‘বিচার মানি তবে তালগাছ আমার’

Send
আশরাফ সিদ্দিকী বিটু
প্রকাশিত : ১৮:০৯, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৮, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮

আশরাফ সিদ্দিকী বিটুজিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে খালেদা জিয়ার ৫ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া এই মামলায় তারেক রহমানসহ বাকি পাঁচ আসামির ১০ বছর সাজা হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেককে ২ কোটির বেশি টাকা করে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়া এখন কারাগারে। নিয়মমাফিকভাবেই কারাগারে। আদালত বলেছেন, বিএনপি নেত্রীর শারীরিক অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে তাকে এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিএনপি এই নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুধু দেখায়ইনি উল্টো বিএনপি নেত্রী আদালতে যাওয়ার সময় পথে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে, ১০ জন পুলিশকে আহত করেছে, পুলিশ বক্সে আগুন দিয়েছে। রায়ের পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদের নামে হামলা, ভাঙচুর চালিয়েছে।
বিএনপি এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রলেপ লাগিয়ে নেতাকর্মীদের প্রবোধ দেওয়ার অপচেষ্টা করছে, সিনিয়র নেতারা কান্নাকাটি করে জনগণের সমবেদনা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিএনপির চরিত্রই এমন, তা হলো সত্যকে অস্বীকার করা, মিথ্যার বেসাতি করা।
মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এহেন কোনও কাজ নেই, যা বিএনপি-জামায়াত করেনি। খালেদা জিয়া সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মুক্তি দিতে বলেছেন। বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের জন্য আইনি লড়াই করেছেন। বিচার ঠেকাতে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করে সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার ঠেকাতে মানুষ হত্যা করেছে কিন্তু সত্যের জয় হয়েছে, বিচার হয়েছে, রায়ও কার্যকর করা হয়েছে। বাকি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের কার্যক্রমও চলমান আছে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের টাকা কী করে এসেছে, কিভাবে টাকা অন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছে, এর আদ্যোপান্ত পুরো জাতি জানে। এখানে আর বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই, পত্র-পত্রিকা, টিভি দেখে সবাই বিস্তারিত জেনেছে কিন্তু এতকিছুর পরও বিএনপি মানতে নারাজ। আইনি প্রক্রিয়ার সবধরনের পথেই বিএনপি চেষ্টা করেছে এই মামলাকে উইথড্র বা বন্ধ করতে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। অপরাধ অপরাধই, বিএনপি নেত্রী বলে অপরাধ থেকে পার পাবেন, সে চিন্তা করা ঠিক নয়। বিএনপি ভেবেছে সরকারকে ভয়ভীতি দেখালে, বিচার বিভাগকে চাপে রাখলে খালেদা জিয়ার অপরাধের শাস্তি হবে না। এমন ভাবনাই তাদের ছিল। কিন্তু সরকার বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করেনি, আদালতও ন্যায়ের পথে থেকেই আইনের শাসনের বিধানকে সমুন্নত রেখে রায় দিয়েছেন করেছে। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

বিএনপি আইনের শাসনে বিশ্বাসী নয়। খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বলেই কি তার অপরাধের শাস্তি হবে না? বিএনপি কি নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবে? ভুলে গেলে চলবে না, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, এমনকি বিএনপি নেত্রীও নন। বিশ্বের কয়েকজন সাবেক সরকারপ্রধান দুর্নীতি ও অপকর্মের জন্য বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন, শাস্তি পেয়েছেন। ইমপিচ হয়ে পদও হারিয়েছেন।

বিএনপি খালেদা জিয়ার অপরাধকে আড়াল করে সরকারকে দোষারোপের চেষ্টা করছে, অথচ এই মামলা আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার দীর্ঘ ১০ বছর পর এ মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী এ ধরনের মামলা ৩৬০ দিবসের মধ্যে সমাপ্ত করার কথা রয়েছে। অথচ খালেদা জিয়া আদালতে অনুপস্থিত থেকেছেন এবং অপ্রাসঙ্গিক বিভিন্ন ইস্যুতে উচ্চ-আদালতে গিয়ে প্রায় সাড়ে ৪ বছর ধরে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রাখেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এই মামলা পরিচালনার জন্য নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই মামলায় বিএনপি ১৫০ বারের বেশি সময়ে নিয়েছে, খালেদা জিয়া কোর্টে অনুপস্থিত থেকেছেন, বিচারক পাল্টাতে বলেছেন, এমনকি কোর্ট পাল্টাতেও সচেষ্ট হয়েছেন। ৩২ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং আসামিরা ২৮ দিন ধরে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন। দেশের সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী আত্মপক্ষ সমর্থনের সব সুযোগ-সুবিধা খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিরা পেয়েছেন। অথচ বতর্মান সরকারকে দোষারোপ করে রাজনৈতিকভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করার হীন চেষ্টা বিএনপি করেছে। এমনকি রায়ের পরও মিথ্যাচার করছে, আবার জামিনের চেষ্টা করবে বলে তাদের আইনজীবীরা বলছেন। এটা কোনও রাজনৈতিক বা দলীয় মামলা নয়। এই সরকারের সঙ্গে এই মামলার কোনও সর্ম্পক নেই। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে এবং চলবে। এই রায় প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে বিএনপি আবারও প্রমাণ করলো দেশের আইন ও আদালতের প্রতি তাদের কোনও শ্রদ্ধা নেই। থাকবেই বা কী করে? বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে জাল সার্টিফিকেটধারীকে বিচারপতি বানিয়েছিল, বিএনপির আইনজীবী প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে প্রিন্টারের অংশ ছুড়ে মেরেছিলেন। দেশের কোনও কিছুর প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নেই। কারণ মিথ্যাচারই তাদের রাজনীতি।

বিএনপি নেতারা মুখে যাই বলুন, রায় মানুন, না মানুন, এই রায়ের আগে তড়িঘড়ি করে তাদের গঠনতন্ত্রের সংশোধন এনে তা নির্বাচন কমিশনে জমাদানের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে, যে দুর্নীতিবাজদের দল বিএনপি। রায়ের পর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন বানিয়ে আবারও প্রমাণ করেছে, গঠনতন্ত্র বিএনপি সংশোধন করছে যেন দুর্নীতিবাজরা দলে থাকতে পারে, দলের রাজনীতি করতে পারে। একটি দল যখন দুর্নীতিবাজদের রাজনীতি করার সুযোগ দেয় তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সে দলের কোনও নৈতিক আদর্শ নেই। দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে দণ্ডপ্রাপ্ত ও দুর্নীতিবাজদের সংগঠন করার অধিকার দিয়ে বিএনপি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিণত হয়েছে। তাদের মুখে তাই নীতি কথা আর মানায় না।

বিএনপি নেত্রীর সাজা হওয়ার পর বিএনপির কর্মকাণ্ড আর বেশি বিতর্কিত হচ্ছে। বিদেশি মিডিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মিথ্যাচার করে তারা কি বোঝাতে চাইছে, রায় হয়েছে কিন্তু বিদেশে যেন প্রচার না হয়? নাকি সরকার বা বিচার ব্যবস্থা ঠিক নেই? এসব অসত্য ও অপচেষ্টা করে লাভবান হওয়ার সুযোগ আর নেই বিএনপির।

আজকে বিএনপি নেত্রীর এই সাজা তার ও তার দলের নিয়মিতভাবে চলে আসা অসততা, অপকর্ম ও দুষ্টাচারের নির্মম শাস্তি। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না তা প্রমাণিত হলো। কিন্তু বিএনপি নেতাদের কর্মকাণ্ড হচ্ছে এমন যে, ‘বিচার মানি তবে তালগাছ আমার’—প্রাচীন এই প্রবাদের মতোই।

রায়ের পর বিএনপির ভেতরে যে হতাশা, অবসাদ তা থেকে নেতাকর্মীদের মুক্তি দিতে সরকার বা বিচার বিভাগকে দোষারোপ করে আসলে আত্মপ্রবঞ্চনা করছে বিএনপি। একবার ভুল করলে, সেই ভুল নিয়ে মেতে থাকলে যে বারবার আরও বড় ভুল হয়, সেই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপি।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ