‘রাজনীতি বিশুদ্ধকরণ’ প্রকল্প কতটা সম্ভাবনাময়?

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ২০:২২, আগস্ট ২৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২৪, আগস্ট ২৮, ২০১৮

মো. জাকির হোসেনড. কামাল হোসেন ও অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী জীবনের অপরাহ্ন বেলায় এসে আমাদের পচা-গলা-সহিংস, নষ্ট-নোংরা-অশ্লীল রাজনীতিকে বিশুদ্ধকরণের প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। প্রকল্পের নাম দিয়েছেন ‘রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন’। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে লোকবল ও ভোটবল দরকার, তা এই দুই জনের কারোরই না থাকায়  প্রকল্প বাস্তবায়নের ঠিকাদার হিসাবে বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপিকে। যদিও এ ধরনের কাজের ঠিকাদার হিসাবে মারাত্মক বিচ্যুতির জন্য বিএনপি একাধিকবার জনতার আদালতে অভিযুক্ত ও কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে। বদরুদ্দোজা চৌধুরী নিজেও অতীতে বিএনপিকে অভিযুক্ত করে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে বলেছেন, ‘বিএনপি দেশে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা করে রাখতে চায়। আইন বলে তারা কোনও কিছু রাখবে না। তারা চায় তাদের কথাই হবে আইন। বিএনপি যদি আবার ক্ষমতায় আসে তারা আইন বলে কোনও কিছু রাখবে? দেশের সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্টে গিয়ে যারা হামলা চালাতে পারে, তারা নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে কোনোদিন দেশ চালাতে পারবে না’। তারপরও বদরুদ্দোজা চৌধুরীরা বিএনপিকেই এ মহান প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বেছে নিয়েছেন। কথায় বলে, মানুষ বদলায়। কারণে বদলায়, অকারণে বদলায়। বদরুদ্দোজা চৌধুরীরই ভালো বলতে পারবেন, ঠিক কী কারণে তিনি তার অবস্থান ৩৬০ ডিগ্রি পরিবর্তন করলেন।

রাজনীতি ‘বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প’ আমার মনে কিছু কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর সাবেক সৈনিক ড. কামাল হোসেন তার বিভিন্ন বক্তব্য, সাক্ষাৎকার ও লেখায় এ সত্য তুলে ধরেছেন। বলেছেন,  বাঙালির প্রাণভোমরা বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্থপতি ও স্বাধীনতার ঘোষক। এ বিষয়ে কামাল হোসেনের কিছু বক্তব্য তুলে ধরছি। ২০১৬ সালের মে মাসে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ করি, এখনও করি।’

‘সাপ্তাহিকের’ সঙ্গে সাক্ষাৎকারে স্বাধীনতার ঘোষক বিষয়ে কামাল হোসেন বলেছেন, ‘বিএনপি যেটা বলে এটা একদম বাজে কথা। আই অ্যাম শিওর, আমি নিজে জিয়াউর রহমানের পঠিত ঘোষণা শুনেছি। শুনে সবারই তো ভালো লেগেছে। তিনি ঘোষণা করেছেন, অন বিহাফ অব শেখ মুজিব। পরে তিনি নিজেই লিখে এটা স্বীকার করেছেন। দ্বিতীয়ত, পরে এখানে ডিটেইলস সবাই বলেছেন। এম আর সিদ্দিকী বলেছেন, হান্নান সাহেব বলেছেন। সবাই বলেছেন।’

 প্রসঙ্গত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা প্রয়াত ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ ১৯৯৫ সালের ২৬ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষণাকারী হিসেবে অস্বীকার করা সংবিধান লঙ্ঘন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি। একে শুধু সংবিধানের অংশ বললে খাটো করে দেখা হবে। মূলত এই ঘোষণাপত্রকে অস্বীকার করা স্বাধীন বাংলাদেশকে অস্বীকার করার শামিল। ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে লেখা আছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক। এই ঘোষণা অস্বীকার করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে অবমাননার তুল্য। এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।’

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ড. কামাল হোসেনের আরও একটি মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রারম্ভিকলগ্নে একটা অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেছিলেন, ‘বলা হতো অসম্ভবকে সম্ভব করা হলো, সেটা বঙ্গবন্ধু করেছেন। এবং আমার মনে আছে কিসিঞ্জার উনাকে যে ট্রিবিউটটা দেন। ইউ হ্যাভ ডিফাইড হিস্ট্রি। আমাদের ইতিহাসসেবীদের দৃঢ়বিশ্বাস ছিল এভাবে একটি রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠা হতে পারে না, কিন্তু তোমরা করে ফেললে। যা হওয়ার নয়, যা অসম্ভব, যা সমীকরণে মেলে না, যা অসাধ্য তার সবটাই যেন ধরা দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কাছে।’ প্রশ্ন হলো, বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে, মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষ হিসাবে ও স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে অস্বীকারকারী বিএনপির সঙ্গে কীভাবে কামাল হোসেনের ঐক্য হতে পারে? যদি হয়ও, তাহলে বঙ্গবন্ধুকে তথা প্রকারান্তরে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে অস্বীকারকারী বিএনপির সঙ্গে ঐক্য কীভাবে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনবে? ড. কামাল হোসেনের বিশ্বাসের বাংলাদেশ ও বিএনপির বিশ্বাসের বাংলাদেশ তো এক বাংলাদেশ নয়। বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে ড. কামাল হোসেন তো ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি ও আদর্শে বিশ্বাসী। অন্যদিকে বিএনপি তো ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী নয়। বরং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ৭২-এর সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছেন। তাহলে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনে কামাল হোসেন কোন রাজনৈতিক গুণগত পরিবর্তন প্রতিষ্ঠা করতে চান? আওয়ামী লীগবিরোধী ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রধান ঘটক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা, বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর নূরের পরিবারের সদস্য। জাফরুল্লাহ চৌধুরী সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর নূরকে ক্ষমা করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। অন্যদিকে, সম্প্রতি এক সভায় তিনি বলেছেন, ‘আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও বিশৃঙ্খলা হবে, নৈরাজ্য হবে। খালেদা জিয়াও তা ঠেকাতে পারবেন না।’ যদি তাই হয়, তাহলে কেন বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের প্রকল্প? ডা. বদরুদ্দোজা তো নিজেই বিএনপির লোক ছিলেন। জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে ঘোরবিশ্বাসী। ‘জিয়াবাদ’ শিরোনামে বইও লিখেছেন তিনি।

‘রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন’ প্রকল্পে অন্যসবের মধ্যে দুর্নীতি বন্ধ ও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার কথা উল্লেখ করা  হয়েছে। খুবই প্রশংসনীয় বিষয়। ২০১১ সালে বিশ্ব ব্যাংক ও জাতিসংঘের ড্রাগ ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (UNODC)-র যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত Asset Recovery Handbook-এর একাধিক জায়গায় একজন বিএনপি নেতা কর্তৃক সিমেন্স কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ এবং ঘুষের অর্থ সিঙ্গাপুরে পাচার ও আমেরিকার আদালতে তা প্রমাণিত হওয়ার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। পাচারকৃত অর্থ সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত আনার পরও বিএনপি একে ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ বলে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছে।  এমন সত্যকে অস্বীকার করে গুণগত পরিবর্তন সম্ভব হবে?

ঐক্যজোটের অন্যতম লক্ষ্য হলো, আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান। কেবল সুষ্ঠু ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করলেই কি রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ও গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে? চারটি নির্বাচন তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হলো। ৪৭ বছরের বাংলাদেশে ২০ বছর তো তত্ত্বাবধায়কের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচিত সরকারের দ্বারাই পরিচালিত হলো। রাজনীতিতে কোনও গুণগত পরিবর্তন হয়েছে কী?

তারপরও ধরে নিলাম ঐক্য হলো। গুণগত পরিবর্তনের জন্য বিএনপির সঙ্গে লিখিত চুক্তি হলো। যদিও আইনের ভাষায় এটি চুক্তি নয় এবং এর কোনও আইনগত মূল্যও নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ  নির্বাচনও হলো। নির্বাচনে ঐক্যজোট জয়ী হলো। কে সরকার গঠন করবে? নিঃসন্দেহে বিএনপির প্রাধান্যসহ সরকার গঠিত হবে। বিএনপি চুক্তি লঙ্ঘন করবে না, তার নিশ্চয়তা আছে? উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী  বিএনপি ২০০১-এর নির্বাচনে ভারতের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পালন করেনি। বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক হাইকমিশনার দেব মুখোপাধ্যায় বিএনপির ভারত সফর বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ওরা ৮০ ও ৯০ দশকের ভুল শুধরে সরে আসতে চাইছে ভালো কথা, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০০১ সালের ভোটের আগে তারেক রহমান নিজে ঠিক এই ধরনের কথাই বলেছিলেন। ঠিক এভাবে ভারতকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস জানে, ক্ষমতায় এসে তার দল কোন ভূমিকা নিয়েছিল। ভারতকে তারা বোকা বানিয়ে দিয়েছিল।’ ভারতের তুলনায় কামাল হোসেনদের চুক্তি তো অনেক কমজোরি। বিএনপি যদি চুক্তি লঙ্ঘন করে তখন রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন দূরে থাক, প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার রাজনীতির যে ভয়াবহ পরিণতি সৃষ্টি হবে, তার বিরুদ্ধে ড. কামাল হোসেন, বি. চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না ও আসম রবরা একত্রিত হয়েও কিছু করার ক্ষমতা কি রাখেন? তাদের ডাকে হাতেগোনা কয়েকজন মানুষের বেশি কি রাস্তায়  নামবে? ঐক্য প্রক্রিয়ার হাতধরে আবারও যদি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তানি তাহজিব-তমুদ্দুন গ্রাস করে ফেলে শহীদের রক্তস্নাত ও মা-বোনের সম্ভমের বিনিময়ে অর্জিত প্রিয় মাতৃভূমিকে তাহলে ড. কামাল হোসেন, বি. চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না ও আসম রবরা ইতিহাসের ‘খলনায়ক’ হিসেবে বিবেচিত হবেন নাকি?

অনেক আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালিকে সতর্ক করেছিলেন, শাস্ত্রবেত্তা এই ধর্মগুরুরা অনেক রকম বিধান দিয়ে থাকেন, দক্ষিণার জোরে। কোত্থেকে দক্ষিণা আসছে? কোন দক্ষিণার জোরে কেবল দল ও ব্যক্তি (শেখ হাসিনা) বিদ্বেষের কারণে মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক আদর্শের ক্ষেত্রে ভয়ানক বিরুদ্ধ শক্তির মধ্যে মিলন ঘটিয়ে ‘রাজনীতি বিশুদ্ধকরণে’র এ অবাস্তব প্রকল্প জানতে চাই। মনে সন্দেহ বাড়ছে এবং তা জোরালো হচ্ছে।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ