বাংলাদেশের শরীরে ২৬টি সেলাই

Send
বিধান রিবেরু
প্রকাশিত : ১৪:৩৩, মার্চ ০৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৯, মার্চ ০৪, ২০১৮

বিধান রিবেরু২৬টি সেলাই কি মুহম্মদ জাফর ইকবালের শরীরে পড়ছিলো, না—বাংলাদেশে যারা অসাম্প্রদায়িকতা, প্রগতি ও আধুনিক শিক্ষার পক্ষে কথা বলেন, লেখালেখি করেন—তাদের মুখে পড়ছিলো? এটাই কি তবে কারণ পেছন থেকে জাফর ইকবালকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করার?
এই ধরনের হামলা, ভাবাদর্শের জায়গা থেকে, ১৯৭১ সালে আমরা দেখেছি, এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন শামসুর রাহমান ও হুমায়ুন আজাদের মতো লেখকরা। এরপর একে একে লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের ওপর এই ধারার নৃশংস হামলা ও হত্যা ঘটনার সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ যোগ হলেন দেশের জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এর দায় কি আমাদেরই প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ এড়াতে পারে? স্বাধীনতার পর থেকেই কি আমরা অবিরত মুখে এক, কাজে আরেক করে চলিনি? দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরেই কি আমরা ভূখণ্ডের অপরাপর মানুষের কথা চিন্তা ব্যতিরেকে একটি ধর্মকে রাষ্ট্র ও সংবিধানের সর্বোচ্চ সম্মানের আসন দিয়ে ধর্মান্ধতাকে পরিচর্যার সকল অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেইনি? দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে অগণতান্ত্রিক সকল কর্মকাণ্ড করে, মানুষে মানুষে নানা মাত্রিক বৈষম্যের সাগর তৈরি করে এই উগ্রবাদ চর্চার পথ প্রশস্ত করিনি? দিনের পর দিন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে কি নানা উসিলায় সমর্থন দিয়ে,তাদের কৃতকর্মের প্রতি উদাসীন থেকে তাদের আরও সংগঠিত করার মওকা দেইনি?

আজ জাফর ইকবাল যখন ২৬ সেলাইয়ে বিদ্ধ হচ্ছেন,তখন সেজন্যই গত পাঁচ দশকের ভুল থেকে জন্ম নেওয়া প্রজন্মেরা উল্লাস প্রকাশ করছেন, আফসোস করছেন কেন তিনি মারা গেলেন না, হামলাকারীকে দিয়ে দিচ্ছেন বীরের খেতাব। ধীরে ধীরে জমতে থাকা আমাদের ভুলের খেসারত হিসেবেই আমাদেরই জমিনের তলে জমে উঠেছে একদল হন্তারক, যারা রাজ্যের অন্ধকার বুকে ধারণ করে অবিরত শিখে যাচ্ছে ‘কতল করতে হবে’, কাকে ও কেন, সেসব প্রশ্নের উত্তরও তাদের এই দীর্ঘসময় ধরে শেখানো হয়েছে তোতা পাখির মতো। পাখির বুলি বিশুদ্ধ যে অন্ধকারে থাকা বাসিন্দারাই মুখস্থ করেছে তা নয় ঠোটস্থ করেছে আলোয় থাকা অনেকেই। তাই তো জাফর ইকবাল আক্রান্ত হওয়ার পর বলতে শোনা যায়, হামলাকারীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা যদি জায়েজ হয়, তাহলে জাফর ইকবালকে মারাও জায়েজ। এ ধরনের মন্তব্য দিয়ে তারা হামলাটিকেই যে সমর্থন করছে সেটা তো আর কারও বুঝতে বাকি থাকে না। কারণ, হয় তারা ‘টার্গেট কিলিং’ ও ‘পাবলিক লিঞ্চিং’কে গুলিয়ে ফেলছেন, নয় তো তারা সেই অন্ধকারেরই পূজারি। এমন পূজারিদের সংখ্যা দেখবেন থৈথৈ করছে বিভিন্ন নিউজপোর্টালের শেয়ার করা নিউজের নিচে, মন্তব্যের ঘরে। এরা কি অন্য গ্রহের বাসিন্দা? তা তো নয়। এরা তো তারাই,যারা আমাদেরই আশ্রয়, প্রশ্রয় ও ভুলে বেড়ে উঠেছে।

জাফর ইকবালকে যে তরুণ হামলা করেছেন তার নাম—জাফর ইকবালের বাবার নামেই— ফয়জুর রহমান, জাফর ইকবালের বাবার নামও ছিল ফয়জুর রহমান, তিনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। নামের এই কাকতালীয় মিল থেকে একটা বিষয় কিন্তু ঠিকঠিকই সামনে চলে আসে, তা হলো—মুক্তিযোদ্ধা নয়, ভিন্ন প্রজন্মে একই নামের আরেকটি মানুষ হয়ে উঠছে জঙ্গি। তারা মুক্তিযুদ্ধের যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা সেটিকে আর ধারণ করে না। এদের চিহ্নিত করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ করি অধিকাংশ সময়, প্রকাশ করি রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণা, তাতে তথাকথিত জঙ্গিদের কার্যকলাপ কিন্তু থেমে নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে এই যে বেপথু উল্লম্ফন, সেটা কাদের জন্য হলো? আমরাই কি এর জন্য দায়ী নই? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রির নামে অন্ধকারের শক্তির সঙ্গে সওদা কি হয়নি? যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে রাজনীতি-নির্বাচন-জনপ্রিয়তা ইত্যাদির জন্য আপস হয়নি? এসব হচ্ছে লাগাতার।

কেউ কখনও ভাবেনি চিন্তার মুক্তি ঘটাতে হলে, অন্ধকার এলাকাকে আলোকিত করতে হলে কোন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলন করতে হবে; কেউ ভাবেনি গোটা দেশে বৈষম্য বাড়লে বাড়বে অন্ধকারের শক্তি, ভাবেনি তা ঠিক নয়, ভাবতে চায়নি। চাইলে যে নগদ পাওয়া সেটা হাতছাড়া হয়। তাই আপস করতে করতে ক্ষয়ে যাওয়া, দুর্বল শাসকদের ঘাড়ে এখন নিঃশ্বাস ফেলছে সেই অপয়া শক্তি, যাদের বেড়ে উঠতে দেওয়া হয়েছে। মুক্তচিন্তার বিকল্প শক্তি তো দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি, উপরন্তু নিজেদের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীলতার মোড়কে মুড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। সেই অপশক্তি জানে তারা যুক্তি ও জ্ঞানের আলো দিয়ে লড়াইটা চালাতে পারবে না, এমনিতে সৎ শাসক থাকলে এমন সাহস তাদের হতো না, যেহেতু রাষ্ট্রের পরতে পরতে অসততা, চলছে দুর্নীতি আর শিষ্টের দমন, তাই তাদের জন্য মাথাচাড়া দেওয়া সহজ থেকে সহজতর হচ্ছে। এজন্যই সামনে থেকে না হোক, পেছন থেকে ঠিকই কোপ পড়ছে, জাফর ইকবালের ওপর নয়, বাংলাদেশের মাথায়, সেই বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশে একদিন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো।

একটি দেশে বিরামহীনভাবে গুম, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ ঘটেই চলেছে, কোন কিছুরই সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না, সেই দেশে অপশক্তি মাথায় ওঠে বসবেই, তারই নমুনা হাজির হচ্ছে নিয়মিত বিরতিতে। এদেশের বুদ্ধিজীবীদের একাংশও এটার জন্য দায়ী। অভিজিৎ রায় যখন খুন হন, তখন ফরহাদ মজহারের মতো মানুষেরা নিবন্ধ লিখেছেন ‘বিজ্ঞান চাই, বিজ্ঞানবাদিতা চাই না’, সেখানে তিনি অভিজিতকে হত্যার সপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ‘অতি বুদ্ধির গলায় দড়ি’। কী নির্মম! এই একই লোক যখন ‘অপহৃত’ হন, তখন অন্ধকারের কোনও শক্তি তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেনি। অথচ তিনি কতই না সাফাই গেয়েছেন অন্ধকারের পক্ষে। আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে, জেএমবির সারাদেশে বোমা হামলার পর মজহার তাদের সমর্থনে বলেছিলেন, ‘১৭ই আগস্টের জেএমবির বোমা হামলাকারীরা যদি সন্ত্রাসী হয়, তাহলে ’৭১-এর মুক্তিযোদ্ধারাও সন্ত্রাসী!’ তাহলে বলুন, ফরহাদ মজহারের মতো একদা কার্ল মার্ক্স চর্চাকারী যদি এই বয়ান দেন তাহলে সেই দেশে অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে কি দেরি হয়? চিহ্নিত রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে তার ওকালতির কথাও সকলে জানেন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কূপমণ্ডূকতা থেকে রেহাই দেওয়ার যে ব্রত,সে ব্রত এসব বিকল বুদ্ধিজীবী, স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদ, রাজনীতিবিমুখ কর্মজীবী কেউই চিন্তা করেনি, করছে না। করবে কি না সেটাও পরিষ্কার নয়। বুদ্ধিজীবী হিসেবে আপনার নির্দিষ্ট মত ও ভাবাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু সমাজ কেবল এ ধরনের অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল দিয়ে চলে না। আমাদের সমস্যা হলো সকলেই দল ও মতের আপন বুদ্ধিজীবীতে পরিণত হয়েছে। পর বুদ্ধিজীবী, অর্থাৎ ট্রাডিশনাল বুদ্ধিজীবী আজ নেই বললেই চলে। তাই অন্ধকারের অপশক্তি বেড়ে উঠছে তরতর করে। আর এক এক করে সেলাই পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। যেন কেউ মুখ শুধু নয়, চোখ ও কানও বন্ধ করে দিতে চাইছে।

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, জাফর ইকবালকে হামলাকারী ফয়জুর রহমান কম্পিউটারের দোকানে কাজ করতেন, তার লেখাপড়া মাদ্রাসায়, তার বাবা আতিকুর রহমান একজন মাদ্রাসার শিক্ষক। এই মাদ্রাসায় কি ধরনের শিক্ষা দেয়া হয় সেটার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাদের জাতীয়সংগীত বিদ্বেষ থেকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ এখানে যেমন ব্রাত্য, তেমনি সঙ্কটাপূর্ণ ইংরেজি মাধ্যমেও। বাংলা মাধ্যমেও কি পরিকল্পিত কিছু আছে? কাজেই শিক্ষায় মনোযোগ দিন, সময় আর নেই।

আরেকটি বিষয় বলে এই লেখা শেষ করছি, সেটা হলো হামলার আগে তোলা এক ছবিতে দেখা যায় হামলকারী দাঁড়িয়ে, দুই হাত দূরেই তিন পুলিশ হাজির আছেন। তাদের দুজন আবার মোবাইল ফোন দেখায় ব্যস্ত। অথচ তাদের দায়িত্ব ছিলো জাফর ইকবালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেটা যদি তারা করতে পারতেন তাহলে ২৬টি সেলাই পড়তো না জাফর ইকবালের শরীরে। পুলিশ প্রকৃতপক্ষে কোথায় সফল হচ্ছে? হচ্ছে কি আদৌ? না কি তারাও সেলাই হয়ে আছেন আগে থেকেই?

লেখক: প্রাবন্ধিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ