রমজান ও বাংলাদেশ

Send
ইকরাম কবীর
প্রকাশিত : ১৭:০০, মে ২৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০১, মে ২৫, ২০১৮

ইকরাম কবীর
রোজা এবং রমজানের চেতনা বোঝার জন্য একজন মানুষকে খুব বেশি ধার্মিক হতে হয় না। একটু  লক্ষ করলেই বোঝা যায় রমজানের শিক্ষাগুলো। রোজা আমাদের অনেক রকম জাগতিক প্রলোভন থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে, জীবনযাপনে এক ধরনের শৃঙ্খলাবোধ তৈরি করে। নিজের ভেতরে তাকিয়ে দেখার একটি ক্ষেত্র তৈরি করে। এই শৃঙ্খলাবোধ হয়তো আমাদের বাকি এগারো মাসেও নিজেকে একটি শৃঙ্খলার ভেতরে রাখতে সাহায্য করবে। রোজা রাখার চর্চা করে রোজার শিক্ষণীয় বিষয়গুলো উপলব্ধি করে জীবনে কাজে লাগাতে না পারলে আমার মনে হয় এ চর্চা করার কোনও অর্থ নেই। এর শিক্ষাগুলো নিজের জীবনে কাজে না লাগালে বোধহয় রোজা না রাখাই ভালো।

আমি যখন সত্তরের দশকে ছোট্ট একটি বালক ছিলাম, দেখেছিলাম আমার বাবার রোজার মাসে সংসার চালাতে কী কষ্ট হতো। প্রয়োজনীয় সব দ্রব্যের দাম বেড়ে যেত। শুধু আমাদের পরিবার নয়, আমার বাবার অন্য সব সহকর্মীর একই অবস্থা ছিল। সবারই রোজার মাসে খাবার-দাবার কেনার জন্য অন্যান্য মাসের চেয়ে বেশি খরচ করতে হতো। এ কথা সত্য, সমাজে চাহিদা বেশি থাকলে এবং সরবরাহ কম থাকলে মূল্য বাড়বে। কিন্তু আসলেই কী এমন হতো? সরবরাহ কী আসলেই কম থাকতো। নাকি গুদামজাত করে বাজারে কম সরবরাহ করা ব্যবসায়ীদের এক ধরনের ফন্দি ছিল। আমরা সেই ছোট বয়সেই কাগজে খবর দেখে জেনে গিয়েছিলাম যে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর জন্য এ কাজ করতেন।

আমার বাবার আমল থেকেই দেখে আসছি। এখনও চলছে। শুধু রমজানে নয়, তারা সারা বছরই এটা করেন। তবে রোজার মাসে যখন তারা ইচ্ছে করে দাম বাড়ান তখন তাদের সততা নিয়ে আমাদে মনে প্রশ্ন জাগে। আমাদের দেশেই বোধহয় এমন সময়গুলোতে– বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসবগুলোতে তারা জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন বেশি মুনাফা করার জন্য।

একটি উদাহরণ দিই। আমাদের দেশ থেকে হাজার হাজার ক্রেতা ভারতে চলে যান ঈদের কেনাকাটা করতে। কেন? সেখানকার বাজারের সাতশ’ রুপির একটি পাঞ্জাবির মূল্য যদি বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে নয়শ’ টাকা হয় এবং তার সঙ্গে যদি আনা-নেওয়ার মূল্য জুড়ে দিই, তাহলে সেই পাঞ্জাবির সেখানকার মূল্য হয় এক-হাজার টাকা। আচ্ছা আমাদের এখানে সেই পাঞ্জাবি যদি আরো পাঁচশ’ টাকা মুনাফা ধরে বিক্রি হয় তাহলে সেটি পনেরশ’ টাকায় কিনতে পারার কথা। কিন্তু এখানকার বাজারে সেই পাঞ্জাবি আমাদের ব্যবসায়ীরা বিক্রি করেন তিন-হাজার টাকা দিয়ে। তবে কেন যেসব ক্রেতার সাধ্য আছে তারা সেখানে গিয়ে কিনে আনবেন না?

প্রশ্ন উঠতে পারে আমরা কেন ভারতীয় কাপড় কিনবো? আমাদের দেশেই তো অনেক ভালো ভালো কাপড় তৈরি হয়! এর উত্তরে বলা যায়, ভারতীয় যে কাপড় আমরা তিন-হাজার টাকায় এখান থেকে কিনবো এবং আমাদের দেশের যে কাপড় তিন-হাজার টাকায় কিনবো, এই দুইয়ের মান তুলনা করে দেখলেই বোঝা যাবে কেন মানুষ কেনাকাটা করতে পাশের দেশে চলে যেতে চায়।

ভারতকে আমরা নানা কারণে দোষারোপ করি; হিসাব করলে দেখা যাবে বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ভারত-বিদ্বেষী। তবু আমরা সেখানকার পণ্য কিনতে সেখানে চলে যাই, সেখানকার পণ্য এখানে এনে বিক্রি করি। পূজার সময় কলকাতায় গিয়ে দেখলে দেখা যাবে সেখানকার ব্যবসায়ীরা মূল্য কমানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। সে দেশের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এমন পার্বণের সময় বেশি বিক্রি হয়; মূল্য কমালে আরও বেশি বিক্রি হয় এবং মুনাফা বাড়ে। পশ্চিমের খ্রিস্টান দেশগুলোতেও সেই একই চর্চা করা হয়। বড়দিন এলেই সেখানে বড় ছাড় দিয়ে জিনিসপত্র বিক্রি হয়। এখনই যদি বিলেতে যান তাহলে দেখবেন সে দেশের খ্রিস্টান, হিন্দু, ইহুদি ও মুসলমান ব্যবসায়ী সবাই পণ্যের মূল্য কমিয়ে ব্যবসা করছেন।

অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশে এমনটি কখনোই ঘটে না। এখানে মূল্য বাড়ানোর একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে। দেখে মনে হয় জীবনের সব মুনাফা ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে করে নিতে চান। প্রতি বছর আরো বেশ-বেশি করে দাম বাড়ানো হয়। অতি মুনাফা করার অর্থ আমি বুঝি অতি লোভ করা। যদি তাই হয়, তাহলে রমজানের চেতনা কোথায় থাকে? আমাদের সংযম জানালা দিয়ে বেরিয়ে চলে গেলো না? মূল্য বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুধু ঢাকায় নয়, সারাদেশে এই প্রতিযোগিতা চলে। রমজান না মানুষকে লোভ সংবরণ করতে সেখায়? আমরা কি তাহলে ভুল রমজানের কথা বলে তার পেছনে ছুটছি?

একটি সময় ছিল আমাদের ইফতারের খাবার কিনতে যেতে হতো না। বাড়িতেই সবকিছু তৈরি করা হতো এবং সবাই তা সানন্দে খেতো। সত্যি সত্যি। তখন এত দোকান-রেস্তোরাঁ ছিল না। সময় বদলেছে, স্বংস্কৃতি বদলেছে। আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতিও বদলে গেছে। আমরা এখন বাইরে গিয়ে খাবার কিনে আনি, বাড়িতে খুব সামান্য কিছু তৈরি করি। এই সুযোগ নিয়ে দোকান-রেস্তোরাঁর মালিকেরা খাবারের মূল্য আকাশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। এই রোজার মাসেই! রোজার মাসে তৈরি খাবারের দাম নিয়ে যত কেচ্ছা লেখা যায় তা বোধহয় আর কোনও দেশে যায় না।

আবার কাপড়চোপড়ে ফিরে যাই। আমাদের একটি সময় ছিল যখন আমরা একটি শার্ট-প্যান্ট বা একটি সালোয়ার-কামিজ নিয়েই মহাখুশি। আমার বাবা এক ঈদে নতুন কাপড় আমায় দিতে পারেননি বলে আমি নিজে একবার স্কুলের জন্য তৈরি নতুন ইউনিফর্ম পরে ঈদ করেছিলাম। ওই যে বললাম, সময় বদলেছে, সংস্কৃতি বদলেছে। আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতিও বদলে গেছে। এখন আর ঈদে একটি কাপড়ে কারো মন ভরে না। সবাই অনেক কাপড় চায়! ঈদের দিন তিনবেলা তিনটি! এবং এই সুযোগই নিচ্ছেন আমাদের ব্যবসায়ীরা। অনবরত দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই।

কেউ ভাবছে না দাম বাড়ানোর সামাজিক প্রভাব বা প্রতিফলন আমরা বোধহয় চিন্তা করে দেখছি না। যে মানুষগুলো এই বাড়তি মূল্যে খাবার-দাবার বা কাপড়চোপড় কিনতে চাচ্ছেন তাদের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এই বাড়তি অর্থ তারা কোথা থেকে জোগাড় করছেন? এই বাড়তি অর্থ জোগাড় করতে তাদের অসৎ পথ চলার যে একটি সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে তা অনস্বীকার্য। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েই তারা এই অর্থ জোগাড় করছেন বাড়তি মূল্যে জিনিসপত্র কেনার জন্য। 

একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে সারাদিন রোজা থেকে যতটুকু খাবার কিনলে বা তৈরি করলে ইফতার যথেষ্ট হয় তার চেয়েও বেশি কেনা হচ্ছে বা তৈরি করা হচ্ছে। অনেক খাবার অবলীলায় নষ্ট হচ্ছে; কেউ কিছু ভাবছে না এ নিয়ে। ইফতার পার্টিতে যান, দেখবেন আরও ভয়ানক চিত্র। খাবার নষ্ট করার প্রতিযোগিতা চলে রীতিমত। রোজার এই ত্রিশ দিনে সারাদেশে কতগুলো ইফতার পার্টির আয়োজন হয় এবং কত খাবার নষ্ট করা হয়, কেউ যদি একটু ভাবতেন।

রাস্তাঘাটে, বাসের মধ্যে, গাড়ি-চালনাতে সবার মধ্যে এক ধরনের ক্ষিপ্ত আচরণ লক্ষণীয়। সবাই একটুতেই রেগে যাচ্ছেন। বাসের ভেতর প্রায়ই ঝগড়াঝাটি এবং ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে দেখা যায়। এক গাড়ি তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আরেক গাড়িকে আঘাত দিয়ে চলে যাচ্ছে। স্বীকার করি যে রোজা থাকলে মানুষের শরীরের রসায়নে কিছু এদিক-ওদিক হয় এবং তা আমাদের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব পড়ে। আমরা অল্পতেই রেগে যাই, সারাক্ষণ আয়েশ করতে ইচ্ছে করে। রমজান আমাদের যে শিক্ষা দেয়, আমাদের ব্যবহারে বোধহয় সবসময় প্রতিফলিত হয় না। রোজা রেখে সহ্যশক্তি বাড়াতে হবে এটাই বোধহয় রমজানের শিক্ষা।    

যে কথাগুলো এখানে বলার চেষ্টা করছি তা আমরা সবসময়ই টেবিল-আলোচনায় বলে থাকি। আমরা সবাই রমজানের চেতনা ঠিকমতোই বুঝি, তবে মেনে চলার সময় ঠিক তার বিপরীত কাজটি করি। কেন যেন মনে হয় আমরা রমজান মাসকে উপলক্ষ করে আরো বেশি লোভ প্রদর্শন করি, আরো বেশি রাগ প্রদর্শন করি, একে-অপরের প্রতি আরো বেশি অশান্ত হয়ে যাই।

রমজান মাসে অধিকাংশ অফিসে কাজ করার সময় কমিয়ে করে আনা হয়। বিকেল সাড়ে-তিনটায় ছুটি হয়ে যায়। সবাই যেন বাড়ি ফিরে ইফতার করতে পারেন, একটু আরাম করতে পারেন, তারাবির জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এ মাসে কি রোজা রেখে আমার করা উচিত? নাকি কতটা কষ্ট সহ্য করতে পারি তার একটি পরীক্ষা হয়ে যায় রমজান মাসে? রোজা রাখার অন্তর্নিহিত অর্থ আসলে কী? তা কতটুকু মনে রেখে আমরা এর চর্চা করছি?

এই লেখাটি আমি কাউকে ছোট করার জন্য লিখছি না; কাউকে বিদ্রুপ করার জন্যও লিখছি না। ছোটবেলা থেকেই আমার কাছে মনে হয়েছে রমজান মাসের তথা রোজা রাখার অন্তর্নিহত অর্থ আমরা অনুসরণ করছি না। আমি যতদূর বুঝি, রমজান আমাদের আরও উদার হতে সেখায়, আরো ধৈর্যশীল হতে সেখায়, আরো সাহায্যকারী হতে সেখায়, আরও মানবতাসম্পন্ন হতে সেখায়– অন্তত আমরা আমাদের চারপাশে তাই দেখেছি, এমনটাই শুনে এসেছি। আমি প্রায়ই এই গুণগুলো আমাদের নিজেদের মধ্যে খুঁজে পাই না। হয়তো একদিন পাবো, এই আশায় বেঁচে থাকি।

লেখক: গল্পকার ও কলামিস্ট

 

চেক-ওএফএম

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ