কিছু প্রশ্ন কিছু উত্তর এবং নারী

Send
ফাহমিদা নবী
প্রকাশিত : ১২:৫৫, মার্চ ১০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০২, মার্চ ১০, ২০১৮

ফাহমিদা নবীগত ৮ মার্চ পালিত হলো বিশ্ব নারী দিবস। এ দিনটিজুড়ে বিশ্বব্যাপী ছিল নারীদের নিয়ে নানান আয়োজন। এরমধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, গান, কবিতা, আলোচনা, সভা ইত্যাদি। সে আয়োজনকে ঘিরে কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর জমা হয়েছে মনের ঝুড়িতে, যা প্রত্যেক নারীমনের অবচেতন স্তরেরই একটা প্রশ্ন। সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বারবার নারীকে কখনও পিছিয়ে যেতে, কখনও বা সামনে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে বা আবার কখনও একেবারে নীরবতায় নিজেকে আগলে নিয়ে চলতে থাকে।
২০১৮ সালে এসে এ বিশ্বায়নের যুগে নারীর ভাবনা কী:
জীবনের চার অধ্যায়ের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে নারীকে এগিয়ে যেতে হয়। নারী কখনও মা, কখনও প্রেমিকা, কখনও স্ত্রী, কখনও মেয়ে। তারা কী ভাবছে। আমি চার অধ্যায়ের চার জনের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রথম অধ্যায়ের গল্পটা বলি। শুরু করি শেষের অধ্যায় থেকে। একজন পঁচাত্তরোর্ধ নারীকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি একা থাকেন কেন? সহজ উত্তর: অনেক দেখেছি, অনেক শিখেছি, অনেক সংগ্রাম করেছি। কিসের আশায় জানো? একদিন ভালো থাকবো বলে। কিন্তু দিন শেষে দেখি, পুরো জীবনটাই আসলে সংগ্রামের। বর্তমানে তিনি প্রত্যাশার জায়গা ছেড়ে দিয়ে শুধু কিছু করে যাওয়ারই স্বপ্ন এবং বাস্তবতাকে এক করে চলছেন। দুঃখ করার মতো কোনও জায়গাই এখন আর তার কাছে নেই। এখানেই তিনি আজ একজন স্বাবলম্বী নারী।
তারপর কথা বললাম সেই বয়সের নারীর সঙ্গে যিনি পঁয়তাল্লিশ ছুঁই ছুঁই। তার কাছে জানতে চাইলাম নারী হিসেবে তার অর্জন কী। তিনি হেসে উত্তর দিলেন, বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া ছাড়া জীবনকে সুন্দর করা যায় না। আমি অনেক মনের পাহাড় ভেঙে ফেলেছি। জীবনে চড়াইউৎরাই পার করেছি, সব কিছু গুছিয়ে উঠে  যখন এক কাপ চা খেতে চাই, তখনই নতুন একটা সমস্যার সমাধানে ছুটতে হয়। আমার মনে হয়, এই ছুটে চলাটাই আমার একটা অর্জন, যা আমাকে গড়তে শেখায়, ভাঙতে নয়। আমি আর এখন ভেঙে পড়ি না, অভিজ্ঞতা আমাকে তাই প্রতিদিন শেখায়।

একজন তরুণী, ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ তার বয়স হবে হয়তো, চোখে তার অনেক স্বপ্ন। তার বিশ্বাসের গল্পটায় প্রজাপতির পাখাটা এখন আর আলতো নরম নেই। সে পাখায় সে এখন পাথর নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সংসার হয়নি এবং কেন হয়নি সে উত্তর এখন আর খোঁজে না সে। কারণ তার উত্তর খোঁজার সময় নেই। তাকে প্রতিনিয়ত পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত, সব জায়গায় অনেক রকম মানুষের মানসিকতাকে মোকাবিলা করতে হয়। এখন তার আর নিজেকে দেখার সময় নেই। হাসিমুখে জীবনকে দেখাই তার কাজ।  

ফুলের মতো প্রস্ফূটিত যে মন, বিশ্বাস যার প্রতিদিনের আশ্বাস, সেই পঁচিশ বছরের মেয়ে তার চোখেও বিশ্বাস ভাঙার ছায়া। তার কাছে প্রতি মুহূর্তের উত্তর, প্রশ্নই ওঠে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী প্রশ্নই ওঠে না। সে বললো, কোনও ভুল করতে চাই না। নিজের পায়ে দাঁড় করার মতো একজন শক্তিশালী মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলাটাই এখন আমার স্বপ্ন। আমার কাছে প্রেম আর পরিণতি দুটোরই একই ব্যাখ্যা। সবটাই এখন পারস্পরিক। তুমি ঠিক যতটা আমাকে দেবে, আমি ঠিক ততটাই তোমাকে দেবো। আমি এই দর্শনেই এখন বিশ্বাসী। একমাত্র আদরের সন্তান হিসেবে আমার পুরো উত্তরাধিকার বুঝে নিতে এখন আমি প্রস্তুত। আমাকে কেউ কোনোভাবেই দুর্বল ভাবতে পারবে না। আমি সবলের দলে। দুর্বলতা আমার জন্য নয়। আমি নারী। আমি আমাকে ভালোবাসি।

একজন সর্বজয়া মানুষ তথা নারী ভালোবাসতে জানে, বেদনা সহ্য করতে জানে, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোদুল্যমানতায় সে নিজের আয়নায় নিজেকে এখন আর দেখতে চায় না। নিজেকে ভালোবাসতে চায়, কারণ নিজেকে ভালোবাসলে পুরো জগৎ সংসারটা সমঝোতায়, অনুভবে, প্রেমে, আর্থিক সচ্ছ্লতায় একজন বাস্তববাদী ও আবেগময় নারীর পরিপূর্ণতায় গড়ে তোলা যায়। নারীর ভেতরের যে মমতা, তাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। একজন নারী হিসেবে প্রত্যেক নারীর সঙ্গে যখন আমি কথা বলেছি, তখন তাদের সবার চোখেই সেই মমতার অশ্রু দেখতে পেয়েছি। নারী বাঁচতে চায় স্বস্তিতে। নারীর জয় হোক।

লেখক: সংগীত ব্যক্তিত্ব

 

/এসএএস/ এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ