মিডিয়া অ্যাক্টিভিজম ও কিছু সতর্কতা

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৪:২০, আগস্ট ১৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২২, আগস্ট ১৮, ২০১৮

মো. সামসুল ইসলামসম্প্রতি পত্রিকায় দেখলাম শিশু-কিশোরদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের সময় ফেসবুকে আন্দোলনকে উসকে দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে এটিই শুধু সাম্প্রতিক কালের এ সম্পর্কিত একমাত্র ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখছি অনেকেই বিশেষত অ্যাক্টিভিস্টরা সোশ্যাল, মূলধারার বা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় লেখালেখি বা কথা বলতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন বা পড়ছেন।
মিডিয়া বিষয়ক শিক্ষকতার সঙ্গে অনেকদিন যুক্ত থাকার সুবাদে আমি এটিকে মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব হিসেবে দেখতে চাই। একাডেমিক পরিভাষায় একে অনেকে মিডিয়া লিটারেসি বা গণমাধ্যম সাক্ষরতার ব্যাপারে দুর্বলতা বলবেন। সেই সঙ্গে সমসাময়িক আইন, রাষ্ট্রীয় বা বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে জ্ঞানের অভাব তো আছেই।
আমার এ লেখাটি লেখার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে যে আমি আমার ফেসবুকে অনেক তরুণ-তরুণী বা অন্যদের পোস্ট বা মন্তব্য দেখি যেগুলো আমার কাছে বিপদজনক মনে হয়। বিপদ যে শুধু সবই সরকার বিরোধিতার জন্য তা আমি বলছি না। অনেক সময় এটি অন্যদের অধিকার বা আমাদের বিদ্যমান আইনকেও লঙ্ঘন করে। আমি এজন্য সবাই বিশেষত তরুণরা কিভাবে সতর্ক থাকবেন সে সম্পর্কে কিছু পরামর্শ তুলে ধরতে চাইছি।

উদাহরণ হিসেবে প্রথমেই আমি সাম্প্রতিক শিশু-কিশোর আন্দোলন নিয়ে আমার অভিজ্ঞতার কথাই বলি। আন্দোলন শুরুর দুই একদিনের মধ্যেই আমার মনে হয়েছে এটি হয়ত সহিংসতার দিকে গড়াবে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো এটি ছিল শিশু কিশোরদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। আমার কাছে মনে হয়েছিল এখানে কোনোভাবেই আমাদের মতো বড়দের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তাই আমি এ ব্যাপারে ফেসবুকে কোনও পোস্ট দেইনি। ধরা যাক আমার একটি পোস্টে উদ্বুদ্ধ হয়ে কিছু শিক্ষার্থী কোথাও গিয়ে সহিংসতার মুখোমুখি হলো। এর দায়ভার তখন তো আমাকেই নিতে হবে। আর অভিযোগ যে সরকারের তরফ থেকেই হবে তা নয়। অভিযোগ তাদের অভিভাবকদের তরফ থেকেও হতে পারতো।

দেশের স্কুল-কলেজতো আছেই, এমনকি আমি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও দেখেছি যে তারা তাদের শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের বাইরে কোনও পিকনিক বা স্টাডি ট্যুরে নিয়ে গেলে অভিভাবকদের লিখিত অনুমতি আনতে বলেন। কারণ রাস্তাঘাটে বা অন্যকোথাও দুর্ঘটনার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষ নেবেন না। শিশু-কিশোরদের ব্যাপারে আইন পৃথিবীজুড়েই বেশ কঠিন।

কিন্তু এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে দেখলাম এটা অনেক অনলাইন ব্যবহারকারী বয়স্করা বুঝেননি। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক তারা বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন, তাদের উৎসাহিত করেছেন। তারা কি এখন পরবর্তী সহিংসতার দায় নেবেন? এক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতা কাম্য ছিল।

আবার ফেসবুক, ইউটিউব বা মূলধারার মিডিয়াই হোক, যে কোনও মিডিয়ায় মন্তব্য বা বার্তা প্রকাশের পূর্বে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজের সামাজিক অবস্থানটি জানা জরুরি। যেমন কাগজে-কলমে জাতিসংঘের সব সদস্যের মর্যাদা সমান হলেও পৃথিবীতে শক্তির দিক দিয়ে সব রাষ্ট্র সমান নয়। তেমনি ফেসবুকে সবাই ফ্রেন্ড হলেও সবার সামাজিক অবস্থান সমান নয়। আর এখানেই অনেকে ভুল করেন।

একটি উদাহরণ দেই। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সাধারণ মানুষের চোখে এবং সব সরকারের কাছেই বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। স্বাধীনতাযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন আন্দোলনে তাদের অবদান ও আত্মত্যাগ তাদেরকে এ মর্যাদার অধিকারী করেছে। তাদের কেউ কেউ পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে অনেক বিবৃতি দিতে পারেন বা ফেসবুকে মন্তব্য করতে পারেন। তাতে তাদের হয়তো বিশেষ কোনও ক্ষতি হবে না। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যদি একই কথা বলেন তখন অনেকেরই বিরাগভাজন হতে পারেন।

একইভাবে আমাদের সমাজে অনেক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বা প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক আছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে তারা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। সবাই যে সেটা নন তা মনে রাখতে হবে। তাদের মতো বক্তব্য যে সবাই দিতে পারেন না সেটাও ভুলে যাওয়া চলবে না।

আবার কোথায় থেকে কে মিডিয়ায় প্রচারণা চালাচ্ছেন তাও খেয়াল রাখতে হবে। যেমন অনেক প্রবাসী ফেসবুকে বা টিভিতে অনেক ধরনের মন্তব্য করেন। ইন্টারনেট তো জঙ্গিবাদ ছড়ানোর একটি জায়গাও বটে। অনেক সময় অনেক প্রবাসী দেখি ফেসবুকে বেশ উত্তেজক মন্তব্য করেছেন। তা তারা করতেই পারেন। বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে অনেকের বিরুদ্ধে অনেক কিছুই বলা যায় কিন্তু তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দেশে অবস্থানকারীদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

মিডিয়া অ্যাক্টিভিজমের মাধ্যমে যারা তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক বা অন্যান্য দাবি আদায় করতে চান তাদের প্রথমে মিডিয়াকে বুঝতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আমাদের দেশে অরাজনৈতিক আন্দোলনের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। এধরনের আন্দোলনের আন্দোলনকারীদের বুঝতে হবে যে তারা রাজনীতিবিদ নন। সুতরাং দাবি আদায়ে তাদের কৌশল ও আন্দোলনের পরিভাষা হতে হবে রাজনীতিবিদের চেয়ে ভিন্ন।

এটা কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কেউ রাজনীতির মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে চাইলে তাকে কেউ বাধা দেবে না। এক্ষেত্রে তার অবস্থান কিন্তু পরিষ্কার। তিনি রাজপথে সরকারের সঙ্গে মারামারি করুন বা আলোচনা করুন সেটা তার ব্যাপার।

কিন্তু ইস্যুভিত্তিক অরাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম ভিন্ন ব্যাপার। আমি এখানে মূলত অরাজনৈতিক মানুষদের কথা বলতে চাইছি যারা তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে মিডিয়ায় বিভিন্ন মন্তব্য করেন।

শুধু যে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপারে বলছি তা নয়। টেলিভিশন সহ মূলধারার মিডিয়ায় বক্তব্য দেওয়ার সময়ও অনেক সাবধানী হতে হবে। যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। মিডিয়া সম্পর্কে ইংরেজিতে একটি কথা প্রায়ই বলা হয় আর তা হলো media thrives on sensationalism– তাই পাঠক-দর্শকের আগ্রহ সৃষ্টির প্রচেষ্টা মিডিয়ার সবসময় থাকে। ক্যামেরার সামনে তাই থাকতে হবে মহাসতর্ক। সাম্প্রতিক শিশু-কিশোর আন্দোলনের সময়ও তো আমরা তাই দেখলাম। মন্ত্রী শাজাহান খানের একটি অপ্রসাঙ্গিক হাসি কী ঘটনারই না জন্ম দিলো!

মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট তো দূরের কথা, অনেক বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতাদেরও আমরা দেখেছি মিডিয়ার কারণে বিপদে পড়তে।

গত ১৬ আগস্ট এক সংবাদে পড়লাম ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অনলাইনে নিরাপদ থাকার প্রশিক্ষণ দেবে সরকার। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারকে উদ্ধৃত করে বাংলা ট্রিবিউন জানায় মূলত তরুণদের জন্যই এই উদ্যোগ, তারা যাতে কল্যাণকর কাজে ইন্টারনেটকে ব্যবহার করে, ঝুঁকিপূর্ণ করে না তোলে। আমি মনে করি এটি অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। সরকার ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে।

আসলে এক্ষেত্রে পড়াশোনার বিকল্প নাই। মিডিয়া এডভোকেসি, মিডিয়া অ্যাক্টিভিজম, ক্যাম্পেইনিং, লবিং ইত্যাদির জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত জ্ঞান এবং এদের জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল। যারা তাদের দাবি দাওয়া পূরণের জন্য এসবের আশ্রয় নিতে চান, তাদের প্রতি একটিই অনুরোধ আপনারা আগে দয়া করে পড়াশোনা করুন, মিডিয়ার ব্যবহার ও অপব্যবহার সম্পর্কে জানুন তারপর অ্যাডভোকেসি বা অ্যাক্টিভিজম ইত্যাদিতে অংশ নিন। এর ফলে আপনারা নিজেরা যেমন নিরাপদে থাকতে পারবেন তেমনি অন্যদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারবেন।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

ইমেইলঃ [email protected]

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ