ছদ্মবেশী প্রতারক হতে সাবধান

Send
রিয়াজুল হক
প্রকাশিত : ১৪:৪৪, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৫, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮

রিয়াজুল হককয়েক দিন আগে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। ব্যক্তিগত প্রয়োজনেই একটি ব্যাংকে গেলাম। শাখা ব্যবস্থাপক পূর্ব পরিচিত। শাখা ব্যবস্থাপকের চেম্বারে বসার কিছু সময় পর একজন বয়স্ক লোক (বয়স সত্তরের ওপরে হবে) এলেন। তার টাকা একজন চালাকি করে নিয়ে গেছেন। কীভাবে নিয়ে গেছে জানতে চাইলে বললেন, গতকাল দুপুরের সময় আমি ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা উঠিয়ে পাশের চায়ের দোকানে গেলাম। সেখানে এক কোনায় টাকাগুলো আমি গুনছিলাম। এক লোক আমার কাছে এসে বললো, চাচা আপনার কাছে তো সব ১০০০ টাকার নোট। আমি ঢাকা যাবো, আমার কাছে ৫০০ টাকার নোট আছে। আপনি যদি বড় নোট আমাকে দেন, তবে আমার অনেক উপকার হবে। আমি ব্যাংকের টাকা ওই লোককে দিয়ে দিলাম। আর তিনি ৫০০ টাকার দুই বান্ডেল নোট আমাকে দিলেন। লোকটি আমাকে চা-বিস্কুট খাওয়ালো। আমার সাথে দশ বছরের নাতি ছিল। তাকেও চিপস কিনে দিয়েছিল।
ম্যানেজার: আপনি সেই টাকা গুনে নেননি?
ভদ্রলোক: আমি তো গুনি নাই। সেই লোক আমার সামনে তার সেই টাকা গুনে দিয়েছিল।

ম্যানেজার: তাহলে সমস্যা কোথায়?

ভদ্রলোক: গতকাল রাতে যখন দোকানে টিনের দাম দিতে যাবো, তখন মেয়েকে বললাম তিরিশ হাজার টাকা দাও। মেয়ে টাকা গুনতে গিয়ে দেখে, ৫০০ টাকার মধ্যে ১০০ টাকার নোট ঢুকানো।

ম্যানেজার: কী বলেন, তারপর?

ভদ্রলোক:  প্রথম বান্ডেলে ৪০টা ১০০ টাকার নোট ঢুকানো ছিল। আর অন্য বান্ডেলেও ৪০টা ১০০ টাকা নোট ছিল।

ম্যানেজার: তার মানে ৮০টা ৫০০ টাকার নোটের জায়গায় ১০০ টাকা ছিল। আপনার তো ৩২,০০০ টাকা ক্ষতি হয়ে গেল। ভদ্রলোক: ছেলেটার এত কষ্টের টাকা।

ম্যানেজার: সব ঘটনা তো ব্যাংকের বাইরে ঘটছে। চায়ের দোকানও একটু দূরে। এখন আমি আপনার জন্য কী করতে পারি বলেন?

ভদ্রলোক: আমি যখন ব্যাংকে ছিলাম, তখন ওই লোককে আমি ব্যাংকের ভেতর দেখেছিলাম। আপনি একটু ক্যামেরায় দেখে দেন।

ম্যানেজার: আপনি বসেন। আমি দেখাচ্ছি।

পুরো ঘটনাটি শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। তবে এরকম ঘটনা আমাদের চারপাশেই ঘটছে। হরদম ঘটছে। হয়তো প্রেক্ষাপট ভিন্ন। প্রতরণার ধরনে মিল নেই। কিন্তু প্রতারণা তো প্রতারণাই। সাধারণ, নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

প্রতারণা বিভিন্ন রকমের হতে পারে। তবে উপরের ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা কিছু প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি।

এক. ব্যাংক থেকে টাকা তোলার সময় নিজের পরিচিত কাউকে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করুন। বয়স্ক মানুষ অবশ্যই সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে যাবেন।  তবে সাথে কাউকে রাখতে গিয়ে ৭/৮ বছরের নাতি/নাতনি নিয়ে যদি ব্যাংকে যান, তবে সাথে না নেওয়াই ভালো। কারণ, তখন আপনাকে আপনার সেই অবুঝ নাতি-নাতনির দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে।

দুই. ক্যাশ কাউন্টার থেকে টাকা নেওয়ার পর প্রয়োজনে কাউন্টারের সামনেই টাকা গুনে নিন। একই টাকা বিভিন্ন জায়গায় বসে গোনার দরকার নেই। এতে আপনার নোটের সংখ্যা বাড়বে কিংবা কমবেও না। ক্যাশ কর্মকর্তারা আপনার সামনেই সাধারণত একবার হাতে টাকা গুনে দেখার পর কাউন্টার মেশিন দিয়ে টাকা চেক করে নেন।

তিন. অনেকেই থাকেন টাকা গুনে দেখার পর আবার কাউন্টারে গিয়ে ১০০০ টাকার নোট খুচরা করে দেন, এই নোট পরিবর্তন করে দেন, জাল টাকা কিনা পরীক্ষা করে দেন ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। টাকা ভাঙিয়ে নেওয়ার পর কিংবা অন্যান্য সমস্যা সমাধানের পর আবার সব টাকা গোনা শুরু করেন। এতে আপনি প্রতারকচক্রের চোখে পড়ে যেতে পারেন। কারণ, এ ধরনের প্রতারক দ্বিধাগ্রস্ত কিংবা বয়স্ক মানুষকে বেশি টার্গেট করে।

চার. যতদূর সম্ভব ভিড়ের মধ্যে থাকবেন না। আপনাকে কেউ খেয়াল করছে কিনা কিংবা নিজে থেকে কেউ এসে পরিচিত হতে চাচ্ছে কিনা, লক্ষ রাখুন। ঠিকমতো কথার উত্তর না দিলে কে কী মনে করবে, এসব পাত্তা দেবেন না।

পাঁচ. ব্যাংকের ভেতর বিভিন্ন মানুষের সাথে খোশগল্পে মেতে ওঠা থেকে বিরত থাকুন। এই বাতিক কিছু মানুষের মধ্যে দেখা যায়।

ছয়. টাকা-পয়সা নিয়ে ব্যাংকের ভেতর সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে থাকার চেষ্টা করুন। এতে আপনার ওপর যারা নজর রাখছে কিংবা ব্যাংকের ভেতর আপনার সঙ্গে যারা কথা বলেছে, তাদের মধ্যে কেউ অপরাধী হলে পরবর্তীতে তাদের শনাক্ত করা সহজ হবে।

সাত. যদি প্রয়োজন মনে করেন, টাকা উঠানোর পর কীভাবে বাসায়/নির্দিষ্ট স্থানে যাবেন, তবে তার জন্য আগে থেকে পরিবহনের ব্যবস্থা করে রাখতে পারেন।

আট. ব্যাংক থেকে টাকা উঠানোর পর আশপাশে চা-বিস্কুট, নাস্তা খাওয়া, ঘোরাঘুরি থেকে বিরত থাকুন। সোজা নিজের গন্তব্যে চলে যান। এতে প্রতারকচক্র সহজে আপনাকে টার্গেট করতে পারবে না।

নয়. টাকার পরিমাণ বেশি হলে পুলিশি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

প্রতারণা যে কত রকমের হতে পারে, তার কোনও ইয়াত্তা নেই। এই লেখায় শুধু একটি বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। ঘটে যাওয়ার পর মনে হয়, আমরা প্রতারণার শিকার হলাম। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। তাছাড়া ছদ্মবেশী প্রতারক থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের আরও বেশি সাবধান থাকা উচিত। আপনার কষ্টের টাকা। নিজেকে অনেক সাধ পূরণ থেকে বিরত রেখে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কিছু টাকা সঞ্চয় করেছেন। ছদ্মবেশী প্রতারকের কেউ এসে আপনার পরিশ্রমের জমানো টাকা প্রতারণা করে নিয়ে যাবে, সেটা কখনও হতে পারে না। সহজ সরল মানুষগুলোই বিপদে পড়ে বেশি। কারণ, তারা সাবধান থাকে না। একটা মানিব্যাগ ছিনতাইয়ের জন্য একজন অন্যজনকে খুন/জখম করছে। মানিব্যাগে সর্বোচ্চ কত টাকা থাকতে পারে? ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা! সামান্য এই টাকার জন্য ছিনতাইকারী যখন আহত কিংবা হত্যা করে, তখন ব্যাংক থেকে ১ লাখ বা ৫ লাখ টাকা নিয়ে যখন আপনি বের হবেন, তখন সাবধানতা অবশ্যই জরুরি। কারণ, ক্ষতি হলে আপনারই হবে। অন্য কারও কিছু যাবে আসবে না।  

লেখক: উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ