নারীর অবদান অস্বীকারের কৌশল ও আমাদের লড়াই

Send
শারমিন শামস্
প্রকাশিত : ১২:৪০, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৩, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭

শারমিন শামস্কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে একটা ভাস্কর্যের কাজ চলছে যেখানে তিনজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি ছিল, যাদের একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা।  একটা মহলের চাপ আর নির্দেশে ওই নারী মুক্তিযোদ্ধার আকৃতি বদলে সেখানে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি স্থাপন করা হচ্ছে। পৃথিবীর আর কোন দেশে এমন ঘটনা ঘটে কি না, আমার জানা নাই।
একই ডিজাইনের আরেকটা ভাস্কর্য করিমগঞ্জে স্থাপন করা হলেও সেখানে কোনও সমস্যা হয়নি। ওই ভাস্কর্যে নারী মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি অবিকল রাখা হয়েছে। দুটি ভাস্কর্যের কাজই শেষের দিকে। জানা গেছে, তাড়াইল উপজেলা পরিষদের সামনে ২০১৬ সালে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ভাস্কর্যটি স্থাপনের কাজ শুরু হয়। কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ ভাস্কর্য দুটির কাজ বাস্তবায়ন করছে। ভাস্কর সুশেন আচার্য ও শ্যামল আচার্য ভাস্কর্য দুটি তৈরি করছেন।
যেখানে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হচ্ছে তার সামনে একটি মাদ্রাসা আর মসজিদ আছে। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বলেছেন, এখানে ভাস্কর্যের নামে যে মূর্তি বানানো হচ্ছে, তা আমাদের মাদ্রাসা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। বিশেষ করে নারী মূর্তিটি মাদ্রাসার দিকে ফেরানো। আমাদের দাবি ছিল ভাস্কর্যটিই যেন এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সেটি না করে প্রশাসন শুধু নারী মূর্তিটিকে পুরুষ বানানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে আমাদের দাবি কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে। 

এরকম ঘটনা এখন নতুন কিছু না। হাইকোর্টের সামনে থেকে জাস্টিসিয়ার ভাস্কর্য সরানোর ঘটনার পর কিশোরগঞ্জের ঘটনা দেখে আমাদের অবাক হবার কিছুই নাই। বিস্মিত হইনা বটে, কিন্তু শঙ্কিত হওয়ার বদভ্যাস তো ছাড়তে পারিনা।

মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে মুছে ফেলার কোন সুযোগ নাই। সবচেয়ে বড় কথা, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নারীকে আলাদা করে চিহ্নিত করবারই কোনও কারণ নেই। একাত্তরে নারী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার তুলনায় কম হলেও, যোদ্ধা হিসেবে নারীরা কোনভাবেই সাহসিকতা, দক্ষতা ও যোগ্যতায় পিছিয়ে ছিলেন না। কিন্তু একথা সত্য যে, ইতিহাসের পাতায়, স্বীকৃতিতে, প্রচারে মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা সবসময়ই অস্পষ্ট আর অবহেলিত। একাত্তরের গণধর্ষণকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। কিন্তু বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিতে লেগে গেছে কয়েক যুগ। নারীর ধর্ষিত হওয়ার বিষয়টি ইতিহাসে সাড়ম্বরে স্থান পেলেও নারীর যোদ্ধা পরিচয়টিকে সেভাবে উপস্থাপন করা হয়নি কোনভাবেই। নারী মুক্তিযোদ্ধারা সে অর্থে কোন পরিচিতিও পাননি। বড় কোন খেতাব পাননি।

এই যখন ইতিহাসের পাতায় নারীর অবস্থা, তখন মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যে নারী মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি থাকা আমাদের মনে আশা জাগায়। অপরাজেয় বাংলাসহ বেশ কিছু ভাস্কর্যে নারী আছে। কিন্তু ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর চিন্তা ও চেতনায় এ ভাস্কর্য তো মুক্তিযোদ্ধার নয়, বীরের নয়, দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবের প্রতীক নয়। এ তো নিতান্তই একটি ‘নারীমূর্তি’।  নারী শরীরের আকার আকৃতির আবেদন ছাপিয়ে নারী বীরযোদ্ধা হয়ে উঠতে পারেনি। তার শরীরের আবেদন ধর্মান্ধকে বিপথগামী করে। তাই তাকে সরিয়ে ফেলাই প্রথম ও প্রধান কাজ। এর কোনও বিকল্প নাই। তারা নারীর ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলতে বলেছে, তাদের ঠাণ্ডা করতে প্রশাসন নারীটিকে সরিয়ে দিয়েছে। সেখানে আরেকজন পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার প্রতিরূপ যুক্ত করে দিয়েছে। পরিস্থিতি ঠাণ্ডাও হয়েছে। মাঝখান থেকে মুছে ফেলা হলো ইতিহাস, নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও তাদের অবদানকে।

আমি জানি না, এভাবে আর কতকাল যুদ্ধ করতে হবে স্বীকৃতি আদায়ের। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আরো পিছনের দিকে হাঁটছি। নারীত্বের বাইরে নারীকে বের হতে না দেওয়ার আয়োজনটি আরও জোরেশোরে চলছে সর্বত্র। চলছে বলেই জাস্টিসিয়াকে ঢুকে যেতে হয় হাইকোর্ট প্রাঙ্গনের ভিতরে, কারণ নারীকে প্রকাশ্যে আসতে নেই। তাদের চোখে নারী একটি রগরগে যৌনবস্তু বলেই নারীর যোদ্ধা রূপটিকে তারা ভাবনাতেইে আনতে পারে না। পারে না বলেই, নারীকে সরে যেতে হয় নিজের আদায় করা যোগ্যতা থেকে, অবদান আর অবস্থান থেকে এবং ইতিহাস আর ঐতিহ্য থেকে।

জানি না, কোন সে আপোষরফা, কোন সে কৌশল যা আমাদের ইতিহাসকে বারবার আঘাত করে, আমাদের প্রগতিশীল চেতনা আর হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ছুড়ে ফেলে দেয় আস্তাকুঁড়ে। ঠিক কোন পথে শুরু করতে হবে এই পিছনে হটার বিরুদ্ধে লড়াই, জানি না। শুধু জানি, নারীর অস্তিত্বকে অস্বীকার ও অপমান করার অধিকার কারো নেই। তাই লড়াই চলবে। এ লড়াই শুধু নারীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নয়, বরং নারীর অবদান আর যোগ্যতাকে তুলে যথাযথ মর্যাদায় তুলে ধরবার লড়াই।

লেখক: প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা

 

এফএএন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ