বার্লিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব: বাংলাদেশ কোথায়?

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৬:৩৬, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৫, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮

দাউদ হায়দারআমরা ভেবেছিলুম উলরিষ স্রাইবার নিশ্চয় হুজুগে, কিংবা, পুরো না হলেও হাফ পাগল। সাহিত্য নিয়ে তাঁর পাগলাটে স্বভাব অনেকেরই জানা। তাই বলে গাঁটের কড়ি খরচ করে সাহিত্য উৎসব? তাও আবার আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব ?
ব্যাঙ্ক থেকে সব টাকা তুলে, বন্ধুদের কাছে হাত পেতে কোনোরকমে এক লাখ ইউরো যোগাড় করে ২০০০ সালে শুরু করেন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব। শুরু ছিল অগোছালো।
আন্তর্জাতিক বলতে ইউরোপের কয়েকজন লেখক, আমেরিকার দুজন, একজন ভারতীয়। বাকি কয়েকজন জার্মানির।
সাহিত্য উৎসবের পোকা এতটাই দানা বাধে উলরিষ স্রাইবারের মগজে, ট্র্যাজেডিও ঘনিয়ে আসে। টাকাকড়ির নয়ছয়ে বিলাভেড স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ। পাগলামি আরো বেড়ে যায়। ধারেকর্জে দিশেহারা হলেও হাল ছাড়েন না। উৎসবের পঞ্চম বছর থেকে দেখা গেল উলরিষের মেজাজ ঝরঝরে।

বার্লিন সিনেট এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় হাত বাড়িয়েছে। আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে।

কথায় বলে, তিল থেকে তাল হয়। এত্ত বলে, দিনে দিনে বাড়ে কালকেতু। ঠিক তাই। বড়-বড় ব্যবসায়িক কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান, হোটেলও এগিয়ে এসেছে। টাকা (ইউরো) ঢালছে। এ বছর বাজেট ছিল দেড় মিলিয়ন ইউরো। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আড়াইশোর বেশি লেখক হাজির। দশদিন ব্যাপী অনুষ্ঠান। ৫-১৫ সেপ্টেম্বর।

স্মরণীয়, এর আগে এক ডজনের বেশি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী যোগ দিয়েছেন ( অনেকেই নোবেল পুরস্কার পাননি তখনো। যেমন মারিও ভাগার্স ইয়োসা। হ্যার্টা ম্যূলার। ইশিগুরো প্রমুখ)। নাডিন গোরডিমার দু’বার। সালমন রুশদী নোবেল পাননি এখনো, কিন্তু তিনবার অংশগ্রহণকারী।

ভারতীয় নানা ভাষার লেখক প্রতি বছরই উৎসবে আমন্ত্রিত। বাদ যায়নি এবারও ( তিনজন )। হালের বিশ্বসাহিত্যে পাকিস্তানের হানিফ মোহাম্মদ, মহসিন হামিদ, কামিলা সামসি বহুল পরিচিত। ওঁদেরও দেখি উৎসবে।

বাংলাদেশের ভাগ্যে গতবছর (২০১৭) শিকে ছিঁড়েছিল, এসেছিলেন ঢাকা লিট ফেস্ট-এর সাদাফ সায। তিনি কবি। তাঁর কবিতা, এবং পাঠ, দুই-ই, বার্লিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে তুমুল প্রশংসিত। সাদাফ সায প্যালেন-আলোচনায় যোগ দিয়েছেন, শ্রোতৃকুল অবাক মেনেছেন তাঁর যুক্তি-তর্কে-বক্তব্যে। অতীব সপ্রতিভ। বাংলাদেশের সাহিত্য-সমাজ-রাজনীতি-সংস্কৃতি যে দর্পন, বৈশ্বিক আলোকে কতটা উজ্জ্বল, ঝলমলে, প্রবাহমান, বলেছেন নিজস্ব প্রত্যয়ে।

সাদাফের প্রত্যয়-দৃঢ়তা কতটা সঞ্চারিত, মার্কিন কবি-সমালোচক-প্রাবন্ধিক এলিয়ট ভাইনবারগারের (এলিয়ট ভাইনবারগার ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’- এ যোগ দিয়েছিলেন।) কৌতূহলী প্রশ্নে : “এবার বাংলাদেশ কোথায়? বাংলাদেশ থেকে কোনো লেখক নিমন্ত্রিত নয়? ‘সুইট পোয়েট’ সাদাফ সাযকে কেন দেখছি না?”

প্রশ্নের উত্তরে মৌন অবলম্বনই শ্রেয়, জ্ঞানীদের উপদেশ। উলরীষ স্রাইবার ঢাকায় গিয়েছেন লেখকের খোঁজে। কোনো খাঁটি লেখকের (ঔপন্যাসিক) সন্ধান পাননি। সম্ভবত হাসান আজিজুল হকের কথা বলেননি কেউ। বললেও (ধরে নিচ্ছি) ইংরেজি অনুবাদ কেউ দেননি। চার পাঁচজন লেখকের ইংরেজি অনুবাদ পেয়েছেন (তাঁকে দিয়েছেন), পড়ে মনে হয় ওঁর ‘অপাঠ্য’। আমন্ত্রণের অযোগ্য।

উলরীষ বললেন, ‘বার্লিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে বাংলাদেশের সাহিত্য প্রচার করতে উৎসাহী খুবই। এখানে বিশ্বের নানাদেশের লেখকের সমাবেশ। এই সমাবেশই (লেখক সমাবেশ) তুলে ধরবে (ধরে) অন্যদেশের সাহিত্য, যে দেশের সাহিত্য অজানা। কিন্তু লেখার মান কী?

আমরা এবার (এই উৎসবে) হাইলাইটস করছি মিয়ানমার লেখকদের। মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার লেখকদের। ওঁদের লেখাপাঠে শ্রোতা মিয়ানমারের সাহিত্যে উৎসাহী, প্রকাশক, অনুবাদকও যোগাযোগ করছেন ( এই উৎসবে )’।

-দেখলুম, মিয়ানমারের তরুণ কবি কো কো থেট- এর কবিতা পাঠের পরে দুই জার্মান প্রকাশক, একজন স্প্যানিশ প্রকাশক, একজন রুশ প্রকাশক, একজন ইটালিয়ান প্রকাশক তাঁর সঙ্গে কথা বলছেন।

ইন্দোনেশিয়ার লেখিকা লাকসমি পামুন্টজাক দুই বছর আগে বার্লিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে হাজির। কেউ চিনতো না। এবার তিনি ‘হিরোইন’। তাঁর দুটি বই জার্মান ভাষায় অনূদিত। তাঁর পাঠে হলভর্তি শ্রোতা। বই বিক্রিও আশাতীত। দুইশ’র বেশি ক্রেতার বইয়ের স্বাক্ষর করেন।

আমাদের বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় খুব ভালো লিখতেন। কিন্তু বাপের পরিচয়ে খ্যাতিমান নন। যেমন নন সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দীপ রায়। যে ছবিই করুন, হোক তা ভালো, অপবাদ: ‘বাপের মতো নয়’।

পিকাসোর কন্যা পালোমা ছবি আঁকাই ছেড়ে দেন, বলেন, ‘আমি পিকাসোর কন্যা। আমার অন্য পরিচয় নেই’।

নাম সমস্যা নানাবিধ। নাম যদি হয় শেকস্‌পিয়র, হালের কোনো লেখকের খ্যাতিমান হওয়া সম্ভব কী?

বিলেতি লেখক নিকোলাস শেকস্‌পিয়র, নাটক-উপন্যাস লেখেন (বিবিসি টিভির সাংবাদিক একদা), বলেন (১৮ বার্লিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে) : ‘আমার বংশউপাধী শেকস্‌পিয়র। উপাধীর নামে লেখক হয়ে বিড়ম্বনা’।

উৎসবে অন্যতম আকর্ষণ মাইকেল ওনডাটজে (ইংলিশ প্যাশেন্ট-খ্যাত), বুকার প্রাইজে সম্মানিত, নোবেল পুরস্কারের তালিকায় (গত চার বছরে), বলেন, ‘এই উৎসবে তিব্বতের লেখকও আছে বাংলাদেশ নেই কেন?’

বললুম, ‘দেখতেই পারছেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছি’।

-ওহ! এখনো বাংলাদেশের বলছেন নিজেকে? ধন্য আপনার দেশপ্রেম।  

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ