নির্বাচন কমিশনও কি ‘গরিবের বউ’?

Send
এরশাদুল আলম প্রিন্স
প্রকাশিত : ২০:১০, অক্টোবর ২২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১২, অক্টোবর ২২, ২০১৮

এরশাদুল আলম প্রিন্সনির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা ও এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ফর্মুলা নিয়েও। আমাদের বর্তমান রাজনীতির যে চিত্র, তার পেছনের একটি বড় কারণ হচ্ছে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’  সম্পর্কে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে ধারণা ও অবস্থানগত দূরত্ব। গত একদশকে এ দূরত্ব আরও বেড়েছে। তবে এ দূরত্ব আদর্শের চেয়ে বেশি ক্ষমতাকেন্দ্রিক।
এরশাদ সরকারের পতনের পর একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তিন জোটের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। সেই রূপরেখার প্রথম খসড়ায় পরবর্তী তিনটি নির্বাচন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্বাচন তদারকির সরকারের অধীনে করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। একইভাবে দুই দশকেরও বেশি সময় পরে পঞ্চদশ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণ হিসেবে আদালতই পরবর্তী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সংসদীয় কমিটির সদস্য ও বিশেষজ্ঞরাও এর পক্ষে অভিমত দিয়েছিলেন।
কিন্তু নির্বাচন নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক সমস্যা এত সহজে মিটবে কেন? ফলে তিন জোটের রূপরেখার প্রথম ড্রাফট বা আদালতের রায় কোনোটিই আমরা গ্রহণ করিনি।

দেশ স্বাধীন হয়েছে পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। কিন্তু এই অর্ধ শতাব্দীতেও দলীয় সরকারের অধীনে একটি আস্থাশীল নির্বাচন আমাদের ভাগ্যে জোটেনি। স্বাধীন বঙ্গভূমিতে আমাদের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা যা-ই হোক, প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ইতিহাস আমাদের অতি প্রাচীন। অবিভক্ত ভারতেও বাঙালি তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। ভোট নিয়ে রাজনীতি হয়েছে, শোষণ-নির্যাতন, দুঃশাসন হয়েছে, কিন্তু জনগণের আমানতের খেয়ানত হয়নি। এমনকি ভোটের মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারত দুই টুকরা হয়েছে, তাও ভোট নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়নি। সে আমলে, ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো’ বা ‘আমার ভোট আমি দেবো, দেখে, শুনে, বুঝে দেবো,’—এ জাতীয় চটকদারি কথার বালাই ছিল না। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালের ৮-১২ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে। সেখানে নব গঠিত যুক্তফ্রন্ট সুপ্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগকে মাত্র ৯টি আসন ধরিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল বাঙালি কী জিনিস। ষোলো বছর পরে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি পাকিস্তানবাদকে চূড়ান্তভাবে না বলে দিয়েছিল। এর স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে জন্ম নিয়েছে নতুন রাষ্ট্র-বাংলাদেশ। কিন্তু ‘কষ্ট করে ভোট দিতে যেতে হবে না, আমরাই দিয়ে দেব’, ‘আপনার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে মুরুব্বি’—এ ধরনের অভিযোগও শোনা যায়নি।

যাইহোক, আমাদের অবস্থা হয়েছে রাষ্ট্রপতির কথিত ‘গরিবের বউয়ের মতো’। ভোটের কথা বললে, কিল একটার জায়গায় দুইটা পড়ে। ভাত যদি আমার উন্নয়ন হয়, তবে ভোট কি আমার টেকসই উন্নয়ন নয়? টেকসই উন্নয়ন না হলে, গরিবের বউরা যে চিরদিন সবার ‘ভাউজ’ হয়েই থাকবে। ফলে, ভাত ও ভোটকে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দাঁড় করানো এক রাজনৈতিক ভ্রান্তি। স্বাধীনতার পর থেকে ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য অনেকে শহীদ হয়েছেন, কিন্তু মানুষের ভাতের অধিকার আদায়ের জন্য প্রেসক্লাব থেকে পল্টন পর্যন্ত পাঁচজন লোকের একটি মিছিল হতে দেখিনি। দেশের সর্বশেষ ভুখা মিছিল হয় স্বাধীনতার আগে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে।

ভোট নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার। নাগরিক জীবনে পাঁচ বছরে একবারই এই অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ আসে। দেশের প্রথম নির্বাচন থেকেই নাগরিকদের এই অধিকারটির ওপর রাজনীতিকদের যত গোস্বা। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে এমন কিছু প্রার্থীকে জয়ী করে আনা হয়েছিল, যারা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের দুঃখের কারণ হয়েছিলেন। খোন্দকার মোশতাক তাদের অন্যতম।

জিয়াউর রহমান যখন ধীরে ধীরে সামরিক পোশাক ছেড়ে গেঞ্জি পরার দিকে ঝুঁকে পড়ছিলেন (কিন্তু সানগ্লাস খোলেননি), তখন তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিলের ভাষণে তিনি গণভোট দেওয়ার ইঙ্গিত দেন। তার প্রতি জনগণের আস্থা আছে কিনা, তা যাচাই করার ৩০ মে গণভোট হয়। আমাদের তদানিন্তন নির্বাচন কমিশন জানালো, নির্বাচনে শতকরা ৮৮ দশমিক ৫০ ভাগ ভোটার ভোট দিয়েছেন আর তাদের মধ্যে ৯৮ দশমিক ৯ ভাগ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। মানে, ৯৮ দশমিক ৯ ভাগ ভোটার জিয়াউর রহমানের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে। বলে রাখা দরকার, এই গণভোটের আগেই জিয়া রাষ্ট্রপতি, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফের পদ দখল করে ফেলেছেন। কাজেই এমন তিনটি পদাধিকারীর সামনে এক পদাধিকারী নির্বাচন কমিশনের আর কী-ই বা করার থাকে? শতকরা ২ ভাগ যে অনাস্থা প্রকাশ করেছে, এটা দেখাতে পেরেছে তা-ই বা মন্দ কী! শাসকের জন্য এমন ‘ভূমিধস বিজয়’ উপমহাদেশে আর কোনও নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত দেখাতে পারেনি।

নির্বাচনের এই অবিশ্বাস্য ফলের জন্য জিয়া যতটা দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী ছিলেন তার চারপাশে ইতোমধ্যেই বেড়ে ওঠা জি-হুজুর মশায়রা। এই জি-হুজুর মশায়রা আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। এরাই আদালতের রায়ের অবাধ্যকর পর্যবেক্ষণমূলক অংশের দ্রুত বাস্তবায়ন করতে সংবিধান সংশোধন করিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রহিত করার ব্যবস্থা করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, যেকোনও নির্বাচনই রাজনৈতিক সরকারের অধীনে হওয়া উচিত। একটি নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা লঙ্ঘন হতে পারে না। পৃথিবীর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে রাজনৈতিক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়ে থাকে। সেখানে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠে না।

আসলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা কোনও সরকারের অধীনে নির্বাচন হলো তার ওপর নির্ভর করে না। নিরপেক্ষ নির্বাচন বা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা একটি আলাদা বিষয়। নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করার যাবতীয় দায়-দায়িত্ব ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে নির্বাচন কমিশন। এ কর্মভার সম্পন্ন করার জন্য যা যা প্রয়োজন, নির্বাচনকালীন সাংবিধানিক সরকার কমিশনকে সে সব বিষয়ে যাবতীয় সহায়তা করবে। এ নির্বাচনকালীন সরকারকে আমরা যে নামেই অভিহিত করি না কেন। এটি কোনও বিশেষায়িত সরকার হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের সংবিধানে এমন বিধান আগেও ছিল এখনও আছে। কিন্তু এসবই তো একাডেমিক কথা, যা কেবল সংবিধানেই লেখা আছে।

সংবিধানে যা-ই থাকুক, বাস্তবে সরকার নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করলো কী, করলো না, কমিশন সরকারের কাছে সাহায্য চাইলো কী, চাইলো না, সাহায্য চেয়ে পেলো কী, পেলো না—এসবই ঘটনার প্রশ্ন (কোয়েশ্চন অবি ফ্যাক্ট), যা শুধু সরকার ও কমিশনই জানে। আম-ভোটারের কাছে সরকার-কমিশনের এই মিথস্ক্রিয়া দৃশ্যমান নয়। সব প্রেম সবার দেখতে নেই। শুধু তাই নয়, সব প্রেম সবার করতেও নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, গরিবের বউয়ের অনেক প্রেমে সাড়া না দিয়ে উপায়ও থাকে না। ইচ্ছা না থাকলেও হাসিমুখে দু’চারটি আবদার মেটাতেও হয় কখনও কখনও।

খুলেই বলি—বিষয়টি এ আমলের বা আগের আমলের নয়। বিষয়টি একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের, যার ওপর মানুষের আস্থা থাকবে। ভোট মানুষের আমানত। সে আমানত গচ্ছিত থাকে কমিশনের হাতে। কমিশনের গাফলতিতে যদি সে আমানতের খেয়ানত হয়, সে দায়িত্ব কার? সরকার যাবে-আসবে। ক্ষমতায় যাওয়া-আসার পথ সহজ করতেই শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন দরকার। না হলে, আবদারের পাল্লাই দিনকে দিন ভারী হবে।

সে লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখাও গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ৭ আগস্ট ও ২৭ সেপ্টেম্বর বলেছিলেন, নির্বাচন খুব সম্ভবত ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার এই বক্তব্যের পর জনগণ ভেবেছিল ডিসেম্বরের মধ্যেই  নির্বাচন হবে। কিন্তু এখন সিইসি বলছেন, ডিসেম্বর নির্বাচন হবে এমন কথা তারা বলেননি। সিইসির কথারই প্রতিধ্বনি শুনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কথায়। ৭ অক্টোবর তিনি বললেন, ‘নির্বাচন কমিশন জানুয়ারি মাসের ২৭ তারিখের আগে যেকোনও দিন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে পারে।’

এদিকে, সরকারবিরোধী মোর্চার দাবি তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে।

আজিজ সাহেবের  কথা মনে পড়ে গেলো।  কারণ, বিএনপি আমলে দেশে আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন ছিল। কিন্তু আজিজ সাহেব বিএনপিকে সামলাতে পারেননি। বিরোধীদেরও খুশি করতে পারেননি।

মাগুরার নির্বাচনও উপহার দিয়েছিল এই বিএনপিই। সেদিন বিএনপি নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করার কথা বলেনি।

নির্বাচন কমিশন সংবিধান ও আইনানুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করবেন, সরকারও সংবিধান অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করবে। এটিই স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন এলেই এ নিয়ে নানা কথা হয়। অথচ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় সরকার বদল বা নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এত কথা হয় না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় কথা হয় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে। কিন্তু এ সময়েও আইন, সংবিধান কিছুই বদলায় না। বদলায় শুধু রাজনীতিকদের মনস্তত্ত্ব। অথচ নির্বাচন কমিশন নিয়েই আমাদের সব সময় কথা বলা উচিত, যেন এই প্রতিষ্ঠানটির ওপর মানুষের আস্থা সৃষ্টি হয়।

নির্বাচন কমিশনকে দামি না বানিয়ে ডামি বানিয়ে অনেক স্বৈরশাসক ফায়দা লুটেছেন। গণতান্ত্রিক শাসকরাও এ থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। ১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। ২ মে জিয়াসহ আরও ১১ জন রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন। একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলও হয়। জিয়া তার নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখানোর জন্য এসব ডামি প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে জিয়া ছাড়া উল্লেখযোগ্য প্রার্থী ছিলেন ‘গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট’এর কর্নেল ওসমানী ও ‘জাতীয় যুক্তফ্রন্ট’-এর আতাউর রহমান খান। তারা নির্বাচনে অংশ নিলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান। উদ্দেশ্য, সংসদের অধীনে একটি খবরদারিমুক্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। কিন্তু জিয়া চেয়েছিলেন আগে রাষ্ট্রপতি হয়ে সংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে। তাই তিনি আগে রাষ্ট্রপতির পদ ঠিক রাখতে চেয়েছেন। এ কাজে ব্যবহার করেছেন নির্বাচন কমিশনকে। এ থেকে এটাই পরিষ্কার যে, ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকলে নির্বাচন কমিশনকে, নির্বাচনকে প্রভাবিত করা যায়। কিলের ভয় সবারই আছে। তাই সবাই ‘ভাউজের’ ক্ষমতা বাড়ুক, এটা কেউ চায় না। সবাই চায় কিল মারার গোঁসাই হতে।

লেখক: আইনজীবী ও কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ