কষ্টের রোজগার কী করছেন?

Send
রিয়াজুল হক
প্রকাশিত : ১৯:০৯, নভেম্বর ১১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৬, ডিসেম্বর ১০, ২০১৭

রিয়াজুল হকএক. জমিরা খাতুন (ছদ্মনাম) মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করেন। স্বামী দিনমজুর। অভাব অনটনের সংসার। প্রতিমাসে জমিরা খাতুন কাজ করার পর সংসারের খরচ মিটিয়ে যেটুকু বাঁচতো, সেটুকু পাশের বাড়ির এক মহিলার কাছে জমা রাখতেন। লেখাপড়া না জানা জমিরা প্রতিমাসেই চার শত কিংবা পাঁচ শত টাকা জমা রাখতেন, এটুকু তিনি ভালোই বুঝতেন। এভাবে বছর তিনেক টাকা জমা রাখার পর, যখন টাকা চাইতে গেলেন, প্রতিবেশী মহিলা তাকে সাত হাজার দিলেন। জমিরার হিসাব মতে, প্রায় পনেরো হাজার টাকা তিনি জমা রেখেছেন। কিন্তু কোনও হিসাব না রাখার কারণে জমিরা প্রতিবাদটুকু করার সাহস পেলেন না।
দুই. সোনিয়া রহমান (ছদ্মনাম) বেসরকারি চাকরিজীবী মহিলা। মাসিক বেতন ত্রিশ হাজার টাকা। স্বামী আসিফ (ছদ্মনাম) পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতনে একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করছেন। ঢাকা শহরে পনেরো হাজার টাকার ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েই চলছিল তাদের সংসার। বিয়ে হয়েছে তিন বছর। একটি মাত্র সন্তান। কোনও অভাব-অনটন নেই। কিন্তু সমস্যা তৈরি হলো অন্যদিক থেকে। সোনিয়ার বড় বোনের স্বামী ছোট একটা দোকান চালান। আয় রোজগার মোটামুটি। তাদের ঘরে দুই সন্তান। দোকান বড় করার জন্য বিয়ের আগে বড় বোনের হাতে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন। এরপর বিয়েতে সোনিয়ার কিছু খরচ হলো। নিজের জমানো টাকা থেকেই বিয়ের খরচ করেছিলেন। সঞ্চয় আর তেমন কিছু ছিল না।  বিয়ের পরও বড় বোন প্রতিমাসেই নিজের সংসারের প্রয়োজনে প্রতিমাসে ১২,০০০/১৫,০০০ টাকা সোনিয়ার কাছ থেকে নিতেন। বিষয়টি প্রতিমাসে নিয়ম মাফিক হওয়ায় আসিফের ভালো লাগতো না। সোনিয়ার সঞ্চয় বলে কিছুই থাকতো না। আসিফ এই বিষয়টি সোনিয়াকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনও কাজেই আসেনি। বরং নীচু মনের মানুষ, ডমিনিটিং ইত্যাদি ধরনের কথা শুনতে হতো। বিষয়গুলো নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া লেগে থাকতো। একসময় সোনিয়া ঝামেলা এড়ানোর জন্য একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বোনের বাসায় চলে যান। মা, ছেলের খরচ যেহেতু বড় বোনের সংসারের ওপর চলে গেছে, সে জন্য মাসে ২০,০০০/২২,০০০ টাকা করে দেওয়া শুরু করলেন। ছেলে আর সোনিয়ার আরও আনুষঙ্গিক কিছু খরচ তো ছিলই।  এভাবেই চলছিল, প্রায় ৯ মাসের মতো। এর মাঝে শুধু ছেলের জন্য সোনিয়া, আসিফের কিছুটা দেখা হতো। তবে ৬ মাসের মাথায়, আসিফ আবার বিয়ে করেন। সোনিয়া বিষয়টা জানতেন। তারও অসম্মতি ছিল না। কারণ সোনিয়া চলে যাওয়ার পর কয়েক মাস আসিফকে মেসেই খেতে হয়েছে। সম্পর্ক জোড়া লাগারও কোনও সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল না। আর আসিফের নাক গলানো বিষয়গুলো সোনিয়ারও ভালো লাগতো না। যাই হোক, হঠাৎ করেই কোনও একটি কারণে সোনিয়ার চাকরি চলে যায়। নতুন চাকরির চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু মাস দুইয়ের মধ্যে সেটা সম্ভব হয়নি। এবার দুলাভাইয়ের খোলস কিছুটা বেরিয়ে আসে। সোনিয়ার দুলাভাই তাকে স্বামীর কাছে চলে যেতে বলেন। কারণ অর্থবিহীন সোনিয়ার কোনও মূল্য দুলাভাইয়ের বাড়িতে নেই। সোনিয়া তার ভুল বুঝতে পারেন। কিন্তু সময়টা পার হয়ে যাওয়ার পর।

তিন. একমাত্র বিপদে না পড়লে কখনোই কে শুভাকাঙ্ক্ষী,  কে নয়, তা বোঝা যায় না। এছাড়া আমরা হিসাব-নিকাশ না করে অনেকের কাছে টাকা জমা রাখি, এটা ঠিক নয়। আমাদের সাধারণ মানুষদের অনেকের ব্যাংকভীতি আছে, বিশেষ করে অশিক্ষিত মানুষদের। যে কারণে অনেকেই নামসর্বস্ব ভুয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে  অতি উচ্চ মুনাফার আশায় কষ্টের সঞ্চিত অর্থ জমা রাখেন। কিছুদিন পরে দেখা যায়, ভুয়া প্রতিষ্ঠানটির দরজায় বড় একটা তালা ঝুলছে। চোখের জল হয় একমাত্র সম্বল। অনেক ঘটছে এ রকম ঘটনা। কে আপনার দুর্দিনে উপকার করবে, কার কাছ থেকে আপনি সাহায্য পাবেন, সেই প্রত্যাশা ছেড়ে দিন। যদি বিপদের সময় সহায়তা পান, তবে অবশ্যই ভালো। কিন্তু যদি না পান, তবে অবশ্যই নিজের সম্বল দিয়েই বিপদ থেকে  উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া, আমাদের আরও মনে রাখতে হবে, সুযোগ কখনও বলে-কয়ে আসে না। অনেক সময় সঞ্চিত অর্থের অভাবে অনেক বড় সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যায়। তাই, সবসময় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষদের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে সুযোগের সদ্ব্যবহারের পাশাপাশি অনেক ধরনের বিপদও এড়িয়ে চলা যায়। মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সঞ্চয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।  আপনি মাসে ৫০,০০০ টাকা আয় করেন কিন্তু মাস শেষে আপনার কোনও সঞ্চয় নেই, তাহলে এই আয়ের কোনও মূল্য নেই। কিন্তু আপনি মাসে ২০,০০০ টাকা আয় করে ৪,০০০ টাকা সঞ্চয় করেন, সেটা অবশ্যই ইতিবাচক এবং আয়েরও মূল্যায়ন থাকে। সঞ্চয়ের যদি কোনও প্রকার সুযোগ না থাকে, সেটা ভিন্ন কথা। তবে আমাদের  দেশের মানুষের অপব্যয়ের একটা বাতিক রয়েছে। অনেকেই লোক দেখানো খরচ করতে অভ্যস্ত। দিন শেষে যে তারই ক্ষতি হলো, সেই বিচার বিবেচনাবোধটুকুও নষ্ট হয়ে গেছে।  

অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি ভালো বেতনে চাকরি করেন। কিন্তু আত্মীয়-স্বজন,পরিবারের অনেক অন্যায় আবদার মেটাতে গিয়ে তার সঞ্চয়ের ঝুলি শূন্য থেকে যায়। বড় ধরনের বিপদে পড়লে, অন্যের অনুগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এটা কারও কাম্য হতে পারে না। আবার অনেকেই আছেন, তাদের মাসিক সামান্য সঞ্চয় দিয়ে ডিপিএস করে মোটামুটি বড় অংকের (সেই সমস্ত সঞ্চয়ী মানুষদের কাছে) টাকা জমিয়ে ফেলেন। সেই টাকা দিয়ে তারা নিজেদের কিংবা পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন।

চার. সবশেষে আরকেটি ঘটনা দিয়ে শেষ করতে চাই। ১৯৯৬ কিংবা ১৯৯৭ সালের কথা। রশিদা বেগম (ছদ্মনাম) মানুষের বাড়ি বাড়ি ছুটা বুয়ার কাজ করেন। মধ্যবয়সী এই নারীর স্বামী রিকশা চালান। রশিদা যে বাসায় কাজ করতেন, সে বাড়ির গৃহকর্ত্রী রশিদাকে ব্যাংকে ডিপিএস খোলার পরামর্শ দিলেন। এতে  কিছু টাকা ব্যাংকে জমা হবে। পরে একটা কাজে আসবে। ওই সময় যারা কিছুটা বোঝে অর্থাৎ ১৯৯৬, ১৯৯৭ সালের দিকে, সবাই ডিপিএস খোলার জন্য ব্যাংকের কাউন্টারে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। বলা যায়, ডিপিএস খোলার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল সে সময়। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্যখানে। রশিদা কিংবা তার স্বামী শুধু নাম লিখতে পারতেন। আর কিছুই জানতেন না। যাই হোক, সেই বাড়ির গৃহকর্তা রশিদার স্বামীকে নিয়ে সোনালী ব্যাংকে গিয়ে সব ফরম পূরণ করে মাসিক ৫০০ টাকার একটি ডিপিএস খুলে দিলেন। রশিদার স্বামী লেখাপড়া জানা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে টাকা জমার ফরম পূরণ করে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে আসতেন। এভাবে ১০ বছর প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে জমা দিয়ে ১০ বছর পর তিনি খুব সম্ভবত ১,২৫,০০০ টাকা পেলেন। ২০০৭ সালে সেই টাকা দিয়েই ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠালেন। এখন তাদের অবস্থা পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে গেছে। রশিদা বেগমকে আর মানুষের বাসায় কাজ করতে হয়না। স্বামী একটা মুদি দোকান চালান। অভাব অনটন গত ১০ বছরে আর স্পর্শ করতে পারেনি রশিদার পরিবারকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি ডিপিএসটা না থাকতো, তবে রশিদার পরিবারের পক্ষে একসঙ্গে লক্ষাধিক টাকা জমানো কখনো সম্ভব হতো না। সামান্য করে সঞ্চয় একসময় ভাগ্য ফেরাতে সহায়তা করেছে।

লেখক: উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

[email protected]

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ