শরতের অরুণ আলোর অঞ্জলি

Send
মিথিলা ফারজানা
প্রকাশিত : ১৪:১৮, অক্টোবর ০৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৪, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

মিথিলা ফারজানাআমার বয়স যখন তিন বছর তখন আমরা ঢাকায় চলে আসি। আব্বার সরকারি চাকরি, তাই জেলা শহর ঘুরতে ঘুরতে ঢাকায় আসা। ঢাকায় আসলেই সরকারি বাড়ি পাওয়া যায় না। কিছুদিন দেরি হয়। তাই আমরাও কয়েক বছর এদিক-ওদিক থেকে আসলাম আজিমপুরের সরকারি বাসায়।
যারা আজিমপুরে গেছেন তারা হয়তো জানেন, পুরনো বাসাগুলো ঠিক যেমন হয় তেমন। দুইদিকে টানা লম্বা দুটো বারান্দা। অনেক জায়গা কিন্তু রুমের সংখ্যা কম। আমরা সেই বারান্দায় ক্রিকেট খেলতাম। আর...আমি? বলছি সে কথা।
আমার ভাইয়েরা একটু ওপরের ক্লাসে পড়ে বলে আব্বা চেষ্টা করতে থাকেন তার যেন ঢাকার বাইরে আর পোস্টিং না হয়। পড়াশোনার ক্ষতি হবে সবার। আব্বা অত্যন্ত ধার্মিক মানুষ, নামাজ বা রোজা বাদ গেছে কোনোদিন আব্বার– এমনটা আমার মনে পড়ে না। সুদ নেওয়া হারাম বলে বহুদিন ব্যাংকে টাকা রাখতেন না। বিদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কমলার রস হাতে নেওয়া আব্বার ছবি এখনও মাঝে মাঝে দেখি। কিন্তু বোধকরি সেই আমার দেখা একমাত্র লোক যে কোনও অনুশাসন মানার জন্যই কাউকে চাপাচাপি করেননি। এমনকি তার পরিবারের কাউকেও না।

আম্মাদের পরিবারটা একটু অদ্ভুত । বিশাল অভিজাত, বিলেত ফেরতা ডিগ্রিধারী কেউ তেমন না। তবে মামারা কেউ কবিতা লেখে, কেউ ৭০ এর দশকে ব্যান্ডে গিটার বাজায়, ঘরোয়া অনুষ্ঠানে খালা গান গায়, আম্মা নাচে। জানি না রক্তের কোন কণিকায় এসব প্রবাহিত হতে থাকে।

তো যেখানে ছিলাম। আমরা আজিমপুরে আসার পর পাশের বাড়িতে পেলাম সেনগুপ্ত চাচাদের। আমার কাছে মুনমুন আপা, বাপ্পু ভাইয়া আর তপু ভাইয়াদের বাসা। বারান্দার কথা বলছিলাম না? পাশাপাশি দুই ফ্ল্যাটের বারান্দা খুলে দিলে লম্বা একটা ট্র্যাক হয়। আমি স্কুল থেকে এসেই সেই ট্র্যাকে আমার তিনচাকার সাইকেলটা নিয়ে এমাথা থেকে ওমাথা করতে থাকতাম।

সকাল দশটা সাড়ে দশটাতেই দুই বাসার দরজা খুলে যায়, চাচী এসে বলে, ‘আপনার রান্না কতদূর, আমি তো মাত্র ডাল চড়ালাম’।

আর আমিও একটু পরপর ওদের বাড়ি গিয়ে নানা ধরনের বকবক করে আসি।

‘মুনমুন আপা রানতে পারেন? কী রাঁধেন?’

‘পারুল তুমি কি করো?’

আমার মূল আকর্ষণ ওদের বাড়িতে যে আমার মতো নাক বোচা গোলগাল ফর্সা চোখ ছোট মেয়েটা কাজ করে– পারুল। ওর কাজ শেষ হলে ওর সঙ্গে খেলা। তাই সেখানেই ঘুরঘুর করি।

বি জি সেনগুপ্ত আর এম ইসলামের বাড়ির রান্নাঘর আমার কাছে শুধুই দুটো রান্নাঘর। এর বাইরে আর কিছু আমাকে শেখানো হয়নি, শিখিওনি। শুধু মনে পড়ে আম্মা নিচু স্বরে একদিন বলছিলেন, ‘বৌদি, ওতো ছোট, বোঝে না, যখন তখন আপনাদের রান্নাঘরে ঢুকে যায়...’।

চাচী হা হা করে ওঠে বললো, ‘আরে তাতে কি হইসে,আমাদের ওসব কিচ্ছু নাই...।’

আমাদের প্রেসার কুকার ওদের বাড়ি যায়, ওদের চালনি আমাদের বাড়ি আসে।

কোরবানি ঈদ আসে। আমার আব্বা সেই অসফল সরকারি কর্মকর্তাদের একজন যে মাসের ২৫ তারিখে পরের মাসের বেতনের অপেক্ষা করেন। সুযোগসুবিধা থাকলেও হাতে টাকার টানাটানি ছিল সবসময়।

‘শুধু গরুর ভাগ দিলেই তো হয়’

আব্বা মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়ে

‘উহু একটা খাসী দিতেই হবে’

তখন কোরবানির ঈদে কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। রাস্তার ওপর গরুর রক্ত, চারিদিকে ময়লা, কয়েকদিন ধরে সেসব জমে থেকে বিকট গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে থাকত। মুনমুন আপারা মোটামুটি কয়েকদিনের জন্য গৃহবন্দী।

ঈদের দিন সকালবেলায় টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে, একটা ট্রেও সাজানো হয়েছে। পোলাও, মুরগী আর খাসীর মাংস যতদ্রুত সম্ভব রান্না করা হয়েছে। আমি ভারী ট্রে নিতে পারি না তবু আমি নেব, আম্মার সঙ্গে ধরে পাশের বাসায় টোকা দেই। চাচী একগাল হেসে দরজা খোলে, ‘বাপ্পু-তপু জিজ্ঞেস করতেসিল, কাকী এখনও খাবার পাঠায় নাই?’

দুর্গা পূজায় তখন স্কুল ছুটি থাকত অনেকদিন, আমি মহা উৎসাহিত, চাচীরা কী কী কিনল তাই নিয়ে, ‘ও চাচী, তিথির জন্য এই জামা, অভির এটা’।

ওদের পরিবারের অন্য বাচ্চাদের জন্যও কী কিনছে, কী হচ্ছে তাই নিয়েই লাফাচ্ছি। অষ্টমীর দিন লুচি, নারকেল দিয়ে রান্না করা ছোলার ডাল আর নিরামিশ। কখনো কখনো নাড়ু, সন্দেশ। সেদিন আর আমাদের রান্নার দরকার নেই, ওই দিয়েই সবাই খাবো।

নবমীর দিন চাচী ডাক দেয়, যাবেন নাকি ঢাকেশ্বরী?

আমরা দুই মা-মেয়ে সেজেগুজে রেডি। তখন এত পূজা হতো না ঢাকায়, এত ভীড়ও হতো না। বাড়ির কাছেই মনে হত ঢাকেশ্বরী, রিক্সা নিয়েই যেতাম, সামনে মেলার মতো হতো। সেখান থেকে চুড়ি কিনতাম, কী সুন্দর সাদা কাজ করা চুড়ি। তার সঙ্গে মেলানো লাল টকটকে চুড়ির জোড়া, ঘরে সাজানোর জন্য শোলার ফুল, পাতা কিনে নিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রতিমা দেখে আপেলের টুকরা আর নারকেল খেয়ে বাড়ি আসতাম।

একবার আমাদের বাসায় মিলাদ হলো, কী উপলক্ষে মিলাদ দেওয়া হয়েছিল মনে নেই। কিন্তু তখন অনেক বাসাতেই মিলাদ হতো মনে আছে। মিলাদের পরদিন ভোরবেলায় আম্মা মোটামুটি আতংকিত হয়ে আব্বাক বলল, ‘হায় হায় কালকে মিলাদে যে গরুর মাংসের টিকিয়া ছিল আমি তো মুনমুনকেও ভুল করে তুলে দিসি’।

আব্বাও জিভ কেটে বসে পড়লেন।

বেলা বাড়তেই চাচী এসে হাজির, হাসি নিয়েই বললো- কী খাওয়াইসেন কালকে আমার মেয়েকে?’

আম্মা কাঁচুমাচু, ‘সরি বৌদি , সবাইকে দিতে দিতে ভুল করে দিয়ে ফেলসি’।

‘না না কী আর হবে, ভুল করে খেয়ে ফেলসে,আমরা বুঝছি আপনিও ভুল করে দিসেন।’

অনেকগুলো দিন, অনেক মাস, বছর আমরা এভাবে পাশাপাশি থেকেছি, তপু ভাইয়া ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে গেছে চাচীকে আর আম্মাকে সালাম করে, চাচী দেশের বাড়ি বেড়াতে গেলে আমাদের বাসা থেকে ওদের খাবার গেছে। মুনমুন আপার গায়ে পূজা করতে গিয়ে আগুন লেগে গেলো। আমরা পূজার ঘরে গিয়ে আগুন নেভালাম।

সত্যি, এগুলো সব সত্যি এই বাংলাদেশেই। মাত্র ২০/২৫ বছর আগেই সত্যি। বাংলাদেশ কি আর এখন আগের মতো সত্যিই নেই নাকি ভার্চুয়াল বাংলাদেশ আমাদের ভুল বার্তা দিচ্ছে? বড় সহজ, বড় নির্মল ছিল যে সেই জীবন। সব কিছুকে এত জটিল এত কঠিন করে ভাবার দিন তখনো আসেনি। নাকি আমরাই দেখতে পাইনি। অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন এত শক্ত শক্ত শব্দ শেখার তো কোনও চেষ্টা দেখিনি সেই মধ্যবিত্ত জীবনে, কিন্তু কোনও সংকটও তো দেখিনি কোনও সাম্প্রদায়িক পরিচয় নিয়ে!

আমি ভাবতে চাই বাংলাদেশের মানুষ মনের মধ্যে এখনো তেমনই আছে। শরতের সব শুভ্রতা ধুয়ে নিয়ে যাক সব কালিমা। শুধু লিটন দাস না, বাংলা মায়ের সকল সন্তান গৌরব নিয়ে আসুক দেশের জন্য সকল ক্ষেত্রে।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ