ইতিহাসচর্চার স্বাধীনতা ও সীমাবদ্ধতা

Send
বিদ্যুৎ দে
প্রকাশিত : ১৭:৪৫, ডিসেম্বর ২২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৬, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯



বিদ্যুৎ দেBertolt Brecht এর উক্তি দিয়েই শুরু করতে চাই—‘সবচেয়ে উঁচু দরের অশিক্ষিত হলেন রাজনৈতিক অশিক্ষিত ব্যক্তি। তিনি শুনতে পান না, কথা বলেন না, রাজনৈতিক ঘটনাবলিতে অংশ নেন না। তিনি জীবনের মূল্য, মটরশুঁটি, মাছ, ময়দা, ঘর ভাড়া, জুতা ও ওষুধের মূল্য সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এ সবই নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। রাজনৈতিক অশিক্ষিত ব্যক্তি এত বোকা যে, তিনি তার বুক স্ফীত করে বলেন, তিনি রাজনীতিকে ঘৃণা করেন। এ ব্যাপারে তিনি গর্বিত বোধ করেন। পতিত মূঢ় সেই ব্যক্তি জানেন না, তার রাজনৈতিক অজ্ঞতা থেকে পতিতাবৃত্তি, পরিত্যক্ত শিশু ও সবচেয়ে খারাপ চোর, খারাপ রাজনীতিক, জাতীয় ও বহুজাতিক দুর্নীতিবাজ ও বিদ্বেষপূর্ণ সংস্থাগুলোর জন্ম হয়।’
রাজনৈতিক নিরক্ষরতা আসে অন্ধকার ইতিহাসের পথ বেয়ে। ইতিহাসের প্রতি উদাসীনতা ও তার অবমূল্যায়ন পুরো জাতির আত্মহত্যার সামিল। নৈতিকভাবে প্রত্যেকটি জাতি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ। আমাদের রয়েছে ৩ হাজার বছর বা তারও বেশি সময়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য। বেশ কয়েকবছর ধরে অনলাইন-অফলাইনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চা ও লেখালেখি বেড়েছে। এটা অবশ্যই একটা ভালো দিক। দীর্ঘদিন আমাদের বীরত্ব, ত্যাগ ও কষ্টের ইতিহাস পুরো একটা প্রজন্ম জানার সুযোগ থেকে অনেকটা বঞ্চিত হয়েছে। জাতি হিসেবে ৭১-এর প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট থাকা অনিবার্য। একইসঙ্গে আমরা সেই কমিটমেন্ট কিভাবে রক্ষা করছি, সেটা দেখাও একটা বড় ব্যাপার।
অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখছেন। এটা ব্যক্তিজীবন ও জাতীয়ভাবে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেটা অবাক হয়ে দেখি, সেটা হলো সব কিছুকেই ‘গবেষণা’ বলে ধরে নেওয়ার একটা প্রবণতা। সেটা আমাদের কাম্য নয়। মানুষ বছরের পর বছর ধরে গবেষণা করতে শেখে। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো—তথ্য-সূত্রের সঠিকতা নিশ্চিত করা। এর প্রতি সৎ থাকা।
আমরা মোটাদাগে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক দুই ধরনের লেখকের লেখা পাই।
(১) যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবিত ছিলেন, তাদের লেখা;
(২) যারা উল্লিখিত ব্যক্তিদের লেখাগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষণাধর্মী লেখা লেখেন, তারা;
যেসব ব্যক্তি এ ধরনের লেখালেখি করেন, তাদের সবারই যেমন লেখার স্বাধীনতা আছে, তেমনি কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। মনে রাখা প্রয়োজন, স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। এ ধরনের লেখালেখির ব্যাপারে সাবধান হওয়ার জন্য আমাদের সবারই কিছু নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। একইভাবে পাঠকদেরও দায়িত্ব রয়েছে লেখকদের সঠিক প্রণোদনা ও পরামর্শ দেওয়ার।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কন্টেন্টের পরিমাণ বাড়ছে কিন্তু এর গুণগত মান নিয়ে দিনদিন প্রশ্ন উঠছে। বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখালেখিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
যারা মুক্তিযুদ্ধের আগে পরে জীবিত ছিলেন, প্রত্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন—তাদের অনেকেই যখন লিখছেন, সেখানে তার নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, অন্যের কাছ থেকে নেওয়া তথ্য আর নিজের পর্যবেক্ষণ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ফলে সেই লেখা থেকে তার নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাটুকুর তথ্য পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। অনেকেই অন্যের কাছ থেকে নেওয়া তথ্যের উৎস উল্লেখ করেন না। উল্লেখ করলেও পেছনে একগাদা বইয়ের নাম লিখে খালাস। কোথা থেকে কোনটুকু নিয়েছেন, তা সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকেন।

এর ফলে যে মুক্তিযোদ্ধা যশোরে যুদ্ধ করেছেন, তিনি অবলীলায় চট্টগ্রামের কথা বলছেন। বলায় দোষের কিছু দেখছি না। লেখক তার পর্যবেক্ষণ দিতেই পারেন, তবে সেই পর্যবেক্ষণের অংশটুকু আলাদা করে দিলে পাঠকদের জন্য সুবিধা হয়। এছাড়া পর্যবেক্ষণের পেছনের যুক্তি-প্রমাণ-রেফারেন্স দেওয়া জরুরি।
দ্বিতীয়ভাগে উল্লিখিত লেখকদের বইয়ের রেফারেন্স উল্লেখ করে যারা বিষয়ভিত্তিক লেখা লেখেন তারা।
এই লেখকদের মধ্যে এমন লেখকও রয়েছেন, যারা বিভিন্ন লেখকের অংশ বিশেষ কোনও যাচাই-বাছাই ছাড়াই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে একটা লেখা লিখে ফেলান। ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত আরও ব্যক্তি'র বক্তব্য সংগ্রহ করা এবং একজনের বক্তব্যের সঙ্গে অন্যের বক্তব্যের মিল-অমিল যাচাই-বাছাই করার মতো ধৈর্য কম লেখকের মধ্যে দেখা যায়।
আরেকটা গ্রুপ আছে, যারা আগেই একটা সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেন। শুধু সেই সিদ্ধান্তের সমর্থনমূলক রেফারেন্সটুকু তিনি উপস্থাপন করেন। পাঠকদের সচেতনভাবে ঋণাত্মকভাবে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা করা হয়।
ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘চেরি পিকিং’ নিজের সুবিধা মতো তথ্য ব্যবহার করা। মুক্তিযুদ্ধের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করার সময় ‘চেরি পিকিং’ করা অনুচিত। সময়ের গর্তে সেটি নিশ্চয় হারিয়ে যাবে। মাঝে যেটা বিশাল ক্ষতি হয়, সেটা হলো একজন ব্যক্তির অবদান। গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। মনে রাখতে হবে আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার কথা। ইচ্ছামতো ছেলেখেলার বিষয় এটা নয়। সমস্যা গুরুতর হয় যখন লেখক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ এবং ইনফ্লুয়েন্সিয়াল ব্যক্তি হন।
একটা উদাহরণ দেই।
আমি দাদুর মুখে শুনেছি তিনি ভারতের শরণার্থী শিবিরে ডাক্তারের অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি কোনও ডায়েরি লিখে যাননি। তার কোনও মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নেই কিংবা ডাক্তারের দেওয়া কোনও একনলেজমেন্ট লেটার নেই। এবং সর্বশেষ আমার দাদু এখন আর বেঁচে নেই। এ মুহূর্তে আমি যদি কোনও মাধ্যমে প্রকাশ করি আমার দাদু মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে মেডিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন সেটা কতখানি ধোপে টিকবে?
আমার দাদু মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি ক্যাম্পে মেডিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন কিংবা করেননি, তাতে দেশ, জাতি, ইতিহাসের তেমন কিছু যায়-আসে না।
কিন্তু এখন যদি আমি এমন দাবি করি যে, আমি দাদুর মুখে শুনেছি, তাজ উদ্দিন আহমেদ যখন কালীগঞ্জ হয়ে ইন্ডিয়া যাচ্ছিলেন, তখন আমার দাদু তার সঙ্গে দেখা করেন। তাকে দ্রুত ইন্ডিয়া গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দেন। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীকে কী বলতে হবে, সে বিষয়েও তাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হয়। সেই পরামর্শ অনুযায়ীই তাজউদ্দিন আহমেদ সীমান্ত পার হয়েই যত দ্রুত সম্ভব দিল্লি গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন।
এ ধরনের দাবি করার সঙ্গে সঙ্গেই আপনি আমার কাছে প্রমাণ চাইবেন। আমি যতই বলি না কেন, আমি নিজে দাদুর মুখে শুনেছি-, আপনি কি তা বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নেবেন? সমস্যা হয় তখনই, যখন এ ধরনের কথাবার্তা বাংলাদেশের জন্ম-যন্ত্রণার সঙ্গে যুক্ত এমন কোনও ব্যক্তি বা কোনও ক্ষমতাধর বা জ্ঞানী-গুণী পরিচয়ধারী ব্যক্তির মুখ থেকে বের হয়। তা হয়তো দীর্ঘমেয়াদে ইতিহাসের কড়িকাঠে ঠাঁই পাবে না, কিন্তু স্বল্প মেয়াদে নিশ্চয় ক্ষতি করে বই কি!
মানুষ তার ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় জেনেছে কোনটি ভালো যুক্তি, কোনটি অপযুক্তি, কোন সাক্ষ্যটি যুক্তিগ্রাহ্য এবং কোনটি নয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা যুক্তিবিজ্ঞান শাস্ত্রের কথা জানি। আইন শাস্ত্রে ‘সাক্ষ্য আইন’ বলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে। আমরা প্রাত্যহিক জীবনে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে প্রত্যেকটি বিষয়ে যৌক্তিক বিচার করে চলার চেষ্টা করি। ইতিহাসের সঙ্গে জনগণের ভাষ্য জড়িত থাকে। একটি ঘটনা যখন ঘটে, তখনই সেখানে বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন মানসিকতার মানুষ থাকে। প্রত্যেকেই সেই ঘটনার অংশীদার হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তাদের জবানীতে যখন সেই ঘটনা উঠে আসে, তখন তার কতটুকু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তা নির্ভর করে প্রত্যেকের যৌক্তিক বর্ণনা ও বিশ্লেষণের ওপর; এমনকী তাদের পরবর্তী জীবনাচরণের ওপরেও তার নির্ভরতা বিচার্য হয়।
অনিবার্যভাবে চলে আসে লেখকের দায়বদ্ধতার কথা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কিছু লিখতে হলে সম্পূর্ণ লেখাটি সঠিক তথ্যভিত্তিক হতে হবে। যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কোনও সিদ্ধান্তমূলক লেখা ঠিক নয়।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা সবসময় প্রস্তুত থাকে মুক্তিযুদ্ধের সব কিছু প্রশ্নবিদ্ধ করতে। দশটি তথ্য উপস্থাপন করে যদি একটি লেখা প্রকাশিত হয়, তার মধ্যে যদি একটা তথ্যতেও ভুল থাকে, বা অসত্য হয়, তাহলে পুরো লেখাটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তখন এটা হয়ে যায় বিরোধীদের হাতের হাতিয়ার। ভুল বা অসত্য তথ্য যে শুধু একটা লেখাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তা নয়, বরং লেখককেও করে। লেখকের আগের সব লেখা এবং ভবিষ্যতের লেখাগুলোও তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ ধরনের কাজের পরিণামে একজন লেখকের সারা জীবনের সুনাম হয়তো এক নিমিষেই ধুলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।
এখানে আরও একটা উদাহরণ দেই।
মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। এটার পক্ষে অনেক তথ্য প্রমাণ আমরা জানি। অনেকগুলো সূত্র এটাও বলে যে, সংখ্যাটা ৩০ লাখের ওপরে। সমস্যা এখানে না। সমস্যাটা হলো অনেকে বলেন জাতিসঙ্ঘের নাকি একটি প্রকাশনা আছে, যেখানে এই ৩০ লাখের উল্লেখ আছে। সেটাকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। আমরা কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও এমন কোনও কিছু সেখান থেকে বের করতে পারিনি। আমরা সরাসরি জাতিসঙ্ঘের যে উইং বিষয়টি নিয়ে কাজ করে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু সেখান থেকে তারা এ ধরনের তথ্যের কথা নিশ্চিত করতে পারেননি।
খেয়াল রাখা দরকার যে, একটা অসমর্থিত তথ্য পাঁচটা জায়গা থেকে পাওয়া যাওয়া মানেই কিন্তু সেটার সত্যতা যাচাই করা নয়। সেই তথ্যটা যে সত্য, সেটার প্রমাণও নয়। এর সব চাইতে ভালো উদাহরণ হলো—জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা। বহু লেখায় স্বাধীনতা ঘোষণার তারিখ হিসেবে ২৬ মার্চ ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু তাতে এই তথ্যের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
আমাদের সবিনয় অনুরোধ থাকবে, ৭১-এর ইতিহাস নিয়ে ক্ষণিকের খ্যাতির লোভে বৃহত্তর ক্ষতির কথা ভুলে যাবেন না। আজকে আপনি হয়তো কোনও পত্রিকায় বা সামাজিক মাধ্যমে কিছু প্রকাশ করে ক্ষণিকের পরিচিতি লাভ করবেন বা করছেন। কিন্তু আপনার একটু দূরদর্শিতার অভাবে সামগ্রিকভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ক্ষতি করছেন কিনা, সেটা ভাবুন। আপনার কাজের ওপর ভিত্তি করে আর যে সব মানুষ কাজ করবে, আপনি তাদের ভিত্তি। নড়বড়ে ভিত্তির ওপর ভর করে মজবুত কিছু কিন্তু কখনোই দাঁড়াতে পারে না। এছাড়া, একজন বিতর্কিত 'গবেষক' কিন্তু অন্য সব গবেষককেও বিতর্কিত করে ফেলতে পারেন শুধু বিষয়বস্তুর কারণে। এটা আমাদের কারও কাম্য নয়।
আমরা আরেকটা সত্যিকার ঘটনার উদাহরণ দেখি:
১৯৮৯ সালে Academic Publishers থেকে প্রকাশিত মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ পিএসসি বীর উত্তম লিখিত BANGLADESH AT WAR বইয়ের ৪৫ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখছেন, মেজর জিয়া ২৬ মার্চ তার প্রথম রেডিও এনাউন্সমেন্ট দেন !

 1

২০১০ সালে এস মাহমুদ আলী নামে একজন পাকিস্তানি লেখক বিখ্যাত কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস, নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত UNDERSTANDING BANGLADESH বইয়ে পূর্বে উল্লিখিত মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ পিএসসি বীর উত্তম লিখিত BANGLADESH AT WAR বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে লিখেছেন, মেজর জিয়া ২৬ মার্চ তার প্রথম রেডিও এনাউন্সমেন্ট দেন! (পৃষ্ঠা নং-৫৯, রেফারেন্স নং-১২। রেফারেন্স পৃষ্ঠা নং- ৩৫৫)
অর্থাৎ একটা ভুল রেফারেন্স আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে !
এই বিষয়টিকে কী বলবেন?
যদিও ২০০৫ সালে পুনর্মুদ্রণের সময় মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ ৬৩ নং পেজে তারিখগুলো সংশোধন করেছেন কিন্তু ইতোমধ্যে যা ঘটার, তা তো ঘটেই গেছে। লক্ষ করুন ২০১০ সালে এস মাহমুদ আলী ২০০৫ সালের নয় বরং ১৯৮৯ সালের বইটির রেফারেন্স উল্লেখ করেছেন। মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ এতবড় একটা ভুলের উল্লেখ পরবর্তী মুদ্রণের প্রথম পৃষ্ঠায়ও উল্লেখ করেননি। শুধু যে পৃষ্ঠায় সেটি লেখা হয়েছিল, সেই পৃষ্ঠায় ফুটনোটে ব্যাখ্যা দিয়ে দায়সারা হয়েছে।

আমি চেষ্টা করছি, যারাই এ বিষয়গুলো নিয়ে লিখছেন, তাদের জন্য সহায়ক কিছু আউটলাইন তৈরি করতে।
সাক্ষ্য আইনে বলা হয়, সবচেয়ে ভালো সাক্ষ্য হলো—প্রত্যক্ষ সাক্ষীর সাক্ষ্য। অর্থাৎ ঘটনার পাত্র-পাত্রীর জবানবন্দি বা প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। যদি তাদের কেউ বেঁচে না থাকেন, তবে তাদের লেখা ডায়েরি বা নিত্যকর্মের ডকুমেন্টগুলো (উদাহরণ: যদি ক্যাশিয়ার হয়ে থাকেন তবে তার লিখিত ক্যাশবুক) ভালো সাক্ষ্য হিসাবে গৃহীত হয়।
আপনি যে বিষয়ে লিখতে আগ্রহী সে বিষয়ে প্রাপ্ত ডাটাগুলো একজায়গায় করুন।
বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন লেখা বা বই আপনি যখন পড়বেন অবশ্যই নোট রাখুন। প্রত্যেকটা নোটের পাশে বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে পাশে উৎস লিখে রাখুন।
এবার ঘটনাগুলো একে অন্যের সঙ্গে ফিট করুন। অর্থাৎ পাত্র-পাত্রী, ঘটনা, সময় একে অন্যের সঙ্গে মেলে কিনা, তা দেখুন। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে প্রশ্ন করুন, সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করুন। যে প্রশ্নগুলোর উত্তর পাননি, সেগুলো নোট করুন।
এবার প্রাপ্ত সাক্ষ্যগুলোর কোনগুলো প্রাইমারি বা প্রত্যক্ষদর্শীর আর কোনগুলো সেকেন্ডারি সেগুলো আলাদা করুন।
প্রাপ্ত ডাটাগুলো আবার রিঅ্যারেঞ্জ করুন এবং গ্যাপগুলোর দিকে ফোকাস করুন। গ্যাপগুলো যথাযথভাবে পূরণ না হলে আরও তথ্য-প্রমাণ আহরণের চেষ্টা করতে পারেন।
এবার ক্রসচেক করুন। অর্থাৎ একজনের বক্তব্যের সঙ্গে আরেকজনের বক্তব্যের মধ্যে মিল-অমিল বের করুন। মিল-অমিলগুলোর পেছনে যৌক্তিক কোনও কারণ আছে কিনা, থাকলে সেগুলোর কারণ লিখে ফেলুন।
ডাটা জোগাড় করতে পারেন প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের লেখা, সাক্ষাৎকার থেকে। দৈনিক পত্রিকা, সরকারি নথিপত্র ভালো মাধ্যম। ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দৈনন্দিন পেশা বা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নথিপত্রও ভালো সাক্ষ্যের সন্ধান দিতে পারে। সাক্ষ্য প্রমাণ খোঁজার সঙ্গে সঙ্গে সমর্থনমূলক প্রমাণ মূল সাক্ষ্যকে জোরালো করে। যে ব্যক্তি নিজেকে অসুস্থ বলে দাবি করেন, সেই সময়ে কোনও হসপিটাল রেজিস্ট্রারে তার নাম থাকা একটি সমর্থনমূলক প্রমাণ।
আরেকটা উদাহরণ দেই, ধরুন আপনি একটি সংবাদপত্রে কাজ করছেন। একদিন সন্ধ্যায় নোয়াখালী থেকে একজন আপনাকে খবর দিলেন, সেখানে একটি বাস দুর্ঘটনা হয়েছে। অনেকলোক হতাহত হয়েছে। আপনি কি যাচাই-বাছাই ছাড়াই খবরটা পরের দিন দৈনিকে তুলে দেবেন? আপনি ওখানকার হসপিটাল, থানা, ফায়ারব্রিগেড ইত্যাদি জায়গায় ফোন দিয়ে ঘটনার সত্যাসত্য, এমনকী কতজন হতাহত হয়েছে, সে ব্যাপারে নিখুঁত খবর পেতে পারেন।
যেকোনও বিষয়ে যখন লিখবেন বা জানার চেষ্টা করবেন, আশা করি উল্লিখিত উপায়ে খোঁজ-খবর করলে একটি বিষয়ে সঠিক তথ্য বের করতে পারবেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিষয়ক ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার তথ্যসূত্র হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে ১৯৭৫ সালের আগে এবং পরের রেফারেন্স দুই রকম গুরুত্ব দেই। কেননা এমনও ঘটনা আছে, একই ব্যক্তি ১৯৭৫ এর আগে একরকম স্টেটমেন্ট দিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে আরেকরকম দিয়েছেন। এতে সত্যিকারভাবে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। দুই সময়ে দুই রকম বলায় অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া সত্ত্বেও তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা/ ক্রেডিবিলিটি নষ্ট হয়েছে।


আপাতত, আরও কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি:
(০১) ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’কে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য রেফারেন্সগুলোর অন্যতম বলে ধরা হয়। এখানকার একটা উদাহরণ দেই:
এই বইয়ের ৮নং ভল্যুম-এর ৫৭৬ পৃষ্ঠায় ১৩ই এপ্রিল, ১৯৭২ তারিখের ‘দৈনিক বাংলা’র সূত্র দিয়ে ‘দানবীর নূতনচন্দ্র সিংহ: গতবছর এই দিনে খান সেনারা তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল’ এই শিরোনামে একটা লেখা দেওয়া হয়। নিয়মানুসারে ওই পত্রিকায় যা লেখা ছিল হুবহু সেটাই থাকা উচিত ছিলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় ওই তারিখের দৈনিক বাংলায় যা লেখা ছিল এবং ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ বইয়ে যে লেখা সেটি অনেকখানি পরিবর্তিত। বইয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং তার পুত্র সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এর ভূমিকাকে গোপন করার চেষ্টা স্পষ্ট। বইতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ‘জনৈক সালাউদ্দিন’ বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে!
এ কাজটি করায় যা হয়েছে, তা হলো এই তথ্যসূত্র বইটির ক্রেডিটিবিলিকে খাটো করেছে।

2

3

4 

(০২) আমরা জানি, তাজউদ্দিন আহমেদ এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম ঢাকা থেকে একসঙ্গে বর্ডারের উদ্দেশে রওনা দেন। তারা একসঙ্গে বর্ডার ক্রস করেন । ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি’ নামে ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের লেখা একটি বই রয়েছে। অন্যদিকে ‘তাজউদ্দিন আহমেদের চিঠি’ নামে তার বয়ানে এই নেতার মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি সম্পাদিত একটি বই রয়েছে। এই দুইটি বইয়ের টাইমলাইন অনুসরণ করলে একটা ব্যাপারে দুজনের টাইমিং দুই রকম। মেজর জিয়ার বেতার ঘোষণার ব্যাপারে ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম ২৮ মার্চ ১৯৭১ তারিখ রাতে জানতে পারেন কিন্তু তাজউদ্দিন আহমেদ জানতে পারেন ২৯ মার্চ ১৯৭১ তারিখ দুপুরে।


(০৩) কিছুদিন হলো কাজী আরেফ আহমেদের ‘বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র’ বইটা হাতে এসেছে। এই বইটির ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের অংশটুকু পড়তে গিয়ে হতভম্ব হয়ে গেছি। প্রথমে বলে নেওয়া ভালো, এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে কাজী আরেফের মৃত্যুর বেশ কয়েকবছর পর। তবে লেখক হিসেবে কাজী আরেফের নাম লেখার পরের লাইনে থার্ড ব্রাকেটে ‘আবদুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খান’ এই দুই জনের নাম লেখা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই বই যখন প্রকাশিত হচ্ছে, তখন ‘আবদুর রাজ্জাক’ও বেঁচে নেই। সম্পাদনা করেছেন স্কোয়াড্রন লিডার আহসান উল্লাহ (অবসরপ্রাপ্ত) নামে একজন। বইয়ের শুরুতে সিরাজুল আলম খান ‘কথা ছিলো...’ শিরোনামে লিখেছেন, বইটা তিন জনে মিলে লেখার কথা ছিল। এই লেখার শেষে লিখেছেন, ‘‘কাজী আরেফ আহমেদ ‘বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র’ শীর্ষক বইটিতে যা লিখেছেন, তা আবদুর রাজ্জাকেরও কথা, আমারও কথা। তাই, এই বইয়ের মূল লেখক কাজী আরেফ আহমেদকে সামনে রেখেই আমরা দু'জন এ পর্যায়ে তার সহযোগী হিসেবে থাকবো।" আবার কাজী আরেফের স্ত্রী ‘আমার কথা’ শিরোনামে যা লিখেছেন, তাতে এটা স্পষ্ট হয়, কাজী আরেফ বিভিন্ন সময় যেসব লেখা লিখেছেন, সেসব লেখার সংকলন হলো এই বইটি।
এ পর্যন্ত পড়ে আমি এখনও পরিষ্কার নই, বইটি শুধু কাজী আরেফ আহমেদের লেখা, নাকি সহলেখক হিসেবে আবদুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খান এই দুজনও লিখেছেন!
যাই হোক, এ বইয়ে যা লেখা আছে, সেই অনুসারেই কাজী আরেফ ভারতে পৌঁছান মে মাসের প্রথম সপ্তাহে, আবদুর রাজ্জাক এপ্রিলের ৬ তারিখে এবং সিরাজুল আলম খান ভারতে প্রবেশ করেন এপ্রিলের ৩ তারিখে।
এই বইতে কাজী আরেফ ভারতে প্রবেশের আগের সময়ের অনেক বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। সেগুলো তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নয়। অর্থাৎ সেগুলো তিনি অন্য কারও কাছ থেকে জেনেছেন বা শুনেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কার কাছ থেকে তিনি এসব তথ্য পেয়েছেন এবং কার কাছ থেকে ঠিক কতটুকু নিয়েছেন, সে ব্যাপারে কোনও কিছুই এই বইতে নির্দিষ্ট করে লেখেননি। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কিংবা রেফারেন্সসহ পর্যবেক্ষণ এই দুইয়ের নিরিখে এই বইটি উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এছাড়া পরস্পর বিরোধী বাক্য ও ঘটনায় আগাগোড়া ভরা এই বইটি।
আজ এপর্যন্তই। এভাবে যে অসঙ্গতিগুলো আমাদের চোখে পড়বে, আগামীতে আমরা চেষ্টা করব, সেগুলো পাঠকের সামনে তুলে ধরতে।

কৃতজ্ঞতা:
(০১) মাহবুবুর রহমান জালাল, CENTER FOR BANGLADESH GENOCIDE RESEARCH (http://www.cbgr1971.org/)
(০২) রায়হান জামিল (Assistant Professor at Zayed University, Abu Dhabi, United Arab Emirates)

লেখক: আইনজীবী ও লেখক।

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ