রাজনীতির সঙ্গে থাকুন

Send
সাইফুল হাসান
প্রকাশিত : ১৩:১৬, মে ২০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২১, মে ২০, ২০১৮

সাইফুল হাসান‘রাজনীতি’ দেশের  জনগণের কাছে সবচেয়ে ‘অজনপ্রিয়’ ও ‘অপছন্দে’র বিষয়ের একটি। অথচ রাজনীতি ছাড়া কিছুই ঘটে না। এটা জানার পরও মানুষ রাজনীতি কেন ঘৃণা করে? এজন্য দায়ী কে, রাজনীতি না রাজনীতিবিদ? কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক কর্মী বা রাজনীতি সচেতন মানুষ তৈরির সুতিকাগার হলেও, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে একদলীয় আধিপত্যে বন্দি ‘রাজনীতি’। বেসরকারিখাতের অনেক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোষণা দিয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ। মজার বিষয় হচ্ছে, রাজনীতিনিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন হয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে।
রাজনীতি লড়াই করার প্রেরণা জোগায়, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করতে শেখায়, দেশ ও মানুষ নিয়ে ভাবতে শেখায়, স্বপ্ন দেখায়। রাজনীতি মানুষের অধিকার। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ এই অধিকার কিভাবে খারিজ করে, তা আমার বোধে আসে না। যদিও ছাত্ররাজনীতির নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় যা ঘটছে, তাতে রাজনীতি চালু রাখার পক্ষে খুব বেশি যুক্তি নেই। ছাত্রসমাজ যেকোনও দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের মূল শক্তি। তারা যদি রাজনীতি সচেতন না হয়, তবে তা যেকোনও দেশের জন্যই দুঃসংবাদ।

আধুনিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়, রাজনীতি থেকে যত দূরেই থাকুন, রাজনীতি আপনাকে ছাড়ে না। জীবনযাপনের প্রতিটি স্তরে আপনাকে আঁকড়ে থাকে। সড়ক, পরিবহন, বাজার, ঘাট, অফিস, মাইনে, বাচ্চার দুধ, কাপড়, বাসাভাড়া, মাছ-মাংস, লাউয়ের দাম, নিরাপত্তা—সব কিছুতেই রাজনীতি আছে।  রাজনীতিই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। তারপরও রাজনীতিকে ঘৃণা কেন? রাজনীতি ঘৃণা করলেই কি জনগণের জীবন বা দেশটা রূপকথার মতো সুন্দর হয়ে যাবে? সব সমস্যা মিটে যাবে? অসৎ রাজনীতিকদের কারণে ‘রাজনীতি’র প্রতি বীতশ্রদ্ধ হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও, ‘রাজনীতি’কে কি বাতিল করা যায়?

সম্ভবত না। রাজনীতি আপনাকে বাতিল করতে পারে কিন্তু আপনি পারেন না। কারণ আপনার জীবন নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনীতি দ্বারা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটল বলছেন ‘প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী’। আর আপনি দাবি করছেন, ঘৃণা করেন রাজনীতি, সঙ্গে নেই। কিন্তু বাস্তবে করছেন উল্টোটা। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত নানা বিষয়ে মত দিচ্ছেন। পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে ঝগড়া করছেন। বন্ধুদের আড্ডায় রাজনৈতিক বিতর্কে অংশ নিচ্ছেন। অর্থাৎ রাজনীতির মধ্যেই ডুবে আছেন।

যদিও, বাংলাদেশের জনগণের সক্রিয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ খুব সীমিত। একমাত্র ভোটদান ছাড়া।

‘রাজনীতির মতো এত জরুরি বিষয় শুধু রাজনীতিবিদদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।’—জনগণকে সতর্ক করে বলেছিলেন ফরাসি রাষ্ট্রনায়ক ও জেনারেল শার্ল দ্য গল। আর আমরা সবকিছু রাজনীতিবিদদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। যদিও রাজনীতিবিদদের ওপর বিশ্বাস নেই বেশিরভাগ মানুষের। এমনকী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও এই বোধ প্রবল। তারপরও শেষ ভরসা রাজনীতি, কারণ বিকল্প নেই। রাজনীতিবিদ ও জনগণের মধ্যে যে দুরত্ব, তা ঘোচাতে কোনও পক্ষেই উদ্যোগ নেই। জনগণের সক্রিয় রাজনীতিতে আগ্রহ নেই। আর রাজনীতিকদের আগ্রহ যেকোনও মূল্যে ভোটে জয় ও রাষ্ট্রক্ষমতা।

যে কোনও শাসন থেকে আধুনিক গণতন্ত্র—সব শাসনেই প্রায় সব শাসকরাই চেয়েছেন, ‘জনগণ রাজনীতি থেকে দূরে থাকুক। রাজনীতি অপছন্দ করুক’। এতে জনগণের ক্ষতি হলেও, লাভ রাজনীতিবিদ বা শাসকের। কারণ জনগণ রাজনীতি থেকে যত দূরে, শাসকের জবাবদিহিতাও তত কম। আর অপশাসন ও দুর্নীতির সম্ভাবনা ততটাই বেশি। এটা বোঝার পরও, মানুষ চুপ থাকে, কারণ রাজনীতি নিয়ে ভয়। রাজনীতিবিদরাও চান, এই ভয় বজায় থাকুক, মানুষ বিভক্ত হোক নানা প্রশ্নে। তাই বলে কি চুপ থাকবো রাষ্ট্র, সমাজ, নীতি ও অধিকারের প্রশ্নে? উদাসীন থাকবো জাতীয় সংকটে, দেশের প্রয়োজনে?

রাজনীতি ছাড়া পৃথিবীর একদিনও চলেনি, ভবিষ্যতেও চলবে না। কোন দেশে রাজনীতি কেমন হবে, তা নির্ভর করে ওই দেশের জনগণের ওপর। বিশ্বের বহু দেশে রাজনৈতিক সচেতন মানুষের সংখ্যা অনেক কম, কিন্তু সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক শক্তিশালী। ফলে রাষ্ট্রে এক ধরনের ভারসাম্য বজায় থাকে। যেমন ইউরোপ ও অ্যামেরিকা। আবার কোনও কোনও দেশে মানুষ অধিকতর রাজনীতি সচেতন হলেও, প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল। রাজনীতির মান ভয়ানক নিম্নগামী। যেমন বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ফিলিপাইন। জনগণের রাজনীতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই, এমন সব দেশের কথা অবশ্য আলাদা। যেমন মধ্যপ্রাচ্য।

রাজনীতির মান দুর্বল হলে রাজনীতিবিদদের মানও দুর্বল হয়। এতে জনগণের জীবন কঠিন হয়, কিন্তু রাজনীতির প্রয়োজন ফুরোয় না। বরং, একুশ শতকে ‘আদর্শ রাজনীতি’র প্রতি মানুষের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু রাজনীতিতে সুযোগসন্ধানী, লুটেরা, কালোটাকার মালিকদের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকায় জনগণ দূরে থাকছে। মজা হচ্ছে, সবাই গণতন্ত্র চায় কিন্তু রাজনীতিকে বাদ দিয়ে। অথচ রাজনীতি ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। রাজনীতি হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র বৈধ কর্মসূচি ও পথ। যেখানে সবপক্ষ নিজেদের শ্রেষ্ঠ ও প্রতিপক্ষকে নিকৃষ্ট দাবি করে। রাজনীতিতে সবসময় কেউ না কেউ হতাশ হয় এবং সে জয়ীকে পরাস্ত করার পরিকল্পনায় ন্যস্ত থাকে।

রাজনীতির মাধ্যমেই সমাজ ও রাষ্ট্রে বড় পরিবর্তনগুলো ঘটে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বোঝা যায়। রাজনীতি বাদ দিয়ে রাষ্ট্র, সরকার বা জনগণের মধ্যে কোনো কিছু ঘটে না। ঘটা সম্ভবও না। এখানে কেউ কাউকে জায়গা দেয় না। জায়গা ও সুযোগ তৈরি করতে হয়। চায়ের দোকান বা ফেসবুকে বিপ্লব করে পরিবর্তন আসে না। এ জন্য চাই কর্মসূচি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ। এখানে রাজনীতি বলতে মানুষ ভোট বোঝে। উৎসব মনে করে, পাঁচ বছর পর পর দলবেঁধে ভোট দেয়।  ভোট পরবর্তী ৫ বছর হতাশায় পার করে।

অথচ রাজনীতি শুধু ভোটের বিষয় নয়। এমনকী সরকার বা বিরোধী কোনও দল বা শক্তিও নয়। রাজনীতি হচ্ছে দেশ, জনগণ, গণতন্ত্র, অধিকার, ক্ষমতার বিষয়। দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের বিষয়। সব ধরনের পরিস্থিত মোকাবিলা করার বিষয়। ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশ ও জনগণকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার বিষয়। সরকার ও আইন বানানোর বিষয়। আবার তা বিরোধিতারও। ন্যায়-অন্যায় প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরোধের বিষয়। রাজনীতির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক কারণেই মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল।

রাজনীতি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে একে অন্যের বিরুদ্ধে উসকে দেয়। বন্ধু ও পরিবারের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে। যুদ্ধ ঘোষণা করে। অভিমত, অর্জন, স্বাধীনতা ও সংগঠন হাইজ্যাক করে। আবার রাজনীতি শান্তি প্রতিষ্ঠা করে, আপস করতে শেখায়। জাতিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী করে। দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে পারে, আবার ঝুঁকির মধ্যেও ফেলতে পারে। নাগরিকদের সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে। শুধু রাজনীতিই জীবনের সবকিছুকে স্পর্শ করে, প্রভাবিত করে। এরপরও রাজনীতিকে ঘৃণা করে দূরে থাকলে,এ নিয়ে আপনার কথা বলার কোনও অধিকার নেই।

কোথাও এক জায়গায় পড়েছিলাম, নির্বোধ রাজনীতিবিদরা কোনও সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে সেই নির্বোধদের, যারা তাদের ভোট দিয়ে টিকিয়ে রাখে। কথাটি আমার কাছে ঠিক মনে হয়। আমাদের মনে রাখা উচিত, জনগণ হিসেবে আমরা যেমন, আমাদের নেতা, পুলিশ, আমলা, সেনা, রাজনীতিবিদরাও তেমন হবে। যখন ভাবছেন কোনও কিছুই ঠিকমতো চলছে না, তখন নিজে মাঠে নামুন। চেষ্টা করুন যেন সবকিছু ঠিকঠাক চলে। প্রয়োজনে নিজেই কর্মসূচি তৈরি করেন অথবা যে কর্মসূচি সমর্থন করেন তার পক্ষে দাঁড়ান।

বিষয় হচ্ছে আপনি নিজের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন কিনা? নাকি, নিরাপদ দূরত্বে বসে গর্ব করে বলছেন, ‘আই হেইট পলিটিক্স’।

যদি তাই হয়, তবে জার্মান নাট্যকার বার্টল্ট ব্রেখটের একটি বিখ্যাত উক্তি মনে করিয়ে দিতে চাই। ‘নিকৃষ্টতম অশিক্ষিত হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে রাজনৈতিকভাবে অশিক্ষিত। সে শুনতে চায় না, বলতে চায় না, রাজনৈতিক বিষয়ে অংশগ্রহণ করে না। সে জানে না জীবনের মূল্য, ধান-মাছ-আটা-বাসা ভাড়া-জুতা বা ওষুধের দাম। সবকিছু নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। এই রাজনৈতিক অশিক্ষিতরা এতই মূর্খ যে, বুক ফুলিয়ে গর্ব করে বলে, রাজনীতিকে ঘৃণা করি! এই নির্বোধ জানে না, তার রাজনৈতিক অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় পতিতা, পরিত্যক্ত সন্তান, সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ভণ্ড রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিবাজ ও দেশি-বিদেশি কর্পোরেট কোম্পানির ভৃত্য দালাল।’

রাজনীতির বিকল্প একমাত্র রাজনীতি। ঘৃণা কোনও সমাধান নয়। রাজনীতি নিরেট দেশ ও জনকল্যাণের বিষয়। রাজনীতি কেমন হবে তা নির্ভর করে এর প্রয়োগ ও সংশ্লিষ্ট জনগণের ওপর। কারণ, রাজনীতির প্রাণভোমরা জনগণের হৃদয়ে গচ্ছিত। জনগণের উচিত রাজনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া। রাজনীতিবিদদের চোখে চোখে রাখা, পাহারা দেওয়া। যেন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থ বলে চালাতে না পারে।

সবাই রাজনৈতিককর্মী হবে না। হয় না, সেটা সম্ভবও না। অন্ধ দলীয় আনুগত্য থাকতে হবে, নেতা-নেত্রীর অনুসারী হতে হবে, মিছিল-মিটিংয়ে থাকতেই হবে এমন নয়। তবে, রাষ্ট্র-সমাজ, ক্ষমতা, বিদ্যমান রাজনৈতিক শক্তি, তাদের চরিত্র, দ্বন্দ্ব, সংঘাত বুঝতে হবে। নজর রাখতে হবে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সামাজিক নানা উপাদানে। যেন জাতীয় সংকট বা দেশের প্রয়োজনে দাঁড়াতে পারেন। তা না করে, নিরপেক্ষতার নামে দূরে বসে রাজনীতি খারাপ বলে আফসোস করবেন, এটা দুঃখজনক।

এখন সিদ্ধান্ত আপনার, ঘৃণা করবেন নাকি সঙ্গে থাকবেন, রাজনীতির।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ