ইভিএমের লাভ-ক্ষতি

Send
মাসুদ কামাল
প্রকাশিত : ১৯:০৭, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৮, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৮

মাসুদ কামালইভিএম নিয়ে ‘চোর-পুলিশ’ খেলা চলছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে কিনা, তা নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে তর্ক চলছে। কেউ বলছেন, ইভিএম থাকবে; কেউ বলছেন, থাকবে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হওয়ার পর নির্বাচনি আইন সংশোধনের লক্ষ্যে বেশকয়েকটি বৈঠক হয়েছে। এর কোনোটিতেই ইভিএমের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনও কথা হয়নি।  কিন্তু যখন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হলো, তখনই তাতে ইভিএম ব্যবহারের প্রসঙ্গ ঢুকে গেলো। কেবল তাই নয়, এই সময়ে আরও জানা গেলো, দেড়লাখ ইভিএম কেনার জন্য ব্যাংকে ঋণপত্রও খোলা হয়ে গেছে। আর এজন্য নাকি প্রায় চার হাজার কোটি টাকা লাগবে!
এটুকু খবর নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছিল, তখন দেশজুড়ে দু’টি পক্ষও স্পষ্ট হয়ে গেলো। মন্ত্রীরা বলতে লাগলেন–ইভিএম খুব ভালো, বিএনপি নাকি কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করছে। আর এক মন্ত্রী বললেন, বিএনপি জনগণের রায়কে ভয় পায় বলেই ইভিএমের বিরোধিতা করছে। আর বিএনপি বললো– ভোট চুরি করতেই সরকার হঠাৎ করে ইভিএম চালুর ষড়যন্ত্র করছে। নির্বাচন কমিশনের মধ্যেও আসন্ন নির্বাচনে ইভিএম চালু নিয়ে মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে এলো। কমিশনারদের একজন মিটিংয়ে ইভিএমের বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিলেন। বললেন, আসন্ন নির্বাচনে ইভিএম চালুর বিষয়ে তিনি একমত নন। কেন একমত নন, সে বিষয়ে তার যুক্তিগুলোও বললেন। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই এক মন্ত্রী মন্তব্য করলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের সময় এই কমিশনার—মাহবুব তালুকদারের নাম বিএনপি প্রস্তাব করেছিল।
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা ও মন্ত্রীরা যখন ইভিএমের পক্ষে জোরালো সব মত প্রকাশ করছিলেন, তখনই তাদের এই প্রবল উৎসাহে যেন পানি ঢেলে দিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাংবাদিক সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বললেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তড়িঘড়ি করে ইভিএম চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
ব্যস, মন্ত্রী আর নেতাদের উৎসাহ শেষ, আর কেউ এর পক্ষে আর কথা বললেন না। এর মধ্যে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ভূমিকায় দেখা গেলো খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে। তিনি যা বললেন, তার মর্মার্থ এমন–জাতীয় সংসদে আইন পাস হলে, ইসির সক্ষমতা অর্জিত হলে এবং ইভিএম মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হলে, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন পেলে, যতখানি সম্ভব, ইভিএম ব্যবহার করা হবে। তিনি আসলে স্পষ্ট করে কিছুই বললেন না। ইভিএম ব্যবহার করা বা না করা- দু’দিকে যাওয়ার পথই খুলে রাখলেন।
এতসব কথাবার্তার মধ্যে একটা বিষয় কিন্তু মোটেই স্পষ্ট হলো না, আর তা হলো, ইভিএম কেনার যে তোড়জোর, সেটা কি এখন তাহলে থেমে যাবে? ঋণপত্র যেটা খোলা হয়েছে—সেটার কী হবে? কেউ জানতে চাইছে না, এত বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনাকাটার যে উৎসাহ, তার পেছনে আসলে কে বা কারা রয়েছে? বর্তমানে যে নির্বাচনি আইন রয়েছে, তাতে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যাবহারের কোনও সুযোগ নেই। নিয়ম পরিবর্তন হবে কি হবে না– সেটা নিশ্চিত না হয়েই এত বিপুল অর্থের কেনাকাটার প্রস্তুতির সুযোগই বা কোথায়?
যে ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে এত আলোচনা, এত বিতর্ক, সেটি কি এদেশের মানুষ খুব চেনে? এটির কার্যকারিতা কি দারুনভাবে প্রমাণিত? সারা দুনিয়ায় এখন মাত্র ২০টি দেশে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট হয়। এই ২০ দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলো নেই। বড় দেশগুলোর মধ্যে ভারত, যুক্তরাজ্য, জার্মানি বা ফ্রান্স আছে। আমাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মিল রয়েছে—এমন দেশের মধ্যে ভারতের কথা উল্লেখ করা যায়। ইভিএম নিয়ে কী হচ্ছে সেখানে? গত কয়েকটি প্রাদেশিক নির্বাচনে সেখানে দারুন বিতর্ক হয়েছে ইভিএমের কার্যকারিতা নিয়ে। বিশেষ করে পাঞ্জাব বা কর্নাটকের নির্বাচনের সময় ইভিএমের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গত বছর দিল্লির বিধান সভায় আম আদমি পার্টির একজন বিধায়ক একটি ইভিএম যন্ত্র এনে হাতে কলমে দেখিয়ে দেন–কিভাবে এর মাধ্যমে ভোট চুরি করা সম্ভব। ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে লেখাপড়া করা উক্ত বিধায়ক এমন চ্যালেঞ্জও করেন, যেকোনও ইভিএম যন্ত্রেই এই টেম্পারিং করা সম্ভব। পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও সফটওয়্যার আবিষ্কার হয়নি, যাকে হ্যাক করা যাবে না, টেম্পারিং করা যাবে না। এই যদি হয় নিরাপত্তার অবস্থা, তাহলে ইভিএম নিয়ে এত জোর গলায় কথা বলার সুযোগ কোথায়?
ভারতে এমন বিতর্কের পর, সেখানকার নির্বাচন কমিশন এখন নতুন এক পদ্ধতি চালু করেছে। একে বলা হচ্ছে–ভিপিআর (ভেরিফিয়েবল পেপার রেকর্ড)। এ পদ্ধতিটি এমন–ভোটার ভোট ইভিএমের মাধ্যমেই দেবে, কিন্তু ভোট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে থাকা প্রিন্টারের মাধ্যমে একটি কাগজ বের হয়ে আসবে। কাগজে দেখা যাবে, সে কোন মার্কায় ভোট দিয়েছে। ফলে ভোটার বুঝতে পারবে, তার দেওয়া ভোটটি ঠিক মার্কায় পড়েছে কিনা। এরপর তিনি এই কাগজটি ব্যালেট বাক্সে ফেলবেন। ভোট শেষে গণনার সময় ইভিএমে প্রাপ্ত হিসাবই প্রকাশ করা হবে, তবে কেউ চ্যালেঞ্জ করলে কাগজের ব্যালেটের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হবে। নতুন এই পদ্ধতিতে এরই মধ্যে ভারতের গুজরাটে নির্বাচন হয়েছে। আমাদের দেশে যারা ইভিএম চালুর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন, কেনাকাটার জন্য মরিয়া হয়ে গেছেন, তারা কি ভিপিআর পদ্ধতির জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছেন? নাকি কেবল যন্ত্র কেনাই তাদের মূল উদ্দেশ্য?
জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম চালুর ক্ষেত্রে প্রধানতম পূর্বশর্ত হচ্ছে—এই যন্ত্রটির বিষয়ে ভোটার কিংবা ভোট গ্রহণকারীর সচেতনতা। আমাদের সিংহভাগ ভোটার এখনও এই মেশিনটি একবারের জন্য দেখেননি। আমি নিজেও দেখিনি। নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে যারা সক্রিয় থাকেন, আমার ধারণা, তাদের ৮০ শতাংশই এই যন্ত্রটির বিষয়ে একেবারে অন্ধকারে। যে রাজনীতিক কিংবা মন্ত্রীরা এর পক্ষে উচ্চকণ্ঠ, তারাও এটির কার্যকারিতা সর্ম্পকে কতটুকু ওয়াকিবহাল, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।
ইভিএম চালু করতে হলে, যন্ত্রটির সঙ্গে মানুষকে পরিচিত করে তুলতে হবে। ভারতে প্রথম ইভিএমের মাধ্যমে ভোট হয় ১৯৮২ সালে, কেরালায় রাজ্য সরকারের একটি আসনের উপনির্বাচন। তাও আবার সব কেন্দ্রে নয়। এরপর ১৯৯৮ সালে প্রথম দেশের ১৬টি সংসদীয় আসনের সবগুলো কেন্দ্রে ইভিএম চালু হয়। এরপর থেকে ভারতে পুরোপরি ইভিএম চালু হয়। এতগুলো বছর সফলভাবে যে পদ্ধতি চললো, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে। কারণ ওই একটাই, এটিকে যে টেম্পারিং করা সম্ভব, তা এখন প্রমাণিত। টেম্পারিং হয়তো আগেও করা যেতো, কিন্তু তখন যারা সরকারে ছিল, তারা এতটা নিচে হয়তো নামেনি। বর্তমান বিজেপি সরকার বিরোধীদের মধ্যে সে আস্থাটা তৈরি করতে পারেনি। আসলে এটাই মূল কথা, যন্ত্রের কোনও দোষ নেই, যন্ত্রের পেছনের যে লোকটি, ঝামেলা থাকলে রয়েছে তার মধ্যে। ফলে সেই অবিশ্বাসের কারণেই সেখানে চালু করতে হলো ভিপিআর পদ্ধতি।
দশ বছরেরও বেশি সময় আগে আমাদের এখানে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম চালু হয়েছে। শুরু থেকেই কোনও একটি নির্বাচনে দু’একটি কেন্দ্রে এর মাধ্যমে ভোট নেওয়া হয়। ফল মোটামুটি মন্দ কিন্তু নয়। বলা হয়েছিল, ধীরে ধীরে কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হবে, তারপর একসময় পুরো একটা স্থানীয় নির্বাচন ইভিএমের মাধ্যমে করা হবে। সেই কাজটি আর করা হয়নি। স্থানীয় সরকারের কোনও একটি নির্বাচনও পুরোপুরিভাবে করা হয়নি এ পদ্ধতিতে। ফলে অভিজ্ঞতাটা ওই দুএকটি কেন্দ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এখন যদি দেড়শ’ আসনে এটি চালুর সাহস দেখানো হয়, সেটিকে আত্মঘাতী দুঃসাহস বলা ছাড়া উপায় থাকে না।  
ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের সুবিধা অনেক। দ্রুত গণনা করা যায়। ভোট বাতিলের কোনও চান্স থাকে না। কাগজ, ভোটের বাক্স—এসবের ব্যয় একেবারেই থাকে না। ভোটাররা এসে প্রার্থীর মার্কার পাশে থাকা একটা বোতামে চাপ দেবে, আর ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সেই প্রার্থীর পক্ষে একটা ভোট যোগ হয়ে যাবে। তত্ত্বগতভাবে খুব সহজ পদ্ধতি। কিন্তু ভোটটি ঠিক জায়গায় পড়লো কিনা, সেটা কি ভোটাররা দেখতে পাবেন? না, তা পাবেন না। তাকে বিশ্বাস করতে হবে। কার ওপর বিশ্বাস? নির্বাচন কমিশনের ওপর, সরকারের ওপর। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা কি আদৌ সম্ভব? একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রধানতম শর্তই কিন্তু হচ্ছে বিশ্বাস। এই আস্থার জায়গাটি তৈরি করতে হয়। তৈরি করতে হয় পর্যায়ক্রমিক আচরণের মাধ্যমে। সেই আচরণ কি আমাদের শাসকরা দেখাতে পেরেছেন? নির্বাচন কমিশনকে বলা হয় স্বাধীন একটা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই কমিশনের প্রধান কিংবা সদস্যরা কি সে ধরনের কোনও নমুনা দেখাতে পেরেছেন? প্রমাণ কি করতে পেরেছেন–তাদের মেরুদণ্ড অনেকটাই শক্ত? তাহলে জনগণের আস্থাটা কিভাবে আসবে?
এসব প্রশ্ন থাকবে। প্রশ্নগুলোর ভিত্তি জোরালো বলেই বোধকরি প্রধানমন্ত্রী বিষয়টাকে থামিয়ে দিয়েছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভবত ইভিএম পদ্ধতি চালু করা হবে না। তিনি ইভিএমে নির্বাচন থামিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু কেনাকাটার যে মহান উদ্যোগ শুরু হয়ে গেছে, তার কী হবে? সেটিও কি থামিয়েছেন? বিষয়টা এখনও স্পষ্ট নয়। হয়তো এখন বলা হবে, এবার নির্বাচনে ব্যবহার না হলেও আগামীতে ব্যবহারের লক্ষ্যে কেনাকাটা বরং করে রাখা যাক। আসলে কেনাকাটায় আমাদের উৎসাহ বরাবরই প্রবল। তাই কেন যেন মনে হয়, হয়তো হাজার হাজার কোটি টাকার কেনাকাটা থেমে থাকবে না। কারণ কমিশন বা লুটপাটের বিষয়গুলো তো এর সঙ্গেই জড়িত।

 লেখক: সিনিয়র নিউজ এডিটর, বাংলাভিশন

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ