হাওরের যোগাযোগ: সড়ক না ফ্লাইওভার?

Send
মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশিত : ১৯:০২, অক্টোবর ১৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৬, অক্টোবর ১৫, ২০১৮

মো. আনোয়ার হোসেনহাওর বাংলাদেশের একটি অনন্য ভূ-প্রাকৃতিক জলাভূমি। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ভূমি নিয়ে হাওর জলাভূমি গঠিত। উক্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম হলো বা ছিল বর্ষায় নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে পায়ে হাঁটা পথ। যদিও হাওরের প্রান্ত অঞ্চলগুলোকে ‘আভুরা সড়ক’ (যে সড়ক পানিতে ডুবে না) নির্মাণ করে অনেক আগে থেকেই জনগণকে চলাচলের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে গভীর হাওরে আভুরা সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। এই রাস্তা হলে হাওর খণ্ড-বিখণ্ড আবদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হবে বলে পরিবেশবিদ ও পরিবেশবাদীরা বিরোধিতা করছেন। তারা বলছেন, আভুরা সড়ক নয়, ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হোক। কিন্তু কেন বলছেন এই কথা। আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পরিবেশ প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ হিসেবে ও হাওর নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করবো।
পৃথিবীর কোথাও এমন স্বাদু পানির জলাভূমি-হাওর পাওয়া যায় না। ভারতের মেঘালয় পাহাড়পুঞ্জের ওপর সংঘটিত প্রায় সকল বৃষ্টিপাতের ড্রেনেজ পথ হলো এই হাওর। বিভিন্ন ছোট-বড় ছড়া ও নদী দিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলের সব পানি হাওরের ভূমিতে নেমে আসে। তারপর মাস ছয়েক হাওরে অবস্থান করে বিভিন্ন নদী দিয়ে (প্রধানত মেঘনা নদী) বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। হাওরের মূলত দুটি অংশ। একটি মূল জলাশয়, যার পানি বছরের সবসময় থাকে। টাঙ্গুয়ার হাওরে বা হাকালুকি হাওরে শুষ্ক মৌসুমে (শীতকালে) এ জলাশয় দেখা যায়। দ্বিতীয় অংশটি হলো ছয় মাস পানির নিচে থাকে অর্থাৎ বছরের ছয় মাস শুকনো থাকে। মূলত এই জমিগুলো কৃষি জমি। বছরের ছয় মাস এখানে ধান, পাটসহ বিভিন্ন কৃষি ফসল উৎপন্ন করেন কৃষকেরা। বৃষ্টিপাতের মৌসুমের তারতম্য হলেই এই কৃষি বিপর্যস্ত বা নষ্ট হয়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে গভীর হাওরে অবস্থিত বিভিন্ন গ্রাম ভাসমান জনপদে পরিণত হয়। নৌযান ছাড়া চলাচলের কোনও উপায় থাকে না। এসব জনপদের অধিবাসীদের বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া কোনও বিকল্প নেই। সেই জন্য প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থা ডাঙ্গার সড়ক যোগাযোগের মডেলকে এই জলাভূমিতে প্রয়োগ করছেন বা করতে উদ্যোগ নিচ্ছেন। এই সড়ক ব্যবস্থার ভালো ও খারাপ দিক তুলে ধরবো এবং ফ্লাইওভারে সুবিধা ও প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করবো।

আভুরা সড়ক হলো যে রাস্তা পানিতে ডুববে না। যেমন স্থলভাগের রাস্তা যা বন্যার পানিতে ডুবে যায় না, ফলে সবসময় চলাচলের উপযুক্ত থাকে। হাওরে বন্যা হয় প্রাকৃতিক নিয়মে; সমস্ত এলাকা প্রতিবছর পাহাড়ি পানিতে ডুবে যায়। সে জন্য হাওরে সবসময় চলাচলের জন্য আভুরা সড়ক তৈরি করার দাবি এবং প্রশাসন সে দাবিকে মেনে নিয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এই রাস্তার সবচেয়ে সুবিধা হলো সব সময় চলাচলের উপযুক্ততা। ফলাফল স্বরূপ সমস্ত নাগরিক সুবিধা সহজে হাওড়ে পৌঁছে যাবে বিনা বাধায়। আভুরা সড়কের অনেক খারাপ দিক আছে। এই রাস্তা তৈরি করা ও টিকিয়ে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, পলি-কাদামাটি দিয়ে ৩০/৪০ ফুট উঁচু রাস্তা তৈরি করা সত্যি ব্যয়সাধ্য। প্রতিবছর হাওরের বিপুল জলরাশির ঢেউ দ্বারা ওয়াশআউট হওয়া থেকে ওই রাস্তা টিকিয়ে রাখাও আর একটি বড় প্রকৌশল ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সরকারের বিপুল টাকা খরচ করে কংক্রিট স্লাব বসিয়ে ঢেউ দ্বারা ওয়াশআউট সাময়িক ঠেকানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রতিবছর রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক বেশি হবে। এই রাস্তা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করবে হাওরের ইকোলজির। পানি প্রবাহের প্যাটার্ন বা কোর্সের আমূল পরিবর্তন করে ফেলবে। যদিও কিছু ব্রিজ বা কালভার্ট করে দেয়া হয়, কিন্তু সেগুলো বর্ষাকালের পানির প্রবাহের জন্য অপ্রতুল হবে। যেমন গভীর হাওরে ২৯.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম মহাসড়ক। বর্ষা মৌসুমে এই ২৯.১৫ কিলোমিটার জায়গা দিয়ে পানি মুক্তভাবে প্রবাহিত হতো। এখন আভুরা সড়ক করার পর তিনটি বড় ব্রিজসহ ১৪টি ছোট বড় কালভার্ট ও আরসিসি পুল দিয়ে পানি বের হবে, যার সর্বমোট দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটারের কম। মাত্র ৮০০ মিটার। বর্ষার সময় এই ২৯.১৫ কিলোমিটারের পানি মাত্র ৮০০ মিটার জায়গা দিয়ে প্রবাহিত হতে হবে। সাধারণ হিসাবে এক বছরের পানি প্রবাহিত হতে ১৮ বছর লাগবে ওই ব্রিজ দিয়ে বের হতে। তাহলে প্রতি বছর সব পানি বের হয়ে যাবে না এবং কিউমুলেটিভ হারে প্রতি বছর পানি জমতে থাকবে। হাওরের সমস্ত কৃষি জমি পানির নিচে চলে যাবে এবং স্থায়ীভাবে পুরোটা জলাভূমিতে পরিণত হবে। হাওরের ধান তথা কৃষি বন্ধ হয়ে যাবে এবং হাওরের শস্যভাণ্ডার তকমা মুছে যাবে। যখন প্রতিটি জনপদ এই রকম আভুরা সড়ক দিয়ে সংযুক্ত করা হবে তখন হাওর খণ্ড বিখণ্ড আবদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হবে, যার পানি কখনও নেমে যাবে না। বরং ফি বছর বেড়ে গিয়ে মারাত্মক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। সৃষ্টি হবে মানবিক বিপর্যয়। বিপুল ক্ষতি হবে মৎস্য সম্পদের। অর্থাৎ হাওরের জলজ জীববৈচিত্র্য  চিরতরে হারিয়ে যাবে। প্রথমে ছোট মাছ ও প্রাণী আক্রান্ত হবে এবং পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত হবে। পরে বড় মাছ ও প্রাণী বিলুপ্ত হবে। উদাহরণ স্বরূপ হাওরের চিংড়ি মাছের কথা বলা যেতে পারে। এই মাছ কম স্রোতের পানিতে চলাচল করে প্রতি বছর একটি অঞ্চলে ডিম দিয়ে বংশবৃদ্ধি করে থাকে। চিংড়ির বংশবৃদ্ধি করা রাস্তায় বা জায়গায় সড়ক হলে বা সড়ক বাঁধের মতো প্রতিবদ্ধকতা সৃষ্টি করলে কী হবে? চিংড়ির বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অভিযোজন করতে না পারলে পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত হবে। জলজ প্রাণীরা বংশবৃদ্ধি না করতে পারলে বিলুপ্ত হতে শুরু করবে; নষ্ট হবে বায়োডাইভারসিটি। পর্যায়ক্রমে একটির পর একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হতে শুরু করবে। এই প্রক্রিয়ায় হাওর মৎস্যশূন্য জলাভূমিতে পরিণত হবে। ফলে দেশ হারাবে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মাছের এক বড় ক্ষেত্র। কৃত্রিমভাবে পুকুরে মাছ চাষের মতো করে ঐসব আবদ্ধ জলাশয়ে মাছ চাষ করা যাবে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সম্ভব হবে না। কারণ, কৃত্রিমভাবে মাছ চাষ করলে পানি দূষিত হয় এবং আবদ্ধ জলাশয়ের পানি পুরোপুরি বের করে পরিশুদ্ধ করার ব্যবস্থা থাকবে না। ফলাফল অজন্মা জলাশয়ে পরিণত হবে হাওরের খণ্ড-বিখণ্ড অংশগুলো। আভুরা সড়ক বর্ষা মৌসুমে নৌচলাচলের বাধা হয়ে দাঁড়াবে। যে পথ বর্ষায় কম সময়ে যাওয়া যেত সেই পথ যেতে আভুরা সড়কের বড় ব্রিজ ঘুরে আসতে হবে। ফলে খরচ ও সময় বাড়বে। হাওরের সমাজ ব্যবস্থায়ও লক্ষণীয় পরিবর্তন হবে। অত্র অঞ্চলের মানুষ কৃষি, জেলে ও মাঝির পেশা ছেড়ে শহরের দিকে যাবে এবং বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হবে। ফলে কৃষি কাজ, মাছ ধরা ও পারাপারের জন্য মাঝি পাওয়া যাবে না এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়ে একসময় বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে শহরের মানুষের পেশার সঙ্গে প্রতিযোগিতার ফলে কর্মহীন হবে অনেক মানুষ।

আভুরা সড়কের বিকল্প সড়ক ব্যবস্থা ফ্লাইওভার সিস্টেম। হাওরের একটি বড় জনপদের সঙ্গে উড়াল পুলের মাধ্যমে আরেকটি জনপদের সংযোগ স্থাপন হবে এবং একইভাবে স্থলভাগের বিভিন্ন শহর-বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন হবে। ফলে হাওড় অঞ্চলে বসবাসকারী অধিবাসীরা বছরের ১২ মাস চলাচলের সুযোগ পাবে, যা হুবহু আভুরা সড়কের মতো। ফ্লাইওভার সংযোগের একমাত্র খারাপ দিক এর নির্মাণ খরচ। নির্মাণ খরচ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে পারলে এটিই হাওরের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট যোগাযোগ ব্যবস্থা। কারণ, আভুরা সড়কের যেসব খারাপ দিকের অবতারণা হয়, ফ্লাইওভারে তার কোনোটাই সৃষ্টি হবে না। হাওরের ইকোলজি ঠিক থাকবে, পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে না। ফলে কৃষি বন্ধ হবে না। জলজ প্রাণী ও মাছের প্রজনন এলাকা বিনষ্ট হবে না এবং প্রজাতি বিলুপ্ত হবে না। ফলে হাওরে স্বাস্থ্যকর বায়োডাইভারসিটি বজায় থাকবে। প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদের বৃহত্তর উৎস এই হাওর টিকে থাকবে এবং ধান ও মাছ সরবরাহ করে দেশের খাদ্য সমস্যা দূরীকরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। আভুরা সড়কের চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক কম হবে ফ্লাইওভারে। নৌ-চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবে না। হাওড় টিকে থাকবে কিন্তু জনগণের যোগাযোগ উন্নত হবে।

আভুরা সড়ক নির্মাণ খরচ, রাস্তার জন্য ব্যবহৃত জমির মূল্য, রাস্তা তৈরি করার জন্য মাটি নেওয়া জমির মূল্য (যে জমি আর অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে না), কংক্রিট স্লাব ও গাইডবাঁধ নির্মাণ খরচ, ফি-বছর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, ইকোলজি ও বায়োডাইভারসিটি চিরতরে নষ্ট করার সমমান মূল্য, চিরদিনের জন্য মৎস্যসম্পদ নষ্টের সমমান মূল্য, চিরতরে কৃষি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমমান মূল্য, আবদ্ধ জলাশয়ে বন্যা ঝুঁকির সমমান মূল্য এবং সর্বোপরি মানুষের পেশা নষ্টের সমমান মূল্য হিসাব করলে দেখা যাবে ফ্লাইওভার নির্মাণ খরচের চেয়ে অনেকগুণ বেশি হবে। তাই হাওরের মানুষের যোগাযোগের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতি ফ্লাইওভার সিস্টেম।

মাননীয় রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল হামিদ সাম্প্রতিক কিশোরগঞ্জ সফরে হাওরে ফ্লাইওভার নির্মাণের কথা বলেছেন। পরিবেশবিদ, পরিবেশ কর্মী, হাওর অ্যাকটিভিস্ট গ্রুপ ও পরিবেশবাদী সংগঠনের উচিত হাওরকে রক্ষার জন্য ফ্লাইওভার সিস্টেম যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য জোর দাবি তোলা ও জনমত গঠন করা এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির কথাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য সহযোগিতা করা। আমি মনে করি হাওর রক্ষায় এটাই সর্বোৎকৃষ্ট পথ।

লেখক: অধ্যাপক, ফার্ম স্ট্রাকচার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ