বিএনপির গঠনতন্ত্রের সংশোধন সংবিধান পরিপন্থী

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৭:২৫, নভেম্বর ০৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৬, নভেম্বর ০৪, ২০১৮

মোস্তফা হোসেইনদুর্নীতিকে দলীয় আইনে জায়েজ করার প্রমাণ বোধ করি বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। আর সেই উদাহরণটি তৈরি করেছে বিএনপি। দলটি তাদের গঠনতন্ত্র থেকে ৭ নম্বর ধারাটি অস্বাভাবিক উপায়ে বাতিল করার পর অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। এটা কীভাবে সম্ভব, এমন প্রশ্ন অনেকের কাছ থেকেই শোনা গিয়েছিল।
প্রশ্নটি জোরালো হয় খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার সপ্তাহকাল আগে তড়িঘড়ি করে দলীয় গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়ার পর। তখনও প্রশ্ন এসেছিল, বিএনপি নেতারা কি স্পষ্ট হয়েছে খালেদা জিয়া বিচারে শাস্তি পেয়ে যাবেন? বাস্তবতা হচ্ছে, খালেদা জিয়া আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। একইসঙ্গে তারেক রহমানও।
ফলে বিএনপির নেতৃত্বে খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমানের থাকাটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার উচ্চ আদালত থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো নির্দেশনায় আরেকবার ঝাঁকুনি দিয়েছে বিষয়টি। এমন সময় এই নির্দেশনাটি গেলো, যখন বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনি সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। যখন নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে দেখা করতে যাওয়ার কথা। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণারও পথে। নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক দলগুলো মাঠ চষে বেড়াচ্ছে। এমনকি কোনও কোনও দল মনোনয়ন কাজেও অনেকদূর এগিয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে বিএনপি কি নির্বাচনের কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে পারবে? বিএনপি বলছে, বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য সরকারের কৌশল এটা। কথা হলো, সরকারি দল রাজনীতি করতে গিয়ে কৌশল তো নিতেই পারে। বিএনপিরও তো পাল্টা কৌশল নেওয়ার কথা। নেয়নি, এমনটা বলার সুযোগ নেই। আর সেই নেওয়াটাই হয়ে গেছে বুমেরাং। গঠনতন্ত্রের এই সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকাশ করে দিলো, তারা প্রকৃতই দুর্বল অবস্থানে এবং দুর্নীতিবাজ হিসেবে সমাজে চিহ্নিত কাউকেও তাদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করতে যাচ্ছে।

এই মুহূর্তে উচ্চ আদালত যখন নির্বাচন কমিশনকে বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র সাময়িক সময়ের জন্য গ্রহণ না করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তখন তাদের নড়েচড়ে বসতে হয়েছে। বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খানসহ অন্য নেতারাও বলছেন, সংশোধনীটা কখনও রাষ্ট্রীয় সংবিধানের পরিপন্থী নয়। আর তাদের দলীয় গঠনতন্ত্র সংশোধনের ক্ষমতা তাদের আছে। এটাও সাংবিধানিক অধিকার তাদের। প্রশ্নটা এখানেই। সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক পথে রাজনৈতিক দল চলবে, এটা প্রত্যাশিত। আর সেই পথচলাকে নির্দেশনা দেয় তার গঠনতন্ত্র। সেই আলোকে প্রতিটি সংগঠনেরই গঠনতন্ত্র থাকতে হয়। আর তা কোনোভাবেই অনৈতিক ও বিতর্কিত পথকে জায়েজ করার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। কিন্তু বিএনপি তাদের গঠনতন্ত্র এমনভাবে সংশোধন করেছে, যা লিখিতভাবে দলটিকে নৈতিকতা বর্জিত বলে আখ্যায়িত করে দিয়েছে। না হলে দলটি সৃষ্টির সময় গৃহীত গঠনতন্ত্র কীভাবে এমন নেতিবাচক সংশোধনের দিকে যেতে পারে। তারা গঠনতন্ত্রের ৭ ধারায় উল্লেখ করেছিল, ‘নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যেকোনও পর্যায়ের যেকোনও নির্বাহী কমিটির সদস্যপদের কিংবা জাতীয় সংসদের নির্বাচনে দলের প্রার্থীপদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তারা হলেন, (ক) ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ৮-এর বলে দণ্ডিত ব্যক্তি। (খ) দেউলিয়া (গ) উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি, (ঘ) সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।’

সুষ্ঠুভাবে সংগঠন পরিচালনা স্বচ্ছ ব্যক্তিদের সদস্যভুক্ত করার জন্য এই ধারা থাকাই স্বাভাবিক। যখন এই ধারা বাতিল করা হলো, তখনই তারা নিজেদের মধ্যে দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয়ের পথ খুলে দিলো বলে প্রমাণিত হয়ে যায়। এই পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও বটে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খানের বক্তব্য কি এখানে টিকতে পারে?

আমাদের সংবিধানে ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘নৈতিক স্খলনজনিত কারণে যদি কারও দুই বছরের বেশি সাজা হয়, তাহলে সাজা ভোগ করার পর আরও পাঁচ বছর তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।’ এই মুহূর্তে প্রশ্ন করা যায়, তাদের সংশোধনী কি নৈতিকতাবিরোধী নয়? কোনও সুস্থ ধারার সংগঠন কি দুর্নীতিবাজদের দলীয় নেতাকর্মী বানানোর পথ বেছে নিতে পারে?

বিএনপি বলছে, এটাও সরকারের ষড়যন্ত্র। রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক কৌশলকে এভাবেই আখ্যায়িত করে থাকেন। যদি তাদের কথা অনুযায়ী সরকারি দল এখানে কোনও ভূমিকা পালন করে থাকেও তাহলেও কি নিজেদের অশুভ উদ্যোগকে জায়েজ করার কোনও পথ খোলা থাকে? আর আদালতে রিট করার বিষয়টি যখন আসে, তখন প্রশ্ন আরও জন্ম নেয়। এই রিটকারী কে? ঢাকার কাফরুলের বাইশটেকির বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহ আলম মিয়ার ছেলে মোজাম্মেল হোসেনের নাম তো বাদী হিসেবে উল্লেখ আছে। যেখানে তিনি নিজেকে বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

কিন্তু তাদের কারও মুখ থেকে এ পর্যন্ত বলতে শোনা যায়নি, এই মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে বিএনপির কোনও সম্পর্ক নেই। কিংবা তারা এটা প্রমাণের চেষ্টাও করেনি যে, এই মোজাম্মেল হোসেন সরকারের হয়েই রিট করেছেন। তার মানে এটাই সত্য বলে ধরে নিতে হবে, বিএনপিই বিএনপির বিরুদ্ধে রিট করেছে। তাহলে সরকারের চেষ্টা কিংবা অপচেষ্টার অপবাদ টিকে কী করে?

দ্বিতীয় কথা, আদালত তো স্থায়ী কোনও আদেশ দেননি। আদালত বলেছেন, মোজাম্মেল হোসেনের এই রিটের আবেদনটি যেন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়। এই সময় যেন নির্বাচন কমিশন বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র গ্রহণ না করে। তাহলে বিএনপি যদি দুর্নীতিবাজ কাউকে দলের সদস্যপদে গ্রহণ করার সংশোধিত গঠনতন্ত্রকে তাদের দলীয় নির্দেশনা হিসেবে গণ্য করতে চায়, আর তা যদি সংবিধানের পরিপন্থী না হয়, তাতে তাদের এত উদ্বিগ্ন হওয়ার কী আছে? আদালতেই তার ফয়সালা হতে পারে।

আদালতের বিষয় আদালতে ফয়সালা না করে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা যে কাণ্ড বুধবার ঘটিয়েছেন, তাতেও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই আইনজীবীরাও কি তাহলে দুর্নীতিবাজদের তাদের দলের নেতাকর্মী হওয়াকে সমর্থন করেন?

বিএনপি নেতাদের বলতে শোনা যায়, একটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে কী থাকবে আর কী না থাকবে, সেটাও কি আদালত নির্দেশ দেবেন? তাদের এই প্রশ্ন যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করা যেতো, যদি তাদের কেউ চ্যালেঞ্জ না করতো। আর সেটা যদি সংবিধানের পরিপন্থী কিছু না হতো? তারা এই সংশোধনীর মাধ্যমে নিজেদের প্রণীত গঠনতন্ত্রকেই শুধু পরিবর্তন করেনি, নৈতিকতার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন। এটা বলার সুযোগ তারাই তৈরি করে দিয়েছেন। দেখা যাক, নির্বাচনের আগে কোনদিক সামাল দিতে তারা অধিক আগ্রহী হয়। আর দুর্নীতিবাজদের দলে রাখার সুযোগকেও জনগণ কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে, তা যাচাইয়ের সুযোগ তো নির্বাচনের মাধ্যমেই আসছে। ততদিন আমরা অপেক্ষায় থাকলাম।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

/এসএএস/এমওএফ/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ