সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ বাড়ানো প্রসঙ্গে

Send
এরশাদুল আলম প্রিন্স
প্রকাশিত : ১৬:১৪, জুলাই ১৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৪, জুলাই ১৭, ২০১৮

এরশাদুল আলম প্রিন্সসংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বাড়ানো হয়েছে। দেশের সবক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি আজ লক্ষণীয়। এর মাধ্যমে নারী-উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের পথও প্রশস্ত হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বক্ষেত্রেই যে নারী সমান অধিকার ও সুযোগ পাচ্ছে এ কথা বলা যাবে না।
সমাজে নারীর অবস্থানের তেমন কোনও পরিবর্তন হয়নি। নারী এখনও রাষ্ট্র ও সমাজের এক অনগ্রসর শ্রেণি। তাই যৌক্তিক কারণেই রাষ্ট্রের কর্মে ও পদে তার জন্য ‘কোটা’র ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে এই ব্যবস্থা সর্বজনীনভাবেই গ্রহণযোগ্য। একইভাবে, জাতীয় সংসদেও নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশের সংবিধানেই এই বিধান আছে।
স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালে। সে সংসদে সংরক্ষিত আসন ছিল ১৫। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৯৭৯, ১৯৮৬) সদস্য সংখ্যা ৩০ করা হয়। আইনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে চতুর্থ সংসদে (১৯৮৮) কোনও সংরক্ষিত নারী আসন ছিল না। ধারাবাহিকতার জন্য পঞ্চম সংসদে (১৯৯১) সদস্য সংখ্যা আবার ৩০ করা হলো। ১৯৯৬ সালের (৬ষ্ঠ ও সপ্তম) সংসদেও ৩০-ই রাখা হলো। চতুর্থ সংসদের মতো অষ্টম সংসদে (২০০১) আইনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে কোনও সংরক্ষিত নারী আসন ছিল না। নবম সংসদে (২০০৮) আসন সংখ্যা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ করা হয় এবং ২০১১ সালে ৪৫ থেকে ৫০ করা হয়।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের জন্যই এই ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছিল। রাষ্ট্রের সব জায়গায় নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতের জন্যই রাষ্ট্রের এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আওতার বাইরে রেখেও সংসদে তাদের আসন নিশ্চিত করা হয়েছে। সংসদ রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন করে, রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও কৌশল প্রণয়ন করে। রাষ্ট্রের জন্য নারীবান্ধব আইন, নীতি ও কৌশল প্রণয়নের জন্যই সংসদে নারীকণ্ঠ নিশ্চিত করা হয়েছে। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনই নারীর জন্য রাষ্ট্রের ইতিবাচক নীতি। এটি এক অর্থে বৈষম্য হলেও আইনের দৃষ্টিতে এই ‘ইতিবাচক বৈষম্য’ গ্রহণযোগ্য। রাষ্ট্রের অবহেলিত শ্রেণির ক্ষমতায়ন ও তাদের মূলস্রোতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্যই এই ‘ইতিবাচক বৈষম্য’ প্রণয়ন করা হয়। এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি সুযোগ ও সম্মান। এর মাধ্যমে যেসব নারী সংসদে যাবেন, তারা নারীদের জন্য কাজ করবেন এটাই যৌক্তিক। এটি তাদের নৈতিক দায়িত্বও। কিন্তু এ দায়িত্ব কতটুকু পালন করছেন বা করতে পারছেন, সেটি বড় প্রশ্ন।

সংসদে সংরক্ষিত নারী সদস্যদের মূল দায়িত্ব সমাজের নারীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। কিন্তু আমরা লক্ষ করি, অনেক সদস্যই নারী উন্নয়নের এজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকে নজর না দিয়ে যে দলের মাধ্যমে সংসদে আসন পেয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেশি সোচ্চার থাকেন। বিষয়টি মেনে নেওয়া যেতো, যদি তারা রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত হয়ে আসতেন। কোনও নারী সদস্য নারী অধিকারের জন্য আলোচিত হয়েছেন বা বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন, এমনটি খুব বেশি শোনা যায় না। কিন্তু বিরোধী দলকে তুলোধুনা করে সুনাম অর্জন করেছেন এমন অনেকের নামই আমরা জানি। অনেক নারী সদস্যই রাজনৈতিক মাঠে  সক্রিয়। নারী অধিকার সংগ্রামে তাদের তেমন পাওয়া যায় না। উন্নয়ন আর নারী-অধিকার কর্মীদেরই এ নিয়ে কাজ করতে হয়। আসলে রাজনীতি করা সহজ, পদ-পদবি পেলে তো আরও সহজ। ক্ষমতাসীন দল হলে তো কথাই নেই। কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করা খুব কঠিন। আর সেই মানুষ যদি হয় নারী, তবে তাদের জন্য কাজ করা আরও কঠিন। তবে ব্যতিক্রমও আছে। অনেক সদস্যই নারীদের জন্য যতটুকু সম্ভব কাজ করছেন। 

আসলে সংসদ প্রতিষ্ঠার মূল আদর্শিক জায়গাটি হলো জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। এটিই গণতন্ত্র। শুধু সংসদে নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও নির্বাচনই হচ্ছে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। কিন্তু আমাদের সংসদে সংরক্ষিত আসনের জন্য প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা নেই। সংসদে যে ৫০টি আসনের বিপরীতেও নারীরা সরাসরি নির্বাচন করে আসতে পারেন। কিন্তু আমাদের দেশে সে ব্যবস্থা নেই। আমাদের সংবিধান বলছে, ‘ পঞ্চাশটি আসন কেবল মহিলা-সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকিবে এবং তাঁহারা আইনানুযায়ী পূর্বোক্ত সদস্যদের দ্বারা সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হইবেন’। সহজ কথায়, সংসদের তিনশ’ সদস্য নারী সদস্যদের নির্বাচন করবেন। তবে সেটি হবে আনুপাতিক হারে। কোনও দল যদি ২০০ আসন (দুই-তৃতীয়াংশ) পায়, তবে ওই দল ৫০টির মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসন পাবেন ৩৩টি (দুই-তৃতীয়াংশ)। আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সব সংরক্ষিত সদস্যপদ পেতো। এর বদলে বর্তমানের আনুপাতিক হারের বিধানটি অপেক্ষাকৃত ভালো। যদিও বাস্তবে দেখা যায়, বিরোধী দলগুলো এতে অংশ নেয় না বা কাউকে মনোনয়ন দেয় না। ফলে পুরো ৫০টি আসনই সরকারি দলের হয়ে যায়।

সংবিধানের ৬৫ (২) অনুচ্ছেদ বলছে, প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনশ’ সদস্য নিয়ে সংসদ গঠিত হবে। এই প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একই জাতীয় নির্বাচনেই ৫০টি আসনও নির্বাচন করা যেতো। প্রয়োজন শুধু নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ৫০টি সংরক্ষিত আসনের জন্য পৃথক সীমানা নির্ধারণ করা। কিন্তু তারচেয়েও বড় প্রয়োজন রাজনীতিকদের সদিচ্ছা।

সংরক্ষিত আসনে পরোক্ষ নির্বাচন বা নির্বাচিত সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচিত নারী সদস্যদের মাধ্যমে নারীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব গত চার দশকেও নিশ্চিত হয়নি। আগামীতেও হবে না। প্রকৃত ক্ষমতায়ন ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে তখনই, যখন কোনও সংরক্ষিত নারী আসনের আর প্রয়োজন থাকবে না। নারীরা পুরুষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদে আসবেন, যেমন আসছেন রাষ্ট্রের অনেক ক্ষেত্রেই। কিন্তু আমরা হয়তো এখনও সে জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি। তাই আগামী ২৫ বছর সংরক্ষিত আসন থাকবে। তা থাক, কিন্তু আইন আরেকটু সংশোধন করে সেখানে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে সেটি সমাজে ও রাষ্ট্রের তথা নারীর জন্য আরও ইতিবাচক হতো।

কোনও আসনে কোনও নারী প্রত্যক্ষ নির্বাচনে অংশ নিলে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। এ আলোচনা ইতিবাচক। গণমাধ্যমে সে খবর বের হয়, কথা হয়। এটি একটি শুভ দিক। সংরক্ষিত আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন হলে নারীরা প্রত্যক্ষ নির্বাচন করতে বা এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী হবে। ধীরে ধীরে তারা সাধারণ আসনেও নির্বাচনে আগ্রহী হবেন। এছাড়া এমনিতেই বেশ কিছু আসনে নারীরা সরাসরি নির্বাচনে অংশও নিচ্ছেন। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মনোনয়নও দিচ্ছে। প্রত্যক্ষ নির্বাচন হলে সংরক্ষিত আসনে আরও বেশি নারীরা নির্বাচনে আগ্রহী হবে। তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত হবে। এমনকি যারা এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তারাও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। তারা দলের ‘অলঙ্কার’ হিসেবে না হয়ে ‘অহঙ্কার’ হবেন। তবে কেন সংরক্ষিত আসনে নারীর প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা হবে না, তা বোধগম্য নয়। এটি হলে ক্ষমতায়নের পথটি আরও প্রশস্ত হতো। শুধু প্রতিনিধিত্ব নয়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে হলেও সরাসরি নির্বাচনের কোনও বিকল্প নেই।

রাজনৈতিক দলবিধি অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের সর্বস্তরে এক-তৃতীয়াংশ পদ নারীদের দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু কোনও দলেরই তেমন কোনও ইতিবাচক সাড়া নেই।

অভিযোগ আছে,  বিকল্প পথে সংসদে আসার ফলে তারা সংসদেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। কিন্তু সংসদে তাদের সবারই সমান সুযোগ থাকার কথা। সাধারণ সদস্যরা প্রত্যক্ষ ভোটে এলাকাভিত্তিক নির্বাচিত হওয়ার ফলে এলাকায় তাদের একটা প্রভাব বা গুরুত্ব আছে। কিন্তু নারী সদস্যরা এলাকার সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত না হওয়ায় তারা এলাকায়ও তেমন গুরুত্ব পান না। প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার থেকেও তারা গুরুত্ব পান না। খোদ নারী সদস্যরাই এ কথা বলেন। 

তাই প্রত্যক্ষ নির্বাচনে নারী সদস্যরা নির্বাচিত হলে তা নারীর ক্ষমতায়নে সহায়ক হবে। তা না হলে ২৫ বছর পর আবার মেয়াদ বাড়ানো হবে। 

লেখক: আইনজীবী ও কলামিস্ট

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ