স্যালুট, সাহস সঞ্চারিণী

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৭:২৪, অক্টোবর ২৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৫, অক্টোবর ২৪, ২০১৮

প্রভাষ আমিনমঙ্গলবার দিনটি আমার দারুণ কেটেছে। নিজেকে অনেক বদলে যাওয়া, সাহসী মনে হয়েছে। প্রতিদিন মুখ বুজে আপস করতে করতে, হাজারটা ভয়ে কাবু হয়ে কেঁচোর মতো গর্তে লুকিয়ে থাকতে থাকতে আমরা ভুলেই যাই, আমরা মানুষ। চাইলে আমরাও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারি। একজন নারী, সাহসী নারী আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে রাত আড়াইটায় চার পুলিশের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করে যেতে হয় শেষ পর্যন্ত। তিনি শুধু সাহসী নন, সাহস সঞ্চারিণীও। তার অমিত তেজ, দৃঢ়তা থেকে আমাদের সবারই শেখার আছে।
তবে এ দেশে প্রতিবাদ করতে শুধু সাহস নয়, দুঃসাহসও লাগে। যে দেশে পরিবারের সামনে থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরদিন কোর্টে চালান দেওয়ার বদলে রাস্তার পাশে লাশ পড়ে থাকে; সে দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস মানুষ পাবে কোত্থেকে? বাংলাদেশের পুলিশ অনেক মানবিক। নইলে মুখে মুখে এত ‘বেয়াদবি’ করার পরও যে পুলিশ সেই নারীটিকে নিরাপদে যেতে দিলো, সেটা কি যথেষ্ট মানবিকতা নয়? পুলিশ একটু অমানবিক হলেই, সেই নারীর কপালে যেকোনও কিছু ঘটতে পারতো। পুলিশের মানবিকতার অনেক মাত্রা আছে। তল্লাশির নামে নারীকে হেনস্তা করে তার ভিডিও ভাইরাল করা অবশ্যই সবচেয়ে মানবিক। আর কী কী হতে পারতো, তা ভাবতেই আমার গা শিউরে উঠছে, বিবরণ দিতে চাই না। কিন্তু ছেলে হলে কী হতে পারতো? চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দিতে পারতো, পকেটে ইয়াবা বা গাঁজা গুঁজে দিয়ে চালান দেওয়া হতে পারতো, কোনও গায়েবি রাজনৈতিক মামলায় রিমান্ডে নিতে পারতো, মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে পরদিন ক্রসফায়ারের গল্প সাজাতে পারতো, মাথায় গুলি করে অস্বীকার করতে পারতো বা মেরে লাশ গুম করে দিতে পারতো। সবচেয়ে অমানবিক পুলিশ হলো সে, যে লাশ গুম করে দেয়। সবচেয়ে মানবিক হলো যে চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দেয়। এই যখন অবস্থা, তখন আপনি কোন সাহসে প্রতিবাদ করবেন? আপনার ঘাড়ে কয়টা মাথা? তবে সাহসী সেই নারী পরবর্তী সময়ে কী কী হতে পারে তা না ভেবেই প্রতিবাদ করেছেন। আমাদের বুঝিয়েছেন, কেঁচোর মতো গর্তে লুকিয়ে বা তেলাপাকার মতো দীর্ঘদিন বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো একদিন বাঁচাও সম্মানের। ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।’ অন্যায় না করলেও প্রতিদিন কত অন্যায় যে আমরা সহে যাই; কত ঘৃণা যে পাই; তার  ইয়ত্তা নেই। কিন্তু নাম না জানা সেই নারী আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, পরিণতি না ভেবেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়, করা যায়।

বিভিন্ন মাত্রার মানবিক পুলিশের কথা বললাম বটে, কিন্তু এই মাত্রার বাইরে আরও অনেক মানবিক পুলিশ সদস্যকে আমি চিনি। আমি বিশ্বাস করি পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি। আমাদের দিনরাত নিরাপদ রাখতে পুলিশ সদস্যরা রাতদিন মাঠে পড়ে থাকেন। তবে তাদের একটু বিচ্যুতি হলেই আমরা হইচই করি। কারণ, পুলিশের হাতে ক্ষমতা বেশি, তাই ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগও বেশি। তাই তাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। চার পুলিশ সদস্য মধ্যরাতে সেই নারীর সঙ্গে যে আচরণ করেছে, অন্য কারও পক্ষে তো ইচ্ছা থাকলেও এটা করা সম্ভব নয়।

পুলিশ রাস্তায় রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালায়, তা আমাদের চলাচল নিরাপদ রাখতেই। শুধু রাতে নয়, দিনেও তারা তল্লাশি চালায়। তল্লাশি চালানোটা অপরাধ নয়, অপরাধ হলো তল্লাশির নামে হেনস্তা করা। চার পুলিশ সদস্য মিলে রাত আড়াইটায় একা এক নারীর সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তা অবশ্যই অপরাধ। তবে তারচেয়ে বড় অপরাধ সেটা, যেটা তার অগোচরে ভিডিও করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া। মহানগর পুলিশকে ধন্যবাদ, তারা ইতোমধ্যে ওই চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হবে। কিন্তু দাবি জানাচ্ছি, তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও মামলা করার।

চার পুলিশ সদস্য খুব পরিকল্পিতভাবে সেই নারীকে হেনস্তা করেছে, ভিডিও করেছে। তবে তারা ভিডিওটি শেয়ার না করলে আমরা জানতেই পারতাম না, রাতের পুলিশ কত ভয়ঙ্কর, কতটা নারীবিদ্বেষী।

পুলিশের বিরুদ্ধে সেই নারীর প্রাথমিক অভিযোগ ছিল, তার চোখ ভালো না, সেই পুলিশ ‘ফিল্ডিং’ মারার চেষ্টা করেছে। একজন পুরুষের দৃষ্টি ভালো না খারাপ, সেটা একজন নারীর চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। তারপর পুলিশ তাকে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তার বিরুদ্ধে বেয়াদব, হোটেল থেকে নেমে আসা, বিশ্বসুন্দরী, র‌্যাম্পে হাঁটা, অ্যাডিক্টেট—ইত্যাদি অভিযোগ করেই গেছে। তার পরিবার সম্পর্কেও অভিযোগ করেছে। তাকে ল্যাং মেরে থানায় নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তার মুখে আলো ফেলে তাকে বিরক্ত করেছে। সেই নারী বারবার বলেছেন, আলো সরান, ব্যাগ চেক করুন। তিনি ব্যাগে বেআইনি কিছু বহন করছেন কিনা, এটা চেক করাই পুলিশের কাজ। তিনি কী করেন, বাসা কোথায়, কয়টার সময় যাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কী পোশাক পরেছেন; এগুলো দেখা পুলিশের দায়িত্ব নয়। সন্দেহজনক কিছু পেলে পুলিশ তাকে থানায়ও নিতে পারে, কিন্তু সেটা ল্যাং মেরে নয়। কিন্তু সেই চার পুলিশ মূল কাজটাই করেনি। পুলিশের উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদে ওই নারী সমানে   জবাব দিয়েছেন। বলেছেন, আমি বেয়াদব, কী সমস্যা? বারবার তিনি বলেছেন, আমি বেআইনি কিছু করছি কিনা, সেটা দেখুন, আমার মুখে আলো ফেলবেন না। সাড়ে ৬ মিনিটের ভিডিও করে ছেড়ে দেওয়ার সময়ও পুলিশ সিএনজিচালককে বলেছে, এটারে ওইখানে নিয়া রাস্তায় ছেড়ে দেন।

একটা শহর কতটা নিরাপদ, তা বোঝা যায়, সেই শহরে নারীরা কতটা নিরাপদ তা দিয়ে। নয়াদিল্লিতে নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ড পাওয়া আসামিও নির্ভয়ার গভীর রাতে বাইরে থাকাকে দায়ী করেছে। একই সুর চার পুলিশ সদস্যের কণ্ঠেও, ‘রাত আড়াইটায় কোনও ভদ্র ঘরের মেয়ে বাইরে থাকে না’–এটাই মূল অভিযোগ। নয়াদিল্লিতে অভিযোগ ছিল বাসচালকদের কণ্ঠে, আর ঢাকায় পুলিশের; এটাই আতঙ্কের। পুলিশকে রাস্তায় পাঠানো হয়েছে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাতদিন ২৪ ঘণ্টা সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কিন্তু তারাই যদি নারীদের হেনস্তা করে, তাহলে তারা যাবে কোথায়?

আমি আমার লেখায় শব্দচয়নের ব্যাপারে খুব সাবধান থাকি। অশ্লীল বলে বিবেচিত হতে পারে বা অপ্রচলিত কোনও শব্দ ব্যবহার করি না। তবে আজ সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে একটা শব্দ ব্যবহার করতে চাই। ওই নারীর সঙ্গে কথোপকথনের ভিডিও ফাঁস করে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে এক পুলিশ সদস্য বলেছিল, ‘কাল দেখবা’। জবাবে সাহসী সেই নারী বলেছেন, ‘...দেখবো’। এভাবে ছন্দ মিলিয়ে পুলিশের অন্যায়ের জবাব দেওয়ার আর কোনও উদাহরণ আমি জানি না। অসাধারণ জবাব।

সেই নারী কী করেন, তিনি কোত্থেকে কোথায় যাচ্ছিলেন, তা নিয়ে আমার কোনও আগ্রহ নেই, মাথাব্যথা নেই। আমি শুধু তাকে অভিবাদন জানাতে চাই। তার এই প্রতিরোধ আমাদের সাহসী করবে। আমাদের নারীরা যে অবলা নয়, দুর্বল নয়; সেটা তিনি প্রমাণ করে দিলেন।

এই ঘটনায় আরেকটা বিষয় পরিষ্কার। যেসব পুরুষ নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবে, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা লালন করে, তারা সবাই এক। একজন ব্যারিস্টার যেমন সরাসরি অনুষ্ঠানে একজন নারীকে ‘চরিত্রহীন’ বলতে পারেন; পুলিশও পারে মধ্যরাতে একজন নারীকে ‘বেয়াদব, হোটেল থেকে আসা’ বলতে। যারা মানুষের চেয়ে বেশি পুরুষ হয়ে ওঠে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হবে ঘরে, বাইরে, রাস্তায়, দিনে, রাতে। নাম না জানা সেই সাহসী বোন আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, সেই প্রতিরোধে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা নারীদেরই আছে। নারী ইস্যু-পুরুষ ইস্যু এভাবে আলাদা না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে হবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানবিক সবাইকে। সুখের কথা হলো, ব্যারিস্টার মইনুলের বিরুদ্ধে যেমন দেশজুড়ে প্রতিবাদ হয়েছে; তেমনি পুলিশের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ হয়েছে, হচ্ছে। অন্যায় সহে সহে আমরা আর ঘৃণা কুড়াতে চাই না; প্রতিবাদ করতে চাই সব অন্যায়ের।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ