রোহিঙ্গা সংকট: জাতিসংঘের সুপারিশে প্রয়োজন বৈশ্বিক সমর্থন

Send
আহমেদ আমিনুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:৪২, আগস্ট ২৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৪, আগস্ট ২৮, ২০১৮

আহমেদ আমিনুল ইসলামরোহিঙ্গা নিধনে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদত থাকায় আন্তর্জাতিক আদালতে তাদের বিচারের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের তদন্ত কমিটি। একটি জাতিসত্তার সুরক্ষায় এটি সময়োচিত উদ্যোগ। এ উদ্যোগে বৈশ্বিক সমর্থন প্রয়োজন। নতুন করে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের এক বছর পূর্ণ হয়ে গেছে। গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনের নিরাপত্তা ছাউনিতে ‘আরসা’র কথিত হামলার প্রতিশোধ নিতে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমান নারী-পুরুষ এবং শিশুদের ওপর সেনাবাহিনী নৃশংস হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করে। শুধু হত্যাযজ্ঞই নয়- রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদের লক্ষ্যে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং ধর্ষণের মতো অমানবিক নির্যাতন চালাতে থাকে। সেখানকার ভয়াবহতা থেকে আত্মরক্ষার স্বার্থে অনেক রোহিঙ্গা সপরিবারে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। রোহিঙ্গারা বাংলা ভাষাভাষী বলে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নাগরিক বলে, সর্বোপরি রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ মুসলমান বলে মুসলমানপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর ছিল এক মনস্তাত্ত্বিক চাপ। এছাড়া, ১৯৭১ সালে স্ব-দেশে নির্যাতন ও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে শরণার্থী হয়ে জীবনযাপনের কথা মনে করে এবং চরম মানবিক অসহায়ত্ব ও বিপর্যয়কে সুরক্ষা দিতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সীমান্ত খুলে দিয়ে তাদের জীবন বাঁচিয়েছেন- মানবিকতার পক্ষে নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করেছেন। পক্ষান্তরে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি সমস্যার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত রহস্যময় আচরণ করছেন। মিয়ানমারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক শিষ্টাচার ও মানবিক মূল্যবোধ সবই যেন রহস্যময়তার গহ্বরে নিমজ্জিত।

যে বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে আমাদের মনের ভেতর-মহলে এক উদারনৈতিক চিত্রকল্পের অধিবাস, মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নাগরিকদের কট্টর-পন্থা আমাদের মনের ভেতরকার শাশ্বত সেই চিত্রকল্পকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে! রাখাইনে সংঘটিত গত বছরের সহিংসতায় ১০ হাজার বেসামরিক নারী-পুরুষ ও শিশুহত্যা এবং প্রায় ছয় হাজার ধর্ষণের ঘটনা আমাদের স্তম্ভিত করে! সভ্যতার বড়াই করা বিশ্বকেও মানবিকতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়! কিন্তু একরোখা ও অমানবিক মিয়ানমারের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই! যে-রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়ে জাতিগত নিধনে তৎপর হতে পারে, যে-রাষ্ট্র তার সেনাবাহিনী ও নির্দিষ্ট একটি বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের মতামতকেই প্রকাশ্যে প্রাধান্য দেয়, আর যাই হোক সে-রাষ্ট্র কখনোই আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্র হতে পারে না। নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রদানের ক্ষমতাধর চীন ও রাশিয়া স্ব-স্ব ব্যবসায়িক স্বার্থে এরকম একটি অমানবিক রাষ্ট্রকেও  সমর্থন দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার উভয় দেশের সীমান্তবর্তী বৃহৎ রাষ্ট্র হয়ে ভারতও নানাবিধ রাজনৈতিক কারণে কার্যত কোনও ভূমিকা রাখছে না। আমরা যে মানবিক বিশ্বের স্বপ্ন দেখি তা শক্তিধর রাষ্ট্রের ‘স্বার্থ’ ও ‘রাজনীতি’র কারণে অহরহই পদদলিত হচ্ছে। অন্যদিকে, মিয়ানমার রাষ্ট্র হিসেবে সেনাবাহিনীকে সকল আইনের ঊর্ধ্বে রেখে নিজেদের অমানবিক এবং অনাধুনিক অবয়বকে স্পষ্ট করে তুলেছে। 

বাংলাদেশ সাময়িকভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল। ভাবা হয়েছিল রাখাইনের পরিবেশ শান্ত হলে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করবে। কিন্তু বিগত এক বছরে তারা কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। উপরন্তু, ‘পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া’ করার মতো অভিযোগ তুলে সম্প্রতি সু চি বলেছেন, ‘বাংলাদেশই চায় না রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে আসুক’। তার এই মন্তব্য কোনোভাবেই দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক নয়। বাংলাদেশ সর্বদাই শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজেছে। সর্বদা দায়িত্বশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মতোই মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা, সমঝোতা কিংবা বিভিন্ন চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু মিয়ানমার সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করেনি। নিজেরাই একের পর এক ভঙ্গ করে চলেছে বিভিন্ন চুক্তি ও স্বাক্ষরিত সমঝোতা। ফলে, বিগত এক বছরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎরতা নিয়ে প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। এখন মূল্যায়ন চলছে বিগত এক বছরের কূটনৈতিক সাফল্য ও ব্যর্থতার।

সাদা চোখে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আমাদের চোখে না পড়লেও সংকট নিরসনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা একেবারে ব্যর্থ হয়েছে একথা বলা ঠিক হবে না- তৎপরতা ধীরগতিসম্পন্ন তা বলা যেতে পারে। কোনও সমস্যার সমাধানই  ত্বরিত গতিতে সম্ভব নয়। আর রোহিঙ্গা সমস্যা তো দীর্ঘদিনের। যদি ভাবা হয়, যত দ্রুত সংকট সৃষ্টি হয়েছে তত দ্রুতই এর সমাধান সম্ভব, তা ঠিক নয়। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার যখন নাগরিকই মনে করছে না তখন এই সংকট মোকাবিলা শুধু কঠিনই নয়, সময়সাপেক্ষও বটে। তবু বাংলাদেশ ধীরে ধীরে হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকটকে বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপনে সক্ষম হয়েছে। মিয়ানমার একঘেয়েমি ও একরোখা মনোভাব বজায় রাখলেও বৈশ্বিক চাপ যে তার ওপর সক্রিয় তা তারা নানাভাবে উপলব্ধি করছে। রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সমঝোতা অনুযায়ী এখনও দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করেনি। তা সত্ত্বেও, বাংলাদেশ ঠান্ডামাথায় মিয়ানমারের সঙ্গে একের পর এক আলোচনার টেবিলে বসছে, কথা বলছে নানাভাবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিভিন্ন স্তরে চালিয়ে যাচ্ছে সংকট সমাধানের আলোচনা। ফলে, ক্রমশ মিয়ানমারের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হচ্ছে একথা সহজেই বলা যায়।

রোহিঙ্গা নিধনের নেতৃত্ব দেওয়ায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জোরালো হয়ে উঠেছিল বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা থেকে। আর এ সপ্তাহে জাতিসংঘের তদন্ত কমিটির সুপারিশেই এরূপ দাবি করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কয়েকজনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে। সর্বশেষ ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্ট থাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে অবশ্যই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে’ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকও ইতোমধ্যে মিয়ানমার সেনাপ্রধানকে ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। গত ২৭ আগস্ট জাতিসংঘের প্রকাশিত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর সঙ্গে বেসামরিক কর্তৃপক্ষও রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে ইন্ধন জুগিয়েছে। রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চিও তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে নিধনযজ্ঞ ও সহিংসতা থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এই প্রতিবেদনে রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণকে মিয়ানমার সরকারের ‘প্রত্যাখ্যান’ ও ‘অস্বীকার’-এ জাতিসংঘ অবাক ও বিস্মিত হয়েছে। জাতিসংঘ এর আগেও মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনকে সমালোচনা করেছে। সেসব প্রতিক্রিয়া ছিল গণমাধ্যমের বিভিন্ন সংবাদ ও প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এবারকার এই প্রতিবেদনটি জাতিসংঘের নিজস্ব। তাই এরূপ ধারণা করা যেতেই পারে যে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এটিই মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কড়া সতর্কতা এবং নিন্দা। 

গত বছরের ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা চৌকিতে ‘আরসা’র হামলাকে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ হিসেবে বুঝানোর চেষ্টা করা হলেও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট হয়েছে, রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করতে এবং তাদের সেখানে ফিরে যাওয়ার সকল পথ বন্ধ করতে আরসার হামলার আগেই সেনা অভিযান শুরু হয়েছিল। অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাড়ে সাত লাখ মানুষ। বিগত এক বছরে রাখাইন পরিস্থিতির কোনও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষর হওয়া বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা মোতাবেক রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কোনও দৃশ্যমান উদ্যোগ মিয়ানমার এখনও গ্রহণ করেনি। বরং এখনও মাঝে মধ্যে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ চলেছেই। ফলে, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরের প্রত্যাশা করতেও ভরসা পাচ্ছে না।

রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে অংশ নেওয়া ছয় সেনা কর্মকর্তার নাম জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় নির্বাহী উপদেষ্টা অং সান সু চির সাংবিধানিক ব্যর্থতার বিষয়টিও। সহিংসতা দমনে তার ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টিও বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিতর্কিত হয়ে পড়েছে তার নোবেল পুরস্কারও। জাতিসংঘ ছয় সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের সুপারিশ করেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত কয়েক দশক ধরেই পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। জন্মের পর থেকেই কাঠামোবদ্ধ নিপীড়নের শিকার হয় রোহিঙ্গারা। প্রতিবেদনে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কচিন, শান  ও রাখাইন প্রদেশে ঘটা নিপীড়নের মধ্যে হত্যা, জেল নিপীড়ন, ধর্ষণ ও দাসত্বের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসবই আন্তর্জাতিক আইনে ঘৃণ্য অপরাধ। রাখাইনে হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগে বাড়িঘর  ধ্বংস এবং দেশত্যাগে বাধ্য করার আলামত পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্র, রাষ্ট্রপ্রধান, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা মিয়ানমারের একগুঁয়ে কর্মকাণ্ড পরিহার এবং শত শত বর্ষ ধরে পুরুষানুক্রমে রাখাইনে জন্মগ্রহণ করা রোহিঙ্গাদের মর্যাদার সাথে রাখাইনে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিক মর্যাদাদানের দাবি জানিয়ে এলেও মাত্র দু-একটি দেশের হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং মিয়ানমার অন্যায্য সমর্থনের ফলে রোহিঙ্গা সংকটের কোনও স্থায়ী সমাধান সম্ভব হচ্ছে না। সাড়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপ সামলানো বাংলাদেশের জন্য কষ্টকর হলেও সামগ্রিকভাবে মানবিক বিশ্বকে উপলব্ধি করতে হবে এ সংকট কেবল বাংলাদেশের একার নয়, ভবিষ্যৎ বিশ্বের সম্মুখেও একটি বড় সংকট। সুতরাং সময় থাকতেই ‘স্বার্থ’ ও ‘রাজনীতি’কে পেছনে ফেলে এবং একটি জাতিসত্তাকে মর্যাদার সঙ্গে স্ব-দেশে, নিজ জন্মভূমিতে প্রতিষ্ঠাদান বিশ্ববাসীর দায়িত্ব। জাতিসংঘের সুপারিশের প্রতি সমর্থন এবং বাস্তবায়নেও বিশ্ববাসীর সক্রিয় উদ্যোগ জরুরি। কেবল বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা অনুসন্ধান অর্থহীন বলে মনে করি।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ