বাংলা ট্রিবিউনের কাছে দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করি

Send
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
প্রকাশিত : ২৩:৫৫, মে ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০১, মে ১৩, ২০১৮

মুহম্মদ জাফর ইকবালআমার ধারণা, কাগজে ছাপানো সংবাদপত্র কিছুদিনের মধ্যেই উঠে যাবে।  এক টুকরো কাগজ মানে, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একটা গাছ কাটা হয়েছে! যদি কাগজ ব্যবহার না করেই কাজটুকু করা যায়, তাহলে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একটা গাছ বাঁচানো সম্ভব! কাজেই আমি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন সাংবাদিকতার পক্ষে।  একইসঙ্গে ধরে নিচ্ছি, কাগজে ছাপানো সংবাদপত্র যেভাবে সাংবাদিকতার রীতিনীতি মেনে চলে, অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোও সাংবাদিকতার সেই নীতিমালা মেনে চলবে।  দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।
প্রায় দেখা যায়, কোনও একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো হয়।  তেমনি সম্প্রতি আমার ওপর হামলার ঘটনায়ও এমন বিদ্বেষ ছড়ানোর খবর পাওয়া গেছে।  ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধে ঘৃণার বার্তা ছড়ানো নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই।  আমি মানুষের কাছ থেকে যত ভালোবাসা পেয়েছি, তাতে আমার আর চাওয়ার কিছু নেই।  তবে এসব দেখে মনে হয়, আমরা ধীরে ধীরে সভ্য মানুষের মতো আচরণ করা শিখেছি।  কোনও কিছু অপছন্দ হলেও সেটা সরাসরি বলি না, ভদ্রতার একটা আচরণ করি।  ফেসবুক বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কে তার প্রয়োজন হয় না, সেখানে ঘৃণা ছড়িয়ে যদি বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, সেটাকে উৎসাহিত করা হয়।  কাজেই আমার ধারণা ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করার উপায় নেই।  সেটা বন্ধ করার ব্যাপারেও কারও আগ্রহ নেই।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া ও বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়গুলো আমি খুব অপছন্দ করি।  খুবই শান্ত-শিষ্ট-নিরীহ ও ভদ্র একটি ছেলে বা মেয়ে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক কিংবা ফেসবুকে ভয়ঙ্কর হিংস্র আচরণ করে বসে।  আমি অনেকবার এ ধরনের বিষয় ঘটতে দেখেছি।  আমার ধারণা মানুষের জন্ম হয়েছে, পরস্পরের সামনা-সামনি কথা বলার জন্যে।  ভাব বিনিময় করার জন্য।  পুরোপুরি স্বাভাবিক একজন মানুষ যখন সোশ্যাল নেটওয়ার্কে সাইবার জগতের আড়ালে কাজ করে, তখন তার সত্যিকারের পূর্ণাঙ্গ মানুষের রূপটি দেখা যায় না।  কাজেই সেখানে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজটি খুব সহজ হবে, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে?

এ বিষয়ে আমার একটি পর্যবেক্ষণ আছে।  তা হলো: যারা ফেসবুক করে, তাদের দু’টি জিনিস জানা দরকার।  প্রথমত, তারা ফেসবুকে নিজের সময় নষ্ট করে জাকারবার্গকে টাকা কামাই করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।  দ্বিতীয়ত, জাকারবার্গকে একসময়ে পৃথিবীর ইতিহাস একটি প্রজন্মের সর্বনাশ করার জন্য দায়ী করা হবে!

সম্প্রতি আমার ওপর যে হামলা হয়েছে, সেই ঘটনাকে আমার একবারও ‘বড় রকমের ধকল’ মনে হয়নি! বরং সবাই আমার জন্য এত ভালোবাসা দেখিয়েছে যে, আমি অভিভূত হয়েছিলাম, হয়ে আছি; ভবিষ্যতেও থাকব।  ডাক্তারদের পরামর্শে বাসায় থাকতে হয়েছিল।  তাই আমার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছি।  যা এ ঘটনার আগে শেষবার কবে ঘটেছে, মনে করতে পারি না।  তাই এক অর্থে বলা যায়, পুরো ব্যাপারটা আমার ভেতরে বিন্দুমাত্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।  বেশকিছু কোর্স পড়াচ্ছিলাম।  সহকর্মীরা সাহায্য করেছে।  আমি নিজে বাড়তি ক্লাস নিয়ে সব শেষ করতে পেরেছি।  তাই সেগুলো নিয়েও কোনও অপরাধবোধ নেই।

আমার ওপর এই হামলার ঘটনাটায় কেউ কেউ হয়তো মৌলবাদের উত্থান হচ্ছে মনে করতে পারেন।  কিন্তু আমি এতে মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে, তেমনটি মনে করি না। আমি বিষয়টিকে বিভ্রান্ত মানুষের  কাজ মনে করি।  সামগ্রিকভাবে যে মৌলবাদের উত্থান হয়েছে, সেটি শুধু আমাদের দেশে হয়নি, সারা পৃথিবীতেই হয়েছে।  পুরো পৃথিবীর ইতিহাস যদি কেউ খুঁটিয়ে দেখে, তাহলে দেখবে মৌলবাদের এই উত্থানটি আসলে খুব যত্ন করে তৈরি করা হয়েছে।  যাদের ব্যবহার করা হচ্ছে, তারা জানেই না, কীভাবে তারা নিজেদের, নিজের দেশের ও নিজের মানুষদের সর্বনাশ করে যাচ্ছে।  আশা করে আছি, কখনও হয়তো তারা এটা টের পাবে এবং তখন লেখাপড়া সুবুদ্ধির চর্চা, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সহমর্মিতা, বিজ্ঞান মনস্কতার মতো ব্যাপারগুলোর গুরুত্ব টের পাবে।

এ ধরনের হামলা বা জঙ্গি কর্মকাণ্ড ঠেকানোর জন্য জনমত গঠনে গণমাধ্যম বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।  তবে আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে বিশেষ কিছু জানি না, সেটি দিয়ে কতটুকু কী করা যায়, তা আমার জানা নেই।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দিয়ে পৃথিবীতে খুব বড় কোনও কাজ হয়েছে বলেও আমার জানা নেই।  তবে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এ রকম উদাহরণ অনেক আছে।

কথাগুলো মনে হলো, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের চতুর্থ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে কিছু কথা বলতে গিয়ে।  একটি দায়িত্বশীল সংবাদ মাধ্যমের কাছে আমার যে প্রত্যাশা, বাংলা ট্রিবিউন নিয়েও সেই একই প্রত্যাশা– নিউজ পোর্টালটি যেন ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝখানে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা কখনোই না করে।  পত্রিকাটির কাছে দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করি। 

 

লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযু্ক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

/এমএনএইচ/এমওএফ/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ