নারীর সম্বোধনেই গলদ

Send
করভী মিজান
প্রকাশিত : ১৫:০২, আগস্ট ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২০, আগস্ট ১২, ২০১৮

করভী মিজানযৌবন যেমন ডাক তেমন
ঢাকা শহরের গাউসিয়া, চাঁদনীচক বা নিউ মার্কেট এলাকায় যেতে হলে আমি টেনশনে পড়ে যাই। টেনশন কী বলছি, আসলে ট্রমাটাইজড হয়ে যাই এই ভেবে যে কী শুনবো? মানে হচ্ছে দোকানদার কী নামে আজ  আমাকে ডাকবেন। ছোটবেলায় শুনতাম ‘অ্যাই খুকি’ ‘অ্যাই বেবি’। এসব ডাকের মধ্যে আমার মা নিজ কন্যার সিকিউরিটি রক্ষার্থে আরও জোরে হাত চেপে ধরে হাঁটা শুরু করতেন। এরপর শুনলাম আপু। তারপর আপা। তারপর ভাবি। এখন আন্টি। মাঝে মাঝে খালাম্মা। নানি ডাকের প্রতীক্ষায় আছি। এসব ডাকে আবার স্ট্যাটাসও নির্ধারণ হয়ে যায়। যেমন, কখনও যদি বান্ধবীসহ মার্কেটে যাই এবং শুনি ‘আপু’ ডাক, তখন বান্ধবী সঙ্গে-সঙ্গেই ঈর্ষান্বিত মন্তব্য করবে ‘ওরে বাপস এখনও আপু? ভালোই তো।’
সেই যে কিশোরী বয়স থেকে কলকাতার লাল ইটের নিউ মার্কেট যেতে যেতে জুতার তলা ক্ষয় করে ফেললাম, কই কেউ তো ‘দিদি’ ছাড়া আর কোনও নামে ডাকলো না? কিংবা কেরালায় ‘আম্মা’। আপনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স নির্বিশেষে যাই হোন না কেন, ‘আম্মা’ ডাকটিই সেখানে নারীর জন্য বরাদ্দ। কিংবা পাকিস্তানে ‘বাজি’। একইভাবে নেপালে দিদি বা বাইনি। আর আফগানিস্তানে নারী-পুরষ নির্বিশেষে নির্ধারিত ডাক ‘জান’। এই ‘জান’ ওই দেশে বাঙালি প্রেমিকের ‘জান’ নয় কিন্তু। পাশ্চাত্যে নারীমাত্রই ‘মিস’ বা ‘ম্যাম’ (ম্যাডাম) এবং পুরুষমাত্রই ‘স্যার’ বা ‘মি.’। এমনকি ‘মিসেস’ ডাকটিও এখন অচল। ইংরেজরা আরেক ডিগ্রি ওপরে। ইংরেজি সম্বোধন ‘লেডি’। তাহলে আমাদের দেশে এই রীতি বা চল কোথা থেকে এলো? আপু-আন্টি-খালা? কোনও সভ্য দেশে নারীর বয়স অনুযায়ী সম্পর্কের পাঁতানো ‘ডাক’ নির্ধারণের চল নেই। এমনকি আরব দেশেও নারীদের বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন সৈয়দা বা সাহিবাহ ইত্যাদি। সম্পর্ক বানিয়ে বা শরীরের সাইজ অনুযায়ী নয়। আমরা কোথা থেকে পেলাম এই অসভ্য অভ্যাস? বেশ কিছু দিন আগে আমার স্কুলের বন্ধু আকন্দ মামুন বলছিল, ‘সেদিন মাছের বাজারে গিয়েছি। মাছওয়ালা আমাকে ডাকে এই যে চাচা মাছ লইয়া যান। বিশ্বাস করতে পারিস? চাচা? বলো তো আমার টাক নাই, চুল সাদা না। শুধু পেটটা একটু বেড়েছে। তাই বলে আমি তার চাচা হয়ে গেলাম?’ ওর কথা শুনে সেদিন খুব হেসেছিলাম। তাও তো রক্ষা পুরুষদের শুধু মাছওয়ালাদের থেকে চাচা ডাক শুনতে হয়। কিন্তু আমাদের মতো তো প্রতিনিয়ত প্রতি স্থানে ডাকের অন্তরালে নিজের নাম ও পরিচয় নিয়ে অপমানিত নিগৃহীত হতে হয় না। শিশুকাল থেকে একজন নারীর এভাবে জনসমক্ষে যাকে বলা যায়, পাবলিকলি নিজের যৌবন বা শরীর নিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে হেনস্তা বা অপমানিত হতে হয় না। এটা হচ্ছে প্রতিদিন। প্রতিনিয়ত। সবার সামনেই।

শিশুকাল থেকে বেড়ে ওঠা একজন নারীর কাছে এই ধরনের ডাক বা নামকরণ তার চিন্তায় ভাবনায় কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে কখনও কি কেউ ভেবে দেখেছে? এটা কি ভার্বাল সেক্সুয়াল হ্যারেসমেন্টের পর্যায়ে পড়ে না? সংজ্ঞা অনুযায়ী মার্কেটে প্রতিটি নারীর যৌবন অনুযায়ী নানা নামে নানা বর্ণে ডাক কেনইবা ভার্বাল সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট হবে না?

পাবলিক ভাবি

সবে ১৯ বছর আমার। প্রেম করেছি। লাফাতে লাফাতে আনন্দে বিয়ে করে ফেললাম। বিয়ের পরেই প্রথম ধাক্কা। ভাবি। মানে? কিশোরী বয়সে বুদ্ধিতে লজিকে কুলায় না। চিন্তায় পড়ে গেলাম। বাবা না আমার নাম রেখেছিলেন একটা! ওটা গেলো কোথায়? একটু বুঝিয়ে বলি। আমি আমার ননদ দেবরের ভাবি ডাক নিয়ে বলছি না। ধরুন, আমার স্বামীর নাম ক্যাপ্টেন করিম। আমি এক লাফে করভী থেকে হয়ে গেলাম করিম ভাবি। কথা সত্য। আপনার স্বামী যে পদবিরই অধিকারী হোন না কেন, আপনার নতুন নামকরণ মাইনাস আকিকা করিম ভাবি। আজীবন সম্মাননা প্রাপ্তির মতো। ধরুন আপনি কোনও ডিসি বা এডিসির স্ত্রী। অবধারিতভাবে আপনার নামকরণ হয়ে যাবে ডিসি ভাবি বা এডিসি ভাবি। আপনার অজান্তেই আপনার অনুমতি ছাড়াই আপনি হয়ে উঠবেন পাবলিক কমোডিটি। আমার বিরুদ্ধে জেল জরিমানা বা ফাঁসির আদেশ হতেই পারে। কিন্তু ট্রুথ ইজ ট্রুথ। একজন নারীর নাম। তার নিজস্ব পরিচয়। সবটুকুই তখন ভাবি শব্দের চাপে চাপা পড়লো। অথচ ভাবি ডাকটির জন্ম হয়েছিল শাশ্বত বাঙালি পরিবারে একান্ত আত্মিক ও পরম ভালোবাসার সম্পর্কের নামকরণের জন্য। যার জন্য বলা হয় মায়ের পরেই ভাবি। অথচ ভারতীয় বা পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে স্ট্যান্ডার্ড ডাক ‘ম্যাডাম’ অথবা মিসেস। অথচ দুই দেশের ভাষাতেই ভাবি শব্দটি বিদ্যমান। আমাদের দেশ স্ত্রীদের ডাক নিয়ে এত ইনফরমাল ক্যাজুয়াল কীভাবে হতে পারে! ভাবতেই অবাক লাগে।

কোনও সময় যে পরিবারের ভাইয়ের স্ত্রী ভাবি বাসাবাড়ি থেকে সভা, সেমিনার, হাটে-বাজারে, স্বামীর কর্মস্থলে পাবলিক ভাবি হয়ে গেলো সেটা হিসাব করে বলা মুশকিল। তবে বলাই বাহুল্য, ‘৭০ দশকের আগে ভাবির এত ছড়াছড়ি সমাজে এমনভাবে ছিল না।

পাবলিক ‘ভাই’ কোথায় গেলেন?

শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ফলে আজ  নারীরা কোনও ফিল্ডে নেই। সরকারি উচ্চপদে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কিংবা বিচারপতি কিংবা সামরিক বাহিনীর অফিসার এমপি অথবা মন্ত্রী, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার, বিমানের পাইলট বা এয়ারফোর্স-নেভিকে  আপ্পি, ভাবি বা আন্টি নামে ডাকা হয় কিনা? কী মাথা খারাপের প্রশ্ন। মোটেও না। উপযুক্ত সম্মান সহকারে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করা হয়। বাহবা পাওয়ার যোগ্য নারীদের সম্মান দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি কোনদিকে যাচ্ছি বুঝেছেন তো? নারী ‘স্যার’দের স্বামীদের নামকরণ তাহলে কী হয়? ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আফটার অল স্যারদের স্বামী বলে কথা। স্বামীপ্রবরটি কিন্তু মোটেও পাবলিক বা জনগণের ভাই বনে যান না। অর্থাৎ উচ্চপদস্থ সব নারীর স্বামীই নিজ নামের সঙ্গে স্যার সম্বোধনটি উপভোগ করেন। একজন বাঙালি পুরুষ হয়ে তার স্ত্রীকে কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন। সেটাতেই দেশ ও জাতি ধন্য। তার ওপর স্বামীর নাম ছিনিয়ে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ধন্য হে সমাজ।

বঙ্গ নারীর অতীত কথা

বাংলা সাহিত্যের পাতা থেকে ‘খোকার মা’ যে আধুনিক নভেলের মিসেস ব্যানার্জি বা মিসেস রহমান হয়ে উঠে এসেছেন, সেই ঢের বেশি। পুরনো বাংলা সিনেমায় তো ‘হ্যাঁ গো’- ‘ওগো’ দিয়েই কাজ চলেছে। আর এখন তো প্রতি বছর নারী দিবসে নারীবাদী প্ল্যার্কাড নিয়ে নারীরা রাস্তায় হাজির। কম পথ তো হাঁটা হয়নি? কম স্বাধীনতা তো অর্জন করা হয়নি? তাও কি যথেষ্ট নয়? সেই ‘গৃহস্থ বাড়ির মেয়ে’ থেকে ‘গৃহস্থ বাড়ির বউ’। সে কি কম প্রাপ্তি? মন্দ কি ছিল এই দুই বাক্যের মধ্যে বঙ্গনারীর জন্ম, পরিচয়, ব্যাপ্তি, প্রচার, প্রসার ও সমাপ্তি। অধুনা ফেসবুকের কল্যাণে বঙ্গনারী ভাবি, আপা, আন্টি, খালাম্মা নামের ঊর্ধ্বে গিয়ে স্বামীর নামের সঙ্গে লেপ্টে লিখছেন নিজের নাম। নিজের ছবি। নিজ নামে অ্যাকাউন্ট খুলছেন। তাওবা কি কম যুগান্তকারী ব্যাপার! আহা কতই না সুমধুর নামে নারীদের অলঙ্কৃত করে এসেছে সমাজ যুগ যুগ ধরে। গৃহলক্ষ্মী, অর্ধাঙ্গিনী, রমনী, যুবতী, জয়িতা, মানসী, মানবী, ললনা ইত্যাদি। এসবইবা কম কিসে? আবার নিজের সম্বোধনটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে কেন? চারদিকে নারীর এত জয়গান কিন্তু শিক্ষিত বাঙালির চিরন্তন আইকন রবীন্দ্রনাথ সর্বত্র ‘মেয়ে’ লিখেই কাজ সেরেছেন।

ম্যানুয়াল আছে একটা

আমরা সবাই সবসময় একটা ম্যানুয়াল নিয়ে ঘুরি। নারী সম্বোধনের ম্যানুয়াল। পরিস্থিতি, সুবিধা বুঝে সেখান থেকে টুক করে যেকোনও সম্মোধন টুকে নিয়ে পাত্রী বিশেষে ব্যবহার করে নেই। বাড়তি ঝামেলা নেই। আহ কী দারুণ! আগের জমানায় অর্থাৎ দেশ স্বাধীনের আগে ও পরে আমার বাবা বা তার বন্ধুদের দেখেছি, কখনোই যেখানে-সেখানে ভাবি শব্দ ব্যবহার না করতে। বাবা মেইড ইট এ পয়েন্ট যে জুনিয়র কলিগ বা পরিচিত সবার স্ত্রীকে নাম ধরে সম্মান সহকারে ডাকার। আর আজকাল তো পুরুষদের মেমোরি ডাউনলোডের সমস্যা এত বেশি যে, কে যায় বাড়তি নাম মনে রাখতে! এতজনের স্ত্রীদের নাম মনে রাখা বাড়তি ঝামেলা বৈকি আর কী? এড়িয়ে যাওয়া এক ধরনের উপায় বটে। ম্যানুয়াল অনুযায়ী তোমার বউ ভালো আছে তো?

ছোট থেকেই আমাদের শেখানো হয় বয়সে একটু বেশি নারীদের আন্টি ডাকবে। সালাম দেবে। কিন্তু এই শিশু পুরুষরাই যখন নিজেদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘আন্টি’দের ওপর ক্রাশ খেতে থাকে, তখন কিন্তু ম্যানুয়েল অনুযায়ী ওই আন্টিই হয়ে যান ‘হট আন্টি’। এই নামে ওয়েবসাইট পেজ খুলে ফেলে গণহারে লাইক দেওয়াও শুরু হয়ে যায় আনন্দের সঙ্গে। কিছুই বলার নেই। তবে ‘আংকেল’ থেকে ‘হট আংকেল’রূপী কোনও ওয়েবপেজ বা নামকরণ দেখতে পেলাম না।

আজকাল তো আপু থেকে আপ্পি সম্বোধনে আপগ্রেড হয়েছে। এই আপ্পি শব্দটার বাংলা অভিধানিক উৎস বা অর্থ কী, সেটাই অজানা। সাধারণত ইয়াং জেনারেশনের কাছে ভীষণ পপুলার এই ডাকটি। বয়সসীমা থাকলেও ফেভারিট আন্টিরাও মুহূর্তে আপ্পি হয়ে উঠতে পারেন। ম্যাজিকাল!

ম্যানুয়েলে সব বয়সের সব সাইজের নারীদের সম্বোধন মজুত। আপনার কাজ শুধু পিক করা। নতুন নারীর সঙ্গে পরিচয়। তার আকিকা দেওয়া জন্মনিবন্ধন পত্র বা পাসপোর্ট বা এনআইডি-তে যেই নাম লেখা থাকুক না কেন, পুরুষ হিসেবে আপনার কাজটি হবে পিক অ্যান্ড চুজ ফ্রম দ্য ম্যানুয়াল। কে জানে এই ডাকের পেছনেই বিরাজ করতে পারে আপনার সঙ্গে ওই নারীর সম্পর্কের সম্ভাবনার নতুন জোয়ার।

ব্যতিক্রম আছে বৈকি

যদি বলা হয়, মার্কেট বা দোকানের কর্মচারীদের ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে। কারণ, ওরা অশিক্ষিত। তবে ধারণা খুবই ভ্রান্ত। ৯৯% কর্মচারী লেখাপড়া জানা শিক্ষিত। বরং ভেবে দেখুন তো প্রতিদিন আপনি আপনার বাসার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বা অফিসে যেসব পিয়ন বা সিকিউরিটি গার্ডদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তারা কি বলে সম্বোধন করে একজন নারীকে? কিংবা একজন রিকশাওয়ালা বা উবার চালক? এমনকি অন ডিউটি পুলিশ? অথবা খোদ ডিসি সাহেব নিজে? সম্বোধন কী করছেন? আপু? ভাবি? আন্টি? না। সবাই একডাকে আপনাকে ‘ম্যাডাম’ ডাকছে কিন্তু। কখনো বা ‘আপা’। সরকারি কর্মকর্তারা মাঝে মাঝে হয়তো উচ্ছ্বসিত হয়ে আবেগের বশে আপনাকে বড় জোর তার ‘দেশি বোন’ ডেকে ফেলতে পারেন।

গ্রামে যখন যাবেন, সেখানে স্থানীয় চেয়ারম্যানও কিন্তু আপনাকে আপা বা ম্যাডামই সম্বোধন করছেন। ‘লেকিন ও আলাগ বাত হ্যায়’ যখন সেই চেয়ারম্যানই তার অঞ্চলের নারীদের ‘পটলের বউ’ বা ‘পচার মা’র বাইরে কিছু ভাবতে বা ডাকতে পারে না।

অতপর হাবি

১৭ শতকের শেষ দিকে ইংরেজি ভাষায় এই শব্দের জন্ম হলেও কয়েক শত বছর পর অধুনা বাংলা ভাষায় নতুন শব্দ হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে। যার নাম ‘হাবি’। এই শব্দের জয়যাত্রা সাধারণত ফেসবুক বা কিটি পার্টি বা ক্লাব পার্টিগুলোতে লক্ষ করা যায়। ‘হাবি’ শুনে খাবি খাওয়ার আগেই এর জন্ম সম্বন্ধে বলে নেই। ‘হাবি’ হচ্ছে হাজব্যান্ডের সংকলন। হাজব্যান্ডের ইনফরমাল ডাক। ফেসবুক একটু ঘুরে আসলেই দেখবেন বাঙালি আধুনিক নারীর একটি গোষ্ঠী কী সুন্দর স্ট্যাটাস লিখছেন মি অ্যান্ড মাই হাবি/অব টু ভাকেশন উইথ হাবি/ আই লাভ মাই হাবি/হ্যাপি বার্থডে টু মাই হাবি ইত্যাদি। আমি আমার বিদেশি বান্ধবীদের টাইমলাইন চক্কর মারি খোঁজার জন্য। নাহ! ইংরেজ নারীদের ইংরেজি জ্ঞানের পরিধি বড়ই সীমিত। ‘হাবি’ শব্দটি অনুপস্থিত তাদের ফেসবুকে। বুঝতে পারলাম আমারই আধুনিকতায় সমস্যা বা জ্ঞানের অভাব। এটা অনেকটাই যেন ভাবি টাইপ ব্যাপার।

মাথা চক্কর দিচ্ছে কি?

ইউপি চেয়ারম্যান যেমন পটলের বউ বা পচার মা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ, তেমনি তার স্ত্রী হয়ে উঠছেন অঞ্চলের ‘চেয়ারম্যান বউ’। মাঝাখানে ‘এর’ শব্দটি জুড়বেন না প্লিজ। কারণ, এটা এমনই। আবার যে নারী শিক্ষিকা, তাকে প্রতিষ্ঠানের সবাই আপা/মিস বা ম্যাডাম ডাকলেও বাড়িতে যখন যাচ্ছেন তিনি অবলীলায় হয়ে উঠছেন রহিম ভাবি বা মার্কেটের আন্টি, খালাম্মা। বুঝতে পারি না, সমাজকে একজন নারীর নাম নিয়ে বলাৎকারের পরিহাসের স্পর্ধা কে দিলো? কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের নারী বসকে ভাবি বা আন্টি ডাক দিয়ে আসুন না। চাকরির ভয়ে নিজের ইগো বির্সজন? ডাক নিয়ে তামাশা আর না করি। 

নানা মত

বিজ্ঞাপন জগতের কর্ণধার ও উদ্যোক্তা নাজিম ফারহান চৌধুরী হাসতে হাসতেই বললো–‘আসল কথা বলো না রিভি তোমার খাল্লামা ডাক শুনতে পছন্দ হয় না। খাল্লামা বা ভাবি সম্মানেরই ডাক। কই আমাকে ‘ভাই’ ডাকলে তো সমস্যা লাগে না। ৩২ বছরের পারফর্মিং আর্টিস্ট ও এক কন্যাসন্তানের জননী ফারাহ নাজ মুন ক্রোধের সঙ্গে বলেন, আমাকে ‘ভাবি’ ডাকার মানে কী? আমি তার কোন ভাইয়ের বউ? আর খালা? তার মায়ের কোন বোন? আমার অসহ্য লাগে। ‘আপা’ তাও চলে।

সাংবাদিক বন্ধু আশরাফ কায়সার বলেন, নারীকে বিভিন্ন সম্বোধনে ডাকা এক ধরনের বৈষম্য বা ডিসক্রিমিনিশন।

বন্ধু সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি বলেন, ইটস ভেরি উইয়ার্ড। আপা? ভাবি? খালাম্মা? মিস বা ম্যাম নয় কেন? আমার নামটা মুখ্য নয় কেন? কাজের জায়গাতেও ‘আপা’ ডাকা হচ্ছে। কেন? সেদিন সচিবালয়ে একজন বললেন, ভাই কেমন আছেন? তার মানে আমি কি তার ‘ভাবি’? আমার স্বামীকে তিনি চেনেন? আমার স্বামীর কি নাম নাই? আমি এই ধরনের সম্বোধনের ঘোর বিরোধী।

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ফিল্মমেকার অমিতাভ রেজা বলেন, আসলেই তো এটা জটিল ব্যাপার। আশ্চর্য লাগছে এটা নিয়ে ভাবা হচ্ছে না কেন?

সত্যি কথা এই যে– একজন নারী তার পরিবারে বড় আপা, ভাবি, খালা, ফুপি, চাচি, মামি, নানি, দাদি অবশ্যই। সম্পর্ক অনুযায়ী নারীর সম্বোধন। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভালোবাসা, আদর, সম্মান। আমার অনেক বান্ধবীই ইতোমধ্যে নানি বা দাদি। তারা ডাকটি প্রাণভরেই উপভোগ করে। কিন্তু একজন অপরিচিত মানুষ আমাকে কেন আমার পারিবারিক ভালোবাসার সম্বোধন দিয়ে ডাকবে? ‘ভাই’ যদি পাবলিক ডাক হয়, হাস্যকর যে তার মানে অপরিচিত নারীকে সম্বোধন করা যাবে ভাবি ডাকে? বলাই বাহুল্য ভাইয়ের বিবাহিত স্ত্রী হচ্ছে ভাবি। ভাবি একক কোনও পরিচয় নয়। বাংলা অভিধান তাই বলে। একজন বিবাহিত নারী কীভাবে হতে পারে সবার ‘ভাবি’? বা অবিবাহিত নারীকে ‘ভাবি’ ডাকা কোন সভ্যতা?

ডাক হোক সর্বজনীন

শুনেছি শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক দেশবাসীকে সম্বোধন করেছিলেন এই নামে- ‘প্রিয় ভাই ও মাতারিগণ’। চমকানোর কোনও কারণ নেই। একসময় নারীর ‘মাতারি’ ডাকটি ছিল বাংলা সমাজে মযার্দাপূর্ণ। ময়মনসিংহে ‘বেটি’ বা ‘বেডি’ যেমন গালির ডাক, তেমনি বরিশালে ‘মাগি’ একটি মর্যাদার সম্বোধন। একবার বরিশালের এক শাশুড়ি খুব স্বাভাবিকভাবেই বৌ মাকে তার বান্ধবীদের খোঁজ নিতে গিয়ে বললেন, ‘মাগিগরে কিসু খাওন দাও’। কথা শুনে ঢাকাবাসী বান্ধবীরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ। বৌমা অনেক কষ্টে সবাইকে বোঝালো যে এই মাগি সেই মাগি নয়। একসময় নিজের স্ত্রীকে ‘বেগম’ সম্বোধনে পরিচয় করানো হতো। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের নারীদেরও ‘বেগম’ নামে ডাকা হতো। আরও আছে, যেমন- ঘরনী যখন ঘরের বাইরে তখন সে বারবনিতা। অর্ধাঙ্গিনী’র কোনও পুরুষ শব্দ নেই। কারণ, তার অর্থ অর্ধেক।

পাশ্চাত্যে একজন সিকিউরিটি গার্ড বা রেল কর্মচারী বা ক্যাশিয়ার এমনকি আপনার দরজা খুলে দেওয়ার মানুষটিকেও কিন্তু সম্বোধন করা হয় ‘স্যার’ বা ‘ম্যাম’ ডাকে। কারণ তারা ভদ্র জাতি। মানুষকে তার স্ট্যাটাস দিয়ে পরিমাপ করে না। আমরা নিজেরা কি চিন্তা করতে পারি– বাসার বুয়া বা রিকশাচালককে ন্যূনতম সম্মান দিয়ে ডাকার। আর ডাকবোইবা কি? নিজেই তো নিজের সম্বোধন নিয়ে নাজেহাল। বাংলা শব্দ নাকি নেই।।

অপরিচিতের কাছে আমি মোটেও ইন্টারেস্টেড নই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পর্কের সম্বোধনের ডাক নিয়ে পরিচিত হতে। কেন হবো? ভদ্র ও শিক্ষিত বিশ্ব যদি নারীকে সম্বোধন করতে পারে সর্বজনীন মার্জিত ভাষায়, আমাদের দেশে কী সমস্যা? আমাদের সমাজের সমস্যা কী? আমি আমার সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই। আমি চাই না আমার মেয়েরা বা তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম–আমার মতো প্রতিদিন প্রতিনিয়ত সম্বোধনেই হতে থাকুক নিগৃহীত অপমানিত ও মানসিকভাবে বলৎকারিত।

লেখক: সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

/এসএএস/এমওএফ/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ