আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা

Send
আনিসুর রহমান
প্রকাশিত : ১৮:৫৪, নভেম্বর ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৯, নভেম্বর ১৩, ২০১৮

আনিসুর রহমানপৃথিবীর ইতিহাসে মত প্রকাশের প্রথম আঘাতটি সম্ভবত পান গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের একটি ছিল– সক্রেটিসের দর্শনে প্রভাবিত হয়ে তরুণরা বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ও ব্যবসায়ীরা মনে করলো, সক্রেটিসের আলোয় আলোকিত তরুণরা শাসক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর শোষণের জন্যে হুমকি হতে পারে। এ রকম ভেবে সক্রেটিসকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। তার বিচার হয়েছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। বিচারক প্যানেলের ৫০০ সদস্যের মাঝে তার মৃতুদণ্ডের পক্ষে ভোট দেয় ২৮০ জন, বিপক্ষে ২২০ জন। সক্রেটিসের ক্ষমা চাওয়ার পথ খোলা ছিল। তিনি সে সুযোগ নেননি। নিজের আত্মসম্মানকে বিকিয়ে দেননি। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে, কয়েকজন বিচারক হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেন।
এ প্রসঙ্গে হাল আমলে আমাদের মত প্রকাশের ওপর আলোকপাত করবো। নিজের সুবিধামতো কিংবা শুধু নিজের স্বার্থে আঘাত হানবে না—এমন মতকে কখনও মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলা যায় না। আবার  যে মতের মধ্যে দেশের বিরুদ্ধে কুৎসা থাকে, ব্যক্তি বিশেষের প্রতি বিরুদ্ধে কুৎসা থাকে, নির্দিষ্ট জাতি-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কুৎসা থাকে–এগুলোকেও মত প্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় আনা যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে অনেকেই ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’–এই বক্তব্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যা ইচ্ছা তা বলার অধিকার চান। 

মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে আমরা কতদূর যেতে পারি? চাকরিতে সংরক্ষিত কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে গোটা দেশকে জিম্মি করার দিকে নিয়া যাওয়ার একটা তৎপতরতা ছিল আমাদের দেশে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের এক শিক্ষার্থীর ( যে কিনা ছাত্রলীগেরও একজন নেতা) গলায় জুতার মালা পরিয়ে উল্লাস করেছিল। আন্দোলনকারীদের একজন বুকে ‘আমি রাজাকার’ লিখে রাজপথে দিব্যি ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়ে দিলো। এটাও কি মত প্রকাশের স্বাধীনতা?

মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে দার্শনিক সৌরেন কিয়ের্কেগার্ড সুন্দর একটা পর্যবেক্ষণ দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন ‘আমাদের যা আছে, তা আমরা যথাযথ ব্যবহার করি না। আর আমাদের যা নাই, তার জন্য আন্দোলন করি।’ অর্থাৎ আমাদের রয়েছে চিন্তার স্বাধীনতা। আমরা তার কতটুকু ব্যবহার করি? আমাদের নেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আমরা তার জন্যে আন্দোলন করি। কিয়ের্কেগার্ড আবার সতর্ক করেছেন অন্য জায়গায়। লেখালেখি হচ্ছে সত্যকে প্রকাশ করা। আর সত্য হচ্ছে আগুনের মতো। আর সত্যকে স্পর্শ করলে হাত পুড়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে মত প্রকাশের কারণে হয়রানির শিকার, জেল-জুলুমের শিকার এই উপমহাদেশ কেন সারা বিশ্বেই তো নতুন নয়। শুরুতেই তো বলেছি সক্রেটিসের কথা। আমাদের দেশের ইতিহাসে চোখ দিলে দেখবেন, ব্রিটিশবিরোধী লেখালেখির কারণে কবি কাজী নজরুল ইসলামও জেল জুলুমের শিকার হয়েছিলেন। তাই বলে কি তিনি লেখা বন্ধ করেছিলেন?

আবার পাকিস্তান শাসনামলে খাজা শাহাবুদ্দিন তথ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করললেন। এই নিষিদ্ধের পক্ষেও কোনও কোনও বুদ্ধিজীবী অবস্থান নিয়েছিলেন। তাহলে এই পক্ষ নেওয়াটাকেও আমরা বাকস্বাধীনতা বলি। কিন্তু এটা কি তারা সঠিক কাজ করেছিলেন? একইভাবে বর্তমান বিশ্বে জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জও চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উইকিলিকসের মাধ্যমে উন্মুক্ত করছে দুনিয়ার সামনে। তিনিও তো জুলুমের শিকার হচ্ছেন। একটি দেশের দূতাবাসে নির্বাসনের মতোই জীবন চলছে জুলিয়ানের। তো, এজন্য কি বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থাগুলো খুব বেশি সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে? কিংবা কয়জন নোবেলজয়ী তার মুক্তির জন্য, নিরাপদে চলাচলের জন্য দাবি জানিয়েছেন? 

আমাদের দেশে বাকস্বাধীনতার নামে কী হয়?  একদল আছেন যারা মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বেড়ান, আবার মাদ্রাসার অনেকে কথায় কথায় ‘নাস্তিক’ উপাধি দিয়ে বসেন। এগুলো নির্ধারণ করে দেওয়াও কি বাকস্বাধীনতার অংশ? এই যে বাকস্বাধীনতার নামে একজনকে নাস্তিক বলে দেওয়া একজনকে জঙ্গি বলে দেওয়া–এগুলোকে কোন নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করবেন আপনারা?

মত প্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা বাকস্বাধীনতা নিয়ে নিজের একটা অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যেতে পারে।

সাপ্তাহিক হলিডে এবং দৈনিক নিউ এইজ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ খান আমাদের সবার মিন্টু ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন – মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মূল তাৎপর্য হলো অন্যের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও সম্মান করা।

যাইহোক, আমি তখন নিউ এইজ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি। একবার একটা চিঠি এসেছে মিন্টু ভাইয়ের কড়া সমালোচনা করে। আমি চিঠিটা চিঠিপত্র বিভাগে বসিয়ে পাতার মেকআপ করিয়েছি। সম্পাদকীয় বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ সহকর্মী মিন্টু ভাইয়ের বিরুদ্ধে সমালোচনার অংশটুকু লাল কালি দিয়ে কেটে দিয়েছেন। প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে মিন্টু ভাই সম্পাদকীয় এবং  বা মতামত পাতা দুটি একবার নজর বোলাতেন। ওইদিন মিন্টু ভাই পাতা দুটি দেখে আমাকে ডেকে বললেন– ‘শোনো, আমার বিরুদ্ধে লেখা অংশটুকু ফেলে দিও না, যেমন আছে, তেমনি যাবে। আমরা যদি অন্যদের সমালোচনা করতে পারি, তাহলে অন্যেরা কেন আমাদের সমালোচনা করতে পারবে না?’

আমাদের দেশের কেউ কেউ ব্লগিং করে কিংবা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে যা ইচ্ছা তা বলে বেড়ান। এটা কখনও বাকস্বাধীনতার অংশ হতে পারে না। অনেককে দেখা যায়, বিদেশি মিডিয়া পেলেই দেশের নামে বদনাম করার জন্য দুই লাইন জুড়ে দেন। দেশের দুর্নীতি কিংবা আপনার ভাবনা নিয়ে অভিমত দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু যখন কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আপনি দেশের বদনাম গাইবেন, তখন সেটা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে থাকে না, সেটা হয়ে পড়ে ষড়যন্ত্র। 

এ বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। সত্য বলাটা অবশ্যই বাকস্বাধীনতার অংশ। কিন্তু মিথ্যাকে সত্যের মতো করে তুলে ধরাটা কখনও বাকস্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হতে পারে না। তাই আমাদের মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ভাবতে হবে কোনটা সত্য এবং কোনটা মিথ্যা।

লেখককবি নাট্যকার, আদিবাসী ভাষা সাহিত্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছেন

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ