অনারারি চিকিৎসকদের নিয়ে কেউ কথা বলেন না কেন?

Send
ডা. রাজীব দে সরকার
প্রকাশিত : ১৩:৩৫, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৯, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

রাজীব দে সরকারজাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের মানুষের হাতেই এদেশের মাটিতেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। যে কাজ পাকিস্তানি বাহিনী করার সাহস পায়নি, সেই ধৃষ্টতা দেখিয়ে আমরাই নিজেদের অকৃতজ্ঞ জাতিতে পরিণত করেছি। সুতরাং এই দেশে ভালো কাজের মূল্যায়ন হবে না–এটা ভেবে নিয়েই সব কাজে হাত দেওয়া উচিত। বিশেষ করে চিকিৎসক সম্প্রদায় এ বিষয়ের ভুক্তভোগী তো বটেই।

চিকিৎসকরা এমবিবিএস শেষ করে অনেকে চাকরিতে প্রবেশ করেন। কেউবা আরও উচ্চতর শিক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু ডাক্তারি এমন এক পেশা, যেখানে বসে থাকার সুযোগ নেই। কোথাও না কোথাও তাকে কাজ করতেই হয়। যেমন, এদেশে বিশেষ চিকিৎসক দল আছে, যে দলের সদস্যরা দিনের পর দিন দেশের অধিকাংশ সরকারি মেডিক্যাল কলেজে কাজ করে যাচ্ছেন। রোগী দেখছেন, রাউন্ড দিচ্ছেন, ড্রেসিং করছেন, ওটি করছেন, সিনিয়র ডাক্তারদেরও সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত যত কার্যক্রম রয়েছে, তার সবই তারা করছেন। কিন্তু বিষয়টা হলো–তাদের কোনও বেতন নেই। 

তারা কারও কাছ থেকে কোনও বেতন নেন না। কোনও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের এই ফ্রি সার্ভিসের জন্য একটি পয়াসাও দেয় না। অথচ তারা কাজ করে যাচ্ছেন। মাসের পর মাস। সকাল-বিকাল-রাত—এক অমানবিক নিয়মের ছকে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন তারা।

তারা হলেন আমাদের অনারারি চিকিৎসক। প্রশ্ন করতে পারেন ‘অনারারি চিকিৎসক’ মানে কী? এমবিবিএস বা বিডিএস পাস করার পর প্রত্যেকেই কমবেশি বেশ কিছু ডিপ্লোমা কোর্স করে থাকেন। এই কোর্সগুলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বারডেমসহ বিভিন্ন হাসপাতালে করে থাকেন। তারাও প্রতিদিন নিয়ম মেনেই হাসপাতালে যান, অ্যাপ্রোন পরেই ডিউটি করেন। নিয়ম অনুযায়ীই রোগী দেখেন কিন্তু কেউ কোনও অর্থ পান না।

এখানে তাদের কোনও সম্মানী দেওয়া হয় না ঠিক। কিন্তু উল্টো তাদেরই অর্থ দিতে হয়। কারণ এই রোগী দেখা অনেকটা তাদের প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়। নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রায় সবাইকেই এই ধরনের কোর্স করতে হয়। নিজের অর্থ ব্যয় করে টানা ছয় মাস একটানা পরিশ্রম করার পর তাদের জন্য পুরস্কার হিসেবে মেলে শুধু একটি মাত্র সার্টিফিকেট।

সুতরাং তাদের এই কষ্টের কথা কিন্তু কোথাও তেমন আলোচনাতেই নেই। ‘হ্যাঁ’ অর্থ দিয়ে তারা ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিচ্ছেন। কিন্তু সেটার জন্য দিন-রাত তাদের যে অমানবিক পরিশ্রম করানো হয়, সে বিষয়ে কেউ কি খেয়াল রেখেছেন?

কোথায় পাবেন এমন সেবা? কোথাও দেখেছেন এমন প্রহসন? অথচ বাংলাদেশের সদ্য এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসকদের সঙ্গে এই আচরণটা করা হয়। বছরের পর বছর ধরে করা হচ্ছে। বরং করা যেতো, ডিপ্লোমার কোর্স ওয়ার্কের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিতো এবং তাদের দিয়ে হাসপাতালে যে সার্ভিস দেওয়ানো হয়, সে জন্য তো একটি সম্মানী তাদের দেওয়া উচিত ছিল।  

যাইহোক, ভাবুন তবে বাংলাদেশ আজকের তারিখ পর্যন্ত কত হাজার চিকিৎসক কাজ করে গেছেন আমাদের হাসপাতালগুলোতে অথচ কোনও টাকা নেননি। বেতন নেননি। ভাতা নেননি। সুবিধা নেননি। বিনিময়ে পেয়েছেন কেবল একটি সার্টিফিকেট?

এতে কষ্ট করেও বাংলাদেশের চিকিৎসকরা দিন দিন যেন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা শুরু করেছে। কারণ ইদানিং তো অনেকে চিকিৎসকদের গায়েও হাত তুলে বসেন। এটাকে অন্তত আপনি চিকিৎসক লাঞ্ছনার ধনাত্মক দিক হিসেবে ধরতে পারেন। নারী-পুরুষ, ডাক্তার পেটানোর সময় সবই সমান ‘বীর’ বাঙালির কাছে।

আমরা আবার ভুলে যেতে ভালোবাসি খুব। যে ছেলেটা বা মেয়েটা চাকরি পাওয়ার পরে গ্রামে ৪ বছরের বাধ্যতামূলক সার্ভিস দেবে, তার আগের জীবনে সে রাষ্ট্রকে কত লাখ টাকার সার্ভিস বিনামূল্যে দিয়ে এলো, সে হিসাব আমরা কেউ রাখি না কেন?

সার্টিফিকেটটা লাগবে আমাদের ডিগ্রির জন্য। আবার ডিগ্রি ছাড়া পদোন্নতি হবে না। আবার ডিগ্রি হলেও পদোন্নতির কোনও গ্যারান্টি নেই।

সম্প্রতি একটি বিসিএস ব্যাচের চিকিৎসক কর্মকর্তাদের পদায়ন নীতিমালা দেখে মনে হয়েছে, এদেশে স্বাস্থ্য ক্যাডারে চাকরি করতে আসা একটি অপরাধ।

আপত্তি ছিল না, যদি কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সশরীরে ঘুরে আসতেন আমাদের গ্রামের হাসপাতাল ক্যাম্পাসগুলো। তাদের সমস্যা, চাওয়া নিয়ে কেউ কথা বলেছেন? কোনও আলাপ-আলোচনা তো নয়ই; এমনকি ডাক্তারদের অদূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করেই একটি নীতিমালার কথা আমরা শুনতে পেলাম।

বাংলাদেশের যেকোনও সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চলে যান, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য নিজেদের কোরবানি করে দেওয়া একদল অনারারি চিকিৎসক পাবেন। তাদের কথা কোনও মন্ত্রী বলবেন না, তাদের পরিশ্রমের গল্পটা কোথাও ছাপা হবে না। 

তাদের এই বেতনবিহীন অক্লান্ত পরিশ্রমের ইতিহাসটা শুধু হাসপাতালগুলোর ইট-কাঠ-পাথরে লেখা থাকবে। অথচ তারাই চিকিৎসাসেবার কারিগর। তাদের চড়াই-উৎরাইয়ের গল্পটা কেউ জানতেও চায় না, শুনতেও চায় না। শুধু আছে ডাক্তারদের ‘অনেক টাকা কামানো’র গল্প নিয়ে। অথচ একজন চিকিৎসককে পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করতেই বয়সের অধিকাংশ সময়ই চলে যায়। সেই সময়টার গল্প কোথাও বলা হয় না। ডাক্তারদের কথা কেউ শুনতে চান না। কেন?

লেখক: রেজিস্ট্রার (সার্জারি বিভাগ), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।


/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ