সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশ কেন থাকে না?

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১২:৫৬, জুন ২৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০০, জুন ২৩, ২০১৮

মো. জাকির হোসেনটাইমস হাইয়ার এডুকেশন (টিএইচই), সাংহাই, কিউএস, দ্য ইকোনমিস্টের মতো নামকরা সংস্থা বা সাময়িকী বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং প্রকাশ করলে যথারীতি আমাদের হতাশ হতে হয়। টিএইচই অতি সম্প্রতি বিশ্বের এক হাজার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে যেখানে বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়েরই নাম নেই। বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থাকায় আমাদের মধ্যে এক ধরনের ‘দুঃখবোধ’ কাজ করে। শুধু এক হাজার কেন ওয়েবমেট্রিক্স বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ২০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েবমেট্রিক্স ২০১৭ সালে বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি র‌্যাংকিংয়ের সংস্করণ প্রকাশ করে। প্রকাশিত সংস্করণে দেখা যায়, বাংলাদেশের ১৫০টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কেবলমাত্র বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) র‌্যাংকিংয়ে ২০৬১-তম অবস্থান পেয়েছে। আমি তো সেরাদের তালিকায় থাকার পেছনে কোনও লজিক দেখি না। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় বাংলাদেশ নামে একটা দেশ আছে, একটা দেশের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় থাকতে হয় বলেই আছে। একেবারে না থাকলে বিশ্বের কাছে কেমন একটা ‘শরম’ লাগে। আর বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু আছে সেখানে কিছু ‘শিক্ষক’ তো রাখতেই হয়। দালান-কোঠা বানাতেই হয়। কিছু শিক্ষক, কর্মচারী আর দালান-কোঠা যেহেতু আছে তাদের পেছনে রাষ্ট্রের কিছু খরচাপাতি তো করতেই হয়। এভাবেই চলছে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।
একটি উদাহরণ দেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালে। ১৯৯৩ সালে শিক্ষার্থী ভর্তি করে কলা অনুষদে আশ্রিত হিসাবে একটি শ্রেণি কক্ষে আইন বিভাগ যাত্রা শুরু করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত জীর্ণ-শীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিত্যক্ত প্রশাসনিক ভবনে স্থানান্তরিত হয় আইন বিভাগ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আড়াই দশক সময়ে এ আইন বিভাগ চার শতাধিক বিচারক ও আমলা, দেশে-বিশে আইনের শিক্ষক, এক হাজারের অধিক আইনজীবী ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি নানা খাতে মানবসম্পদ সরবরাহে ভূমিকা রেখে চলেছে। পরিত্যক্ত, ভাঙা-চোরা ও অতি অপ্রতুল অবকাঠামোতে শিক্ষাদান অসম্ভব হয়ে ওঠায় আইন বিভাগের জন্য ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ভবন তৈরি করে দেওয়ার জন্য নির্বাচিত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারসমূহের দ্বারে দ্বারে ১৫ বছর ধরে ধরনা দিয়েছি আমরা। কিন্তু আইন বিভাগের জন্য রাষ্ট্র ১৫ বছরেও চার কোটি টাকার সংস্থান করতে পারেনি। এদিকে অবকাঠামোর মারাত্মক অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপশি ঝুঁকির মাত্রা চরমে পৌঁছায়। ক্লাস বা পরীক্ষা চলাকালীন মাঝে-মধ্যেই বিকট শব্দে ভবনের নানা অংশ ধসে পড়তে থাকে। এ দীর্ঘ সময়ে সরকারি অর্থে অনুৎপাদনশীল খাতে কত দালান উঠতে দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই।
অবশেষে সেই ‘একদিন’ আইন বিভাগের জন্য বাস্তবেই ধরা দিয়েছে। একাধিক মেয়াদে আইন অনুষদের ডিনের দায়িত্বপালন করার সময় ভবন জোগাড় করা যায় কিনা সে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেই আমি এবং যাদের কাছে ভবন নির্মাণের জন্য অনুদান চাওয়া যেতে পারে তার একটা তালিকা তৈরি করে তৎকালীন উপাচার্য মহোদয়কে জানাই। তিনি এ ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী না হলেও আমার অনুরোধে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে এ. কে. খান অ্যান্ড ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি সেক্রেটারি জনাব সালাহউদ্দিন কাশেম খাঁনকে আইন বিভাগের জন্য একটি ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দিলে জনাব খাঁন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক পত্র প্রেরণের প্রস্তাব দেন। আর এভাবেই এ. কে .খান পরিবারের সদস্যদের সদয় অনুগ্রহে প্রায় বিশ কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক ভবন নিয়ে নির্মিত হয়েছে এ. কে. খান আইন অনুষদ কমপ্লেক্স। আবেদন যদি সফল না হতো, তাহলে হয়তো এখনও জীর্ণ-শীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ, পরিত্যক্ত আর অপ্রতুল অবকাঠামোতেই দিনাতিপাত করতে হতো আইন বিভাগকে। বেসরকারি অনুদানে দৃষ্টিনন্দন এ. কে. খান আইন অনুষদ কমপ্লেক্স হলেও আইন বিভাগের শিক্ষার মান পড়তির দিকে। আড়াই দশক আগে যখন শুরু করেছিলাম তখন আর এখন শিক্ষার মানে অনেক ফারাক। পড়াশুনা বিমুখতা ভীষণ রকম পেয়ে বসেছে আমাদের শিক্ষার্থীদের। তাই এ ভাবনা আমাকে প্রায়ই পেয়ে বসে।
আবেগতাড়িত হয়ে সঠিক কারণ চিহ্নিত না করতে পারলে র‌্যাংকিংয়ে অন্তর্ভূক্তির প্রচেষ্টা সফল নাও হতে পারে। 'নষ্ট' ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি, শিক্ষকের 'দলবাজি', সাদা-নীল-গোলাপীতে বিভক্তি, শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনার কারণেই বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে আমাদের কোনও অবস্থান নেই এটি পুরো সত্য নয়, আংশিক সত্য। আমি আড়াই দশক যাবৎ শিক্ষকতা করছি। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি অধিকাংশ শিক্ষকই 'দলবাজি'র সঙ্গে জড়িত নন। সরাসরি 'দলবাজি'র সঙ্গে জড়িত শিক্ষক ১০ শতাংশও হবে না বলে আমার বিশ্বাস। সংখ্যায় যা-ই হোক, ছাত্র-শিক্ষক দলীয় লেজুড়বৃত্তি যে কোনও বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য ও পরিত্যাজ্য। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি সার্কভুক্ত সবগুলো দেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছি। ভারতের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি রয়েছে, তারপরও এ দু’টি দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে স্থান পেয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং মূলত কিছু ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। তার মধ্যে অন্যতম হলো– শিক্ষাক্ষেত্রে সুনাম, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাত্রদের কর্মক্ষেত্রে সুনাম, শিক্ষক ও ছাত্রের অনুপাত, প্রতি শিক্ষকের যে গবেষণাপত্র বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয় তার সাইটেশন, দেশি-বিদেশি শিক্ষকদের অনুপাত এবং দেশি-বিদেশি ছাত্রদের অনুপাত ইত্যাদি। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে প্রায় অনুপস্থিত থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে গবেষণার হার কম থাকা, শিক্ষার সুনাম ক্রমাগত কমতে থাকা ও সনদ-নির্ভর গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতা শূন্যের কোঠায় পৌঁছে যাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে মূলত শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা জড়িত থাকেন। কিন্তু দিন দিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার হার ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে পর্যাপ্ত অর্থের অপ্রতুলতা, অনুকূল পরিবেশের অভাব, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অভাব ইত্যাদি। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার উৎকর্ষের চেয়ে প্রশাসনিক দিককেই বেশি গুরুত্ব প্রদান, কিছু শিক্ষকের শিক্ষা বিমুখতা ও শিক্ষকতার চেয়ে রাজনৈতিক গ্রুপিং-লবিং-এ সময় বেশি দেওয়া।
বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পেছনে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-প্রকাশনা ব্যয় শুনে আক্কেলগুড়ুম হওয়ার অবস্থা। উদাহরণস্বরুপ, জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক গবেষণা সংক্রান্ত ব্যয় ২.৩১ বিলিয়ন ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় ১৯ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক গবেষণা ব্যয় ১১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা, ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। ডিউক, স্টানফোর্ড ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বার্ষিক ব্যয় যথাক্রমে– ৮ হাজার ৬৩২ কোটি, ৮ হাজার ৪৬৬ কোটি এবং ৮ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ গবেষণা খাতে তাদের জিডিপির কত শতাংশ ব্যয় করে তার ভিত্তিতে United Nations Educational, Scientific, and Cultural Organization (UNESCO) Institute for Statistics ১৩৫টি দেশের তালিকা করেছে। তালিকায় ভারত, পাকিস্তান এমনকি নেপালের নাম আছে, কিন্তু বাংলাদেশের নাম নেই। এ তালিকায় ৪.২৭ পয়েন্ট পেয়ে ইসরায়েল সবার ওপরে আর দশমিক শূন্য দুই (০.০২) পয়েন্ট স্কোর করে মাদাগাস্কার ১৩৫তম অবস্থানে ঠাঁই পেয়েছে। বিশ্বের যে সকল রাষ্ট্র গবেষণা খাতে বছরে ন্যূনতম ৫০ মিলিয়ন ডলার তথা ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করে, উইকিপিডিয়া তাদের তালিকা প্রকাশ করেছে। এ তালিকায় ৮৭টি রাষ্ট্রের নাম রয়েছে। আর্থিক পরিমাণের দিক থেকে সর্বোচ্চ ব্যয় করে তালিকার শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আর ৮৭তম অবস্থানে রয়েছে মন্টেনিগ্রো। তবে জিডিপির হিসাবে সর্বোচ্চ ৪.৩ শতাংশ গবেষণা ব্যয় করেছে ইসরায়েল। ব্যয়ের ক্রম অনুযায়ী ৬৬.৫ বিলিয়ন ডলার (পিপিপি অনুযায়ি) ব্যয় করে ভারত ৬ষ্ঠ আর ২.৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে পাকিস্তান ৪২তম অবস্থানে রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গবেষণা খাতে ভারত তার জিডিপির ০.৮৫ শতাংশ, আর পাকিস্তান জিডিপির ০.২৯ শতাংশ ব্যয় করে। এ তালিকাতেও বাংলাদেশের কোনও অবস্থান নেই। তার মানে বাংলাদেশ গবেষণা খাতে বছরে ৪০০ কোটি টাকাও ব্যয় করে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামী ৫ বছরের মধ্যে ভারতের সেরা ১০টি সরকারি ও ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের সমকক্ষ বানানোর জন্য ১০ হাজার কোটি রুপি ব্যয় করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ এবং এর ফলে তারা গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে উন্নত দেশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানি, প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণার অর্থ জোগানের মূল স্পন্সর। নাসা, বোয়িং, জেনারেল মটরস, স্যামসাং, ইন্টেল, মাইক্রোসফট, জিই ইত্যাদির মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায়। আমাদের করপোরেট হাউসগুলোর টার্ন ওভার হাজার হাজার কোটি টাকা হওয়া সত্ত্বেও গবেষণায় স্পন্সরশিপের সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি। আমাদের গবেষণা খাতে অর্থ বরাদ্দে কী দৈন্য দশা তা একটি উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ মাত্র ১৪ কোটি টাকা। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা না-ই বা বললাম। যেসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কার্যে যত বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়, সেসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তত বশি গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় সেগুলো বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তাছাড়া একটা দেশ বিশ্ব রাজনীতিতে তখনই ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে যখন সে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত গবেষণায় সক্ষমতা ও সফলতা বৃদ্ধি পায়।
গবেষণায় আর্থিক দৈন্যের পাশাপাশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অখণ্ড মনোযোগের অভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন-পাঠনের পরিবেশ তথা একাডেমিক সুনামের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে একাডেমিক সুনাম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শিক্ষার মানহানির ফলাফল বাংলাদেশের জন্যও ভয়ংকর ফলাফল বয়ে আনছে। এক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি অভিবাসী বছরে রেমিটেন্স পাঠায় ১৬ বিলিয়ন ডলার, আর এ কোটি মানুষের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার এক তৃতীয়াংশ নিয়ে যাচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মরিশাস, ইন্দোনেশিয়া, উজবেকিস্তান, ইউক্রেন সহ আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকার ৫৫টি দেশের কয়েক লক্ষ কর্মী। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি'র ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় পাঁচ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করেন। তারা এক বছরে তাদের দেশে ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সমান। বাংলাদেশ ভারতে পঞ্চম রেমিটেন্স প্রদানকারী দেশ হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের বছরভিত্তিক আরেক হিসাবে দেখা যায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশের বাইরে চলে যাওয়া অর্থের পরিমাণ ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিদেশিদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে দেশটি যে ৮৮ কোটি ৯৩ লাখ ডলার আয় করেছে তার মধ্যে বাংলাদেশি রোগীদের কাছ থেকেই আয় করেছে ৩৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
প্রশ্ন হলো, কেন অখণ্ড মনোযোগ নেই? স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো ফলাফলকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেও রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অন্যান্য সামরিক-বেসামরিক চাকরিজীবিদের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য-বঞ্চনা সামাজিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করেছে যার ফলে শিক্ষককে অনেক ক্ষেত্রে আপস করতে হচ্ছে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। আমার বন্ধুরা যারা সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেছে তারা, এমনকি আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করি তখন যাদেরকে স্কুলে পড়তে দেখেছি তাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট হয়ে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেছেন, তাদের অধিকাংশই সরকারি গাড়িতে করে অফিস যান। অনেকেরই সরকারি প্লট আছে, অনেকে আবার ডেভেলপার দিয়ে সরকারি প্লটে বাড়ি তৈরি করে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করছেন। সিটিং এ্যালাউন্স, রেশনসহ নানা ভাতার মাধ্যমে বেতনের প্রায় সমপরিমাণ আয় করছেন। সরকারের কাছ থেকে বিনাসুদে টাকা নিয়ে গাড়ি কিনে মাসিক ৫০ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ খরচ পাচ্ছেন ও গাড়ির মালিক বনে যাচ্ছেন। এটি শিক্ষককে সামাজিক-পারিবারিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে। স্কুল শেষে সহপাঠি কারও জন্য যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সরকারি গাড়ি আপেক্ষা করে, আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সন্তান রোদে দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করে তখন সে ক্ষুব্ধ হয় বটে যা পারিবারিক চ্যালেঞ্জ। তথ্য প্রযুক্তি, ডিজিটাল আর ফেসবুকের এ যুগে সবকিছু দেদীপ্যমান।

নানা প্রশ্ন, চাওয়া ও চাপের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিজেই রাষ্ট্র সৃষ্ট বঞ্চনা ও বৈষম্য মোচনের দায়িত্বগ্রহণ করেছেন। অনেকেই প্রজেক্ট-কনসালট্যান্সি, শেয়ারবাজার, প্রাইভেট-কোচিং, স্কুল-কলেজের জন্য বই লেখা, এমনকি লিজ নিয়ে জমিচাষ সহ নানা পথ বেছে নিয়েছেন। এভাবেই শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের অখণ্ড মনোযোগে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়েছে। শিক্ষকতা ব্রত থেকে পেশা তথা চাকরিতে রুপ নিয়েছে। উচ্চশিক্ষার প্রাণ গবেষণা কমে এসেছে। শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষকের যান্ত্রিক সম্পর্ক গতানুগতিক ক্লাস আর পরীক্ষার ফাঁদে অটকা পড়েছে। শিক্ষার্থী শিখছে কিনা, বাস্তবজীবনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে কিনা এসব দেখার সময় শিক্ষকের নেই। এভাবে শিক্ষার্থীরা ক্রমেই শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ছে। কেবল পরীক্ষা পাসের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুই মুখস্ত করছে। শিক্ষার্থীরা এখন আর বেশি ক্লাস নেওয়া, বেশি পড়ানো কিংবা বেশি বইয়ের রেফারেন্স দেওয়া শিক্ষকদের পছন্দ করে না। কম ক্লাস নেওয়া, সিলেবাসের কম অংশ পড়ানো এবং বেশি নম্বর দেওয়া শিক্ষকরাই শিক্ষার্থীদের কাছে ‘ভালো’ শিক্ষক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠছেন। আর এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাদামাটা পাঠদান ও সনদ প্রদানের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
বৈশ্বিক র‌্যাংকিং দূরে থাক, গবেষণা খাতে অর্থের দৈন্যতা, নষ্ট ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির কুফল আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের অখন্ড মনোযোগহীনতার কবলে পড়ে শিক্ষার্থীরা যেভাবে শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ছে তা জাতি হিসেবে আমাদেরকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে তা সত্যিই বড় আশঙ্কার কথা।
লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ