রূপালি গিটার ফেলে, অবশেষে চলে গেলেন

Send
রাহমান নাসির উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৬:১৯, অক্টোবর ১৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৩, অক্টোবর ২০, ২০১৮

রাহমান নাসির উদ্দিনকিছু কিছু মৃত্যু সংবাদ কেবল ভীষণ কষ্টই দেয় না, বা চোখের কোণে কেবল পানির স্রোত এনে হাজির করে না, কিংবা কেবলই ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দেয় না, বরঞ্চ কিছু সময়ের জন্য বুকের ভেতরটা ফাঁকা করে দেয়। বুকের ঠিক মাঝখানে যেখানে প্রেম থাকে, ঘৃণা থাকে, ভালোবাসা থাকে, মায়া-মমতা থাকে, আবেগ-অনুভূতি থাকে, দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনার সংমিশ্রণে এক মানবিক গুণাবলীর মিশেল থাকে, ঠিক সেই জায়গাটা হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে যায়। কিছু সময়ের জন্য সেখানে কোনও আলো-বাতাস যাওয়া-আসা করে না। সেখানে নিশ্চুপ শব্দহীন পিন-পতন নিঃশব্দতা। সুনসান নীরবতা।
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর সংবাদটি ঠিক একইভাবে আমার ভেতরটা কিছু সময়ের জন্য এভাবে ফাঁকা করে দিয়েছিল। কোনও শ্বাস-প্রশ্বাস নাই। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। নানান ব্যস্ততার সব কাজ ফেলে,বাংলাদেশের সব প্রাইভেট টিভি চ্যালেনগুলো আর সংবাদপত্রের অনলাইল পোর্টালগুলো হুড়মুড় করে দেখছিলাম। আর সব জায়গায় অবিরাম হাহাকার শুনতে পাচ্ছিলাম। তখনই বিশ্বাস করতে শুরু করলাম। আর  তখনই বুকের ভেতরটা কেমন জানি ফাঁকা হয়ে গেল। আধুনিক বাংলা ব্যান্ড সংগীতের তুমুল জনপ্রিয় সুপারস্টার আইয়ুব বাচ্চু আর নেই। আইয়ুব বাচ্চু শেষ পর্যন্ত তার নিজের কথা রেখেছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এ রূপালি গিটার ফেলে/ একদিন চলে যাবো দূরে/ বহুদূরে/’। কিন্তু তার দূরে যাওয়াটা এত কাছে সেটা বুঝতে পারিনি। আমার মতো অনেকেই বুঝতে পারেননি।একই গানে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, ‘সেদিন চোখে/অশ্রু তুমি রেখো/ গোপন করে’। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু তার কথা রাখলেও,আমি রাখতে পারিনি। চোখের পানি চোখে গোপন রাখতে পারিনি। চোখ পানিতে ভিজে গেছে। 

আমার প্রজন্মের অনেকেই আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনে বড় হয়েছে। আমার পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই আইয়ুব বাচ্চুর স্টাইল দেখে আধুনিক হয়েছে। বিশেষ করে আমার প্রজন্মের অনেকেই আইয়ুব বাচ্চুর গানের বাণী এবং সুরের যে প্রেমবোধ, বেদনা-বিলাস, এবং কষ্ট উদযাপনের নিদারুণ সব আনন্দ, তার নিজের জীবনে ধারণ করেই বড় হয়েছে।আইয়ুব বাচ্চুর অসম্ভব সব জনপ্রিয় গান নব্বই দশকের তরুণ প্রজন্মের বেশির ভাগই এক অকৃত্রিম মমতা দিয়ে ধারণ করেছিল, যা তাদের পরবর্তী জীবনেও সমানভাবে প্রভাব ফেলেছিল। প্রভাব বিস্তার করেছিল উত্তর-প্রজন্মের মন ও মননেও। ‘কোনও সুখের ছোঁয়া পেতে নয়/ নয় কোনও নতুন জীবনের আশায়/ তোমার চোখে তাকিয়ে থাকা,আলোকিত হাসি নয়/আশা নয়, না-বলা ভাষা নয়। আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি, তাই তোমার কাছে ছুটে আসি’— এসব গান কেবল আইয়ুব বাচ্চুর গান ছিল না, এ গান ছিল তরুণ প্রজন্মের অসম্ভব আবেগে বেড়ে ওঠার অনিন্দ্য সুন্দর প্রেম-ভালোবাসার, মান-অভিমানের স্বর্গীয় ব্যাকরণ। কিংবা ‘ফেরারি এই মনটা আমার/ মানে না কোন বাঁধা/তোমাকে পাওয়ারই আশায়/ ফিরে আসে বারবার’—এসব গান নির্দিষ্ট কোনও প্রজন্মকে নয়, বরঞ্চ প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত করেছে অসম্ভব জনপ্রিয়তার শক্ত মজবুত পাটাতন।কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকা মান-অভিমান ভাঙার জন্য আইয়ুব বাচ্চুর এ গানটি রীতিমতো কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিল— ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে/সেই আমি তোমাকে দুঃখ দিলে/ কেমন করে এত অচেনা হলে তুমি/ কিভাবে এত বদলে গেছি এই আমি/ও বুকেরই সব কষ্ট দু’হাতে সরিয়ে/ চলে বদলে যাই/ তুমি কেন বোঝ না/ তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়/ আমার সবটুকু ভালোবাসা তোমায় ঘিরে/ আমার অপরাধ ছিল যতটুকু তোমার কাছে/ তুমি ক্ষমা করে দিও আমায়’। আইয়ুব বাচ্চুর কষ্ট এবং দুঃখের গান গুলো বয়স নিরপেক্ষ শ্রোতার কাছে এখনও তুমুলভাবে জনপ্রিয়। যেমন— ‘কত রাত আমি কেঁদেছি/বুকের গভীরে কষ্ট নিয়ে’ বা ‘হাসতে দেখো, গাইতে দেখো/ অনেক কথায় মুখর আমায় দেখো/ দেখে না কেউ হাসি শেষে নীরবতা’ কিংবা ‘সুখেরই পৃথিবীর/ সুখেরই অভিনয়/যতই আড়ালে রাখি/আসলে কেউ সুখী নয়’ প্রভৃতি গান কোনও কালের বেদীতে সীমাবদ্ধ গান নয়, বরঞ্চ কালান্তরের বুকে বোরাকের চরিত্র নিয়ে এ গান সবসময়ই সমকালের হয়ে হাজির হয়েছে এদেশের একেক একটা প্রজন্মের কাছে। এভাবে একের পর  একের অ্যালবাম বের করে আইয়ুব বাচ্চু একটার পর একটা জনপ্রিয় গানের জন্ম দিয়ে নিজেই রীতিমতো কিংবদন্তী হয়ে উঠেছিলেন।নিজে গান লিখেছেন, নিজে সুর করেছেন এবং নিজে গেয়েছেন। সোলস-এর পর নিজের ব্যান্ড এলআরবি’র মাধ্যমে আইয়ুব বাচ্চু নিজের লেখা, সুর করা এবং নিজের গাওয়া অসংখ্য গান জনপ্রিয়তার এমন তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন যে, নব্বই দশক এবং শূন্য দশকের এদেশের শহরে ও গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘরে ঘরে সকাল-বিকাল আইয়ুব বাচ্চুর গান বাজতো। বর্তমানে অসংখ্য সংগীত শিল্পী,নানান তারকা শিল্পী এবং অসংখ্য ব্যান্ডের ভিড়ে আইয়ুব বাচ্চুর গান নিজস্বতা নিয়ে এখনও তুমুল জনপ্রিয়। তাই, তিন দশক ধরে আইয়ুব বাচ্চুই বাংলা ব্যান্ড সংগীতে বেতাজ-বাদশা। বাংলা সংগীত ও এর বিকাশ-বিস্তার নিয়ে আমার নিজের গবেষণার অংশ হিসেবে আমি আইয়ুব বাচ্চুকে একটা স্বতন্ত্র জায়গায় দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু নানান একাডেমিক ব্যস্ততার কারণে যা নিয়ে এখনও কোনও লেখালেখি করা সম্ভব হলো না। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু সে সময়টা আমাকে দিলেন না।

ষাটের দশকে চট্টগ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম আইয়ুব বাচ্চু, নব্বই দশকের বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের জগতে একজন মহাতারকা হিসেবে হাজির হন। আযম খান, ফিরোজ সাঁই এবং ফেরদৌস ওয়াহিদের হাত ধরে বাংলা সংগীতের জগতে যে পপ সংগীতের আবির্ভাব, তা আইয়ুব বাচ্চুর হাতে একটা স্বতন্ত্র, পরিশীলিত এবং মৌলিক চরিত্র পায়। পাশ্চাত্য যন্ত্র সংগীতের সব উপাদান ব্যবহার করে একেবারেই দেশীয় আবেগ, অনুভূতি, প্রেম,ভালোবাসা,কষ্ট,দুঃখ,দেশপ্রেম,প্রকৃতি,সমাজ এবং আমাদের মধ্যবিত্ত যাপিত জীবনের নানান অনুষঙ্গকে উপাদান করে গানের কথা, সুর এবং তার উপস্থাপনার একটা স্বতন্ত্র ঢং-এর কারণে আইয়ুব বাচ্চু খুব দ্রুততম সময়ে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। অসম্ভব ভালো গিটার বাজাতেন বলে প্রায় প্রতিটি ওপেন-এয়ারকন সার্টে আইয়ুব বাচ্চুর গিটারের তালে নাচেনি উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে এমন ছিল বিরল। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে— ব্যান্ড সংগীতের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও আইয়ুব বাচ্চু কখনও মা,মাটি,মাতৃভূমি এবং মানুষকে ভুলে যাননি। পাশ্চাত্যের মিউজিক্যাল ট্রেন্ড গ্রহণ করলেও দেশীয় সুর, কথা এবং দেশজ উপাদানকে সবসময় তার গানের উপজীব্য করেছেন। বিগত তিন দশক ধরে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের জগতে আইয়ুব বাচ্চু এক অদ্বিতীয় ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন— তার নিজস্বতা এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের গুণে। তিনি সিনিয়র শিল্পীদের যেমন যথাযথ সম্মান করতেন, তেমনি জুনিয়র স্নেহ সাহায্য এবং সহযোগিতা দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দিতেন। তাই তো, তাকে দেখি আযম খানকে প্রকাশ্যে পা ছুঁয়ে কদমবুচি করতে। আবার পার্থ বড়ুয়ার মতো শিল্পীকে দেখি আইয়ুব বাচ্চুকে প্রকাশ্যে ‘শিক্ষক’ হিসেবে মনে করতে। বাংলাদেশে তারকাদের আচরণ যখন সকাল-বিকাল সংবাদ শিরোনাম হয়, তখন আইয়ুব বাচ্চুর মতো শিল্পীরা কিভাবে তারকা হতে হয়, কিভাবে তারকারত্ব উদযাপন করতে হয় এবং তারকা হিসেবে সমাজ-রাষ্ট্র-মানুষ-প্রজন্মের প্রতি বাড়তি দায়িত্ব ও কর্তব্য কিভাবে পালন করতে হয়, তার নজির স্থাপন করে গেছেন। এজন্যই আইয়ুব বাচ্চুরা সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং সর্বজন প্রেম্য।

লেখাটা শুরু করেছিলাম, আইয়ুব বাচ্চু ‘রূপালি গিটার ফেলে চলে যাবো’ বলেছিলেন, তাই তিনি চলে গিয়ে কথা রেখেছেন। কিন্তু শেষ করবো এটা বলে যে, আইয়ুব বাচ্চু কথা রাখেননি, কেননা আইয়ুব বাচ্চু গেয়েছিলেন— ‘আর কত এভাবে কাঁদাবে আমাকে/আর বেশি কাঁদালে/উড়াল দেবো আকাশে’। কথা ছিল, কেউ কাঁদালে তিনি আকাশে উড়াল দেবেন। কিন্তু যাকে মানুষ এত ভালো বাসে তাকে কাঁদাবে কে? কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই ‘সুখের অভিনয়ের পৃথিবী ছেড়ে’ আইয়ুব বাচ্চু আমাদের সবাইকে ছেড়ে আকাশে উড়াল দিয়েছেন। আইয়ুব বাচ্চু আকাশে থাকবেন, কিন্তু তার গান আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবে। আইয়ুব বাচ্চুর গান থাকবে আমাদের প্রেম, ভালোবাসা, সুখ- দুঃখ, আনন্দ-বেদনায় আশ্রয় হয়ে। আমাদের নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হয়ে। আমাদের একাকীত্বের বন্ধু হয়ে। আমাদের সব ভালোবাসার সারথী হয়ে। আইয়ুব বাচ্চু তার রূপালি গিটার ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু তার রূপালি গিটার আমরা অত্যন্ত যত্ন করে রাখবো।আমাদের পরম ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা দিয়ে। 

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো হিসাবে উচ্চতর গবেষণা করছেন।

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ