার হতেই হবে। না হলে বাবা-মা সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না।  সন্তানের কী ইচ্ছা, সেটা জানার প্রয়োজন কয়জন পিতা-মাতা করেন? এই প্রতিফলন কর্মজীবনেও দেখা যায়। অমুকের ছেলে সরকারি চাকরি করে, তোমাকেও করতে হবে। কী দরকার, আপনার সন্তান যদি ব্যবসা করতে চায়, তবে তাকে সেই সুযোগ দিন। যে কাজই করুক, শীর্ষে উঠতে হবে। এই মানসিকতা তৈরি করতে সহায়তা করুন। স্ট্যাটাস নিয়ে চিন্তা করবেন না। সেটা এমনিতেই চলে আসবে। অনলাইন ভিত্তিক খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সালমান খান ২০০৬ সালে আকর্ষণীয় চাকরি ছেড়ে একাডেমির কাজে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। কী বলবেন আপনি, সালমান খানের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল? এখন বিশ্বের ক্ষমতাধর ১০০ জন মিডিয়া ব্যক্তির মধ্যে তিনি একজন।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি বিল গেটস। আমাদের আমাদের দেশে বিল গেটসের জন্ম হলে, প্রতিবেশিরা সবাই বলত, ছেলে উচ্ছন্নে গেছে। পড়ালেখাই শেষ করতে পারলো না। অথচ সেই বিল গেটস এক যুগ ধরে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। আর যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারেননি, সেই হার্ভার্ড সহ বিশ্বের প্রথমসারীর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে। জীবনের সফলতার আর কী বাকি রইলো।

এখন দেখা যাচ্ছে, নার্সারি, কেজি’তে পড়া বাচ্চাদের ব্যাগের ওজন সবচাইতে বেশি। এরপর শিক্ষার্থী যত উপরের ক্লাসে ওঠে, তার ব্যাগের ওজন আস্তে আস্তে কমতে থাকে। সবশেষে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র খাতা নিয়ে ক্লাসে যাচ্ছে। অথচ বিষয়টি উল্টো হওয়া উচিত ছিল। বাচ্চাদের ব্যাগের ওজন বৃদ্ধি করে, কখনও তাদের শিক্ষিত করা সম্ভব না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে এর প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমাদের অভিভাবকদের একটু সচেতন হওয়া উচিত। নিজেদের ইচ্ছা, অনিচ্ছা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এখন যেন একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। জন্মের পরেই যেন সন্তানের ভবিষ্যত নির্ধারণ করা যাচ্ছে। সন্তান কী চায়, তার খোঁজ-খবর কে রাখে? সন্তানের ভালো লাগে ইতিহাসের বিষয়, শিল্পকলা, অথচ তাকে পদার্থ বিজ্ঞানের তত্ত্ব পড়তে হচ্ছে। পেশাগত জীবনে কী আশা করা যায় সেই সন্তানের কাছ থেকে?

শচীন টেন্ডুলকার তার বিদায়ী ম্যাচে বলেছিলেন, ‘আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হচ্ছেন আমার বাবা। ১১ বছর বয়সে উনি আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, আমার উচিত স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়া আর আমি যেন জীবনে চলার পথে কোনও শর্টকাট পথ বেছে না নেই। উনি আমাকে সবার আগে ভালো মানুষ হতে বলেন, সেটা আমি সবসময় পালন করেছি। প্রত্যেকবার আমি যখন বিশেষ কিছু করেছি আর নিজের ব্যাটটি আকাশের দিকে উঁচু করে দেখিয়েছি, সেটা আমার বাবার জন্য ছিল’। সুযোগ থাকলে প্রত্যেকের পছন্দের পেশার মাঝে নিজেকে উৎসর্গ নিয়োজিত করা উচিত। এতে করে কাজকে আর কাজ মনে হবে না। পেশা তখন নেশার মতো হয়ে যাবে। সফলতা থাকে তখন হাতের মুঠোর মধ্যে। আর আর্থিক স্বচ্ছলতা নিয়ে ন্যূনতম চিন্তা করতে হয় না।

লেখক: উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

[email protected]

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ