খামারে খাবারের হিসাব রাখার সফটওয়্যার, বিনামূল্যে ইন্টারনেটেই

Send
জিশান হাসান
প্রকাশিত : ১১:৫১, নভেম্বর ০৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৬, নভেম্বর ০৩, ২০১৭

জিশান হাসানওপেনসোর্স সফটওয়্যার এখন শুধু একটি শব্দই না। এখন এটি পুরো একটি শিল্পকে তৈরি করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোলট্রি কোম্পানি কাজী ফার্মস। দেশের অন্যান্য পোলট্রি ফার্মগুলোর মতই সবচেয়ে কম খরচে পুষ্টিমান নিশ্চিত করাটাই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। 
এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক এমন প্রতিষ্ঠানগুলো খুব ব্যয়বহুল সফটওয়্যার ব্যবহার করতো। কিন্তু এখন ওপেন সোর্সে পাওয়া সফটওয়্যারের মাধ্যমেই নিজেদের কার্যক্রম ভালোভাবেই পর্যবেক্ষণ করতে পারছে কাজী ফার্মস। বিদেশি সফটওয়ারের মতোই নিজেদের মতো করে খাবার খাওয়ানোর প্রক্রিয়া তৈরি করেছে তারা।
এমন সফটওয়ার যদি অন্যান্য শিল্পেও সুযোগমতো ব্যবহার করা যায় তবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর আমদানি খরচ লাখ লাখ ডলার কমিয়ে আনতে পারে।
যখন ফার্মে শুধু দেশি পশু থাকতো তখন খাবার খাওয়ানো অনেক সহজ ছিল। স্থানীয় গরুগুলো ঘাস খেত, আর মুরগি পোকামাকড় খেয়ে থাকত। কিন্তু আধুনিক যুগে দুধ দেওয়া গরু ও ব্রয়লার মুরগির অধিক উৎপাদনশীলতার জন্য খাবার তালিকা ভিন্ন হয়।

এটা খুবই স্বাভাবিক যে ভালো উৎপাদনের জন্য ভালো খাবার প্রয়োজন। আর একটি প্রাণী থেকে মাংস, ডিম বা দুধ যাই আসুক না কেন সেটা মূলত তাদের খাবারের পুষ্টি থেকেই আসে। তাই একটি আধুনিক ফার্মের প্রয়োজন আধুনিক খাবার ব্যবস্থা।

কিন্তু তাদের জন্য পুষ্টিমান রক্ষা করে খাবার তৈরি ও খাওয়ানোর প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। কারণ এটি করতে হয় সর্বনিম্ন খরচে যেন কৃষক লাভ রাখতে পারে। এজন্য অনেকগুলো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু সফটওয়্যার তৈরি করেছে।

ব্যয়বহুল পদ্ধতি

তবে এই ফিড ফর্মুলেশন সফটওয়ার খুবই ব্যয়বহুল। শুধু লাইসেন্স নিতেই প্রতিবছর হাজার হাজার ডলার ব্যয় করতে হয় খামারগুলোকে। কাজী ফার্মসও বছরে প্রায় এক লাখ ডলার ব্যয় করেছে শুধু ফিড ফর্মুলেশন সফটওয়ারের জন্য। তবে এই খাবারের প্রক্রিয়াটি জটিল হলেও কয়েকধাপে ভেঙে সহজ করা যায়।

প্রত্যেকটি ধাপই সহজে সমাধান করা সম্ভব। প্রথমত আমাদের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের একটি তালিকা করতে হবে যেমন শস্য, গম, সয়াবিন, চালের খুদ, সয়াবিন তেল। সঙ্গে উল্লেখ থাকবে তাদের দামও। এছাড়া বিভিন্ন প্রাণীর জন্য বিভিন্ন খাবারের তালিকা তৈরি করতে হবে, উল্লেখ থাকবে পুষ্টিগুণ ও দাম আর এই বিষয়গুলো এখন খুব সহজেই পাওয়া যায়। অনেক বছর ধরে পুষ্টিগুণের ওপর গবেষণায় অনেক তথ্য বেরিয়ে এসেছে যা খুব সহজেই পাওয়া সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, উল্লেখিত তথ্যগুলো এমন একটি ডাটাবেজে সংরক্ষণ করতে হবে যেন সেটি খুব সহজেই আপডেট করা যায়। আর এখন এমন ডাটাবেজ পাওয়া ‍খুবই সহজ। যেমন এইচ২ ডাটাবেজ। যেকোনও কম্পিউটারেই খুব সহজে এবং বিনামূল্যে এটি ইনস্টল করা যায়।

তৃতীয়ত, একটি গাণিতিক লাইব্রেরি প্রয়োজন যেটি ডাটাকে কম খরচের ফরম্যাটে হিসেব করতে পারবে। আর এটি সবসময়ই সর্বশেষ দাম অনুযায়ী আপডেট থাকবে। এরকম সফটওয়্যারও বিনামূল্যে বা ওপেন সোর্স সফটওয়্যার হিসেবে পাওয়া যায়। জিএনইউ লিনিয়ার অপটিমাইজেশন কিট হিসেবে এটি পাওয়া যায়।

সর্বশেষ এই সফটওয়্যারটি খুবই সহজে ব্যবহার উপযোগী হতে হবে যেন মিলের পুষ্টিবিদরা সহজে ব্যবহার করতে হবে। কাজী ফার্মসও সিসনোভা নামে একটি সফটওয়ার কোম্পানি পরিচালনা করে। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই সর্বনিম্ন খরচে মাত্র একজন স্থানীয় জাভা প্রোগ্রামার দিয়ে এই সফটওয়ারটি তৈরি করেছে। এক্ষেত্রেও ওপেন সোর্স জাভা ইনপ্রেটার ব্যবহার করা হয়েছে।

সিসনোভাফিড সফটওয়ার নামে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এইচটু ডাটাবেজ, জিএনইউ লিনিয়ার অপটিমাইজেশন কিট ও ওপেন জেডিকে জাভা ইনটারপ্রেটার ব্যবহার করে সিসনোভাফিড তৈরি করা হয়েছে। জিএনইউ জেনারেল পাবলিক লাইসেন্স-এর আওতায় এগুলো নিবন্ধিত। এগুলো ওপেন সোর্স সফটওয়ারের মতোই।

জিপিএলকে নিয়ে কাজী ফার্মস ও সিসনোভা মিলে সিসনোভাফিড সফটওয়্যার তৈরি করছে। ইন্টারনেট থেকে যেকেউ এটি বিনামূল্যে ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারবেন। সিসনোভাফিডের মতো এত জটিল সফটওয়্যারটি এত তাড়াতাড়ি করা সম্ভব হতো না যদি পুষ্টিগত বিষয়ে এত গবেষণা করা না থাকতো কিংবা ওপেনসোর্স সফটওয়্যার না পাওয়া যেত।

ইতোমধ্যে করা কাজ ও জ্ঞান ব্যবহার করে প্রযুক্তির তৈরি বিজ্ঞানে নতুন কিছু নয়। স্যার আইজ্যাক নিউটনই বলেছেন, ‘আমি যদি বেশি কিছু দেখে থাকি তা কারও কাঁধে চড়ে।’

ওপেনসোর্স বিশ্বব্যাপী সফটওয়্যার শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়েছে। গবেষণার বিশাল ক্ষেত্র উন্মোচন করেছে তারা। যেখানে কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও নতুন কিছু করার সুযোগ থাকে। একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি করতে হয় না কাউকে।

তবে প্রত্যেকটি শিল্পেই তাদের নিজস্ব কিছু জটিলতা থাকে যা নির্দিষ্ট কিছু সফটওয়্যারের মাধ্যমে সমাধান করতে হয় এবং সেগুলোর খরচ কম হয় না।

এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এটাই বোঝাতে চাইছি যে, মানুষ যেন জটিল প্রক্রিয়াগুলো বুঝতে পারে এবং সহজেই ভেঙে ফেতে পারে। আর এই ছোট সমস্যা যখন ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব তখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য সেটা খুবই উপকারী। আমাদের নিজেদের আইটি বিষয়ক জটিলতাগুলো এই ওপেনসোর্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে সমাধান করতে পারি। এতে আমাদের বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে না। আশা করি অনেক স্থানীয় সংগঠন ভবিষ্যতে নিজেদের জন্য ওপেনসোর্স সফটওয়ারের মাধ্যেম নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে।

লেখক: পরিচালক, টুএ মিডিয়া লিমিটেড

 

/এমএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ