ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভালো-মন্দ

Send
এরশাদুল আলম প্রিন্স
প্রকাশিত : ১৩:৪১, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৫, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৮

এরশাদুল আলম প্রিন্সমন্ত্রিসভা ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৭’-এর খসড়া অনুমোদনের পর থেকেই আইনটির অপব্যহারের সম্ভাবনা নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। প্রাসঙ্গিকভাবে ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার কথাও বলা হচ্ছে।
২০০৬ সালের আইনটি প্রণয়ন করার সময়ও বিএনপি সরকার থেকে বলা হয়েছিল ওই আইনের অপব্যবহারের কোনও সুযোগ নেই, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনের জন্যই ওই আইন করা হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি, ওই আইনের অপপ্রয়োগের হাত থেকে ৫ বছরের শিশু থেকে ৮৫ বছরের বৃদ্ধরাও রেহাই পাননি। নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ-ধর্ম ভেদে অনেক নিরপরাধ ওই আইনের অপপ্রয়োগের ফলে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

কিন্তু নতুন আইনের খসড়া অনুমোদনের পর আমরা দেখছি বিএনপি-ই এর বিরুদ্ধে বেশি সোচ্চার। কারণ, তারা ভাবছে এই আইনের মাধ্যমে বিরোধীদলের কর্মীরাই বেশি হয়রানির শিকার হবে। আর বিরোধী দলে থাকলে তো জনকল্যাণের কথা বলা সহজই হয়ে থাকে। তথ্য প্রযুক্তি আইনের মাধ্যমে আমরা দেখেছি সাধারণ নাগরিক ও বিরোধীদলের কর্মীদের হয়রানির চিত্র। সরকারদলীয় নেতাকর্মীর হয়রানির শিকার হওয়ার কথা তেমন শোনা যায়নি।

উদাহরণ হিসেবে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের কথা আমরা বলতেই পারি। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে এই আইনটির জন্য। আবার এটাও সত্যি, এ আইনের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি হয়রানিরও শিকার হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাই। সে সময়ের প্রেক্ষিতে এরকম একটি আইন দরকার ছিল কিনা সেটা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ওই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা পেতে ব্যর্থ হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ভালো হলেও প্রয়োগের দিক থেকে তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ, কারণ এর বিভিন্ন অপরাধগুলো সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়নি। ফলে আইনের বিস্তৃত ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সুফল ভোগ করেছে সরকার। কিন্তু যারা আইনটি প্রণয়ন করেছে সে আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতার বাইরে!

২০০০ সালের ‘জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন আইন’-এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আওয়ামী লীগ সমালোচনার মুখে এ আইনটি পাস করলেও কত আইনে কত ধারা তা ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে তারা ক্ষমতার বাইরে থেকে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। তাই সরকারের শেষের দিকে এরকম একটি আইন করা কতটুকু সুদূরপ্রসারি দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

এসব কারণে প্রস্তাবিত আইনটি নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে একই রকম আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে সাংবাদিক সমাজ থেকেই সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্নতা প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার এই আইনটি সাংবাদিকদের হয়রানি করার জন্য করা হয়নি। এটি করা হয়েছে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের (Aggrieved) সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। ২০০৬ সালের তথ্য প্রযুক্তি আইন, ২০০০ সালের জননিরাপত্তা আইন ও ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনেরও একই উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু সব আইনেরই অপব্যবহার হয়েছে। বর্তমান আইনটিরও অপব্যবহারেরর সুযোগ আছে।

আশঙ্কা হচ্ছে ,এ আইনের ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যদি সাংবাদিকতাকে গুপ্তচরবৃত্তি হিসেবে মনে করেন তবে ওই সাংবাদিকের ১৪ বছরের জেল-জরিমানাও হয়ে যেতে পারে। এটি আসলে আশঙ্কা। সাধারণ আইনেও গুপ্তচরবৃত্তি অপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত।

শৃঙ্খলা বিধানের নামে অতি উৎসাহী মনোভাবের ফলে ৫৭ ধারার যে অপপ্রয়োগ আমরা দেখেছি তাতে সাংবাদিকদের আশঙ্কা করার যৌক্তিক কারণ আছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়ে কোনও সাংবাদিক গুপ্তচরবৃত্তির মামলা খাবেন না এই নিশ্চয়তা এ আইনে নাই। কারণ, গুপ্তচরবৃত্তির সংজ্ঞাটি এখানে নিরূপণ করা হয়নি। কোনও সরকারি অফিসের দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে গেলেও এখন অনুমতি লাগবে। 

এই সরকার তথ্য অধিকার আইনের মতো একটি ভালো আইন করেছে। কিন্তু তথ্য অধিকার আইনের কয়েকটি ধারা নতুন আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে তা নির্ভর করছে আইনটির অপব্যবহার বা অপব্যাখ্যার ওপর। তারচেয়েও বড় কথা সামগ্রিকভাবে এই আইনটির মধ্যে মত প্রকাশ ও তথ্য অধিকারকে সংকুচিত করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ৫৭ ধারার ঠেলা সামলাতে যেন নতুন এ আইনটি করা হলো। কারণ, ৫৭ ধারার বিচারযোগ্য অপরাধগুলোকেই নতুন আইনের চারটি ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন আইনের কিছু ধারায় শাস্তির মাত্রা কমলেও হয়রানির আশঙ্কা কমাতে পারেনি।

এ আইনের একটি ভালো দিক হচ্ছে সর্বনিম্ন দণ্ডের মাত্রা কমানো। আবার পাশাপাশি কিছু অপরাধকে জামিনযোগ্যও করা হয়েছে, যা আগে অজামিনযোগ্য ছিল; যেমন তথ্য প্রযুক্তি আইনে মানহানি মামলায় আগে শাস্তি ছিল ৭ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা। কিন্তু এই আইনে তা কমিয়ে যথাক্রমে ৩ বছর কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা অনেকটাই বাস্তবসম্মত।

যেকোনও আইনের মূল বিষয়ই হলো তার শব্দ ও ভাষা। এগুলো সুনির্দিষ্ট না হলে তার বিস্তৃত ব্যবহার হয়, যা আদতে অপব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। শুধু এ আইনই নয়, আরো কয়েকটি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও শব্দের এ অবাধ ব্যবহার হয়েছে আইন প্রয়োগকারীদের মাধ্যমে। যেমন ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, ‘ধর্মীয় অনুভূতি’,  ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’ ইত্যাদি। এখন ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম’-এর ব্যাখ্যা ও সীমারেখা একেক জনের কাছে একেক রকম। এদিকে মফস্বলের এক সাংবাদিক তো মামলা খেয়ে বসে আছে! কাজেই আইনের ক্ষেত্রে ওই ধারণা ও বিষয়গুলোকে সংজ্ঞায়িত করা ও তার প্রয়োগ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ (২১ ধারা)।

আইনের ব্যাখ্যা দেবে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু তার ব্যাখ্যা যদি দেন একজন এসআই, তখনই বিপত্তিটি হয়। মাঠপর্যায়ে আইনের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ আইনের অপপ্রয়োগের দ্বার উন্মুক্ত করে। এর ফলে সাদা আইনও কালো আইন হয়ে যায়।

এছাড়া দণ্ড ও জরিমানার যে পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে তাও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এদিকে আলোচিত ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি বেআইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ কোনও সংস্থার অতিগোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটালযন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ এবং এই অপরাধের সর্বোচ্চ দণ্ড ১৪ বছর কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। সাংবাদিকদের এখানেই সবচেয়ে ভয়। কারণ, এখানে ‘অতিগোপনীয়’ ও ‘গোপনীয়’ তথ্য-উপাত্ত বলতে আমরা কী বুঝি? এখানেই তথ্য অধিকার আইনের অধিকারগুলো খর্ব হওয়া আশঙ্কা। কোনও কর্মচারী যদি তার নিয়ন্ত্রণাধীন কোনও সাধারণ তথ্যকেও গোপনীয়  বা অতিগোপীয় মনে করেন তবে ওই সাংবাদিক বা তথ্য অনুসন্ধানকারীর গুপ্তচরবৃত্তির মামলা খাওয়া ছাড়া আর কী করার থাকবে?

নতুন আইন প্রণয়ন করার সময় পুরনো আইনের গলদের কথা সরকারই সবচেয়ে বেশি বলে। তাই অনেক মন্ত্রীই এখন ৫৭ ধারার সমালোচনা বেশি করছেন।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না অনলাইন মিডিয়া বা ডিজিটাল মিডিয়ার অগ্রযাত্রা রোধ করা যাবে না। এটাও ঠিক যে অনলাইন মিডিয়া বা ডিজিটাল মিডিয়ার অপব্যবহারও রোধ করা প্রয়োজন। কিন্তু অপব্যবহার রোধ করা ও ‘মান-ইজ্জত’ রক্ষা করা এক জিনিস নয়। মান-ইজ্জত লঙ্ঘন হলে দণ্ডবিধি আছে, মানহানির মামলা আছে, তার আশ্রয় নেওয়া যায়। আর ডিজিটাল মিডিয়ার অপব্যবহার রোধ করতে হলে প্রয়োজন ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়ার মনিটরিং ও ব্যবহারবিধি প্রণয়ন। চোরের চেয়ে গৃহস্থকেই বেশি সজাগ থাকতে হয়। কিন্তু চোরের ভয়ে দরজা-জানালা সব বন্ধ করে ঘরের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে মরা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

আমাদের ডিজিটাল ও প্রকৃত অনলাইন মিডিয়ার অগ্রযাত্রার পথ প্রশস্ত করতে হবে। আবার অন্যদিকে ভুঁইফোড় অনলাইন মিডিয়ার মাশরুমিংও বন্ধ করতে হবে। সেটি ৫৭ ধারা বা ৩২ ধারা দিয়ে হবে না। সেজন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু-সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন। সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই, তবে অপব্যবহারের আশঙ্কাযুক্ত ধারাগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলেই মনে হয়।

লেখক: আইনজীবী ও কলামিস্ট

/এসএএস/ওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ