বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিব্বতি মুক্তিযোদ্ধা

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৪:০৯, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১১, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮

মোস্তফা হোসেইনবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর অবদান স্বীকৃত। কিন্তু তৃতীয় দেশ হিসেবে তিব্বত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে অবদান রেখেছে, তা নিয়ে খুব একটা কথা হয় না। অথচ সেদেশের ৮০ থেকে ১০০ জন নাগরিক শহীদ হয়েছেন একাত্তরে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে। আইনগত কারণে একাত্তরে তাদের যুদ্ধকথা প্রকাশ হয়নি ওইভাবে। আজ সময় এসেছে তিব্বতিদের অবদানকে স্বীকার করার।

ভারতীয় বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত তিব্বতিদের অংশগ্রহণের বিষয়ে সামান্য লেখা পাওয়া যায়। কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে তারা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যে লড়াই করেছে, তা নিয়ে আমাদের ইতিহাসবিদদের খুব একটা কথা বলতে শোনা যায় না। ভারতীয় বাহিনী যেমন মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তেমনি তিব্বতের মুক্তির জন্য গঠিত স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে আমাদের বিজয়কে দ্রুততর করেছে। এই এসএফএফ মূলত তিব্বতের গেরিলা বাহিনী, যারা চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল ১৯৬২ সালে। এসএফএফ-কে এস্টাব্লিস্টমেন্ট টু টু বলা হয়। আবার সংক্ষেপে শুধু টু টু-ও বলা হয়।

এই বাহিনীর দাপন বা ব্রিগেডিয়ার ছিলেন রাতুক জাওয়াং। রাতুক জাওয়াং আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তিব্বতিদের অংশগ্রহণ,তাদের ত্যাগ ও অর্জন সম্পর্কে তার বইয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বক্তব্য থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালে দিল্লিতে মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান তিব্বতি সৈনিকদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রস্তাব করেন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। তিব্বতি আরেক সিনিয়র দাপন জম্পা কালদেন এতে রাজি হয়ে যান। কিন্তু জাওয়াং বললেন, প্রস্তাবটা আনুষ্ঠানিক হতে হবে। যেহেতু ভারতীয় সৈন্যদেরই বাংলাদেশের হয়ে লড়াই করাটা ওই মুহূর্তেও অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে ছিল, তাই তিব্বতিদের জড়িত হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিক হওয়ার সুযোগ ছিল কম। কিন্তু  জাওয়াং বললেন, টু টু গঠিত হয়েছে তিব্বতের স্বার্থে ভারতীয় সৈনিকদের সঙ্গে কাজ করার জন্য এবং তাদের কার্যসীমাও ভারত-চিন সীমান্ত এলাকায়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগী হিসেবে যুদ্ধ করতে হলে, টু টু-র যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য তা থেকে সরে যেতে হবে।  তবে, ভারত সরকার যদি বলে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে তোমাদের অংশ নিতে হবে, তখন সেটা ভিন্ন জিনিস। মোট কথা হচ্ছে, ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক চিঠি পেলেই টু টু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবে বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।

মেজর জেনারেল উবান শেষ পর্যন্ত তাতেই রাজি হলেন। এরপর থেকে টু টু তিব্বতি রেজিমেন্ট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মাঠে নেমে পড়ে। ওই সময় রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল উত্তর প্রদেশে। সেখানে গেলেন ভারত সরকারে বৈদেশিক বিষয়ক সিনিয়র কর্মকর্তা আর এন কাও। আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয় তিব্বত কর্তৃপক্ষের কাছে। এদিকে ধর্মশালাতেও সিদ্ধান্ত হয়েছে, রেজিমেন্ট টু টু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে যাচ্ছে। মেজর জেনারেল উবান রেজিমেন্ট টু টু’র অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এই বেসামরিক কর্মকর্তা আর এন কাও ছিলেন ছায়ার মতো।

যাই হোক তিব্বতি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর রেজিমেন্টের  দাপন জাওয়াং, দাপন ধনধুপ গেয়াটুসাং, দাপন পেকার থিনলির নেতৃত্বে তিনটি ইউনিট গঠিত হয়। দাপন জম্পা কালদেন রয়ে গেলেন প্রশাসনিক কাজে। ভারত সরকার ও রেজিমেন্ট টু টু-র মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা তার দায়িত্বে অর্পিত হলো। ফলে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে পারলেন না। গেয়ালো থনডুপ ছিলেন দেরাদুন এসএফএফ এর স্ট্র্যাটেজিক চিফ। বাংলাদেশ যুদ্ধে টু টু-কে পাঠানোর এই প্রক্রিয়ায় তিনি যুক্ত ছিলেন না। এখানে একটা বিষয় বলা দরকার, দাপন পদটা শুধু সামরিক পদবিই নয়। তিব্বতিদের মুক্তির লড়াইয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বও তাদের হাতে। কিন্তু তিব্বতিরা যখন ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে তখন ভারত সরকার তাদের রাজনীতি না করার শর্ত আরোপ করে। সেই কারণে থনডুপ ও অনড্রাপ গনপু তাসি সামরিক বাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন।

যাই হোক, টু টু রেজিমেন্ট বাংলাদেশ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। দেরাদুনে তাদের প্রশিক্ষণ শিবির ছিল। মেজর জেনারেল উবান তাদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। ওই সময় বাংলাদেশ থেকে প্রায় হাজারখানেক মুক্তিযোদ্ধা আসেন দেরাদুনে। তাদেরও প্রশিক্ষণ প্রদানের দায়িত্ব পড়ে মেজর জেনারেল উবানের ওপর। বাংলাদেশের ওই মুক্তিবাহিনীর কিছু সদস্য টু টু রেজিমেন্টের গাইড ও সহযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করে।

নভেম্বর মাসে জাওয়াং বাংলাদেশে আসেন। তখন তার বয়স ৩৯ বছর। প্রথম তাদের দায়িত্ব পড়ে মিজো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবিলা করার। লক্ষণীয় যে মিজোদের বিরুদ্ধে তিব্বতিদের লড়াইয়ের মধ্যেও পাকিস্তান ও ভারতের যোগসূত্র রয়েছে। তিব্বতিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল ভারতীয় সৈন্যরা আর মিজোদের প্রশিক্ষক ছিল পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী। দেরাদুন থেকে তাদের নেওয়া হয় কলকাতা। বিমানে করে সেখানে আসেন তারা। সেখান থেকে মিজোরাম নেওয়া হয় সড়ক পথে। মিজোরাম সীমান্তে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ে যুক্ত হতে হয় নভেম্বরেই। নভেম্বরের ১২ তারিখ থেকে একটানা ২৮দিন লড়াই চলে সেখানে। এস্টাব্লিস্টমেন্ট টু টু বা রেজিমেন্ট টু টু-র সৈনিকরা মূলত কমান্ডো যুদ্ধের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কারণ, চীনের সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের ওই পদ্ধতিতেই লড়াই করতে হয়েছে। মেজর জেনারেল উবান নির্দেশ দিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধেও কমান্ডো আক্রমণই যেন তারা পরিচালনা করে। ২৮ দিনের লড়াইয়ে সাফল্যও আসে। অসংখ্য পাকিস্তানি সৈন্য সেই লড়াইয়ে প্রাণ হারায়। শুধু তাই নয় জীবিত অনেক সৈন্য তাদের কাছে আত্মসমর্পণও করে।

মেজর জেনারেল উবান তাদের নির্দেশ দিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের অপারেশন চালানোর জন্য।, যেখানে প্রায় এক হাজার সৈন্য ছিল।  তাদে সঙ্গে ছিল বাঙালি মুক্তিবাহিনীর কিছু সদস্য। মেজর জেনারেল সরাসরি এস্টাবলিস্টমেন্ট টু টু-কে কমান্ড করছিলেন। তিনি ওয়াকিটকির মাধ্যমে সৈন্যদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতেন। নির্দেশনাও প্রদান করতেন।  তিনজন দাপনের সঙ্গে যুক্ত হন ভারতীয় বাহিনীর তিনজন কর্নেল পদমর্যাদার সৈনা কর্মকর্তাও। ট্রুপের মধ্যে মেডিক্যাল টিমও যুক্ত হয়, যাদের সিনিয়র কর্মকর্তা ছিলেন কর্নেল ও মেজর পদমর্যাদার। তারা সবাই ছিলেন ভারতীয় বাহিনীর। পাবর্ত্য চট্টগ্রামের মুক্ত এলাকায় তখন তাদের জন্য হাসপাতালও তৈরি হয়। আহত সৈনিকদের সেখানে পাঠানো হতো চিকিৎসার জন্য।  লক্ষণীয় যে, ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর সদস্যরা তিব্বতিদের যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি সহযোগিতা করতে কম সক্ষম হয়েছেন। কারণ, ওখানে কর্মরতদের মধ্যে গেরিলা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভারতীয় সৈনিক ছিল না। ফলে সেই লড়াইয়ে তিব্বতিদের নিজেদের কৌশলেই এগিয়ে যেতে হয়েছে।

১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর পান তারা। তাদের পক্ষ থেকে মেজর জেনারেল উবান এবং আর এন কাও চট্টগ্রামে যান।

জাওয়াং এর তথ্য অনুযায়ী, সেই যুদ্ধে তিব্বতিদের ৫৬ জন শহীদ হয়েছেন এবং ১৯০ জন আহত হয়েছেন। বীরত্বপূর্ণ এই লড়াইয়ের পরও কোনও তিব্বতি সৈন্য কোনও খেতাব পাননি।

লেখক: সাংবাদিক, শিশু সাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ