বাংলাদেশ কতটা ‘ভালো দেশ’

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১৭:৪০, মে ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৩, মে ১৩, ২০১৮

মাসুদা ভাট্টিপৃথিবীটাকে কেমন দেখতে চাই? এই প্রশ্ন নিয়ে সর্বত্র পণ্ডিতদের তর্ক-বিতর্ক চলছে এবং মোটা দাগে সবাই একমত, এ পৃথিবীর সকল নাগরিক সুখে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারলে তবেই তারা স্বস্তি পাবেন। আমি নিজেও পৃথিবী নিয়ে ভাবতে গিয়ে মৌলিক যে প্রশ্নটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায় তা হলো,পৃথিবী কি কখনো কোনও দিন সম্পূর্ণ শান্তি অর্থাৎ যুদ্ধ-রোগ-দারিদ্র্য-ক্ষুধা ইত্যাদি নেতিবাচক প্রপঞ্চমুক্ত হতে পারবে? এই প্রশ্নে তাড়িত হয়ে অনবরত খুঁজতে থাকি এ সম্পর্কিত কোনও বিশেষজ্ঞের লেখা বই, কিংবা কোনও নির্দিষ্ট দেশ বা জাতি নয়, সমগ্র মানব জাতি বা পৃথিবী নিয়ে ভাবে বা কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করি। হঠাৎ একদিন পেয়ে যাই এরকম একটি প্রতিষ্ঠান, যারা মনে করে পৃথিবী একক কোনও দেশ, জাতি বা পক্ষের নয়, পৃথিবীর সকলে সকলের সঙ্গে জড়িত।
নব্বইয়ের দশক থেকে যখন পৃথিবীকে একটি ‘গ্রাম’ কল্পনা করে বনায়ন বা গ্লোবালাইজেশন-জাতীয় শব্দবদ্ধ দিয়ে পৃথিবীময় একটি আশার প্রবাহ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা  ১০-১২ বছর যেতে না যেতেই কেন এক স্বপ্নভঙ্গের বেদনার মতো আমাদের সামনে দৃশ্যমান হতে থাকে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানান্তে একক সুপার পাওয়ার পৃথিবীকে নিয়ে পিং পং খেলতে শুরু করলে নতুন সুপার পাওয়ারের পদধ্বনি শোনা যায় এবং এই মুহূর্তে তো পৃথিবীর বাস্তবতা হলো, কে কত বেশি ক্ষমতা প্রদর্শন করে বাজার দখল করতে পারে এবং ক্ষুদ্র দেশ ও জাতিসত্তাগুলোকে কে কতটা চাপে রেখে নিজেদের বৃহদাকার ও শক্তিময়তাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং এ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কে কতটা এগিয়ে আছে তা প্রমাণ করাটাই ‘বিগ ব্রাদার রাষ্ট্রসমূহে’র প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমতাবস্থায় একটি প্রতিষ্ঠান যে পৃথিবীর দেশে দেশে আন্তসম্পর্কের ভিত্তিকে প্রাধান্য দিয়ে একটি নতুন ‘ইনডেক্স’ বা সূচক নিয়ে ভাবতে পারে তা আমাকে অবাক করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির নাম গুড কান্ট্রি বা ভালো দেশ। তারা বলতে চায় যে তথাকথিত গ্লোবালাইজেশন বা বনায়নের কারণে পৃথিবীতে জলবায়ুজনিত পরিবেশ বদল,সন্ত্রাসবাদ,জোরপূর্বক অভিবাসন,মানবপাচার বা অর্থনৈতিক-প্রলয়ের মতো ঘটনা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। তথ্য প্রযুক্তি আর বিমানযাত্রার সুবিধা পৃথিবীকে কাছাকাছি নিয়ে এলেও এসব সমস্যার সমাধান তো হচ্ছেই না, বরং বাড়তি বিপদ যোগ হয়েছে। যেমন,কোনও এক পাগল চাইলেই সন্ত্রাসবাদের নামে শত শত মানুষকে মেরে ফেলতে পারে বা চালাতে পারে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন; কোনও ব্যক্তি একটি ল্যাপটপ থেকেই পৃথিবীকে বা নিদেন কোনও একটি দেশের পাওয়ার গ্রিড বা বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনকে বিঘ্নিত করে পৃথিবীকে অন্ধকারে রাখতে পারে; কিংবা ধরুন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোনও ব্যাংক চাইলেই রাতারাতি পৃথিবীর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিরাট ধস নামিয়ে আনতে পারে। এই সমস্যাগুলো বিশাল এবং কোনও একটি মাত্র দেশের পক্ষে এগুলো সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই একা একা জলবায়ুজনিত সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, ইতালি চাইলেই অভিবাসন সমস্যার সমাধান আনতে পারবে না কিংবা মেক্সিকো পারবে না পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়া মাদক সমস্যাকে রুখতে। এ জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত পদক্ষেপ, পৃথিবীকে সঠিকভাবে কাজ করাতে চাইলে এই সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। কিন্তু কেন আমরা একত্রে এরকম কোনও প্রয়াসে সকলে এগিয়ে আসতে পারি না? কারণ এই মুহূর্তে পৃথিবীতে যে সাত বিলিয়ন মানুষ বাস করে তারা বিভক্ত ২০০ ‘ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী’ বা যাকে আমরা ঘটা করে ‘নেশন’ বা জাতি বলে থাকি। এবং প্রত্যেক জাতিই আলাদা আলাদাভাবে একটি সরকার দ্বারা শাসিত যারা কেবল নিজেদের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সুখ ও সমৃদ্ধি নিয়েই চিন্তিত। তারা অন্য কোনও কম-উন্নত, দরিদ্র, দুর্বল ও কম সমৃদ্ধ জাতি নিয়ে ভাবে না বা ভাববার প্রয়োজন বোধ করে না, প্রত্যেকে প্রত্যেককে ভাবে ‘ফরেনার’ বা বিদেশি; আর বিদেশিরা ভোটার নয়, আমাদের সকলের চিন্তা সংশ্লিষ্ট দেশের ভোটারদের নিয়েই। গণতন্ত্রের মতো সু-প্রসিদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থা যাতে দাবি করা হয় যে, সবকিছু জনগণের জন্য,তার অন্তর্নিহিত সবচেয়ে বড় ত্রুটিই এখানেই। গণতন্ত্র রাষ্ট্র বা জাতিকে স্বার্থপর হতে শেখায়, নিজেদের সুখ-সমৃদ্ধি-উন্নয়ন নিয়েই পড়ে থাকতে শেখায়, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে গণতন্ত্রের মাথাব্যথা কম বা নেই বললেই চলে।

এই অবস্থা থেকে কি উত্তোরণ সম্ভব? গুডকান্ট্রি বা ভালো দেশ মনে করে যে অবশ্যই সম্ভব। এই পরিবর্তন তখনই সম্ভব যখন একটি ‘ভালো দেশ’ নিজেদের প্রতিযোগিতাপ্রবণ রেখেও অন্য দেশের জন্য ভালো কিছু কাজ করে যেতে পারে। ইতোমধ্যেই পৃথিবীর ৭০০ মিলিয়ন মানুষ ‘ভালো দেশ’-এর নাগরিক হতে ইচ্ছুক, যারা অন্য দেশকে কেবল বাজার হিসেবে নয়, অন্য দেশকেও সমকক্ষ না হোক অন্তত মানবীয় মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে পারবেন। ইতোমধ্যেই একটি তালিকা প্রণীত হয়েছে, নির্ধারিত হয়েছে কিছু সূচক, যার দ্বারা একটি ‘ভালো দেশ’ নির্ধারণ করা যায়। পাঠকের উদ্দেশ্যে এখানেই একটি তথ্য জানিয়ে রাখি, ভালো দেশের তালিকায় সর্বপ্রথম নামটি হচ্ছে নেদারল্যান্ডের এবং সবশেষ নামটি হচ্ছে আফগানিস্তান (১৬৩)। আর এর মধ্যে তালিকায় ১০৭তম দেশটির নাম বাংলাদেশ, যেখানে ভারত রয়েছে ৫৯তম স্থানে আর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি রয়েছে ১২৩তম অবস্থানে। জাতিসংঘের সরবরাহকৃত বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে এই অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে কিন্তু সংস্থাটি বলছে যে ভবিষ্যতে তারা নিজেরাও পৃথিবীময় গবেষণা চালিয়ে নিজস্ব তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ‘ভালো দেশের’ তালিকা নির্ধারণ করবে।

ছোট করে আমরা দেখতে চাই যে কেন নেদারল্যান্ড তালিকার শীর্ষে রয়েছে আর কেনইবা বাংলাদেশ একশ সাততম অবস্থানে রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, তাদের প্রাপ্ত ফলাফল দিয়ে তারা কোনও দেশের ‘মরালিটি’ বা মূল্যবোধকে  যাচাই করছে না, বরং দেশটি অন্য দেশের জন্য কতটা মানবিক, কত সুযোগ সৃষ্টিতে আগ্রহী সেটাই যাচাই করার চেষ্টা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সংশ্লিষ্ট দেশটি অন্য কোনও দেশের জন্য যুদ্ধের বা সমস্যার কারণ হচ্ছে কিনা সেটিও মূল বিচারযোগ্য বিষয় ছিল। মোটকথা, এই তালিকার দেশগুলো তার নিজের দেশের ভেতর কী করছে সেটা বিবেচ্য বিষয় হিসেবে নেওয়া হয়নি, বরং দেশটি পৃথিবীর জন্য কী করছে সেটাই বিবেচনা করা হয়েছে। সে হিসেবে নেদারল্যান্ড নামক দেশটি পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

নেদারল্যান্ড বৈশ্বিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদান রাখার ক্ষেত্রে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে, অর্থাৎ তারা পৃথিবীর মানুষকে তাদের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত আবিষ্কার দ্বারা সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। নেদারল্যান্ড সাংস্কৃতিক সূচকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় ২৭তম, বৈশ্বিক অগ্রগতিতে তৃতীয়, জলবায়ু পরিবর্তনে সহায়তাদানে ১৯তম, উন্নয়ন ও সমতারক্ষার ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ এবং বিশ্বে স্বাস্থ্যখাতে তারা যে অবদান রাখছে সে হিসেবে তাদের অবস্থান নবম। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে নেদারল্যান্ড ‘গুড কান্ট্রি’ বা ভালো দেশের তালিকায় প্রথম অবস্থানে আছে। আমরা যদি নেদারল্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে, যার সামগ্রিক অবস্থান ২৫তম তখন দেখতে পাই, এসব বেশিরভাগ সূচকেই দেশটি শুধু পিছিয়ে আছে তাই-ই নয়, বরং দেশটি পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশ হওয়ার পরও তারা অন্য কোনও দেশ নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। যেমন শুধুমাত্র বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বে অবদান রাখার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ৭২তম, যাকে লাল রঙে রাঙিয়ে সূচকে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ কোনও একটি দেশের জন্য যদি পৃথিবীময় অশান্তি তৈরি হয়ে থাকে তাহলে সে তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থাকতে ৭২তম, কিন্তু হয়তো এ প্রশ্ন কোনও মধ্যপ্রাচ্যবাসীর কাছে করলে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তালিকায় প্রথম অবস্থানেই রাখতে চাইবেন। আর এই তালিকায় বাংলাদেশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশ্বের ১৬৩টি দেশের মধ্যে পরিচালিত জরিপে ১৩০তম হলেও স্বাস্থ্য ও ভালো থাকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ৩২তম, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থানকে এগিয়ে এনেছে অনেক। এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় অবদানে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে মাত্র ১৫ ধাপ নিচে অবস্থান করছে, অর্থাৎ বাংলাদেশ ৮৭তম অবস্থানে রয়েছে। সব মিলিয়ে ১৬৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৭তম অবস্থানে থাকায় আমরা কি এরকম সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে বাংলাদেশ একটি ‘মোটামুটি ভালো দেশ?’ বিষয়টি নিঃসন্দেহে ভাবনার দাবি রাখে।

বাংলাদেশ দেশ হিসেবে ক্ষুদ্র এবং অপেক্ষাকৃত তরুণ রাষ্ট্র। সবচেয়ে বড় কথা হলো দেশটির সীমিত সম্পদ কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠী দেশটিকে নতুন এক মাত্রা দিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে কেবলমাত্র দারিদ্র্যপীড়িত, খরা-বন্যা-দুর্যোগের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু দিন ঘুরেছে এবং বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তার অবস্থানকে বদলানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে অনেক ক্ষেত্রেই। একেবারে সর্বসম্প্রতি বাংলাদেশ আলোচনায় এসেছে মিয়ানমার থেকে নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা নাগরিককে আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহ করে। মানবিকভাবে বাংলাদেশ এই ‘গুড কান্ট্রি’ বা ভালো দেশের তালিকায় অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে।

প্রশ্ন করতে পারেন যে বাংলাদেশ তার নিজের জনগণের জন্য কতটা ‘ভালো দেশ’। এ প্রশ্ন নিয়ে আরেকদিন আলোচনা করা যাবে। কিন্তু আজকে বাংলা ট্রিবিউনের মতো একটি জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টালের জন্মদিনের মতো একটি বিশেষ দিনে,বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশ কতটা ‘ভালো দেশ’ সে সম্পর্কে একটু আলোচনা করাটাই যুক্তিযুক্ত মনে হলো। আগ্রহীরা গুগলে সার্চ দিয়ে ‘গুড কান্ট্রি ইনডেক্স’ দেখে নিতে পারেন। তবে দেশের মতো বৃহৎ বা ম্যাক্রো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তির মতো ক্ষুদ্র বা ‘মাইক্রো’ প্রপঞ্চের দিকে যদি তাকান তাহলে আপনার/আমার পক্ষে নিজেদের বিচার করা সহজ হয়, আমি বা আপনি অন্যের জন্য কতটা ‘ভালো’ সে প্রশ্ন নিয়ে এগুলে কিন্তু কোনও একটি দেশ আরেকটি দেশের জন্য কতটা ভালো তা নির্ণয় করাটা সহজতর হয়। কেন না আমরা সে কাজটিই প্রথমে করি?

শুভেচ্ছা বাংলা ট্রিবিউন, শুভ কামনা অপার।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

 


[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ