প্রাথমিক শিক্ষায় আইসিটির যাত্রা

Send
জিশান হাসান
প্রকাশিত : ১৫:২২, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৬, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭

জিশান হাসানবাংলাদেশ সরকার প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) সমন্বয় ঘটানোর পরিকল্পনা করছে বলে সম্প্রতি ঢাকা ট্রিবিউনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। খবরটি পড়ে বেশ ভালো লাগলো। এখন প্রশ্ন হলো, কী শেখানো হবে? বাংলাদেশের প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অনেকে হয়তো কোনোদিন কম্পিউটার দেখেনি কিংবা স্পর্শ করেনি। সেক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদেরকে অনেক বেশি মৌলিক পর্যায় থেকে কম্পিউটার শেখাতে হবে। কারণ পাশ্চাত্যের শিক্ষার্থীরা সাধারণত অনেক কম বয়স থেকেই তাদের বাড়িতে কম্পিউটার দেখে। অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে গণিত ও ইংরেজিতে পাস করতে হিমশিম খেতে হয়। গণিত ও ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে আইসিটির ব্যবহারের প্রতি খানিকটা মনোনিবেশ করা যেতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই অনেকের কম্পিউটার ব্যবহারের খুব একটা অভিজ্ঞতা থাকে না, তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাটাও জরুরি।
প্রথমত, কম্পিউটার ব্যবহার করতে হলে মাউস ও কি-বোর্ডের ব্যবহার ভালোভাবে রপ্ত করতে হয়। সেক্ষেত্রে, ৭-৮ বছরের শিশুদেরকে প্রথমে ফ্রি/ওপেন সোর্স টাক্সপেইন্টের (www.tuxpaint.org) মতো শিশুবান্ধব সাধারণ পেইন্টিং সফটওয়্যার কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা দেখানো যেতে পারে। এর মধ্য দিয়ে মাউস ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কিভাবে স্ক্রিনে কার্সর নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং মাউস ক্লিক করে কাজ করতে হয় তার মৌলিক শিক্ষাটুকু পাওয়া যাবে।

দ্বিতীয়ত, কি-বোর্ডের ব্যাপারে একটা মূল ধারণা অর্জন করতে হবে। ফ্রি/ওপেন সোর্স টাক্সটাইপ (https://tux4kids.alioth.debian.org/tuxtype/)  সফটওয়্যার ব্যবহার করার মাধ্যমে এই ধারণা অর্জন করা যেতে পারে। এই সফটওয়্যার দিয়ে টাইপিং ওয়ার্ড-টাইপিং স্পিড এর উপর ভিত্তি করে অনেক আর্কেইড গেইম তৈরি করা হয়েছে। ৭-৮ বছরের শিশুদেরকে এ সফটওয়্যার দিয়ে কি-বোর্ড সম্পর্কিত ধারণা স্পষ্ট করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, শিশুদের ইন্টারনেটে থাকা শিক্ষামূলক বিষয়গুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। অনেক স্কুল শিক্ষার্থীই গণিতকে ভয় পায়। আর এ কারণে অনেকে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করতে চায় না। প্রাথমিক পর্যায়ে গণিত শেখার ব্যর্থতাই এক্ষেত্রে একটি বড় কারণ। বিজ্ঞানের বদলে তারা বাণিজ্য ও কলা বিভাগের বিষয়গুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ে। আবার কেউ কেউ এই কারণে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে না। তবে খান একাডেমির ((www.khanacademy.org) নির্দেশনামূলক ভিডিওগুলো অনুসরণের মধ্য দিয়ে গ্রামের স্কুলের অনেকগুলো ঘাটতিই দূর করা যেতে পারে। খান একাডেমির ভিডিওগুলো শিক্ষার্থীদেরকে উচ্চ পর্যায়ের গাণিতিক নির্দেশনা দেবে। ৮-৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদেরকে এই ভিডিও অনুসরণের কথা বলা যেতে পারে। কারণ এই বয়সী শিক্ষার্থীদেরকে ভগ্নাংশ, অনুপাত এবং শতাংশের মতো অনেক বেশি বিমূর্ত গাণিতিক ধারণাগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে হয় এবং এগুলো শিক্ষার্থীদেরকে ধন্দে ফেলে দেয়। খান একাডেমির ভিডিওগুলো দেখার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের অস্পষ্ট ধারণাগুলোকে স্পষ্ট করতে পারবে বলে আশা করা যায়।
 খান একাডেমির ভিডিওগুলো এখন বাংলাতেও (bn.khanacademy.org) পাওয়া যাচ্ছে। একই ভিডিওগুলো প্রথমে বাংলায় এবং পরে ইংরেজিতে দেখার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা কেবল উচ্চ গুণ সম্পন্ন টিউটোরিয়ালেরই সুযোগ পাবে না, তাদের ইংরেজি বলার সক্ষমতাও বাড়বে। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এই ভিডিওগুলো ইংরেজি শেখার সহায়ক হওয়া প্রযোজন। কারণ এটি (ইংরেজি) আরেকটি বিষয় যেটিতে পাস করতে শিক্ষার্থীদের প্রায়ই হিমশিম খেতে হয় এবং তাতে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা শুরু করার পথে বাধা তৈরি হয়।

শিশু শিক্ষার্থীদের ইংরেজি গান শেখানোটা তার মৌলিক শব্দ ভাণ্ডার বাড়ানোর পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বাড়ানোর একটি ভালো উপায়। প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্বের সূচনা থেকেই; এমনকি শিক্ষার্থীরা পড়তে শেখার আগেই তা শুরু করা যেতে পারে। কথাসহ শিশুদের গানের রেকর্ডিং করা এবং সেগুলো ওয়েবে দেওয়ার বেশিরভাগ কাজই এরইমধ্যে ব্রিটিশ কাউন্সিল (https://learnenglishkids.britishcouncil.org/en/songs) এর মতো সংস্থাগুলো করে ফেলেছে। সাধারণত, শিশুরা গান ভালোবাসে; আর পাঠ্যবই শিক্ষার আনন্দদায়ক বিকল্প হতে পারে এটি। কারণ পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার প্রতি অনেক শিশু শিক্ষার্থী অনাগ্রহী থাকে। 

সবশেষে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের ব্যাপারে আসা যাক। ‘সি’ ও ‘জাভার’ মতো বেশিরভাগ প্রোগ্রামিং ভাষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদেরকে অনেকগুলো প্রোগ্রামিং টেক্সট টাইপ করতে হয় (যেগুলোকে সাধারণত প্রোগ্রাম কোড নামে ডাকা হয়)। এটা প্রাথমিক স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় অসম্ভব। কারণ তাদের অনেকেরই টাচ-টাইপিং দক্ষতা অর্জনের জন্য কয়েক বছরের চর্চা নেই। অবশ্য,
এমআইটির গবেষকরা টাইপিং দক্ষতা না থাকা শিশুদের প্রোগ্রামিং ভাষা শেখার জন্য একটি ওপেন/সোর্স স্ক্র্যাচ প্রোগ্রামিং ল্যানগুয়েজ তৈরি করেছেন। দীর্ঘ পৃষ্ঠাজুড়ে প্রোগ্রাম কোড টাইপ করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করার বদলে স্ক্র্যাচের মাধ্যমে মাউস টেনে ড্র্যাগ অ্যান্ড ড্রপ প্রক্রিয়ায় কাজ করতে পারবে শিশুরা। পাজলের মতো ছোট ছোট খণ্ডে থাকা প্রোগ্রাম কোডগুলোকে টেনে জড়ো করে একটি ব্যবহার উপযোগী প্রোগ্রামে পরিণত করা হবে। স্ক্র্যাচে ফ্রি/ওপেন সোর্সের বইগুলোও পাওয়া যাবে যা বাংলায় ভাষান্তর করে স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করা যাবে। উদাহরণস্বরূপ ‘লার্ন টু কোড উইথ স্ক্র্যাচ’ (https://www.raspberrypi.org/magpi-issues/Essentials_Scratch_v1.pdf) এর কথা বলা যায়। এটি হলো শিক্ষামূলক কম্পিউটার রাস্পবেরিপাই এর ব্যবহারকারীদের জন্য ম্যাগপাই ম্যাগাজিনের কর্মীর লেখা একটি বই। ভাষান্তর ও বিনামূল্যে পুনঃবিতরণের অনুমতি প্রদানকারী কোম্পানি ক্রিয়েটিভ কমন্সের লাইসেন্সের আওতায় এটি ছাড়া হয়েছে। স্ক্র্যাচ ব্যবহার করে সাধারণ গেইমগুলোর মৌলিক প্রোগ্রামিং শেখায় এটি। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রোগ্রামিংয়ের মৌলিক বিষয়গুলো শিখতে। পরবর্তীতে মাধ্যমিক পর্যায়ে এ নিয়ে আরও বিশদভাবে পড়ানো যেতে পারে।

উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আইসিটি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে প্রধান ইস্যুগুলো বিশ্বের অন্যান্য দেশে গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা হয়েছে। এর জন্য প্রচুর ফ্রি/ওপেন সোর্স সফটওয়্যার এবং শিক্ষামূলক সরঞ্জামাদি তৈরি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে যদি মুল বিষয় রয়েছে। প্রথমত, প্রাথমিক স্কুলে সফলভাবে আইসিটি ব্যবস্থা চালু করতে হলে শিক্ষকদেরকে উপরের বিষয়গুলো নিয়ে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব থাকতে হবে। রাস্পবেরিপাই (www.raspberrypi.org) এর মতো স্বল্পমূল্যের লিনাক্স ক্ষমতাসম্পন্ন শিক্ষামূলক কম্পিউটারকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে কম খরচে তা করা যায়। হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের অন্য মিশ্রণগুলোর চেয়ে অনেক কম খরচে  এসব কম্পিউটার কম্পিউটিং সেবা দিতে পারে।     
আমার নিজের প্রতিষ্ঠান সিসনোভাসহ www.sysnova.com অনেক প্রতিষ্ঠান এরইমধ্যে র‌্যাস্পবেরিপাই কম্পিউটার বাংলাদেশে আমদানি ও সরবরাহ শুরু করেছে। কিভাবে সেগুলো ব্যবহার করতে হবে তা নিয়ে সিসনোভা এখন পর্যন্ত দেশজুড়ে ১ হাজারের বেশি শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। দেশের প্রত্যেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে চাইলে এই প্রশিক্ষণের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়াতে হবে।

লেখক: পরিচালক, টুএ মিডিয়া লিমিটেড

 

/এমএইচ/এফইউ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ