দেশের গান ও দেশাত্মবোধ

Send
ফাহমিদা নবী
প্রকাশিত : ১১:২৯, মার্চ ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২১, মার্চ ০২, ২০১৮

ফাহমিদা-নবী‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি/ সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি’; অথবা‘একটি বাংলাদেশ, তুমি জাগ্রত জনতার/ সারা বিশ্বের বিস্ময় তুমি, আমার অহংকার’; ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল/ জোয়ার এসেছে জন সমুদ্রে রক্ত লাল রক্ত লাল, রক্ত লাল’;‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো, এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো’; ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা/ আমরা তোমাদের ভুলবো না’—এ রকম আরও অসংখ্য দেশের গান আজ বাংলা গানের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার রয়েছে।

বাংলা গানের জগতে বিভিন্ন ধারার গানের সঙ্গে অনেক বড় একটি জায়গা নিয়ে আছে এই দেশের গান। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে সবসময় দেশের গানগুলো প্রচারিত হতো। সে সময় গীতিকবি, সুরকবিরা মূলত যে সব গান রচনা করতেন, তার মধ্যে দেশের গানই বেশি ছিল। যেমন সুন্দর গানের কথা, তেমনি মিষ্টি এই গানগুলোর সুরও।  বিদ্রোহ, অঙ্গীকার,  প্রত্যয়, দৃঢ়তা সব কিছুই প্রকাশ পেয়েছে মিষ্টি সুরে রচিত এই গানগুলোর মধ্য দিয়ে। এর একটাই মূল কারণ—নতুন দেশ গড়ার অঙ্গীকার আর প্রত্যয় নিয়ে আমরা সবাই ওই সময় ঐক্যবদ্ধ ছিলাম।

বায়ান্ন'র ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ, বিজয়ের পর বিজয়ের গান—এ রকম প্রতিটা ক্ষেত্রে আমাদের সাহস ও শক্তির মূল উৎস ও জায়গাটি ছিল দেশের গান।  এই প্রেক্ষাপটে  বাংলা গানের সমৃদ্ধ ভাণ্ডারকে অনেক বেশি ঋদ্ধ করেছে দেশের গান। পৃথিবীর কোনও দেশে শুধু দেশ নিয়ে এত সুন্দর সুরারোপিত এত বেশি গান কখনও হয়নি বলে আমার ধারণা। এখন আমাদের অনেক টিভি-রেডিও চ্যানেল হয়েছে। প্রচারের মাধ্যমও বেড়েছে,  সব কিছু আরও বেশি আধুনিক হয়েছে কিন্তু দেশের গান সেই তুলনায় অনেক অনেক কমে গেছে। খুব অল্প সংখ্যক গান হচ্ছে হয়তো কিন্তু গানের বিষয় বা মানের দিক থেকে ততটা গভীরতা বহন করতে পারছে না। সেই তুলনায় অনেক প্রেমের গান হচ্ছে,  অনেক ধরনের চটুল প্রেমের গান হচ্ছে।  কিন্তু যারা প্রেমের গান লিখছেন, তারা হয়তো সেভাবে দেশের গান লিখতে অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন না।  কিন্তু প্রেমবোধ সত্যি বলতে দেশাত্ববোধেরই একটা অংশ বলে আমি মনে করি।  দেশাত্মবোধ না থাকলে আসলে প্রেমের কোনও অস্তিত্ব নেই।  নিজের দেশ,  নিজের মাটি, নিজের মানুষকে ভালোবাসতে না পারলে সত্যিকারের প্রেম কখনোই রচিত হবে না। তাই সবার আগে নিজের দেশকে, মাটিকে জানতে হবে।

এখন দেখা যায় শুধু  ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ, বা ২১ ফেব্রুয়ারির বিশেষ দিনগুলোয় অল্প কিছু গান রচিত হচ্ছে। বলা যায়, শুধু এই নির্দিষ্ট সময়গুলোয় দেশের গান রচনার প্রবণতা দেখা যায়, যা আসলে একেবারেই অপ্রতুল। তবু আশার কথা আমাদের তরুণ প্রজন্ম আবার নতুন করে এগিয়ে আসছে। তারা চেষ্টা করছে, কিছু কিছু গান হচ্ছে আবার নতুন করে। তবে তরুণ প্রজন্মকে আরও বেশি এগিয়ে আসতে হবে, দেশের গান নিয়ে আরও বেশি কাজ করতে হবে।

আমি মনে করি, জ্ঞান মূলত একটা চর্চার বিষয়। যতবেশি  চর্চা হয় জ্ঞানের পরিধি ততই বাড়ে। তরুণদেরও আরও বেশি জ্ঞান চর্চা বাড়াতে হবে, অনেক বেশি পড়তে হবে, জানতে হবে, দেশ সমাজ মানুষ নিয়ে কাজ করতে হবে। তবেই আমরা এগিয়ে যেতে পারবো। আর সঙ্গীত এমন এক সূক্ষ্ম বিষয় যা দিয়ে মানুষের কাছে বাণী পৌঁছানো সব চেয়ে সহজ। আর সুর এমন একটি বিষয় যা খুব দ্রুত এবং সহজেই মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারে। যেমন: ‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে’ গানটি মুক্তিযোদ্ধাদের ওই সময় যে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, তা কি করে ভুলি আমরা! যে গানগুলো একসময় এভাবে  আমাদের শক্তি, প্রেরণা যুগিয়েছে, আবার নতুন করে আরও নতুন নতুন দেশের গান রচিত হোক, সে গানগুলো আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে উঠুক, সেটাই তো প্রত্যাশা। যারা গান লিখছেন, তাদের অন্তত প্রতিটি প্রেমের গানের পাশাপাশি একটি করে দেশের গান লিখতে হবে। এভাবে আরও অনেক গান আমাদের সমৃদ্ধ গানের ভাণ্ডারে যুক্ত হবে। প্রচারের ব্যাপারেও আগ্রহ বাড়াতে হবে। চ্যানেল ও রেডিওগুলোতে দেশের গান,  অঞ্চলভিত্তিক দেশের গান, এসব গানের অনুষ্ঠান বাড়াতে হবে এবং নিয়মিত প্রচার করতে হবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের উচ্ছ্বাসে দেশ এগিয়ে যাক, ভাষা সমৃদ্ধ হোক, মায়া মমতা, মানবিকতায় বাংলাদেশ আরও সুন্দর থেকে আরও সমৃদ্ধ হোক, স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও একই দৃঢতায় মানুষ খুঁজে পাক, সেই দিন যে দিন ভালোবাসার, একতার কথা বলে। আবার নতুন করে এই প্রত্যাশা আমাদের সবার।

 

লেখক: সংগীত ব্যক্তিত্ব

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ