রাজনৈতিক এতিম ও বিকল্পের গল্প!

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৬:২৫, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৭, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৮

আহসান কবিরসাবান কিনতে এক ভদ্র মহিলা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গেছেন। সেদিনই নতুন একজন কর্মী যোগ দিয়েছেন ওই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। ভদ্রমহিলা ওই কর্মীর কাছে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির সাবান চাইলেন। নতুন কর্মী খানিক খোঁজাখুঁজি করে জানালেন, ওই কোম্পানির সাবান নেই। ভদ্রমহিলা চলে যাওয়ার পরে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক ব্যাপারটা খেয়াল করে নতুন কর্মীকে ডেকে বললেন, কাস্টমারকে কি বলা যেতো না যে, ওই সাবান নেই তো কী হয়েছে? অন্য আরও অনেক কোম্পানির সাবান তো আছে। আপনি বিকল্প হিসেবে অন্য একটি সাবান ব্যবহার করে দেখতে পারেন। নতুন কর্মী বললেন,  স্যার এখন থেকে আপনার নির্দেশই পালন করবো।
খানিক পরেই এক ভদ্রলোক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে এসে একটি নির্দিষ্ট নাম বলে টয়লেট টিস্যু চাইলেন। নতুন কর্মী টিস্যু খুঁজে না পেয়ে ভদ্রলোকের কাছে এসে বললেন, স্যার ওই টয়লেট টিস্যু নেই তো কী হয়েছে? আমাদের স্টোরে অতি উন্নত মানের সিরিষ কাগজ আছে। আপনি বিকল্প হিসেবে সেটা ব্যবহার করে দেখতে পারেন!

এই গল্পের মূলভাব হচ্ছে–‘ভাবিয়া বিকল্প নাও, যেনতেন বিকল্প নিয়া পসতাইও না!’

মানুষ খুব সহজেই বিকল্প খোঁজে। যাপিত জীবনের শেষ কয়েকটা দিন দিয়েই হয়তো সব কিছুর মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে। সহজে মূল্যায়িত হয় না সোনালি অতীত। কিন্তু সহসা কি বিকল্পের দেখা মেলে? যে যেভাবেই বিশ্লেষণ করুক না কেন, বিকল্প বিষয়ক কিছু কিছু ঘটনা হয়তো অনেকেরই মনে আছে।

একবার ‘উন্মাদ’ পত্রিকায় এমন কিছু বিকল্প সম্ভাবনার কাজের কথা ছাপা হয়েছিল। যেমন–ছোটকালে এক ছেলে খুব সুন্দর তবলা বাজাতো। সবাই আশা করেছিল যে, ছেলেটি বড় হয়ে নামকরা তবলচি হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো, সে বাসের হেলপার হয়েছে। বাসের শরীর বাজিয়ে তাকে বলতে হচ্ছে–এই ফার্মগেট, শাহবাগ, মতিঝিল। ওই ফার্মগেট, শাহবাগ, মতিঝিল! কী আশা করেছিল সবাই আর বিকল্প হিসেবে কী পেলো ছেলেটি! ঠিক তেমনি এক ছেলে ছোটকালে খুব সুন্দর করে গিটার বাজাতো। সবার আশা ছিল বড় হয়ে সে দেশের নাম করা গিটারিস্ট হবে। পনেরো বছর পরে দেখা গেলো ছেলেটা লেপ তোষকের দোকানের কর্মচারী হয়েছে। ধনুকের মতো যন্ত্রটা দিয়ে টিং টিং করে সে তুলা ধুনে! (সম্ভবত এখান থেকেই তুলাধুনা শব্দটা এসেছে!)

এরশাদ সাহেব ছাত্রদের ওপর ক্ষেপা ছিলেন। সারাদেশে ছাত্ররা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এবং শেষমেষ ছাত্র আন্দোলনের কারণেই তাকে গদি ছাড়তে হয়েছিল। তিনি ক্ষমতা দখলের পরপর তিনি ‘স্টুডেন্ট ব্রিগেড’ নামে একটা প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। ছাত্ররা ব্রিগেড ক্যাম্পে গেলে তাদের ফ্রি কম্বল আর টাকা দেওয়া হতো। ছাত্ররা স্টুডেন্ট ব্রিগেডে যেতো, টাকা ও কম্বল নিয়ে ফেরার পথে এরশাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিত। এরপর বিকল্প পরিবহন নামে একটা মিনিবাস সার্ভিস চালু হয় ঢাকা শহরে। এই বাস সার্ভিস চালু করার প্রেরণায় এমন বলা হয়েছিল যে, ছাত্ররা পড়ালেখার ফাঁকে এই বাস চালিয়ে ইনকাম করবে এবং পড়ালেখার টাকা জোগাবে! মজার ব্যাপার হচ্ছে বিকল্প পরিবহন ছাত্রদের কাছে কিংবা পরিবহন খাতে ভালো বিকল্প হয়নি। এরশাদ সাহেব সম্ভবত ছাত্রদের ওপর মন খারাপ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিতে চেয়েছিলেন। ১৯৯২ সাল থেকে এই দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়।

এবার রাজনৈতিক বিকল্প নিয়ে মাথা ঘামানো যাক। স্বাধীনতার আগে ও পরে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ ছিল উল্লেখ করার মতো রাজনৈতিক দল। মুসলিম লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মতো মাওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর ন্যাপও চলে গেছে মানুষের চোখের আড়ালে। স্বাধীনতার পর বিরোধী দল ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদ। জনপ্রিয়তার দিক থেকে এটা বিবেচনা করা হতো যে আওয়ামী লীগের পর জাসদই হবে এদেশের জনপ্রিয় দল। ১৯৭৫’র পট পরিবর্তনকে ধারণ করতে গিয়ে কর্নেল তাহের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার দিকে। বিচার বিভাগীয় হত্যাকাণ্ডে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হলে জাসদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। এই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা কাটাতে জাসদ বারবার নিজেকে ভেঙেছে এবং ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার স্বপ্ন থেকে বের হতে চায়নি। তাই অনেক নেতা কর্মী বিএনপিতে দিলেও আ স ম রব ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে এরশাদের সঙ্গে গিয়ে হাত মিলিয়েছিলেন।  ২০০১ সালের পর থেকে রব সাহেব একরকম রাজনৈতিক এতিমে পরিণত হয়েছেন।  তিনি অবশ্য আবারও আলোচনায় এসেছেন আওয়ামীবিরোধী নির্বাচনি জোট করতে গিয়ে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মতো ক্ষমতায় থেকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার উদরে জাতীয় পার্টি নামের আরেকটি দলের জন্ম দিয়েছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জাসদের পরে সবচেয়ে বেশিবার ভেঙেছে এরশাদের জাতীয় পার্টি। এরশাদ সাহেব যখন জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে থাকবেন না, তখন এটির অস্তিত্ব থাকবে কিনা, সন্দেহ আছে। হয়তো জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা তখন কেউ আওয়ামী লীগ আর কেউ বিএনপির সঙ্গেই মিশে যাবেন! ন্যাপ, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগের মতো জাতীয় পার্টিকে তখন পাওয়া যাবে রাজনৈতিক জাদুঘরে!

অ্যান্টি আওয়ামী লীগ-খ্যাত বিএনপিই টিকে গেছে কোনও না কোনোভাবে। বিকল্প কোনও রাজনৈতিক দল এদেশে কখনোই সুবিধা করতে পারেনি। এমনকি এককভাবে কোনও ব্যক্তির নির্বাচিত হয়ে আসাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। গত বিশ বছরের রাজনীতি ও নির্বাচনের নিরিখে এটা বলা যায় যে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—এই দুই দলের বাইরে গিয়ে কেউই তেমন কিছু করতে পারেননি। যত দিন গেছে, যারা দলছুট হয়েছিলেন, তারা ক্রমশই জনবিচ্ছিন্ন হয়েছেন। মিডিয়ার আলোচনায় থাকলেও মানুষের হৃদয়ে তারা কতখানি থাকতে পেরেছেন, সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকেই গেছে।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার দিন তার সঙ্গে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থান করা বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বিএনপি সরকার রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিল। পরে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে তিনি বিকল্পধারা নাম দিয়ে নতুন এক রাজনৈতিক দল খুলেছিলেন। তিনি ও তার ছেলে ছাড়া এই দলে আর কে কে আছেন, তা তারাই শুধু জানেন। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না  (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায় আওয়ামী লীগের পক্ষে লিখতে বললে জুড়ে দেন কান্না) এবং আ স ম রব (প্রধানমন্ত্রী ভাষায়-অসময়ে সরব সুসময়ে নীরব আসম রব। আর ড. কামালের ব্যাগ ও পাসপোর্ট নাকি ওনার গাড়িতেই থাকে। সবাইকে মাঠে নামিয়ে তিনি চলে যান বিদেশ!) বি. চৌধুরী ও ড. কামাল সাহেবের সঙ্গে মিলে ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন। কাদের সিদ্দিকী সাহেবও তাদের সঙ্গে আছেন বলে শোনা যাচ্ছে। বিকল্প কোনও নতুন ধারা বা নতুন কোনও রাজনৈতিক দলের মতো নির্বাচনের আগে কোনও বিকল্প নির্বাচনি ঐক্য রাজনীতির চেহারা বদলে দেবে কিনা, সেটা সময়ই বলে দেবে।

তবে বি. চৌধুরী, ড. কামাল, কাদের সিদ্দিকী, আসম রব কিংবা মাহমুদুর রহমান মান্না এক হলেও তারা বুঝতে পেরেছেন, তারা কোনোভাবেই নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। আলাদাভাবে নির্বাচন করলে প্রত্যেকের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যেতে পারে। তাই তারা এই প্রক্রিয়ায় বিএনপিকে চাচ্ছেন। ভাবখানা এমন বিএনপি নির্বাচনে এসে তাদের জিতিয়ে দিলে তারা প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হয়ে যাবেন। সম্ভবত তাদের সবার চেয়ে জামায়াতে ইসলামীই বিএনপির কাছে বেশি প্রিয়। বিকল্প নির্বাচনি ঐক্যের নামে এসব মিডিয়ার রাজনীতিবিদদের বিএনপি কাছে টেনে নেবে, নাকি সে তার পুরনো বন্ধু জামায়াতের সঙ্গেই থাকবে, সেটাও ভবিষ্যৎ বলে দেবে।

লেখাটা শুরু করেছিলাম ‘বিকল্প’ বিভিন্ন জিনিসের সাতকাহন নিয়ে। শেষ করি তেমন একটা গল্প দিয়ে। বনের রাজা সিংহ সব পশু-পাখিকে ডেকেছে। সবাই নির্দিষ্ট স্থানে হাজির হয়েছে। সিংহ সবাইকে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে। ময়না পেলো সকালে গান গাওয়ার কাজ। বানর পেলো জোকারি করার কাজ। কাঠঠোকরা পেলো গাছ খোঁটাবার কাজ। গরু আর হরিণ পেলো ঘাস কাটা ও খাওয়ার কাজ। এমন করে সবাইকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে সিংহ যখন চলে যাচ্ছে, তখন এক সজারু তার সামনে এসে মিনতি জানিয়ে বললো, মহারাজ সবাই কাজ পেলো, আমি তো পেলাম না।

সিংহ খানিক ভেবে বললো, তোকে বিকল্প হিসেবে রাখলাম। যারা কাজে ফাঁকি দেবে এবং ঠিকমতো কাজ করবে না, তাদের সঙ্গে তুই কুস্তি করবি!

জানি না, সব বিকল্প জনগণের কুস্তির জন্য কিনা!

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ