রায় ও রাজনীতি

Send
এরশাদুল আলম প্রিন্স
প্রকাশিত : ১৬:৫৬, মার্চ ০৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৮, মার্চ ০৩, ২০১৮

এরশাদুল আলম প্রিন্সজিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এখন কারাবন্দি। এদিকে বছর শেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে খালেদা জিয়ার এ রায়ের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক। সেই সঙ্গে বিএনপির জন্য এটি একটি টার্নিং পয়েন্ট। আসন্ন নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির ওপর এ রায় কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ৫ জানুয়ারির মতো জাতীয় নির্বাচন আর একটিও হয়নি। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ও পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর মাধ্যমে পরপর চারটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর অধীনে ২০০৮ সালের নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে তেমন প্রশ্ন নেই। নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-প্রক্রিয়া। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আর যাই হোক, অন্তত রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের চাকাটি চলমান থাকে। জবরদস্তিমূলক ও আনুষ্ঠানিকতা-সর্বস্ব নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা প্রকাশ পায় না। বরং জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাকে বৃদ্ধাঙ্গুলিই প্রদর্শন করা হয়।

২০১৪ সালের নির্বাচন আওয়ামী লীগের সে রকমই একটি রাজনৈতিক ‘ভুল’। তবে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি মতো আরেকটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করলে হিসাব ভিন্ন হতে পারতো। কিন্তু তারা ক্ষমতার শপথ পাঠ করে তা কতটুকু পালন করলো, এই নিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। আর বিএনপি নির্বাচনের মতো একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে রাজনীতির মাঠেও পিছিয়ে গেলো। ফলে, এবারের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির জন্য রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন।

বিএনপিও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এমন একটি বিতর্কিত নির্বাচন করেছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতোই ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’ রক্ষার অজুহাতেই ওই নির্বাচনটি করেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। কিন্তু আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে পরে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে বাধ্য হয়। বিএনপি সেই নির্বাচনের পর তাদের প্রতিশ্রুতি মতো সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করে। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি পরাজিতও হয়। বিএনপি ১৯৯৬ সালে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে যে ভুল করেছিল, ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সেই একই কাজ করলো। শুধু আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে যে দাবি আদায় করতে পেরেছিল, বিএনপি ২০১৪ সালে তা পারেনি। ২০১৪ সালে বিএনপি যা করতে পারেনি, ২০১৮ সালে তা করতে পারার সম্ভাবনাও দৃশ্যমান নয়।

এ অবস্থায় বিএনপি আবারও উভয় সংকটে। নেত্রীকে ছাড়া নির্বাচনে যাওয়া এক ধরনের রাজনৈতিক পরাজয়। কিন্তু নির্বাচনে না যাওয়া আরও বড় পরাজয়ের বার্তা নিয়ে আসবে। সেই সঙ্গে নির্বাচন সুষ্ঠু হোক না হোক, বিএনপি পরাজিত হলে তা দলটির জন্য আরও প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে। কারণ, আপিলে খালেদা জিয়ার সাজা (কিছুর কমার পরেও) বহাল থাকলে তার কারাজীবন আরও দীর্ঘ হবে। তার বিরুদ্ধে আরও ৩৪টি মামলা বিচারাধীন। তারেক রহমানের ওপরও সাজা বহাল আছে। অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে বিএনপি নেতা-কর্মীশূন্য। প্রায় সবাই জেল-হাজতে। যে দুই-চারজন বাইরে আছেন, তারা কোনোমতে আওয়ামী লীগ-পুলিশ-প্রশাসন ‘ম্যানেজ করে’ আজ এখানে তো কাল ওখানে করে টিকে আছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আপাতত ঐক্যবদ্ধ বলেই মনে হয়। তবে আগামী নির্বাচনে পরাজিত হলে খালেদা-তারেকের অনুপস্থিতে সে ঐক্যকে দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা সহজ হবে বলে মনে হয় না।

বিএনপির বর্তমান যে হাল, তা আমাদের বিদ্যমান প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতিরই ফল। একপক্ষ যেভাবেই হোক গদিতে বসতে হবে, আরেক পক্ষ যেভাবেই হোক গদি থেকে নামা যাবে না—এই গদিসর্বস্ব রাজনীতিতে গণতন্ত্র ও জনগণের শাসন নেহায়েত কথার কথা মাত্র।

গদিরক্ষার মহাযজ্ঞে এখানে পাইক, পেয়াদা, লস্কর, নবরত্ন, ‍উজির, নাজির, কাজি, হাজি—সবই ব্যবহৃত হয়। ফলে, কোনও কিছুই আর রাজনীতির বাইরে নেই। মামলা মোকাদ্দমাও রাজনীতির বাইরে না। ২ কোটি ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকার দুর্নীতি বিচারের মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ন্যায়বিচারের নজির স্থাপিত হয়েছে। এতে জনগণ খুশি। কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকা গায়েবের গায়েবানা বিচার হলেও জনগণ অখুশি হতো না।

রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা নতুন কিছু নয়। ক্ষমতা থেকে সটকে গেলে প্রথমেই ক্ষমতাহীনদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতারা কেউ মামলা থেকে রেহাই পান না। আর ক্ষমতাসীনরা তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো উঠিয়ে নেন। রাজনৈতিক মামলার এ দুষ্টচক্র চলতেই থাকে।

দুর্নীতির বিচার করতে চাইলে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিচার আগে হতো। আদালতের কার্যতালিকায় খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার স্থান অনেক পরেই হওয়ার কথা—অন্তত মামলার মূল্যমান বিচারে। কিন্তু রাজনৈতিক মামলার আর্থিক মূল্যের চেয়ে রাজনৈতিক মূল্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, খালেদা জিয়ার আমলেও এরকম মামলা হয়েছে। সেদিন খালেদা বাদী আর এরশাদ আসামি। তখন এরশাদকে গ্রেফতার করা হলো অবৈধ অস্ত্র রাখার অপরাধে। এছাড়া বিভিন্ন অপরাধে আরও মামলা হলো। সাজাও হলো। কিন্তু অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের বিচার হলো না, মঞ্জুর হত্যা মামলার কোনও অগ্রগতি হলো না। এরশাদের দুর্নীতির বিচার হয়েছে, না রাজনীতির বিচার হয়েছে, তা আমাদের জানা নাই। কিন্তু এরশাদ জেল খেটেছেন। এখনও ফোঁস-ফাঁস করলে মামলার নথিপত্র নাড়া চাড়ার খবর চাউর হয়। এটাই এরশাদের সবচেয়ে বড় শাস্তি। বিশ্বে এরশাদই মনে হয় একমাত্র স্বৈরশাসক, যিনি ক্ষমতা ছাড়ার পরও রাজনীতিতে বহাল আছেন। শুধু তাই নয়, দুধেভাতে আছেন। কারণ, রাজনীতিই এখানে মুখ্য।

রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা করার ফলে তাদের আসল দুর্নীতি ও অপরাধ ঢাকা পড়ে যায়। বড় বড় দুর্নীতি ও অপরাধের তদন্তও ঠিকমতো হয় না। হয়তো জেনেবুঝেই সাগর চুরি বাদ রেখে পুকুর চুরির অপরাধের বিচার করা হয়। কারণ, আজকের বাদীই আগামী দিনের বিবাদী। উদ্দেশ্যটি যেহেতু রাজনৈতিক, সেহেতু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলই বড় কথা। নির্বাচনের অযোগ্য বা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে ছোটখাটো মামলাই যথেষ্ট, বড় অপরাধের বিচার করে আর কী হবে!

তবে এ রকম মামলা আওয়ামী লীগ, তার আগে বিএনপি, তারও আগে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানও করেছেন। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কাছে থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদটি  নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদকে গ্রেফতার করান। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করা হয়, পাঁচ বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে তিনি অবশ্য আপিল করে খালাস পান। কিন্তু বঙ্গবন্ধু খুনের প্রধান ইন্ধনদাতা ও ষড়যন্ত্রকারী খন্দকার মোশতাকের আসল বিচার হলো না, হলো তার দুর্নীতির বিচার, এরশাদের আসল বিচার হলো না, হলো তার অস্ত্ররাখা বা জনতা টাওয়ারের বিচার! কারণ, দুর্নীতি দমন বা দুষ্টের দমন বড় কথা নয়, বড় কথা হলো ক্ষমতা ও শাসন।

আইন তার আপন গতিতে চলছে, চলবে। রায় নিয়ে বিএনপি যতই রাজনীতি করুক বা আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করুক, ক্ষমতার অপব্যবহার যে হয়েছে, তা খণ্ডাতে পারেনি। বর্তমান রায়ের রাজনীতির সুফল যারাই পাক, ভবিষ্যতের রাজনীতির কোনদিকে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: আইনজীবী ও কলামিস্ট

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ