বিশ্বকাপ ফুটবল: কার পতাকা কে তোলে!

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৩:০৬, জুন ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০৭, জুন ১১, ২০১৮

রেজানুর রহমানফেসবুকে ছবিটা দেখে একটু যেন হোঁচট খেলাম। দুজন কিশোর একটি পোস্টার উঁচিয়ে ধরে আছে। পোস্টারে লেখা ‘বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে আনন্দ করার জন্য তো অনেক টাকা খরচ করছেন। আমাদের মতো অসহায়দের জন্য কিছু টাকা কি খরচ করা যায়?’ ব্যানারে উল্লেখ করা কথাগুলো খুবই যৌক্তিক এবং মর্মস্পর্শী। কিন্তু পোস্টার এবং কিশোরদ্বয়ের চেহারা দেখে খটকা লাগলো। দেখে মনে হচ্ছে ছিন্নমূল এই কিশোরেরা যে পোস্টারটি হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে তা অন্য কেউ লিখে দিয়ে ওই কিশোরদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। যদি তাই হয়ও তাহলেও আমি দোষের কিছু দেখি না। কারণ, এই পোস্টারটির সামান্য কয়েকটি শব্দ অসামান্য কিছু উপলব্ধি ছড়িয়ে দিয়েছে। কথা তো সত্য। বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশ নেই। তাতে কী? আনন্দ করতে তো দোষ নেই। হ্যাঁ, অবশ্যই আনন্দ করতে দোষ নেই। কিন্তু আনন্দের বহিঃপ্রকাশটা কেমন হবে সেটাই বিষয়। আনন্দ করতে গিয়ে কী পরিমাণ টাকা খরচ করবো তাও বোধকরি বিবেচনার বিষয়।
প্রচার মাধ্যমে দেখলাম জার্মান ফুটবল দলের ভক্ত বাংলাদেশের এক কৃষক তার জমাজমি বিক্রি করে কয়েক কিলোমিটার লম্বা জার্মানির পতাকা বানিয়েছেন। নিজের বাড়িকে ব্রাজিল অথবা আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে রং করার হিড়িক পড়েছে। দেশের বড় বড় পত্রিকার প্রথম পাতায় ওইসব বাড়ির ছবিও ছাপা হচ্ছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকেরা যে যত পারে বড় পতাকা বানাচ্ছে। একদল হয়তো বানিয়েছে এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পতাকা, অন্য দলের এরচেয়েও বড় পতাকা চাই। আবার কেউ কেউ নিজের বাড়ির সামনে বিয়ে বাড়ির গেটের আদলে আর্জেন্টিনা অথবা ব্রাজিলের পতাকা দিয়ে গেট সাজিয়েছেন। ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে দেশব্যাপী বাহারি আয়োজন দেখে ধারণা করা হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে আনন্দ করার জন্য আমাদের দেশে আগামী ৩০ দিনে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হবে।

অনেকে হয়তো ভাবছেন, কত টাকা কতভাবেই না খরচ হয়ে যায়। আর বিশ্বকাপ ফুটবল বলে কথা। ৪ বছর পর একবার এই আনন্দের মুহূর্ত আসে। কাজেই টাকা তো একটু খরচ হবেই। এতে তো দোষের কিছু দেখি না...। না, না আমিও এখানে দোষের কিছু দেখছি না। আনন্দ করতে হলে টাকা তো লাগবেই। কিন্তু আনন্দের মাত্রাটা কেমন হবে সেটাই প্রশ্ন। আনন্দ করতে গিয়ে কী পরিমাণ টাকা খরচ হবে সেটাই দেখার বিষয়। নিজের জমি বিক্রি করে যে কৃষক একটি ভিন্ন দেশের পতাকা বানিয়েছে তার পক্ষে যুক্তি কী? জমি বিক্রি করে ভিন্ন দেশের পতাকা বানাতে হবে এই আবেগের যৌক্তিকতা কী? নিশ্চয়ই তার বাড়ির আশপাশে অভাবগ্রস্ত মানুষের বসবাস আছে। তিনি কি তাদের খোঁজ-খবর রাখেন? জমি বিক্রি করে অন্য দেশের পতাকা বানাতে পারেন যিনি, তিনি নিজ দেশের পতাকার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল? ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে অনেকে বাড়ির রং করছেন। একবারও কি কোনও উপলক্ষে নিজ দেশের পতাকার আদলে বাড়ির রং করতে কাউকে দেখেছি আমরা? অর্থাৎ পুরো বাড়ি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের পতাকা এমন নজির কি আছে?

ব্রাজিলে থাকে আমার এক বন্ধু। তার মন্তব্য, বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে ব্রাজিলের জন্য বাংলাদেশে যে ধরনের উন্মাদনা হয়, তার অর্ধেকও দেখা যায় না ব্রাজিলে।

আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষ বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছুই জানে না। অথচ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে আর্জেন্টিনা অনেক প্রিয় দেশ! এটা সম্ভব হয়েছে ফুটবলের জনপ্রিয়তার কারণে। একথা সত্য, এবং এটাই বাস্তব বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে বাংলাদেশে একটু মাতামাতি হবেই। বাংলাদেশ ফুটবলে পিছিয়ে পড়া দেশ হলেও ফুটবলের প্রতি এই দেশের মানুষের রয়েছে অগাধ ভালোবাসা। আর তাই বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই গোটা দেশ আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে। কখনও কখনও আনন্দ উদযাপনে একপক্ষ অন্য পক্ষের থেকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশায় অঢেল অর্থ খরচের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এবারও সেই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।

অথচ বিশ্বকাপ ফুটবলের এই আনন্দ উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ফুটবল জাগরণের একটা ঢেউ তো তুলে দেওয়া যেতো। স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ ব্যাপারে কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতো। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফুটবলকে ঘিরে একটা জাগরণের ডাক শুরু হতে পারতো। ফুটবলের উন্নয়নে পাড়া-মহল্লার ক্লাবগুলো নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারতো। এলাকার বিশিষ্ট ফুটবলারদের এক মঞ্চে ডেকে এনে সংবর্ধনা প্রদান অথবা ফুটবল জাগরণের ব্যাপারে পরামর্শ নেওয়া যেতো। দেশের ৩০০ জন সংসদ সদস্য তাদের নিজ নিজ এলাকায় ফুটবল জাগরণের ডাক দিতে পারতেন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ভূমিকাও এক্ষেত্রে নতুন ধারণার জন্ম দিতে পারতো। ধরা যাক, দেশের ৩০০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১০০ জনও যদি তার নির্বাচনি এলাকায় ফুটবলের উন্নয়নে কার্যকর কর্মসূচি নিতে পারতেন, তাহলে গোটা দেশ ফুটবলের উন্নয়নে ব্যস্ত হয়ে উঠতো।

কিন্তু দেশের ফুটবলের উন্নয়নে কোথাও কোনও উদ্যোগ নেই। তবে বিশ্বকাপে অন্য দেশের খেলা দেখার ব্যাপারে একপক্ষ অন্য পক্ষের চেয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিতে ব্যস্ত রয়েছে। বাসার টিভিটা ছোট। কাজেই বড় টিভি কিনে ফেলেছি। টিভিতে চলবে না, বড় পর্দা দরকার, তাও জোগাড় করে ফেলেছি। খেলা দেখা নিয়ে কথা। মেসি, নেইমার, রোনালদো, মোহাম্মদ সালাহ’র জন্য চিৎকার করে গলা ফাটাবো। কিন্তু যদি প্রশ্ন করি– এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ফুটবলের দুজন জনপ্রিয় ফুটবল খেলোয়াড়ের নাম বলুন তো? আমরা অনেকে হয়তো একজনের নামও বলতে পারবো না। অথচ বিশ্বকাপ ফুটবলের এই সময়কে উপলক্ষ করে বাংলাদেশে ফুটবলকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে নানান ভাবনা যুক্ত করা যেতো। তার কোনও উদ্যোগই চোখে পড়লো না।

লেখাটি শুরু করেছিলাম ছিন্নমূল দুজন কিশোরের কথা দিয়ে। তাদের বক্তব্য– বিশ্বকাপ ফুটবলে আনন্দ করতে গিয়ে অনেক টাকাই তো খরচ করছেন। আমাদেরকে কি একটু সাহায্য করা যায়? প্রশ্নটির উত্তর বোধকরি সবার জানা। কাজেই, এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বও সবার। প্রিয় পাঠক, পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা নিন। ঈদ মোবারক।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ